কমরেড ভারতজ্যোতি রায়চৌধুরী ছিলেন একজন মহান নকশালবাদী বিপ্লবী

ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে কমরেড ভারতজ্যোতি রায়চৌধুরী (১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬), যিনি অনেক সময় সাধারণ্যে কমরেড বি. জে. চৌধুরী নামে পরিচিত, ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট বিপ্লবী আন্দোলনের প্রথম যুগের নেতা, অবিভক্ত সিপিআই (এম-এল)-এর বাংলা বিহার সীমান্ত আঞ্চলিক কমিটির অন্যতম সদস্য। তাঁর জীবনের মূল ভিত্তি ছিল শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষা এবং সাম্যবাদী আদর্শের প্রসার।

কমরেড ভারতজ্যোতি রায়চৌধুরী ছিলেন অবিভক্ত ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম একজন একনিষ্ঠ কর্মী। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে যখন ভারতবর্ষ জুড়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন এবং পরবর্তীতে কৃষক-শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের লড়াই তীব্র হয়ে ওঠে, তখন তিনি বামপন্থী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে রাজনীতিতে পদার্পণ করেন। সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা মোচনে মার্কসবাদ ও লেনিনবাদের আদর্শকে পাথেয় করে তিনি আজীবন কাজ করে গেছেন।

ভারতজ্যোতি রায়চৌধুরী ছিলেন একজন বিশিষ্ট গবেষক, লেখক এবং রাজনৈতিক কর্মী, যিনি মূলত নকশাল আন্দোলন ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে গবেষণার জন্য পরিচিত। তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ সাতচল্লিশ থেকে ৭০ এবং আগে পরে যেটির প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান পুনশ্চ। এই বইটিতে তিনি বীরভূমের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক আন্দোলন এবং নকশাল আন্দোলনের সময়কাল, বিশেষত ১৯৭১-৭২ সালের অস্থির পরিস্থিতির প্রামাণিক তথ্য তুলে ধরেছেন। তাঁর প্রামাণ্য গ্রন্থ সাতচল্লিশ থেকে সত্তর এবং আগে পরেতে নাম–ঠিকানাসহ লিখেছেন পুলিশের হাতে ১৯৭১ সালের জুলাই থেকে ১৯৭২ সালের জানুয়ারির মধ্যে শুধু বীরভূম জেলাতেই মারা গেছেন অন্তত ৭১ জন। ভারতের অন্য রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে জাতপাতের লড়াই বা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় (দেশভাগ বাদ দিলে) খুব বেশি মানুষ মারা যাননি। কিন্তু রাজনৈতিক হিংসায় মৃত্যু হয়েছে ধারাবাহিকভাবে।

কমরেড ভারতজ্যোতি রায়চৌধুরী: এক আদর্শনিষ্ঠ বিপ্লবীর জীবন

তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বড় একটি অংশ অতিবাহিত হয়েছে কৃষক ও শ্রমিক সংগঠন গড়ে তোলার কাজে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ এলাকায় ভূমিহীন কৃষকদের অধিকার রক্ষা এবং জোতদার-জমিদারদের শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তিনি সম্মুখ সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল প্রখর, যার ফলে অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশেও তিনি সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারতেন। দলের অভ্যন্তরে তিনি একজন অত্যন্ত পড়াশোনা জানা এবং তাত্ত্বিক নেতা হিসেবে শ্রদ্ধেয় ছিলেন।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অত্যন্ত সাদাসিধে ও আড়ম্বরহীন জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। ক্ষমতার মোহ বা পদমর্যাদার চেয়ে আদর্শের প্রতি আনুগত্যই ছিল তাঁর কাছে মুখ্য। বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি কারাবরণ করেছেন এবং নানা পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, কিন্তু কক্ষনো নিজের নীতি থেকে বিচ্যুত হননি। তাঁর অমায়িক ব্যবহার এবং সাধারণ মানুষের সাথে মিশে যাওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা তাঁকে জনগণের প্রিয় করে তুলেছিল।

কমরেড ভারতজ্যোতি রায়চৌধুরীর অবদান কেবল রাজনৈতিক ময়দানেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি বামপন্থী চিন্তাধারার প্রসারে লেখালেখি এবং লিফলেট প্রচারের কাজেও যুক্ত ছিলেন। নতুন প্রজন্মের কর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন একজন পথপ্রদর্শক ও শিক্ষক। তাঁর মৃত্যুতে কমিউনিস্ট আন্দোলনে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, তা আজও অপূরণীয়। শ্রমজীবী মানুষের মুক্তি এবং বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের বিপ্লবীদের জন্য আজও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে রয়েছে।

সাতচল্লিশ থেকে সত্তর এবং আগে পরে

কমরেড ভারতজ্যোতি রায়চৌধুরী রচিত একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ হচ্ছে সাতচল্লিশ থেকে ৭০ এবং আগে পরে। এই বই সম্পর্কে তিনি নিজেই বলেছিলেন যে, বস্তুত কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনই তার অভীষ্ট পূরণ না হওয়া পর্যন্ত শেষ হয়ে যায় না। আন্দোলনে বাঁক আসে, বাধা আসে, বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হয়, থমকাতে হয়, … কিন্তু থামে না।

তিনি লিখেছিলেন রাজনৈতিক আন্দোলনের মানচিত্র তৈরির কাজে ইতিহাসবিদদের উপর খুব একটা নির্ভর করা যাবে না, … কেননা সংবাদপত্রের ভাষ্য, পুলিশী ভাষ্য, ইতিহাসবিদদের ভাষ্য তেমনই রাজনৈতিক নেতাদের ভাষ্য বা তাদের ছাপানো কর্মসূচি, কর্মকৌশল ইত্যাদি দেখতে হবে। তিনি বলেছিলেন, তিনি রাজনৈতিক দলের ইতিহাস লিখতে বসেননি, … চেষ্টা করেছেন রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস লিখতে। তিনি মনে করতেন, ফেলে আসা পথের তথ্যনিষ্ট মানচিত্র এবং এগিয়ে যাবার পথের নকশা, রাজনৈতিক কর্মীদের নিজেদেরকেই বানিয়ে নিতে হবে।

বইটি তিনটি পর্বে সমাপ্ত করেছিলেন। প্রথম পর্বে আছে জাতীয় কংগ্রেসের জন্ম, স্বাধীনতা আন্দোলনের অহিংস এবং সশস্ত্র সংগ্রামী ধারা, সোশ্যালিস্ট এবং কমিউনিস্ট আন্দোলনের সূচনা। ১৯৪৭- এর ক্ষমতা হস্তান্তর এবং মুলতুবি হয়ে যাওয়া স্বাধীনতা সংগ্রাম।

দ্বিতীয় পর্বে আছে যোশীর আইনী যুগ, রণদিভের বে-আইনী যুগ পার হয়ে উদ্বাস্তু পর্ব, তেলেঙ্গানা-কাকদ্বীপ, ভারতীয় কমিউনিস্টদের স্তালিনের সাথে সাখ্যাৎকার। স্তালিনের মৃত্যু, চিন-ভারত যুদ্ধ, পার্টি ভাগ। ১৯৬৬-এর খাদ্য-আন্দোলন পার করে ১৯৬৭-এর যুগবিভাজিকা — নকশালবাড়ির সূচনা।

তৃতীয় পর্বে আছে শুধুই সত্তর। বিদ্রোহ,বিকাশ এবং বিস্তার। শেষ ষাটের বিস্তৃতি, ১৯৭০ এবং সি পি আই (এম-এল)। ৮/১ পার্টি কংগ্রেস। কংগ্রেসের আগে এবং পরে — কলকাতা ‘৭১। রাষ্ট্রের দ্বারা সংগঠিত গণহত্যা গুলি (বেলেঘাটা, কোন্নগর, বরানগর-কাশীপুর, হাওড়া এবং অন্যান্য), সরোজ দত্তের গ্রেফতার এবং হত্যা, জেল সংঘর্ষ, জেল লাইন,জেল হত্যা। বীরভূমে ক্ষেত্র সমীক্ষা। সমীক্ষায় উঠে আসা শহিদদের নামের তালিকা এবং ফটো। শহিদদের সামাজিক অবস্থানের উপর ৪টি সারণী, নির্দিষ্ট এলাকায় আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের নামের তালিকা, তাদের সামাজিক অবস্থানের উপর ৫ টি সারণী। পশ্চিমবঙ্গ বিহার সীমান্ত আঞ্চলিক কমিটির শেষ বৈঠক, আঞ্চলিক কমিটির দ্বিতীয় দলিল। বাকি ইতিহাস।

পশ্চিমবঙ্গ, বীরভূম ও রামপুরহাট শহর

ভারতজ্যোতি রায়চৌধুরী পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন রাজনৈতিক সহিংসতা ও আন্দোলন নিয়ে গবেষণাধর্মী কাজ ও লেখালিখি করতেন । ভারতজ্যোতি রায়চৌধুরী তাঁর গবেষণার মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের, বিশেষ করে বীরভূমের, রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট ও উত্তাল সময়ের দলিল সংরক্ষণ করেছেন

গবেষক ও রাজনৈতিক কর্মী ভারতজ্যোতি রায়চৌধুরী নকশাল আন্দোলন নিয়ে এবং পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক সঙ্কট, আর খুব পরিষ্কার বললে এর জন্য কংগ্রেসই যে দায়ী তা উল্লেখ করেছেন। ১৯৪৭ সালের হস্তান্তরের পর থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত যত দিন তারা টানা ক্ষমতায় ছিল, তত দিন ভারতের জাতীয় কংগ্রেস এমন আর্থিক নীতি বানিয়েছে, যাতে পশ্চিমবঙ্গ একটি দরিদ্র রাজ্যে পরিণত হয়। পশ্চিমবঙ্গ থেকে টাকা বেরিয়ে যায় আর এটি একটি ‘লেবার হাব’ বা শ্রমিক জোগানের কারখানা হিসেবে গড়ে ওঠে, এটাই ছিল কংগ্রেসের লক্ষ্য। গোটা পূর্ব ভারতকে শ্রমিক জোগানের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছিলো স্বাধীনতা-উত্তর ভারত।

রামপুরহাট শহরের উপরে ওঁর আলাদা দুর্বলতা ছিল কারণ উনি কিছুদিন রামপুরহাট কলেজে পড়াশোনা করেছিলেন। রামপুরহাটের কথা তিনি তাঁর লেখা সাতচল্লিশ থেকে সত্তর এবং আগে পরে নামক বইয়ে বারবার উল্লেখ করেছেন। অসাধারণ একজন পণ্ডিত মানুষ ছিলেন। ঘন্টার পর ঘন্টা তিনি শোনাতে পারতেন তাঁদের অতীতের নকশালপন্থী রাজনৈতিক কথা। কথায় চলে আসতো অসীম চ্যাটার্জী, শৈলেন মিশ্র, সুদেব বিশ্বাস, কিষাণ চ্যাটার্জী প্রমূখ বিশিষ্ট বীরভূমের নকশাল নেতাদের তখনকার রাজনৈতিক কার্যকলাপের ঘটনা।

মৃত্যু

কমরেড ভারতজ্যোতি রায়চৌধুরী গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখ রাত্রে শ্রীরামপুরের শ্রমজীবী হাসপাতালে প্রয়াত হয়েছেন। তাঁর পিতা ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী আন্দামান ফেরত প্রদ্যুৎ রায় চৌধুরী। এছাড়াও তাঁর পিসেমশায় ভালাস গ্রামের প্রভাত ঘোষ ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী লড়াইয়ের অগ্নিনায়ক। 

আরো পড়ুন

টিকা

১. লেখাটির কিছু তথ্য ফেসবুকের কয়েকটি পোস্ট থেকে সংগৃহীত এবং বর্ধিত আকারে ফুলকিবাজ.কমে প্রকাশ করা হয়েছে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!