ডকুমেন্টারি ফিল্ম

ডকুমেন্টারি ফিল্ম সম্পর্কে আমাকে আপনারা কিছু লিখতে বলেছেন। (ডকুমেন্টারি ফিল্মের বাংলা হিসেবে তথ্যচিত্র বা দলিলচিত্র আমার পছন্দ নয়।) ও-ধরনের ছবি সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা অত্যন্ত সীমাবদ্ধ। কাজেই আমার কথাগুলোকে আপনারা দয়া করে প্রামাণ্য বলে ধরে নেবেন না।

এককালে বিহার সরকারের হয়ে উপজাতিদের বিষয়ে কিছু ছবি করা গিয়েছিল, মাঝে পুনার বিপর্যয় ঘটে, সেখানেও কিছু কিছু কাজ কর্ম করতে হয়েছে এবং হালে ভারত সরকারের হয়ে একটি ডকুমেন্টারি আমি শেষ করেছি। মোটামুটি এই আমার অভিজ্ঞতার পুঁজি।

ভারতবর্ষের পরিপ্রেক্ষিতে ডকুমেন্টারি ফিল্ম করার অবস্থা অত্যন্ত সীমিত বলেই মনে হয়। এদেশে প্রধানত ভারত সরকার এবং বিভিন্ন রাজ্য সরকার এধরনের ছবি করিয়ে থাকেন। তার মধ্যে রাজ্য সরকারগুলোর কথা না তোলাই ভালো। তারা যা কাণ্ড করেন, সেগুলো ছবি বললে ছবি কথাটারই অপমান করা হয়। ভারত সরকার বরং কিছু পরিমাণে সত্যিকারের গুণী শিল্পীদের রেখেছেন, যারা ছবি ব্যাপারটা বোঝেন। তাদের সচরাচর সুযোগ পাওয়া হয়ে ওঠে না, কারণ একটা সরকারি ব্যাপারের মধ্যে থাকলে কতকগুলো দিনগত পাপ ক্ষয় করতেই হয়। তবুও তারই ফাকে ফাকে তারা কিছু কাজ করেছেন, যেগুলোর জন্য গর্বিত এবং কৃতজ্ঞ বোধ করা চলে।

কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, ভারত সরকার বাইরের প্রযোজকদের যে-সমস্ত ছবি চুক্তি করে দেন, সেগুলো প্রায় সবসময়ই অতি অখাদ্য বলে যে-কোনো ভদ্রলোকের কাছে পরিগণিত হবে। ওগুলোতে কল্পনার অবকাশ প্রায় থাকেই না। কোনো সৃষ্টিশীল শিল্পী তার মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করার অবকাশ খুজে পান না।

তবুও ভরসা ছিল যে, ভারত সরকার এক ভদ্রলোককে ইউনেস্কো থেকে ধার করে এনেছিলেন, ভদ্রলোকটির নাম জাঁ ভাবনাগরি- ইনি যে সমস্ত ছবি প্রযোজনা করেছেন ভারতের বাইরে গিয়ে, তার কিছু কিছু দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। ওঁর রুচি অপূর্ব, ছবি সম্বন্ধে ধারণা তীক্ষ এবং উনি সাধারণ সরকারি কর্মচারীদের মতো ফাইলে আবদ্ধ থাকেন না। ওঁর মেজাজ সত্যিকারের শিল্পীর। কিন্তু খবর পেয়ে দুঃখিত হলাম যে ওঁকে প্যারিসে ফিরে যেতে হচ্ছে আগামী সেপ্টেম্বর মাসে। উনি থাকলে হয়তো কিছু একটা স্থায়ী কাজ হতে পারত।  

এই সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ছাড়া আর একমাত্র এদেশে ডকুমেন্টারি ফিল্মকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আসেন বিভিন্ন বড়ো বড়ো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তারা সকলেই বিদেশী, তাঁদের ঝোকটা সব সময়েই গিয়ে পড়ে ভারতবর্ষের দারিদ্র্য, দুঃখ-দুর্দশা আর মানুষের শোচনীয় জীবনযাপন, এগুলোর ওপরে। তারা পয়সা দিয়ে, ভালো পয়সা দিয়ে, ভালো লোককে দিয়েও এই-সমস্ত ছবি তোলান এবং এগুলোকে পাচার করেন সারা পৃথিবীতে, যার ফলে আমাদের দেশের একটা ভয়াবহ চিত্র বিদেশের লোকের সামনে ফুটে ওঠে।

এ ছাড়া ভারতবর্ষে ডকুমেন্টারি ফিল্ম করার আর কোনো রাস্তা নেই। ভালো ডকুমেন্টারি ভারতবর্ষে প্রচুর হতে পারে, কিন্তু চিরকালের যে ঘটনাটা দুঃখজনক, তা হচ্ছে, যাঁরা ছবি করবেন, তারা সবাই গরিব। কাজেই পয়সাওয়ালা একটা লোকের প্রয়োজন সব সময়ই থেকে যায়। সেজন্য আমার নিজের যেটুকু সামান্য অভিজ্ঞতা হয়েছে, তাতে মনে হয়, ভালো ডকুমেন্টারি ফিল্ম হওয়া এদেশে ভীষণ কঠিন। আর সে-ই করবে, সে-ই একটা প্রচারের ব্যাপার ঢুকিয়ে দিয়ে বসে থাকবে। যার ফলে ছবিগুলোতে শেষ অব্দি উৎরোবার সুযোগ খুব কমই থাকে। অবশ্য একজন ফ্লাহার্টি যদি জন্মাতেন এদেশে, তা হলে ব্যাপারটাকে ঘুরপাক মেরে ঠিক জায়গায় পৌছে দিতে পারতেন। যেমন ‘লুইসিয়ানা স্টোরি’তে ওঁকে শেল অয়েল কোম্পানি একটা তেল খুঁড়ে বের করার ওপরে ছবি করতে দিয়েছিল। উনি সেটাকে লক্ষ ফুট expose করে একটা পাঁচ হাজার ফুটের ছবি দাঁড় চলচ্চিত্র মানুষ এবং আরো কিছু করালেন। এবং কোম্পানির লোকেরা ছবি দেখে কই। তাতে আর সব কথাই আছে, তেলের কথাটাই নেই, এবং আজও পর্যন্ত এই ফিল্মের ফিতের ওপরে যতগুলো মহাকাব্য রচনা হয়েছে, তার মধ্যে এটি একটি সর্বশ্রেষ্ঠ। তা এইরকম জেদ ক’জনের থাকে, ক’জন পারে পৃষ্ঠপোষকদের এইভাবে আঘাত করতে এবং করেও টিকে থাকা! সেটা আমাদের দেশে আশা করা কঠিন। আমরা সকলেই অনেক বেশি ভীতু।

মোটামুটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম সম্পর্কে আর বেশি কিছু বলার নেই, তবে ভারতবর্ষে এখন যা চেহারা, ডকুমেন্টারির কপাল পুড়েছে। এদেশে এখনো পর্যন্ত আমি অন্তত কোনো আশার চিহ্ন দেখছি না। অপরের মতো অন্যরকম হতে পারে, সে বিষয়ে তর্কে অনুপ্রবিষ্ট হতে চাইব না, কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা এই।

কিন্তু মজা কী জানেন, এ দেশটায় একটা ফাটাফাটি কাণ্ড করা যেত মশাই, করা গেল। যদি হত!  

(আমাদের এই বিরাট দেশে কত বিষয় নিয়ে ডকুমেন্টারি করার সুযোগ ছিল। ভারতে কত উপজাতি, তারা এখনও তো সব নিঃশেষ হয়ে যায় নি, ‘সভ্যতা’ এসে কীরকম তাদের বদলে দিচ্ছে; ভারতের নতুন শ্রমিকশ্রেণী, তাদের দৈনন্দিন আচরণের প্যাটার্ন কলকাতার পার্ক স্ট্রিট অঞ্চলের চোঙা-প্যান্ট যুবক কিংবা হাতাকাটা ব্লাউজ যুবতী, আমাদেরই ছেলেমেয়ে তারা এই সব কত বিষয় আছে। দুটো বিদেশী ডকুমেন্টারি ফিল্ম দেখেছিলাম, মনে আছে। নিস্তব্ধ, সুন্দর প্রকৃতি, পাখির ডাক, একটা ব্রিজ আছে, হঠাৎ অনেকক্ষণ ধরে প্রচণ্ড আওয়াজ করতে করতে একটা ট্রেন চলে গেল- ব্যাস, আর কিছু নেই! আরেকটা দেখেছিলাম ; কর্মব্যস্ত শহরে বৃষ্টি পড়তে শুরু করল, কিছুক্ষণ পরে থেমে গেল- এই অল্প সময়টুকুর ফাকে বিভিন্ন চরিত্রের কত বিচিত্র প্রকাশ, বিরহ মিলন বন্ধুত্ব শত্রুতা সব ঘটে যাচ্ছে। এই হচ্ছে ডকুমেন্টারি কাজ। একটা ছোট্ট ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোটা দেশের চেহারাকে দেখিয়ে দেওয়া।)

আরো পড়ুন

টিকা:

১. ঋত্বিক ঘটক রচিত বর্তমান লেখাটি তাঁর চলচ্চিত্র মানুষ এবং আরো কিছু, নিউ এজ পাবলিকেশন্স, ঢাকা; দ্বিতীয় প্রকাশ আগস্ট ২০০৩, পৃষ্ঠা ১৩৪-১৩৬ থেকে সংকলিত। এর আগে লেখাটি ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশিত হয়েছিল। এখানে ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ফুলকিবাজ.কমে হুবহু প্রকাশ করা হলো।

Leave a Comment