চার্লি চ্যাপলিন ফ্যাসিবাদ ও পুঁজিবাদবিরোধি এক মহান চলচ্চিত্রকার

চার্লি চ্যাপলিন নামেই বেশি পরিচিত স্যার চার্লস স্পেনসার চ্যাপলিন জুনিয়র (ইংরেজি: Charlie Chaplin; ১৬ এপ্রিল, ১৮৮৯ – ২৫ ডিসেম্বর, ১৯৭৭) একজন ইংরেজ হাস্যরসিক অভিনেতা, চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং সুরকার যিনি নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। হলিউড সিনেমার প্রথম থেকে মধ্যকালের বিখ্যাততম শিল্পীদের একজন চ্যাপলিন পৃথিবী বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালকও বটে। চ্যাপলিনকে চলচ্চিত্রের পর্দায় শ্রেষ্ঠতম মূকাভিনেতা ও কৌতুকাভিনেতাদের একজন বলেও মনে করা হয়। চলচ্চিত্র শিল্প জগতে চ্যাপলিনের প্রভাব অনস্বীকার্য।[১]

নির্বাক চলচ্চিত্র যুগের অন্যতম মৌলিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব চ্যাপলিন নিজের ছবিতে নিজেই অভিনয়, সংলাপ রচনা, পরিচালনা, প্রযোজনা এমন কী সঙ্গীত পরিচালনা পর্যন্ত করেছেন। শিশুশিল্পী হিসেবে ইংল্যান্ডের ভিক্টোরিয়ান নাট্যমঞ্চ ও মিউজিক হলে সূচিত চ্যাপলিনের ৬৫ বছরের কর্মজীবনের যবনিকাপাত ৮৮ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যুতে।

চ্যাপলিনের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হচ্ছে দ্য সার্কাস, মডার্ন টাইমস, দ্য কিড, সিটি লাইটস, মঁসিয়ে ভের্দু, দ্য গ্রেট ডিক্টেটর প্রভৃতি। মনে করা হয়, দ্য গ্রেট ডিক্টেটর (১৯৪০) হিটলারকে ব্যঙ্গ করে নির্মিত।

চার্লস চ্যাপলিনের সিনেমা দেখে আমরা হাসি। হাস্যরস, কৌতুক আরবিচিত্র পোশাকের এই লোকটি সব সময় সবাইকে জানাতে চায় অভাবীর জন্য কত নির্মম এ সভ্যতা।তাঁর হাসির পেছনে আছে এক তীব্র ক্ষোভ, আছে প্রতিজ্ঞা যিনি ভবঘুরে হয়ে ক্ষমতাশালীকে সামান্যই ভয় করেন। তিনি তাঁর সিনেমাতে দেখিয়ে দেন মানুয়ের জীবন থেমে থাকেনা; থেমে থাকারও নয়। তিনি দেখিয়েছেন যন্ত্র সভ্যতার ভেতর একজন শ্রমিক যান্ত্রিক হবার বাইরেও পরিপূর্ণ মানবিকতা নিয়ে বাঁচতে পারেন। আবার সম্পদের কাছে একজন মানুষের মানবিকতা খাদের তলায় নেমে যেতে পারে।

জীবনের ট্রাজেডি ও কমেডি

চ্যাপলিন তাঁর সিনেমায় দেখিয়েছেন কেউ সাথে না থাকলেও কোন পথে চলতে হবে সামনে; কিভাবে এগুতে হবে জীবনের জন্য, মানুষের জন্য। দেখিয়েছেন সবকিছুর ভেতরেই আছে প্রেম, মানবিকতা, ভালোবাসা আর জীবনের জয়গান। চাপা কোট, সাইজে বড় প্যান্ট, বড় জুতো, মাথায় বাউলার হ্যাট, হাতে ছড়ি আর অদ্ভুত গোঁফঅলা ভবঘুরে হলেও ভদ্রজনোচিত আদব-কায়দায় সুসংস্কৃত এবং সম্মানবোধে অটুট চার্লি চ্যাপলিন মানবিকতায় ভরপুর এক বিশ শতকের মহান বিপ্লবী।

আরো পড়ুন:  কোমল গান্ধার চলচ্চিত্র দুই বাংলার সাংকৃতিক মেলবন্ধনের আকুতি

সেই সাথে আমরা বুঝতে পারি এই ছোট্ট দুটি হাত ও ছোট্ট দুটি পায়ের মহৎ মানুষটির অফুরন্ত ভালোবাসা। তাই তিনি অতি সহজে বলতে পারেন,

“মানুষকে ভালোবাসার জন্য যদি আমাকে কমিউনিস্ট বলা হয় তবে আমি একজন কমিউনিস্ট”।

চ্যাপলিনের শৈশব কাটে প্রচণ্ড দারিদ্র আর কষ্টের মাঝে আর তাই হয়তো তিনি উপলদ্ধি করতেন দেওয়া ও পাওয়াতে, ভালবেসে আর ভালবাসাতে কী আনন্দ। তিনি একটা কথা প্রায়ই বলতেন যে বৃষ্টিতে হাঁটা খুবই ভালো কারণ এই সময় কেউ তোমার চোখের অশ্রু দেখতে পায় না।

অত্যধিক দারিদ্রই চ্যাপলিনকে শিশু বয়সেই অভিনয়ের দিকে ঠেলে দেয়…তার মা-বাবা দুজনেই মঞ্চের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন তাই এই পেশাতে আসাটাই তাঁর কাছে সহজ ছিল। চ্যাপলিন সেই সময়ের জনপ্রিয় লোকদল ‘জ্যাকসন্স এইট ল্যাঙ্কাসায়ার ল্যাডস’ এর সদস্য হিসাবে নানা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। এরপর ১৪ বছর বয়সে তিনি উইলিয়াম জিলেট অভিনিত শার্লক হোমস নাটকে কাগজওয়ালা বিলির চরিত্রে অভিনয় করেন। এই সুবাদে তিনি ব্রিটেনের নানা প্রদেশে ভ্রমণ করেন ও অভিনেতা হিসাবে তিনি যে খুবই সম্ভাবনাময় তা সবাইকে জানিয়ে দেন ।

বিশ্বব্যাপী যখন দুঃসময় তাড়া করে ফিরছে, মানবিকতা ও শ্রমিক শ্রেণির বিরুদ্ধে পুঁজিবাদ এবং ফ্যাসিবাদ বিষাক্ত থাবা ফেলছে; তখনই তিনি তৈরি করলেন তাঁর অমর দুটি সিনেমা ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’ ও ‘মসিয়ে ভের্দু’। প্রথমটিতে ব্যঙ্গের অস্ত্র দিয়ে আঘাত করলেন ফ্যাসিবাদকে, দ্বিতীয়টিতে একটি শক্তিশালী পুঁজিবাদী রাষ্ট্রকে। এর জন্য তাঁকে মূল্য দিতে হলও অনেক, কিন্তু তিনি তা গায়ে মাখেননি। বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্রকার আইজেনস্টাইন বলেছেন,

“চ্যাপলিন সেইসব ধ্রুপদী শিল্পীদের মধ্যে নিজের স্থান করে নিয়েছেন যুগে যুগে যারা ব্যঙ্গের অস্ত্র দিয়ে অন্ধকারের বিরুদ্ধে লড়েছেন। এঁরা হলেন এথেন্সের আরিস্তোফেনিস, রোতরদামের ইরাসমাস, মেডনের ফ্রাঁসোয়া রাবেলিয়াস, ডাবলিনের জোনাথন সুইফট ও ফ্রান্সের ফ্রাঁসোয়া ভলতেয়ার।”  

এই মহান ব্যক্তি সম্পর্কে সত্যজিৎ রায় বলেছেন,

“যদি একটি নামকেই বেছে নিতে হয় যিনি সিনেমার প্রতীক স্বরূপ তবে সেই নামটি হলো চার্লি চ্যাপলিন। … … আমি নিশ্চিত যে শৈল্পিক প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে যদি সিনেমার অবলুপ্তিও ঘটে তবু চ্যাপলিনের নামটি টিকে থাকবে। চ্যাপলিন সত্যিই অমর।”

চ্যাপলিনকে ছবিতে দেখলে খুব চেনা মনে হয়, নিজের মনে হয়। তাঁর ছবিতে কে যেন এক এক করে পুতুলের মতো সাজিয়ে দর্শকের মনের কথা সহজ করে বলে রাখে। চ্যাপলিন সহজ করে জটিল কথা বলতে পারতেন বলেই তিনি দ্রুত বিশ্বব্যাপী স্থায়ী জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন।[২]

আরো পড়ুন:  নাগরিক: যুদ্ধোত্তর ও বাংলাভাগ পরবর্তী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মধ্যবিত্তের জীবন চিত্র

তথ্যসূত্র

১. অনুপ সাদি, ২৬ মে ২০১৮, “চার্লি চ্যাপলিন ফ্যাসিবাদ ও পুঁজিবাদবিরোধি এক মহান চলচ্চিত্রকার”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/biography/charlie-chaplin/
২. মমতাজউদ্দীন আহমদ, চার্লি চ্যাপলিন ভাঁড় নয় ভবঘুরে নয়, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, প্রথম পুনর্মুদ্রণ এপ্রিল ১৯৯৪, পৃষ্ঠা ৪৭।

Leave a Comment

error: Content is protected !!