‘কোমল গান্ধার’ নির্মাণকালে কোনাে সুনির্দিষ্ট তত্ত্বকে অনুসরণ করা হয় নি। সমস্ত অবরােহী তত্ত্বগুলি প্রকৃতপক্ষে বাস্তবের সুসংবদ্ধ মূল্যায়নের প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। আর সে কারণেই সব তত্ত্বই বাস্তবের তুলনায় কম নির্ভরযােগ্য। কোনাে পূর্বনির্ধারিত তত্ত্বের আক্ষরিক অনুসরণ সৃষ্টিশীলতার পক্ষে বিশেষ অনুকুল নয়। তা ছাড়া বিশিষ্ট শৈল্পিক সমস্যার সম্মুখীন হলে সৃষ্টির ক্ষেত্রে একটি বিশেষ ভঙ্গি বেছে নেওয়া আদৌ অযৌক্তিক নয়। আর সমস্ত শিল্পরীতিই কার্যকরী, যদি তার সঙ্গে জীবনের যােগ হয় নিবিড়।
একটি বিশেষ বক্তব্যের উপস্থাপন এই ছবির অন্বিষ্ট; সে বক্তব্যের অবলম্বন, অনেক উপাদানের একত্র সমাবেশ। বক্তব্যের খাতিরে ঘটনাপরম্পরায় সুসজ্জিত কৌতুহলােদ্দীপক কাহিনীবিন্যাসের প্রয়ােজন আদৌ অনুভূত হয় নি। কেবল একটি সুপরিচিত ত্রিকোণ কাঠামাে অবলম্বিত হয়েছে- রূপকের সাহায্যে বিষয়বস্তুর গভীরে অভিনিবেশের উদ্দেশ্যে।
‘বক্তব্য’ কথাটিই সাহিত্যগন্ধী। ‘রূপক’ও তাই। আধুনিক কাব্যে এমন-কি নাট্যশিল্পের একটি বিশিষ্ট ধারাতেও তাদের প্রয়ােগ তার উদাহরণস্বরূপ। চলচ্চিত্রশিল্প তথাকথিত ‘সাহিত্যিক’ উপায় অবলম্বনে নিঃসংকোচ, সে উপায় তির্যক কিংবা সরল যাই হােক।
সমসাময়িক বঙ্গদেশ দেশবিভাগের দায়ভাগে ক্ষতবিক্ষত, অনিশ্চিত স্বাধীনতায় দ্বন্দ্বসংকুল, রাষ্ট্রীয় ঐক্যের আদর্শ বিনা বিবেচনায় চাপিয়ে দেবার ফলে অবদমিতচিত্ত (স্বভাবতই ঐক্যাদর্শ বাস্তব জগতের অনেক স্বাভাবিক প্রবৃত্তির পরিপন্থী) আর সেই অবদমনের ফলস্বরূপ পশ্চিমী সভ্যতার রসে পরিপুষ্টচিত্ত জাতীয় নেতাদের চিন্তারাজ্যের দেউলেপনা ইত্যাকার দেশজ ও আন্তর্জাতিক কারণের ফলশ্রুতিতে দেশের চরম দুর্গতি। এ ছবির লক্ষ্য সেই অধােগমনের, সেই মূলহীনতা ও আশ্রয়হীনতার চিত্রায়ণ। এই বক্তব্যে নির্ভর করে ছবিটি ভাবাবেগের একটি স্তরে উন্নীত। তাতে একটি বিশেষ মনােভঙ্গি প্রতিফলিত।
বিভিন্ন স্তরে জীবনের এই অনিকেত রূপটির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
পতিগৃহে যাত্রাকালে শকুন্তলাকে তার বহু পরিচিত জগৎ ঐ আজন্ম বাসভূমি আশ্রম থেকে নিজেকে ছিন্ন করে নিতে হয়েছিল।
বাংলাদেশের শকুন্তলার প্রতিমূর্তি এ ছবির নায়িকা আর একালের যুবচিত্তে যে বিক্ষোভের প্রদাহ, তারই প্রকাশ নায়কের চরিত্রে। সে সম্পূর্ণ সুস্থও নয়, সম্পূর্ণ প্রকৃতিস্থও নয়, অবদমিত, কিছুটা বিকারগ্রস্ত।
রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ, দীনমলিন নাট্য আন্দোলন ও দলাদলির প্রায় বাস্তবানুগ চিত্রায়ণ ও তৎসমান্তরাল কৌতুকাবহ প্রেমাখ্যান, এ সমস্তই পরিকল্পিত ও সন্নিবেশিত হয়েছে মূল পরিকল্পনা অনুসারে- রূপকগুলিকে সমৃদ্ধ করার উদ্দেশ্যে। একটি বাস্তবধৃত বহুবিষয়সমন্বিত জটিল নকশা (pattern) প্রস্তুত করাই ছিল অভিপ্রেত।
শব্দযােজনার, বিশেষ করে শত শত বছরের পুরােনাে লােকগাথা ও আনুষ্ঠানিক সংগীত প্রয়ােগের উদ্দেশ্য হলো বাস্তবে নিহিত কোনাে সুপ্ত প্রেরণার প্রতি অবিরাম দিগদর্শন। তা ছাড়া সে-সব গান এদেশের অতীত ও বর্তমান জীবনের মাঝে সেতুস্বরূপ। উপরন্তু এরা ছবিটির ত্রয়ীরূপকের ভাষণও বটে।
প্রথার (convention) জন্মের কারণ সম্ভবত সামাজিক অবদমন। সমষ্টিগত অবচেতনের আদিম তাগিদ ও আর্কিটাইপাল অনুভূতির সঙ্গে তার যােগ নিবিড়। পুরাণের অলৌকিকতা ও প্রতীক প্রথাকে খাদ্য জোগায়। সময় বিশেষে তারা অমার্জিত হতে পারে, কিন্তু প্রতিপাদ্য বক্তব্যকে ধারালাে করে তুলবার কাজে তাদের দান অপরিমেয়। তা ছাড়া প্রথা নিকট ভবিতব্য সম্পর্কে আমাদের মনকে সুস্থির রাখে- কৌতুহলােদ্দীপক ঘটনার লােভে মনকে অস্থির করে না। শিল্পভাষার অতিব্যবহৃত কৌশলের স্থান এতে নেই।
এ ছবি উপভােগ করতে হলে মনে হয় সর্বাগ্রে মস্তিষ্কের উত্তেজনা পরিত্যাজ্য এবং কোনাে পূর্বনির্দিষ্ট আশা পােষণ না করে মুক্তচিত্ত থাকলে দর্শক এ ছবি দেখে সন্তুষ্ট হতে পারেন। তাই এ ছবির দর্শকদের কাছ থেকে একটি এপিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রার্থনীয় যে দৃষ্টিভঙ্গি এদেশে এখনও একটি প্রাণবন্ত ঐতিহ্যরূপে বিরাজমান।[১]
আরো পড়ুন
- প্রেমেন্দ্র মিত্রের গান আধুনিক বাংলা গানের ধারায় রচিত
- আমি নতি স্বীকার করিনা — ঋত্বিক ঘটক
- শিল্প মানেই লড়াই — ঋত্বিক ঘটক
- আমাদের দৃষ্টিতে বাস্তববাদী ধারা
- নগ্নতা এবং চলচ্চিত্র
- চলচ্চিত্রের স্বরূপ কী?
- ‘কোমল গান্ধার’ প্রসঙ্গে
- দুই বাংলায় আমার দেখা মানুষ
- শিল্প ও সততা
- ডকুমেন্টারি ফিল্ম
- ছবিতে বাংলাদেশ
- শিল্প, ছবি ও ভবিষ্যৎ
- ছবিতে ডায়লেকটিকস
- চলচ্চিত্র সাহিত্য ও আমার ছবি
- আমার কথা
- চার্লি চ্যাপলিন ফ্যাসিবাদ ও পুঁজিবাদবিরোধি এক মহান চলচ্চিত্রকার
- সুবর্ণরেখা বাঙালির অস্তিত্বের লড়ায়: অতীত, বর্তমান ও ভবিষৎতের প্রতিচ্ছবি
- যুক্তি তক্কো আর গপ্পো: ঋত্বিক সমাজের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক ফুটিয়ে তুলেছেন
- বাড়ি থেকে পালিয়ে: কলকাতার ভঙ্গুর অর্থনীতি ও উদ্বাস্তুর করুণ চিত্রের প্রতিফলন
- ঋত্বিক ঘটকের প্রথম চলচ্চিত্র ‘নাগরিক’: একটি আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষণ
- তিতাস একটি নদীর নাম: সামন্তীয় চিন্তার ভাঙ্গন, নগরায়ন ও অন্যান্য
- কোমল গান্ধার চলচ্চিত্র দুই বাংলার সাংকৃতিক মেলবন্ধনের আকুতি
- মেঘে ঢাকা তারা: কলকাতার অর্থনীতি ও উদ্বাস্তু পরিবারগুলোর সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি
- অযান্ত্রিক চলচ্চিত্র মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যে দ্বান্দিক সম্পর্কের প্রকাশ
টিকা:
১. ঋত্বিক ঘটক রচিত বর্তমান লেখাটি তাঁর চলচ্চিত্র মানুষ এবং আরো কিছু, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা; পুনর্মুদ্রণ নভেম্বর ২০১৫; পৃষ্ঠা ১৪২-১৪৩ থেকে সংকলিত। এর আগে লেখাটি ১২ আগস্ট ২০১৯ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশিত হয়েছিল। এখানে ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ফুলকিবাজ.কমে হুবহু প্রকাশ করা হলো।

ঋত্বিক ঘটক (জন্ম: ৪ নভেম্বর, ১৯২৫ – মৃত্যু : ৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৬) একজন বিখ্যাত বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাঁর নাম বহুবার বহুভাবে উচ্চারিত। তিনি পরিচালনা করেছেন নাগরিক (১৯৫২, মুক্তি ১৯৭৭), অযান্ত্রিক (১৯৫৮), বাড়ী থেকে পালিয়ে (১৯৫৮), মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০) কোমল গান্ধার (১৯৬১), সুবর্ণরেখা (১৯৬২), তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩), যুক্তি তক্কো আর গপ্পো (১৯৭৭) প্রভৃতি চলচ্চিত্র।