আত্ম-নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক সত্তা গঠনের অধিকার

আত্ম-নিয়ন্ত্রণ (ইংরেজি: Self-determination) বলতে জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক সত্তা গঠনের অধিকারকে বোঝায়, এবং অভ্যন্তরীণ আত্ম-নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে পূর্ণ ভোটাধিকারসহ প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের অধিকার। অর্থাৎ আত্ম-নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে একটি ভূখণ্ডের অধিবাসীদের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে স্বাধীন স্বশাসিত ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের জাতীয় আবেগপ্রসূত অভিলাষ।[১]

আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনে আত্ম-নিয়ন্ত্রণ একটি মূল নীতি, যা জাতিসংঘের সনদের নীতিমালার একটি কর্তৃত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা হিসেবে বাধ্যতামূলক। রাষ্ট্রসংঘে ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে গৃহীত মানবাধিকার সনদের প্রথম অনুচ্ছেদেই আত্মনিয়ন্ত্রণের অগ্রাধিকারকে উল্লেখ করা হয়েছে। নীতিটি কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, বা ফলাফল কী হওয়া উচিত তা উল্লেখ করে না এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের মধ্যে প্রাক্তন ঔপনিবেশিক অঞ্চলের মধ্যে প্রতিটি জাতিগত গোষ্ঠীর জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অধিকার অন্তর্ভুক্ত নয়। অধিকন্তু, আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে বিচ্ছিন্নতার কোনও অধিকার স্বীকৃত নয়।

১৯ শতকে জাতীয়তাবাদের উত্থানের সাথে সাথে এই ধারণার উদ্ভব হয় এবং ১৮৬০-এর দশকে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, এরপর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এবং তার পরে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন এবং অন্যান্যরা আত্মনিয়ন্ত্রণের একটি সাধারণ নীতি ঘোষণা করেছিলেন। প্রথম বিশ্ব-মহাযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন তাঁর চোদ্দ দফা সনদে এই অভিলাষকে স্বীকৃতি ও উৎসাহদান করেন। ১৯১৮ সালের ৮ জানুয়ারী তার চৌদ্দ দফা ঘোষণা করার পর, ১১ ফেব্রুয়ারী ১৯১৮ সালে, উইলসন বলেছিলেন: “জাতীয় আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান করতে হবে; এখন জনগণ কেবল তাদের নিজস্ব সম্মতির মাধ্যমেই শাসিত ও চালিত হতে পারে। ‘আত্মসংকল্প’ কেবল একটি বাক্যাংশ নয়; এটি কর্মের একটি অপরিহার্য নীতি।”

প্রথম বিশ্ব-মহাযুদ্ধের পূর্ব ইউরোপে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় এবং অটোম্যান সাম্রাজ্য দুটি ভেঙে ছোট ছোট রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল। তাতে আফ্রিকার বিভিন্ন জনজাতির মধ্যেও অনুরূপ স্বাজাত্যবোধের ভিত্তিতে একটি প্রাক-রাজনৈতিক পশ্চাৎপট এবং রাষ্ট্রীয় আবেগ উৎসারিত হয়।

আত্ম-নিয়ন্ত্রণ-এর জন্য জাতীয় আবেগ সঞ্জাত পশ্চাৎপট থাকা প্রয়োজন। আত্ম-নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জাতীয়তাবাদের একটা সুস্পষ্ট সম্পর্ক আছে। দ্বিতীয় বিশ্ব-মহাযুদ্ধের পর এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের জাতীয়তাবাদী আবেগের কাছে পশ্চিমের বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী দেশ নতি স্বীকার করে।

ভ্লাদিমির লেনিনের চিন্তাতেও জাতীয় আত্ম-নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি সবিশেষ গুরুত্ব পায়। তাতে রাষ্ট্রীয় বিধিব্যবস্থার ক্ষেত্রে সমস্ত জাতির সমতা ও সার্বভৌমত্বের পন্থা স্বীকৃতি পায়। লেনিনবাদী দৃষ্টিতে আত্ম-নিয়ন্ত্রণের অধিকার ছাড়াও প্রতিটি দেশের বিশেষ কোনও যুক্তরাষ্ট্রে অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে যোগদানের অধিকার অথবা কোনও যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের স্বতন্ত্র জাতীয় রাষ্ট্র গঠনের অধিকার আছে।[২]

আরো পড়ুন

চিত্রের ইতিহাস: ১৯৪৫ সালে পশ্চিম ইউরোপের উপনিবেশসমূহ

তথ্যসূত্র

১. অনুপ সাদি, ৩ নভেম্বর ২০১৮; রোদ্দুরে.কম, “আত্ম-নিয়ন্ত্রণ কাকে বলে”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/ideology/leninism/what-is-self-determination/
২. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ৩২-৩৩।

Leave a Comment