আজ্ঞা বা অনুশাসন (ইংরেজি: Mandate) হচ্ছে, প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রে, জনসমর্থনের মাধ্যমে শাসন করার একটি অনুভূত বৈধতা। নির্বাচনের মাধ্যমে আজ্ঞা জ্ঞাপন করা হয়, যেখানে ভোটাররা তাদের নিজস্ব নীতিগত পছন্দের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীদের নির্বাচন করেন। অর্থাৎ আজ্ঞা হচ্ছে কোনও কিছু করা বা না করা সম্পর্কে আদেশ বা অনুমতি।[১]
নির্বাচনের ফলাফল ব্যাখ্যা করে কোন নীতিগুলি জনসমর্থিত তা নির্ধারণ করা হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার একটি স্পষ্ট আজ্ঞা প্রদান করে, অন্যদিকে বহুত্ববাদী বা জোট সরকার একটি কম আজ্ঞার ইঙ্গিত দেয়, যার জন্য দলগুলির মধ্যে বৃহত্তর সমঝোতার প্রয়োজন হয়। শক্তিশালী আজ্ঞাযুক্ত দলগুলি তাদের পছন্দের নীতিগুলি বাস্তবায়নের জন্য স্বাধীন, এই বোধগম্যতার কারণে যে তারা জনগণের দ্বারা সমর্থিত। যখন কোনও একক দলের জন্য কোনও আজ্ঞা বিদ্যমান থাকে না, তখন মধ্যম ভোটারদের ব্যবহার করে কোন নীতিগুলি বাস্তবায়নের আজ্ঞা রয়েছে তা নির্ধারণ করা যেতে পারে। রাজনৈতিক আজ্ঞার আধুনিক ধারণাটি প্রথম ষোড়শ শতাব্দীর দিকে বিকশিত হয়েছিল এবং ফরাসি বিপ্লবের পরে রাজনীতির একটি বিশিষ্ট দিক হয়ে ওঠে।
উন্নয়ন এবং কার্যকারিতা
আজ্ঞা হচ্ছে একটি সামাজিক গঠন যা ভোটারদের ইচ্ছার উপর ভিত্তি করে তৈরি। আজ্ঞা তত্ত্ব প্রস্তাব করে যে রাজনৈতিক দলগুলি নীতিগত বিকল্পগুলির জন্য বাহন। ভোটাররা নির্বাচনের সময় এই বিকল্পগুলি থেকে নির্বাচন করেন, যা পরবর্তীতে সেই নীতিগুলিকে ক্ষমতায়িত করে যেগুলির সর্বাধিক জনপ্রিয় সমর্থন রয়েছে এবং তাদের বাস্তবায়নের অনুমতি দেয়।
রাজনৈতিক নানা ধরনের ক্রিয়াকর্মে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। নির্বাচনে অবতীর্ণ হয়ে কোনও রাজনৈতিক দল যখন কিছু প্রতিশ্রুতি দেয় এবং সে দল নির্বাচিত হলে বলা হয় যে সংশ্লিষ্ট কাজ করার পিছনে ভােটদাতাদের সঙ্গে চুক্তি পূরণ তথা আদেশ পালনের দায়িত্ব রয়েছে। অর্থাৎ ক্ষমতাসীন দলের জনগণের আজ্ঞাধীনে থাকা বিধেয়। জনসাধারণের আজ্ঞা পালনের উপর দল ও সরকারের বৈধতা নির্ভর করে। গণতন্ত্রে বৈধতার উৎস হলো জনগণের সম্মতি।[২]
নির্বাচনে, বিশেষ করে একটি বৃহৎ বিজয়ে প্রায়ই বলা হয় যে নতুন নির্বাচিত সরকার বা নির্বাচিত কর্মকর্তাগণ নির্দিষ্ট নীতিগুলি কার্যকর করার জন্য নিরপেক্ষভাবে আজ্ঞাসমূহ পালন করবে।[৩] যখন কোনো সরকার পুনঃনির্বাচন চায় তখন তারা প্রচারণার অংশ হিসাবে নতুন নীতিগুলি পেশ করতে পারে এবং ভোটারদের কাছ থেকে অনুমোদনের জন্য নতুনভাবে আশা করতে পারে যে তারা “নতুন আজ্ঞা” চাইছে।
বুর্জোয়া গণতন্ত্র ধারাবাহিকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ আজ্ঞা প্রদান করে না, কারণ বেশ কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বী দল বিভিন্ন নীতি প্রদান করে, যার ফলে জোট সরকারগুলিকে তাদের সদস্যদের মধ্যে আপস করতে হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, দ্বি-দলীয় ব্যবস্থার ফলে সর্বদা একটি দলের সরকারে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে যা আজ্ঞা হিসাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
আজ্ঞা সূত্রে নানা প্রশ্ন ওঠে। নির্বাচনে বহুরকমের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তাই ক্ষমতাসীন দলের কাছে বিভিন্ন ভোটদাতার বিভিন্ন প্রত্যাশা থাকে। বহু ভোটদাতা প্রতিশ্রুতি ব্যতিরেকেই স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে ক্ষমতাসীন দলকে ভোট দেয়, সেক্ষেত্রে তাদের কাছে সেই দলের আজ্ঞা পালনের প্রকৃতি ও পরিমাণ কী হবে? নির্বাচনের পর সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। তখন নতুন প্রেক্ষাপটে আজ্ঞা নেবার প্রয়োজন সম্পর্কে প্রশ্ন দেখা দেয়।[২]
এছাড়াও এই বিশেষ প্রত্যয়টির অপর একটি প্রয়োগ ইতিহাস-বিখ্যাত। প্রথম বিশ্ব-মহাযুদ্ধের পর জার্মানি ও তুরস্কের কয়েকটি ভূখণ্ড ও উপনিবেশের প্রশাসন সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের একটি বিভাগ কর্তৃক অধিগৃহীত হয়। দ্বিতীয় বিশ্ব-মহাযুদ্ধের পরও ইতালি ও জাপানের কয়েকটি ভূখণ্ডের প্রশাসন অনুরূপভাবে জাতিসংঘের অছিপরিষদের উপর ন্যস্ত হয়।
আরো পড়ুন
- বিপ্লবের পর্যায় প্রবণতা এবং পটভূমি
- আজ্ঞা বা অনুশাসন হচ্ছে জনসমর্থনের মাধ্যমে শাসন করার একটি অনুভূত বৈধতা
- বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব প্রসঙ্গে লেনিনবাদ
- মৌলিক গণতন্ত্র হচ্ছে স্বৈরতন্ত্রী শাসনব্যবস্থা পাকা করবার পদ্ধতি
- অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা
- পার্টি শৃঙ্খলা সম্পর্কে লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টির নীতি ও সে সম্পর্কিত ধারণা
- গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতাবাদ কমিউনিস্ট পার্টির সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নীতিনির্ধারণ প্রণালী
- গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাবাদ লেনিনবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর কাঠামোগত নীতি
- প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের বিরোধী হিসাবে নির্বাচিত ব্যক্তি চালিত
- আবুল কাসেম ফজলুল হকের সাক্ষাৎকার — মানুষের কামনা-বাসনা শূন্যে থাকে না
- আবুল কাসেম ফজলুল হকের সাক্ষাৎকার — নেতা ছাড়া, দল ছাড়া নেতৃত্ব হয় না
- আবুল কাসেম ফজলুল হকের রাজনৈতিক সাক্ষাৎকার — গণতন্ত্র বিকাশশীল আদর্শ
তথ্যসূত্র:
১. অনুপ সাদি, ৩ নভেম্বর ২০১৮; রোদ্দুরে.কম, “আজ্ঞা হচ্ছে কোনও কিছু করা বা না করা সম্পর্কে আদেশ বা অনুমতি”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/encyclopedia/on-mandate/
২. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ৩১-৩২।
৩. Glossary Elections ACT. Jul 2012. http://www.elections.act.gov.au/glossary (cf., The Government’s claim that once elected they have the right and responsibility to implement their policies.)
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।