অন্তর্ভুক্তি বা পররাজ্য গ্রাস (ইংরেজি: Annexation) হচ্ছে একটি রাষ্ট্র কর্তৃক অন্য একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভূখণ্ড বলপ্রয়ােগের মাধ্যমে দখল বা অধিকার করা।[১] এরূপ দখলের মাধ্যমে দখলকৃত অঞ্চলের সার্বভৌম কর্তৃত্ব দখলকারী রাষ্ট্র প্রয়োগ করে। অপর রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রাংশের উপর সার্বভৌম অধিকার প্রয়োগ পররাজ্যগ্রাসের একটি লক্ষণ হলেও জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী কোনো আশ্রিত বা অছিরাষ্ট্রকে এই পর্যায়ভুক্ত করা চলে না। অছিভুক্ত একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতাও সাময়িককালের জন্য অপর রাষ্ট্রের হাতে দেওয়া যেতে পারে।[২] আন্তর্জাতিক আইনের অন্তর্গত এই প্রত্যয়টি সম্পর্কে নানারকম অভিমত আছে। বিষয়টি সম্পর্কে আইনের পুরানাে ও নতুন অর্থ ও প্রয়ােগেও পার্থক্য বিদ্যমান। কোনও ভূখণ্ড অধিকারভুক্ত করা (occupation) এবং জয় করে নেওয়া (conquest) সমার্থক নয়।
সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ কর্তৃক অনুসৃত আজ্ঞা (ইংরেজি: mandate) নীতি অনুযায়ী ব্রিটেন ও ফ্রান্স কর্তৃক মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা প্রভৃতি দেশে জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ইতালি প্রভৃতি রাষ্ট্রের উপনিবেশগুলির উপর কর্তৃত্ব ও অধিকার অবৈধ ছিল না। কিন্তু রাষ্ট্রসংঘ স্থাপনের পর ১৯৬৭ খ্রি ইজরায়েল কর্তৃক মিশরের গাজা ভূখণ্ড দখল করে নেওয়া আইনবিরােধী। আশ্রিত রাজ্য ও যুদ্ধে বিজিত ভূখণ্ড দখল করে রাখার মধ্যে পার্থক্য আছে।
সংযুক্তি বা অন্তর্ভুক্তির ফলে অধিকৃত ভূখণ্ডের উপর যাবতীয় কর্তৃত্বের সুযােগ পাওয়া যায়। অধিকৃত দেশ বা ভূখণ্ডের অধিবাসীদের আনুগত্য অধিকারকারী রাষ্ট্রের উপর বর্তায়। নতুন রাষ্ট্রের সঙ্গে বিরােধ না ঘটলে অধিকৃত ভূখণ্ডের পুরানাে রীতিনীতি বজায় থাকতে পারে। সংযুক্তি বা অন্তর্ভুক্ত কোনও দেশ উপনিবেশে পরিণত হয় না। অধিকৃত অর্থাৎ অন্তর্ভুক্ত দেশের অধিবাসীদের আনুগত্যের সঙ্গে সম্মতি পাওয়া গেলে বিতর্ক বিশেষ থাকে না। বলপ্রয়ােগ ছাড়াও চুক্তির মাধ্যমেও অন্তর্ভুক্তি ঘটে। সেক্ষেত্রে অধিবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন ওঠে না। কয়েক শতক আগে নতুন ভূখণ্ড আবিষ্কারের সঙ্গে সেটিকে অধিকার করে নেওয়াই ছিল স্বীকৃত নীতি। কালক্রমে সেটাই হয় সাম্রাজ্যবাদ। বর্তমানে বৃহৎ শক্তি ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের ভূখণ্ড অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। ভারত এই প্রক্রিয়ায় সিকিম দখল করে নেয়।[১]
আরো পড়ুন
- বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল) কর্তৃক আসন্ন ভোট বর্জনের আহবান
- নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা প্রদানের বিরুদ্ধে সমাবেশ
- আমাদের কেন যে কোনো মূল্যে কিউবাকে রক্ষা করা উচিত
- আশ্রিত রাজ্য হচ্ছে প্রতিরক্ষার জন্য অন্য রাষ্ট্র দ্বারা সুরক্ষিত এলাকা
- একাধিপত্য হচ্ছে আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক, অন্য রাষ্ট্রের উপর একটি রাষ্ট্রের প্রাধান্য
- আত্ম-নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক সত্তা গঠনের অধিকার
- অন্তর্ভুক্তি হচ্ছে এক রাষ্ট্র কর্তৃক অন্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ড দখল
- চীন থেকে অস্ত্র আমদানি বাংলাদেশকে সাম্রাজ্যবাদের অধীনস্থ করেছে
- মাও সেতুং-এর গণচীনের হারিয়ে যাওয়া লাল রং এবং বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী চীন
- আফিম যুদ্ধ ১৯ শতকে কিং রাজবংশ এবং পাশ্চাত্যের মধ্যে সংঘটিত দুটি যুদ্ধ
- সাম্রাজ্যবাদের কুফল সম্পর্কে পুলিশ হিসেবে কর্মরত জর্জ অরওয়েলের বর্ণনা
- সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায় লেনিন রচিত পুঁজিবাদের বিশ্লেষণমূলক গ্রন্থ
অন্যান্য রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি যদি সাধারণভাবে স্বীকৃতি দেয় তবে অন্তর্ভুক্তি বৈধ হতে পারে। অন্তর্ভুক্তির অবৈধতার অর্থ হলো যে এই ধরনের কাজ সম্পাদনকারী রাষ্ট্রগুলি সাধারণত তাদের কর্মকাণ্ড বর্ণনা করার সময় “অ্যানেক্সেশন” শব্দটি ব্যবহার করা এড়িয়ে চলে; ইসরায়েল, মরক্কো এবং রাশিয়ার প্রতিটি অমীমাংসিত অন্তর্ভুক্তিতে, রাষ্ট্রগুলি তাদের কর্মকাণ্ডকে এইভাবে চিহ্নিত করা এড়িয়ে গেছে।
তথ্যসূত্র:
১. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ১৯।
২. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; ৫ম মুদ্রণ জানুয়ারি, ২০১২; পৃষ্ঠা ৫৮।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।