শ্রেণিসংগ্রাম বা শ্রেণিসংঘর্ষ বা শ্রেণি সংঘাত বা শ্রেণি দ্বন্দ্ব (ইংরেজি: Class struggle) হচ্ছে শ্রেণি বিভক্ত সমাজে পরস্পরবিরোধী স্বার্থসংশ্লিষ্ট মুখ্য দুটি শ্রেণির মধ্যে প্রকট আকারের দ্বন্দ্ব-সংঘাত বা সংঘর্ষ যা বৈরি উৎপাদন সম্পর্কের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শ্রেণি বিভক্ত সমাজব্যবস্থা শুরুর পরে দাসপ্রথা থেকে শুরু করে যত সমাজ দেখা দিয়েছে তাদের ইতিহাস হলো শ্রেণিগুলোর মধ্যে সংগ্রাম অর্থাৎ শোষিত ও শোষক, নিপীড়িত ও নিপীড়ক শ্রেণিগুলোর মধ্যেকার সংগ্রামের ইতিহাস। তাই বলা যায়, শ্রেণিসংগ্রাম হচ্ছে বিপরীত স্বার্থের বহনকারী সামাজিক শ্রেণিগুলোর মধ্যেকার পারস্পরিক ধারাবাহিক লড়াই।[১]
কোনো বৈশিষ্ট্য বা গুণের ভিত্তিতে যে-কোন সমষ্টিকে শ্রেণি বলে অভিহিত করা চলে। ‘শ্রেণি’ শব্দটি তত্ত্ব এবং বিজ্ঞানের বাইরে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ। যুক্তিবিদ্যায় কোনো জাতিবাচক পদকে শ্রেণি বলা হয়। ‘মানুষ’, ‘পশু’, ‘বাঙালী’, ‘হিন্দু’, ‘মুসলমান’ – ইত্যাদি পদ শ্রেণীবাচক পদ। কোনো বিশেষ গুণের ভিত্তিতে একাধিক ব্যক্তি বা উপাদানের উপর প্রযোজ্য নাম।
মার্কসবাদী তত্ত্বে ‘শ্রেণি’ শব্দের প্রধান ব্যবহার অর্থনৈতিক ব্যবহার। জীবন ধারণের সম্পদের মালিকানা এবং অ-মালিকানার ভিত্তিতে কোনো সমাজের মানুষকে চিহ্নিত করার তত্ত্ব। মার্কসবাদের মতে মানব সমাজের আদিতে সামাজিক সম্পদের কোনো ব্যক্তিগত মালিকানা ছিল না। সে হিসাবে সেই আদি কালের মনুষ্যসমাজ শ্রেণিহীন ছিল বলে অনুমান করা চলে।
জীবন যাপনের হাতিয়ার বা যন্ত্রপাতির বিকাশের একটা বিশেষ পর্যায়ে সম্পদের উপর ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা যখন সমাজের কোনো অংশের পক্ষে সম্ভব হয়, তখনই সমাজে এরূপ অর্থনৈতিক শ্রেণীর উদ্ভব হয়। এবং তারপর থেকে সমাজ বিকাশের প্রধান চালিকা শক্তি হিসাবে সম্পদের এরূপ মালিক শ্রেণি এবং সম্পদের মালিকানাবিহনীন সম্পদহীন শ্রেণির মধ্যকার দ্বন্দ্ব এবং সংগ্রাম কাজ করে আসছে বলে মার্কসবাদ মনে করে। এ হিসাবে কার্ল মার্কস এবং ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস তাঁদের বিখ্যাত ‘কমিউনিস্ট ইশতেহারে’ উল্লেখ করেন যে, ‘মানবজাতির জ্ঞান ইতিহাস হচ্ছে শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস’।
অবশ্য মার্কসবাদের অপর এক তত্ত্ব হচ্ছে এই যে, মানুষের সমাজের বিকাশের পরিণতিতে ভবিষ্যতে সমগ্র সামাজিক সম্পদের উপর মানুষের সামাজিক মালিকানা যখন প্রতিষ্ঠিত হবে তখন এরূপ বৈষম্যমূল অর্থনৈতিক শ্রেণির আর অস্তিত্ব থাকবে না।[২]
আরো পড়ুন
- রাষ্ট্র ও বিপ্লব: অধ্যায় ৩ (৪) — জাতীয় ঐক্যের সংগঠন
- মার্কসবাদ এবং শোধনবাদ
- মার্কসবাদের তিনটি উৎস ও তিনটি উপাদান
- মার্কসবাদ প্রসঙ্গে
- কর্তৃত্ববাদ হচ্ছে রাজনৈতিক ব্যবস্থা যার বৈশিষ্ট্য হলো রাজনৈতিক বহুত্ববাদ প্রত্যাখ্যান
- কর্তৃত্ব প্রসঙ্গে
- দ্বন্দ্ববাদের উদাহরণ
- মার্কসবাদ ও অভ্যুত্থান
- বিশ্বজুড়ে মার্কসবাদ, মুক্তি কোন পথে
- বাংলাদেশে মার্কসবাদ চর্চা
- শ্রেণি উদ্ভব হবার কারণ ও বিলুপ্তি প্রসঙ্গে মার্কসবাদ
- বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের দর্শন হচ্ছে মার্কসবাদ
- রাষ্ট্র হচ্ছে শ্রেণি শোষণ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ার
- বিপ্লব কেন হয় বা বিপ্লব সংঘটিত হবার কারণ প্রসঙ্গে
- ধ্রুপদী জার্মান দর্শনের সমালোচনা হচ্ছে মার্কস ও এঙ্গেলসের দার্শনিক আলোচনা
- বস্তুবাদ ও ভাববাদ হচ্ছে দুটি পরস্পরবিরোধী বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি
- মার্কসবাদের তিনটি উৎস ও তিনটি উপাদান প্রসঙ্গে একটি আলোচনা
- মার্কসবাদী দর্শন-এর একটি সাধারণ রূপরেখা
- মার্ক্সবাদ প্রলেতারিয়েতের শ্রেণিযুদ্ধের হাতিয়ার ও তাদের মুক্তির মতবাদ
- ভ্যানগার্ডবাদ বা ভ্যানগার্ড পার্টি গঠন সম্পর্কে লেনিনবাদী দৃষ্টিভঙ্গি
- মার্কসবাদে লেনিনের অবদান সৃজিত হয়েছে ছয়টি প্রধান ক্ষেত্রে
- পুঁজিপতিরা কীভাবে তাদের মুনাফা গোপন করে
- বলশেভিকবাদ রাষ্ট্রচিন্তা এবং রাষ্ট্রশাসন প্রণালীর বিপ্লবী মার্কসবাদী ধারা
- শ্রেণিহীন সমাজ হচ্ছে এমন সমাজ যেখানে কেউ সামাজিক শ্রেণিতে থাকে না
- হেগেলীয় দ্বান্দ্বিকতা বা দ্বন্দ্ববাদ: পরম ভাববাদ ও জগতের প্রপঞ্চ অনুধাবনের দার্শনিক পদ্ধতি
- উৎপাদিকা-শক্তি ও উৎপাদন-সম্পর্ক প্রসঙ্গে মার্কসীয় অর্থশাস্ত্রের বিশ্লেষণ
তথ্যসূত্র:
১. অনুপ সাদি, সমাজতন্ত্র, ভাষাপ্রকাশ, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, পৃষ্ঠা ৫৭।
২. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; ৫ম মুদ্রণ জানুয়ারি, ২০১২; পৃষ্ঠা ১১২
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।