অবিলম্বে পৃথক ও রাজ্যগ্রাসী শান্তি চুক্তি সম্পাদনের প্রশ্নে থিসিসের পরিশেষ

উপরোক্ত থিসিসগুলি আমি পড়ে শোনাই ১৯১৮ সালের ৮ই জানুয়ারি পার্টি কর্মীদের একটি ছোট ঘরোয়া সভায়। আলোচনায় উক্ত প্রশ্নে পার্টির তিনটি মত দেখা গেছে: সভার প্রায় অর্ধেক বিপ্লবী যুদ্ধের পক্ষে মত দেয় (এই দৃষ্টিভঙ্গিটাকে কখনো কখনো ‘মস্কোর’ নামে অভিহিত করা হয়েছে, কেননা অন্য সংগঠনের আগে এটি প্রথমে আমাদের পার্টির মস্কো আঞ্চলিক ব্যুরোয় গৃহীত হয়); তারপর প্রায় এক চতুর্থাংশ নেয় এৎস্কির পক্ষ, ইনি প্রস্তাব করেন ‘যুদ্ধ বন্ধ ঘোষণা করা হোক, সৈন্যবাহিনী ভেঙে দিয়ে তাদের বাড়ি পাঠানো হোক, কিন্তু সন্ধি চুক্তি সই করা হবে না,’ এবং পরিশেষে প্রায় এক চতুর্থাংশ মত দেয় আমার পক্ষে।

পার্টির ভেতরে যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে তাতে আমার ১৯০৭ সালের গ্রীষ্মের কথা খুব মনে পড়ছে, যখন বলশেভিকদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ছিল তৃতীয় দুমা [১] বয়কটের পক্ষে, যখন আমি দানের সঙ্গেই দুমায় যোগদান সমর্থন করি এবং তার জন্য সুবিধাবাদের অভিযোগে কঠোরতম আক্রমণ সইতে হয়। অবজেকটিভভাবে বর্তমানের প্রশ্নটাও দাঁড়িয়েছে একেবারে অনুরূপ: তখনকার মতোই পার্টি কর্মীদের অধিকাংশ সর্বোত্তম বিপ্লবী উদ্দীপনা ও শ্রেষ্ঠ পার্টি ঐতিহ্য থেকে এগিয়ে ‘দীপ্ত’ ধ্বনির আকর্ষণে আত্মসমর্পণ করছে। নতুন সামাজিক-অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিটাকে বুঝছে না, পরিস্থিতির বদলটা হিসাবে নিচ্ছে না, যার জন্য দরকার রণকৌশলের দ্রুত ও তীব্র একটা বদল। এবং তখনকার মতোই আমার সমস্ত বিতর্ক’ কেন্দ্রীভূত করতে হচ্ছে এইটে বোঝানোয় যে মার্কসবাদ দাবি করে অবজেকটিভ পরিস্থিতি ও তার পরিবর্তনের খতিয়ান, সমস্যাটাকে দেখতে হবে প্রত্যক্ষ নির্দিষ্টভাবে, এই সব পরিস্থিতিতে প্রযোজ্যরূপে; রাশিয়ায় সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের উদ্ভবটাই হলো বর্তমানের মৌলিক বদল, এবং ইতিমধ্যেই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব যা শুরু করে দিয়েছে সেই প্রজাতন্ত্রটাকে রক্ষা করাই আমাদের পক্ষে এবং আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সর্বোচ্চ কর্তব্য; বর্তমান মুহূর্তে রাশিয়ার পক্ষ থেকে বিপ্লবী যুদ্ধের ধ্বনিটার অর্থ হয় বাজে বুলি ও ফাঁকা আড়ম্বর, নয় অবজেকটিভভাবে সাম্রাজ্যবাদীদের ফাঁদে পা দেওয়া, এ সাম্রাজ্যবাদীরা এখনো দুর্বল একটা ইউনিট হিসাবে আমাদের টেনে আনতে চায় সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মধ্যে এবং যথাসম্ভব শস্তায় ধ্বংস করতে চায় নবীন সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রকে।

‘আমি লেনিনের পুরনো মতের পক্ষে,’ চিৎকার করে বলেন একজন তরুণ মস্কোওয়ালা (এই বক্তাগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্যসূচক সবচেয়ে বড়ো গুণই হল তারুণ্য)। এবং এই বক্তা আমায় ভর্ৎসনা করেন এই বলে যে আমি নাকি জার্মানিতে বিপ্লবের অসম্ভাব্যতা বিষয়ে প্রতিরক্ষাবাদীদেরই পুরনো যুক্তি পুনরুক্তি করছি।

বিপদটা ঠিক এইটেই যে মস্কোওয়ালারা পুরনো রণকৌশলেই দাঁড়িয়ে থাকতে চাইছে, নতুন অবজেকটিভ অবস্থা কীভাবে বদলেছে, কীভাবে গড়ে উঠেছে সেটা কিছুতেই দেখতে চাইছে না।

মস্কোওয়ালারা পুরনো ধ্বনি পুনরুক্তির উদগ্রতায় এটাও বিবেচনা করে দেখে নি যে আমরা বলশেভিকরা বর্তমানে সবাই প্রতিরক্ষাবাদী হয়ে দাঁড়িয়েছি। কেননা বুর্জোয়াদের উচ্ছেদ করে, গুপ্ত চুক্তিগুলো ছিড়ে ফেলে ও ফাঁস করে, সমস্ত জাতির কাছে সত্য সত্যই শান্তির প্রস্তাব দিয়ে…[২]

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র ও টিকা

১. রাষ্ট্রীয় দুমা ছিল প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠান, ১৯০৫ সালের বিপ্লবী ঘটনাবলীর চাপে জার সরকার এটি আহহ্বান করতে বাধ্য হয়। বাহ্যত রাষ্ট্রীয় দুমা ছিল একটি আইন প্রণয়নী প্রতিষ্ঠান, কিন্তু কার্যত তার কোনো আসল ক্ষমতা ছিল না। তৃতীয় দুমা গঠিত হয় ১৯০৭ সালের ৩ জুনের নতুন নির্বাচনী আইনের ভিত্তিতে, তাতে জমিদার ও বৃহৎ পুঁজিপতিদের প্রতিক্রিয়াশীল ব্লকটির আধিপত্যের ব্যবস্থা হয়।
২. ভি আই লেনিন লেখাটি লেখেন ৮ ও ১১ (২১ ও ২৪) জানুয়ারির মধ্যে, ১৯১৮। প্রথম প্রকাশিত ১৯২৯ সালে লেনিনের বিবিধ সংগ্রহে, ১১শ খণ্ডে। লেখা ও তথ্য ভ. ই. লেনিন, রচনাবলী; পঞ্চম রুশ সংস্করণ; ৩৫ খন্ড, ২৫৩-২৫৪ পৃষ্ঠা হতে। ফুলকিবাজ.কমে প্রবন্ধটি সংকলিত এবং এটি নেয়া হয়েছে প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৭০ থেকে প্রকাশিত বিপ্লবী বুলি ব্রেস্ত শান্তি চুক্তির প্রশ্নে ‘বামপন্থী কমিউনিস্টদের’ ভুল নিয়ে প্রবন্ধ ও বক্তৃতা গ্রন্থের ১৫-১৬ পৃষ্ঠা থেকে। পাণ্ডুলিপি এরপর থেকে ছিন্ন বলে প্রগতি সংস্করণে উল্লেখিত।

Leave a Comment