ইউরোপের ইতিহাস: গ্রিক ও রোমান ঐতিহ্য, সামন্তযুগের ধর্মবাদ ও শিল্প বিপ্লবের আখ্যান

ইউরোপের ইতিহাস ঐতিহ্যগতভাবে চারটি সময়কালে বিভক্ত: প্রাগৈতিহাসিক আদিম গোত্রবদ্ধ ইউরোপ (প্রায় ৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের পূর্বে), ধ্রুপদী প্রাচীন দাস যুগ (৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৫০০ খ্রিস্টাব্দ), সামন্তবাদী মধ্যযুগ (৫০০-১৫০০ খ্রিস্টাব্দ), এবং আধুনিক পুঁজিবাদী যুগ (১৫০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৯২), এবং সাম্রাজ্যবাদী আধুনিক বর্বর যুগ (১৯০৫- বর্তমান কাল)। অন্য কথায়, ইউরোপের ইতিহাস প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সভ্যতার সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, সামন্তবাদী মধ্যযুগের উত্থান-পতন এবং রেনেসাঁ ও শিল্প বিপ্লবের মাধ্যমে আধুনিক বিশ্বকে রূপদানের এক বৈচিত্র্যময় আখ্যান।

ইউরোপের ইতিহাসে প্রথম আধুনিক মানুষ ক্রো-ম্যাগননের পদচিহ্ন পড়েছিল আজ থেকে প্রায় ৪৮,০০০ বছর আগে, প্যালিওলিথিক বা প্রাচীন প্রস্তর যুগে। পরবর্তীকালে নবোপলিথিক যুগে কৃষিনির্ভর সমাজ ব্যবস্থার সূচনা হয়, যা দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ থেকে ক্রমান্বয়ে উত্তর ও পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়ে। এই যুগের শেষভাগে ধাতুবিদ্যার বিকাশ ঘটে, যার ফলে তামা দিয়ে তৈরি উন্নত সরঞ্জাম ও অস্ত্রের ব্যবহার শুরু হয়; পাশাপাশি স্টোনহেঞ্জের মতো বিশাল সব মেগালিথিক স্থাপত্য নির্মিত হতে থাকে।

এরপর ইন্দো-ইউরোপীয় অভিবাসনের প্রভাবে ইউরোপের জনতাত্ত্বিক কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আসে। ধ্রুপদী প্রাচীন যুগের সূচনায় প্রাচীন গ্রিসের নগর-রাষ্ট্রগুলোর উত্থান ঘটে এবং কালক্রমে রোমান সাম্রাজ্য সমগ্র ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। সবশেষে, খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর শেষের দিকে জার্মানিক জনগোষ্ঠীর অভিবাসনের মাধ্যমে ইউরোপীয় ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।

৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতনের মাধ্যমেই ইউরোপীয় ইতিহাসে সামন্তবাদী যুগের বা মধ্যযুগের সূচনা হয়। যদিও পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য বা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য আরও এক হাজার বছর টিকে ছিল, তবে পশ্চিমের বিশাল ভূখণ্ড ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই সময়ের প্রথম শক্তিশালী সাম্রাজ্য হিসেবে উত্থান ঘটে শার্লেমেনের ফ্রাঙ্কিশ সাম্রাজ্যের; ঠিক একই সময়ে আইবেরিয়া উপদ্বীপে মুসলিম বিজয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় আল-আন্দালুস। পরবর্তীতে ভাইকিং যুগে নর্স জনগোষ্ঠীর দ্বিতীয় এক বিশাল অভিবাসন প্রত্যক্ষ করে ইউরোপ।

মধ্য সামন্তযুগে মুসলিম রাজ্যগুলো থেকে লেভান্ট অঞ্চল পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে শুরু হওয়া ক্রুসেড ইউরোপের ইতিহাসে এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের সৃষ্টি করে, যার সমান্তরালে সামন্ততান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা পৌঁছে যায় তার চরম শিখরে। তবে সামন্তযুগের শেষভাগ ছিল বেশ বিপর্যয়কর। বুবোনিক প্লেগ বা ‘ব্ল্যাক ডেথ’-এর ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব এবং ইউরেশিয়ান স্টেপ্প থেকে আসা মঙ্গোল বাহিনীর আক্রমণে ইউরোপের জনসংখ্যা ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। এই অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ের শেষে এক ক্রান্তিকালীন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে রেনেসাঁ বা নবজাগরণের সূচনা ঘটে, যা ইউরোপকে আধুনিক যুগের পথে চালিত করে।

আদি আধুনিক ইউরোপের উন্মেষ ঘটে সাধারণত পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে। এ সময়ে বারুদ ও ছাপাখানার মতো বৈপ্লবিক প্রযুক্তির উদ্ভাবন যুদ্ধকৌশল এবং জ্ঞানচর্চার পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে। একদিকে ছাপাখানা জ্ঞান সংরক্ষণ ও দ্রুত প্রচারে সহায়ক হয়, অন্যদিকে ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন বা রিফর্মেশন মানুষের ধর্মীয় চিন্তাধারাকে খণ্ডিত করে তোলে, যা পরবর্তীতে দীর্ঘস্থায়ী ধর্মীয় যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়। একই সময়ে ভৌগোলিক আবিষ্কারের নেশায় শুরু হওয়া ঔপনিবেশিক অভিযানগুলো পশ্চিম ইউরোপে অঢেল সম্পদ ও প্রতিপত্তি বয়ে আনে, যদিও এর নেপথ্যে ছিল উপনিবেশিত দেশগুলোর মানুষ ও সম্পদের চরম শোষণ। 

পরবর্তীকালে ১৮০০ সালের পর শিল্প বিপ্লবের প্রভাবে পশ্চিম ইউরোপে পুঁজি সঞ্চয় এবং দ্রুত নগরায়ণ শুরু হয়। এই অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সমান্তরালে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও ব্যাপক বিবর্তন ঘটে; বেশ কিছু দেশ তাদের দীর্ঘদিনের নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হতে থাকে। বিপ্লব যুগে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা উল্টে যায়।

বিংশ শতাব্দীতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলে ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক আমূল পরিবর্তন আসে; বিশাল সাম্রাজ্যগুলো ভেঙে তৈরি হয় অসংখ্য নতুন জাতিরাষ্ট্র। তবে অমীমাংসিত রাজনৈতিক অস্থিরতা শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয় ইউরোপকে, যার কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে নাৎসি জার্মানি ‘হলোকাস্ট’ বা ভয়াবহ গণহত্যা সংঘটিত করে। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ‘লৌহ পর্দা’ (Iron Curtain) ইউরোপকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দেয়—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী ব্লক এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সাম্যবাদী ব্লক। এই বিভাজন ন্যাটো (NATO) এবং ওয়ারশ চুক্তির মতো সামরিক জোটের জন্ম দেয় এবং একই সময়ে পশ্চিমের অবশিষ্ট ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যগুলোর অবসান ঘটে।

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে পশ্চিম ইউরোপে সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের অবসান ঘটে এবং শুরু হয় রাজনৈতিক একীকরণের প্রক্রিয়া, যা ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) গঠনে সহায়ক হয়। ১৯৮৯ সালের প্রতি-বিপ্লবের জোয়ারে সাম্যবাদ অভিমুখী রাষ্ট্রগুলো পুঁজিবাদের পথে যাত্রা শুরু করে এবং ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে প্রাক্তন সাম্যবাদ অভিমুখী দেশগুলো ইইউ-তে যোগদানের মাধ্যমে নতুন এক নয়া-উদারতাবাদী ইউরোপের সূচনা করে। তবে ২০১০ এবং ২০২০-এর দশকগুলো ইউরোপের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়; ইউরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক সংকট, ২০১৫ সালের শরণার্থী সংকট এবং সবশেষে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের ফলে মহাদেশটি পুনরায় এক অস্থির ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে।

ইউরোপের প্রাচীন যুগ

ব্রোঞ্জ যুগ

ইউরোপের বুকে প্রথম যে শিক্ষিত ও সুসভ্য জাতির পরিচয় পাওয়া যায়, তারা ছিল মিনোয়ান সভ্যতার মানুষ। ক্রিট দ্বীপকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই সমৃদ্ধ সভ্যতাটি আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৭ শতক থেকে ১৫ শতক পর্যন্ত তার উন্নতির শিখরে অবস্থান করেছিল।

মিনোয়ান সভ্যতার উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রায় ১৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মাঝামাঝি সময়ে গ্রিসে মাইসিনীয় (Mycenaean) সভ্যতার বিকাশ ঘটে। মূল ভূখণ্ড গ্রিসের হেলাডীয় সংস্কৃতি যখন মিনোয়ান ক্রিটের প্রভাবে বিবর্তিত হচ্ছিল, তখনই এই নতুন সভ্যতার জয়যাত্রা শুরু হয়, যা প্রায় ১১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল।

এই সভ্যতার প্রধান কেন্দ্রগুলো ছিল আর্গোলিসের মাইসিনে ও টিরিনস, মেসেনিয়ার পাইলোস, অ্যাটিকার অ্যাথেন্স, বোয়েটিয়ার থিবস ও অর্কোমেনাস এবং থেসালির ইওলকোস। এমনকি ক্রিট দ্বীপের বিখ্যাত শহর নসোসও মাইসিনীয়রা দখল করে নিয়েছিল। তাদের প্রভাব ও বসতি কেবল মূল ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এপিরাস, এজিয়ান দ্বীপপুঞ্জ, এশিয়া মাইনরের উপকূলভাগ থেকে শুরু করে লেভান্ট, সাইপ্রাস এবং ইতালিতেও তাদের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। মাইসিনীয় বিশ্বের সীমানা ছাড়িয়ে আরও দূরদূরান্তেও এই সভ্যতার অমূল্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন খুঁজে পাওয়া গেছে।

বাণিজ্যনির্ভর মিনোয়ানদের বিপরীতে মাইসিনীয় সমাজ ছিল মূলত যুদ্ধজয়ী এক অভিজাত শ্রেণির শাসনাধীন। বিজয়ের নেশায় মত্ত এই বীর যোদ্ধারা আনুমানিক ১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মিনোয়ানদের মূল কেন্দ্র ক্রিট দ্বীপ পর্যন্ত নিজেদের কর্তৃত্ব বিস্তার করে। তবে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ব্রোঞ্জ যুগের অন্যান্য সভ্যতার পতনের সাথে সাথে মাইসিনীয় সভ্যতারও বিনাশ ঘটে। এই বিপর্যয়ের পেছনে ঐতিহাসিকভাবে ডোরিয়ান আক্রমণকে প্রধান কারণ মনে করা হলেও, বর্তমান সময়ের গবেষকরা প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলোকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন। 

কারণ যাই হোক না কেন, খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগে মাইসিনে ও টিরিনসের মতো শক্তিশালী কেন্দ্রগুলো পুনরায় ধ্বংস হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে এই সভ্যতার দীর্ঘ পতন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত রূপ নেয়। একাদশ খ্রিস্টপূর্বাব্দের শুরুতে এই প্রাচীন গৌরবের বিলুপ্তি ঘটে এবং গ্রিক ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়—’প্রোটোজিওমেট্রিক’ বা জ্যামিতিক যুগ—শুরু হয়, যা ঐতিহাসিকভাবে ‘গ্রিক অন্ধকার যুগ’ (Greek Dark Ages) নামে পরিচিত।

প্রযুক্তিগত ইতিহাসের আলোকে ব্রোঞ্জ যুগের পতনকে একটি বিশেষ সন্ধিক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৩শ এবং ১২শ শতাব্দীতে বর্তমান বুলগেরিয়া ও রোমানিয়া অঞ্চল থেকে লোহা গলানোর প্রযুক্তির ধীর কিন্তু নিশ্চিত বিস্তার শুরু হয়, যা সভ্যতার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

এই বিবর্তনের মূলে ছিল মধ্য ইউরোপের টুমুলাস সংস্কৃতি এবং তার পরবর্তী আর্নফিল্ড সংস্কৃতি। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এই সংস্কৃতিগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলোকেই পরবর্তীকালের ধ্রুপদী গ্রিক ও রোমান সংস্কৃতির অন্যতম উৎস বা ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়।

লৌহ যুগ

ইউরোপের প্রাগৈতিহাসিক ও প্রোটোহিস্টোরিক (আদি-ঐতিহাসিক) সন্ধিক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো লৌহ যুগ। গ্রিক ও রোমান লেখকদের বর্ণনায় এই যুগের বিস্তৃতি ও প্রভাব বিশেষভাবে ফুটে ওঠে। ইউরোপের অধিকাংশ অঞ্চলে রোমান বিজয়ের মাধ্যমে এই যুগের পরিসমাপ্তি ঘটলেও, প্রযুক্তি হিসেবে লৌহশিল্প আধুনিক সময় পর্যন্ত তার শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেছে। তবে কিছু অঞ্চলে খ্রিস্টধর্মের প্রসার বা বড় আকারের গণ-অভিবাসনের মাধ্যমে এই যুগের অবসান ঘটে।

খ্রিস্টপূর্ব একাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে সম্ভবত ককেশাস অঞ্চল থেকে ইউরোপে লৌহশিল্পের প্রচলন শুরু হয়। পরবর্তী প্রায় ৫০০ বছরে এই প্রযুক্তি ধীরে ধীরে উত্তর ও পশ্চিম দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই বিবর্তনের সময়কাল অঞ্চলভেদে ভিন্ন ছিল; উদাহরণস্বরূপ, যখন গ্রিসের লৌহ যুগ শেষ হয়ে আসছিল, আয়ারল্যান্ডে তখন এই যুগের সবে সূচনা (প্রায় ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)। শেষ পর্যন্ত ৪০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে আয়ারল্যান্ডে এর সমাপ্তি ঘটে। ইউরোপ ও এশিয়া—উভয় মহাদেশেই লৌহ প্রযুক্তি এবং এর ব্যবহার প্রায় একই সময়ে ব্যাপক প্রসার লাভ করেছিল।

ধ্রুপদী প্রাচীনত্ব

ধ্রুপদী প্রাচীনত্ব বা ক্লাসিক্যাল অ্যান্টিকুইটি—যাকে ধ্রুপদী যুগ বা প্রাচীন কাল হিসেবেও অভিহিত করা হয়—হলো খ্রিস্টপূর্ব ৮ম শতাব্দী থেকে খ্রিস্টীয় ৫ম শতাব্দী পর্যন্ত বিস্তৃত সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। মূলত প্রাচীন গ্রিস ও রোমের সভ্যতাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই সময়কালটি ‘গ্রিকো-রোমান বিশ্ব’ নামে পরিচিত। এই দীর্ঘ সময়ে গ্রিস ও রোম কেবল সমৃদ্ধির শিখরেই পৌঁছায়নি, বরং ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা এবং পশ্চিম এশিয়ার এক বিশাল অংশজুড়ে তাদের গভীর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেছিল।

প্রাচীন গ্রিস

হেলেনিক সভ্যতা ছিল মূলত অসংখ্য নগর-রাষ্ট্র বা ‘পোলিস’-এর এক অনন্য সমন্বয়। এই প্রতিটি নগর-রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা ও সংস্কৃতি ছিল স্বতন্ত্র, যা তৎকালীন বিশ্বে বৈচিত্র্যের এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। এই সভ্যতার হাত ধরেই শাসনপ্রণালী, দর্শন, বিজ্ঞান, গণিত ও রাজনীতির মতো মৌলিক ক্ষেত্রগুলোতে বৈপ্লবিক উন্নতি সাধিত হয়। পাশাপাশি খেলাধুলা, থিয়েটার এবং সংগীতের মতো সৃজনশীল শাখাগুলোতেও তারা যে অসামান্য উৎকর্ষ অর্জন করেছিল, তা আজও আধুনিক বিশ্বসভ্যতার ভিত্তি হিসেবে গণ্য হয়।

হেলেনিক সভ্যতার সবচেয়ে প্রভাবশালী ও শক্তিশালী নগর-রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল এথেন্স, স্পার্টা, থিবস, করিন্থ এবং সিরাকিউস। এর মধ্যে এথেন্স তার অনন্য শাসনব্যবস্থার জন্য বিশেষভাবে সমাদৃত ছিল। ক্লেইস্থেনিসের হাত ধরে এখানে বিশ্বের প্রথম ‘প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র’ প্রবর্তিত হয়, যেখানে নাগরিকরা সরাসরি ভোট দেওয়ার মাধ্যমে আইন প্রণয়ন ও শাসনতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ করতেন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এথেন্স ছিল বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিস ও প্লেটোর বিচরণভূমি এবং এখানেই গড়ে উঠেছিল প্লেটোনিক একাডেমির মতো প্রখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

প্রাচীন হেলেনিক নগর-রাষ্ট্রগুলো কৃষ্ণ সাগর এবং ভূমধ্যসাগরের বিভিন্ন উপকূলে (যেমন—এশিয়া মাইনর, সিসিলি এবং দক্ষিণ ইতালির ম্যাগনা গ্রেসিয়া) তাদের উপনিবেশ বিস্তার করেছিল। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাগে এশিয়া মাইনরের গ্রিক নগর-রাষ্ট্রগুলো পারস্য সাম্রাজ্যের অধীনে চলে যায়। একই সময়ে পারস্যরা বলকান অঞ্চল (ম্যাসিডোনিয়া, থ্রেস) এবং পূর্ব ইউরোপের কিছু অংশ নিজেদের দখলে নিতে সক্ষম হয়। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে আয়োনীয় বিদ্রোহের মাধ্যমে গ্রিক রাষ্ট্রগুলো পারস্য শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে, পারস্য সম্রাট গ্রিসের মূল ভূখণ্ডে প্রথম আক্রমণ শুরু করেন।

পরবর্তী গ্রিক-পার্সিয়ান যুদ্ধের এক সংকটময় মুহূর্তে, থার্মোপাইল ও আর্টেমিসিয়ামের যুদ্ধের পরপরই, করিন্থের ইস্থমাসের উত্তরভাগের প্রায় পুরো গ্রিস পারস্যদের পদানত হয়। তবে প্লাটিয়ার যুদ্ধে গ্রিক নগর-রাষ্ট্রগুলোর চূড়ান্ত বিজয় পারস্য বাহিনীকে ইউরোপ ত্যাগ করতে বাধ্য করে। এই বিজয় ইউরোপীয় ইতিহাসের গতিপথ চিরতরে বদলে দেয়। যুদ্ধের পর পারস্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বজায় রাখতে এথেন্সের নেতৃত্বে ‘ডেলিয়ান লীগ’ গঠিত হয়। তবে এথেন্সের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রতিক্রিয়ায় স্পার্টা গড়ে তোলে ‘পেলোপনেশিয়ান লীগ’। এর ফলে শুরু হওয়া ভয়াবহ পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধে স্পার্টা জয়লাভ করলেও, তাদের কঠোর আধিপত্য শীঘ্রই অসন্তোষের জন্ম দেয়। ফলস্বরূপ করিন্থিয়ান যুদ্ধ এবং লুকট্রার যুদ্ধে স্পার্টার পরাজয় ঘটে। সমসাময়িক কালে উত্তরে খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দী থেকে প্রথম শতাব্দী পর্যন্ত থ্রেসিয়ান ওড্রিসিয়ান রাজ্য তাদের শাসন বজায় রেখেছিল।

গ্রিক নগর-রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ কলহ তাদের ক্রমেই দুর্বল করে তুলেছিল, আর এই সুযোগেই ম্যাসিডোনিয়ার রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ সেগুলোকে নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে ঐক্যবদ্ধ করেন। তাঁর সুযোগ্য পুত্র আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট এরপর প্রতিবেশী পারস্য সাম্রাজ্যে আক্রমণ চালিয়ে তা জয় করেন এবং সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। তিনি কেবল পারস্যেই থেমে থাকেননি, বরং মিশর জয় করে ভারতের সীমান্ত পর্যন্ত নিজের আধিপত্য বিস্তার করেন। তাঁর এই বিশাল দিগ্বিজয়ের ফলে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ ও সংস্কৃতির মধ্যে মেলবন্ধন ঘটে, যা ইতিহাসে ‘হেলেনিস্টিক যুগ’ (Hellenistic period) নামে পরিচিত। 

আলেকজান্ডারের অকাল মৃত্যুর পর কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তরাধিকারী না থাকায় তাঁর বিশাল সাম্রাজ্য তাঁর প্রধান সেনাপতিদের (দিয়াডোচি) মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই সেনাপতিরা সাম্রাজ্যের দখল নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী এক যুদ্ধে লিপ্ত হন, যা ‘দিয়াডোচির যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর শুরুতে এই সংঘাতের শেষে তিনটি প্রধান শক্তিশালী রাজ্য টিকে ছিল—টলেমীয় মিশর, সেলুসিড সাম্রাজ্য এবং ম্যাসেডোনিয়া। এই রাজ্যগুলোর মাধ্যমেই গ্রিক সংস্কৃতি সুদূর ব্যাকট্রিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে এবং তৎকালীন বিশ্বের শিল্প, বিজ্ঞান ও দর্শনে গভীর প্রভাব ফেলে।

প্রাচীন রোম

ইতালি থেকে বহির্বিশ্বে রোমান আধিপত্য বিস্তারের সাথে সাথে গ্রিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক বিশাল অংশ এই নবজাতক রাষ্ট্রটি নিজের করে নেয়। মূলত শত্রুদের অনৈক্য ও পারস্পরিক দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়েই রোম তার সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিল। রোমান উত্থানের পথে একমাত্র বড় চ্যালেঞ্জ ছিল উত্তর আফ্রিকার ফিনিশীয় উপনিবেশ কার্থেজ। তবে দীর্ঘস্থায়ী তিনটি ‘পুনিক যুদ্ধে’ কার্থেজের পরাজয় ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে রোমের একচ্ছত্র আধিপত্য সুনিশ্চিত করে। 

রোমের রাজনৈতিক পরিক্রমাও ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। শুরুতে রাজতন্ত্র দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও পরবর্তীতে এটি একটি সিনেট-চালিত প্রজাতন্ত্রে (রোমান প্রজাতন্ত্র) রূপান্তরিত হয়। তবে এই প্রজাতন্ত্রের পতন ত্বরান্বিত হয় জুলিয়াস সিজার হত্যাকাণ্ড ও ১৫ই মার্চের সেই অভিশপ্ত ষড়যন্ত্রের  মাধ্যমে। সবশেষে, খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর শেষভাগে অগাস্টাসের ক্ষমতা গ্রহণ এবং তাঁর কর্তৃত্ববাদী উত্তরসূরীদের হাত ধরে রোম এক বিশাল ও শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত হয়।

রোমান সাম্রাজ্যের প্রাণকেন্দ্র ছিল ভূমধ্যসাগর, যার চারপাশের প্রতিটি দেশ ও উপকূলীয় অঞ্চল রোমের শাসনাধীন ছিল। এই বিশাল সাম্রাজ্যের উত্তর সীমানা নির্ধারিত হতো রাইন এবং ড্যানিউব নদীর প্রবাহ দিয়ে। সম্রাট ট্রাজানের শাসনামলে (খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দী) রোমান সাম্রাজ্য তার ভৌগোলিক বিস্তারের চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছায়। সে সময় প্রায় ৫৯ লক্ষ বর্গকিলোমিটার (২৩ লক্ষ বর্গমাইল) ভূখণ্ড তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল, যার মধ্যে বর্তমানের ইতালি, ফ্রান্স (গ্যালিয়া), ব্রিটেন, স্পেন (হিস্পানিয়া), গ্রিস, বলকান অঞ্চল, মিশর, উত্তর আফ্রিকা, এশিয়া মাইনর এবং মেসোপটেমিয়ার কিছু অংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল।

দীর্ঘদিন ধরে চলা ‘প্যাক্স রোমানা’ বা রোমান শান্তির যুগে ইউরোপে সভ্যতা, স্থিতিশীলতা এবং একটি দক্ষ কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা বজায় ছিল। তবে খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতাব্দীতে এই সোনালী সময়ের অবসান ঘটে। একের পর এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ রোমের অর্থনৈতিক ভিত নাড়িয়ে দেয় এবং তাদের সামাজিক শক্তিকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে তোলে।

চতুর্থ শতাব্দীতে রোমান সাম্রাজ্যের পতন রোধে সম্রাট ডায়োক্লেটিয়ান এবং কনস্টানটাইন এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তাঁরা বিশাল এই সাম্রাজ্যকে দুই ভাগে বিভক্ত করেন—পশ্চিমাংশের কেন্দ্র হিসেবে থেকে যায় রোম এবং পূর্বাংশের রাজধানী করা হয় বাইজেন্টিয়ামকে, যা পরে কনস্টানটিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল) নামে পরিচিতি পায়। কনস্টানটিনোপল কালক্রমে “পূর্ব অর্থোডক্স সভ্যতার প্রাণকেন্দ্রে” পরিণত হয়।

ধর্মীয় ক্ষেত্রেও এই সময়টি ছিল অত্যন্ত নাটকীয়। যেখানে ডায়োক্লেটিয়ান খ্রিস্টানদের ওপর কঠোর দমন-পীড়ন চালিয়েছিলেন, সেখানে সম্রাট কনস্টানটাইন ৩১৩ খ্রিস্টাব্দে ‘মিলান আদেশ’ (Edict of Milan)-এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সেই নির্যাতনের অবসান ঘটান। তাঁর এই পদক্ষেপ ৩৮০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ খ্রিস্টধর্মকে রোমান সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রীয় ধর্মে পরিণত করার পথ প্রশস্ত করে। তবে উত্তর ইউরোপীয় বিভিন্ন গোষ্ঠীর উপর্যুপরি আক্রমণে রোমান সাম্রাজ্য ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। অবশেষে ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটে, যখন শেষ সম্রাট রোমুলাস অগাস্টাস জার্মানিক রাজা ওডোসারের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন।

প্রাচীনকালের শেষ এবং অভিবাসনের মেয়াদকাল

৩১২ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট কনস্টানটাইন যখন খ্রিস্টীয় ক্রুশের পতাকাতলে রোম পুনর্দখল করেন, তখন সাম্রাজ্যের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ৩১৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘মিলানের ফরমান’ (Edict of Milan) জারি করেন (যদিও এর আগে ৩১১ খ্রিস্টাব্দে সার্ডিকার ফরমান জারি হয়েছিল), যার মাধ্যমে রোমান সাম্রাজ্যে খ্রিস্টধর্মকে বৈধতা প্রদান করা হয়। এছাড়া, এক যুগান্তকারী প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে কনস্টানটাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী রোম থেকে প্রাচীন গ্রিক শহর বাইজান্টিয়ামে স্থানান্তরিত করেন। তিনি এই নতুন রাজধানীর নাম দিয়েছিলেন ‘নোভা রোমা’ বা নতুন রোম, যা পরবর্তীকালে তাঁরই নামানুসারে ‘কনস্টানটিনোপল’ (কনস্টানটাইনের শহর) হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করে।

সম্রাট প্রথম থিওডোসিয়াস ছিলেন একীভূত রোমান সাম্রাজ্যের শাসনভার গ্রহণকারী শেষ মহান সম্রাট। ৩৯৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর পূর্বেই তিনি খ্রিস্টধর্মকে সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁর প্রয়াণের পর বিশাল এই সাম্রাজ্য দ্বিখণ্ডিত হয়ে পড়ে—একটি হলো রাভেনা-কেন্দ্রিক পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য এবং অন্যটি কনস্টান্টিনোপল-কেন্দ্রিক পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য (যা পরবর্তীতে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য নামে ইতিহাসে খ্যাতি লাভ করে)। পরবর্তী সময়ে হুন, জার্মানিক ও স্লাভিকসহ বিভিন্ন বহিঃশত্রুর ধারাবাহিক আক্রমণে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। অবশেষে ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে হেরুলি সর্দার ওডোসারের হাতে রোমের পতনের মাধ্যমে প্রাচীন এই সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে।

পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় এক গভীর ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়। রোমের সুসংগঠিত প্রশাসনিক কাঠামো, আইন ও সামরিক শক্তির অনুপস্থিতিতে বিশাল এলাকা বহিরাগত অভিবাসী উপজাতিদের আক্রমণের মুখে অরক্ষিত হয়ে পড়ে। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ইউরোপে গড়ে ওঠে সামন্ততন্ত্র (Feudalism) ও জমিদারিতন্ত্র (Manorialism)

এই নতুন ব্যবস্থায় জমি ও শ্রমের ওপর ভিত্তি করে সমাজ এক জটিল ও অসম শ্রেণিবিন্যাসে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ বা কৃষকরা তাদের জীবিকার তাগিদে নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সাথে দায়বদ্ধ হয়ে পড়েন। বিনিময়ে স্থানীয় সামন্ত প্রভু বা জমিদাররা কৃষকদের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তি ও আইন পরিচালনা করতেন এবং বহিরাগত শত্রুর আক্রমণ থেকে তাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেন। মূলত পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও সুরক্ষার এই কাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই মধ্যযুগীয় ইউরোপের আর্থ-সামাজিক ভিত্তি রচিত হয়েছিল।

পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে মূলত তিনটি প্রধান শক্তির আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথমত, ৪৮১ থেকে ৮৪৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বর্তমান ফ্রান্স ও জার্মানির বিশাল অংশ জুড়ে বিস্তৃত ছিল ফ্রাঙ্কদের মেরোভিনজিয়ান রাজবংশ। দ্বিতীয়ত, ৪১৮ থেকে ৭১১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আইবেরিয়ান উপদ্বীপে (বর্তমান স্পেন) রাজত্ব করেছিল ভিসিগোথিক রাজ্য। আর তৃতীয় শক্তিটি ছিল অস্ট্রোগোথিক রাজ্য, যা ৪৯৩ থেকে ৫৫৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ইতালি ও পশ্চিম বলকান অঞ্চল শাসন করেছিল; যদিও পরবর্তীতে (৫৬৮-৭৭৪ খ্রিস্টাব্দ) লম্বার্ডরা তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়।

এই রাজ্যগুলো বিশাল ভূখণ্ডের অধিকারী হলেও, তাদের হাতে রোমান সাম্রাজ্যের মতো অঢেল সম্পদ বা সুসংগঠিত আমলাতান্ত্রিক কাঠামো ছিল না। ফলে কেন্দ্র থেকে পুরো অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং শাসনকার্যের সিংহভাগ ক্ষমতা ও দায়িত্ব স্থানীয় প্রভুদের হাতে ছেড়ে দিতে হয়। এর ফলে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ঘটে, যা বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা বৃদ্ধির সুযোগ করে দেয়।

ইতালিতে থিওডোরিক দ্য গ্রেট তাঁর নবগঠিত রাজ্যে রোমান সংস্কৃতির এক অনন্য সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। তিনি রাভেনাকে রোমান ও গ্রিক শিল্প-সংস্কৃতির এক সমৃদ্ধ কেন্দ্রে পরিণত করেন। তাঁর রাজদরবারে লাতিন ভাষায় সাহিত্য ও দর্শনের চর্চা বিশেষ উৎসাহ লাভ করেছিল, যা ধ্রুপদী জ্ঞানকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, আইবেরিয়া উপদ্বীপে রাজা চিন্দাসুইন্থ বিখ্যাত ‘ভিসিগোথিক কোড’ প্রণয়ন করেন, যা ছিল সমকালীন আইন ও বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে একটি মাইলফলক।

পূর্ব অংশে প্রভাবশালী রাজ্য ছিল অবশিষ্ট পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য।

সামন্তবাদী ব্যবস্থার অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়েই নতুন এক রাজন্যবর্গের উত্থান ঘটে, যাঁদের মধ্যে ফ্রাঙ্কিশ শাসক শার্লেমেন ছিলেন সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী। তাঁর অসামান্য সামরিক বিজয় ও বিশাল ভূখণ্ড দখলের মাধ্যমে তিনি পশ্চিম ইউরোপে একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। ৮০০ খ্রিস্টাব্দে পোপ তৃতীয় লিও তাঁকে ‘রোমান সম্রাট’ হিসেবে অভিষিক্ত করেন, যা তাঁর রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

শার্লেমেনের এই রাজত্বকাল পশ্চিম ইউরোপে এক নতুন জার্মান-রোমান সাম্রাজ্য তথা ‘পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য’ (Holy Roman Empire)-এর ভিত্তি স্থাপন করে। তবে এই সাম্রাজ্যের সীমানার বাইরেও তখন নতুন নতুন শক্তির উত্থান ঘটছিল। একদিকে কিয়েভান রুস তাদের বিশাল অঞ্চল সুসংগঠিত করছিল, অন্যদিকে গ্রেট মোরাভিয়া শক্তিশালী হয়ে উঠছিল। একই সময়ে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে অ্যাঙ্গেল ও স্যাক্সনরা নিজেদের সীমানা সুরক্ষিত করতে ব্যস্ত ছিল।

ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে পূর্ব রোমান বা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য এক ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়। প্রথমে তাদের দীর্ঘকালব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হতে হয়েছিল পারস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে। এই সংঘাতের রেশ কাটতে না কাটতেই উদীয়মান ইসলামি খিলাফতের (রাশিদিন ও উমাইয়া) প্রবল আক্রমণের মুখে পড়ে সাম্রাজ্যটি।

এর ফলে ৬৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বাইজেন্টাইনরা তাদের অত্যন্ত সমৃদ্ধ প্রদেশ মিশর, ফিলিস্তিন ও সিরিয়া মুসলিম বাহিনীর কাছে হারায়। পরবর্তী সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দীতে এই আধিপত্য বিস্তার আইবেরিয়া (হিস্পানিয়া) এবং দক্ষিণ ইতালি পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তবে পূর্ব দিক থেকে আসা এই আরব অভিযান শেষ পর্যন্ত বুলগেরিয়ান সাম্রাজ্যের শক্তিশালী হস্তক্ষেপের ফলে থমকে যেতে বাধ্য হয়।

ধ্রুপদী-পরবর্তী এবং সামন্তযুগীয় ইউরোপ

ইউরোপীয় ইতিহাসে সামন্তবাদী মধ্যযুগের পরিব্যাপ্তি সাধারণত পঞ্চম শতাব্দীতে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতন থেকে শুরু করে ষোড়শ শতাব্দীতে আধুনিক যুগের সূচনা পর্যন্ত ধরা হয়। এই দীর্ঘ সময়কালটি বিশ্ব ইতিহাসের বেশ কিছু যুগান্তকারী পরিবর্তনের সাক্ষী। আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের উত্থান, ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের (Reformation) ফলে পশ্চিমা খ্রিস্টধর্মের বিভাজন এবং ইতালীয় রেনেসাঁ বা নবজাগরণে মানবতাবাদের জয়গান—এই সবকিছুই সামন্ত যুগের অবসান ও আধুনিকতার পথ প্রশস্ত করেছিল।

একই সময়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর ভৌগোলিক আবিষ্কার ও সমুদ্রপথে সাম্রাজ্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এর ফলেই শুরু হয় ঐতিহাসিক ‘কলম্বিয়ান বিনিময়’ (Columbian Exchange), যা পূর্ব ও পশ্চিম গোলার্ধের মধ্যে উদ্ভিদ, প্রাণী, সংস্কৃতি এবং মানবজাতির এক অভূতপূর্ব আদান-প্রদান সম্ভব করে তুলেছিল।

বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য

বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সূচনা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে নানা মতভেদ থাকলেও, সম্রাট প্রথম কনস্টানটাইনকে (৩০৬-৩৩৭ খ্রি.) অনেকেই প্রথম ‘বাইজেন্টাইন সম্রাট’ হিসেবে গণ্য করেন। ৩২৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি সাম্রাজ্যের রাজধানী নিকোমিডিয়া থেকে বাইজেন্টিয়ামে স্থানান্তরিত করেন, যা পরবর্তীতে ‘কনস্টান্টিনোপল’ বা ‘নোভা রোমা’ (নতুন রোম) নামে পুনর্প্রতিষ্ঠিত হয়। উল্লেখ্য যে, সম্রাট ডায়োক্লেটিয়ানের সময় থেকেই রোম শহরটি কার্যত তার রাজধানীর মর্যাদা হারিয়েছিল।

কিছু গবেষক সম্রাট প্রথম থিওডোসিয়াসের (৩৭৯-৩৯৫ খ্রি.) শাসনামলকে সাম্রাজ্যের প্রকৃত শুরু বলে মনে করেন, কারণ তাঁর সময়েই খ্রিস্টধর্ম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাচীন রোমান পৌত্তলিক ধর্মের স্থলাভিষিক্ত হয়। আবার ৩৯৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর পর সাম্রাজ্য যখন স্থায়ীভাবে রোম ও কনস্টান্টিনোপল—এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়, তখন থেকেও অনেকে এর সূচনা ধরেন। অন্য একদল ঐতিহাসিকের মতে, ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে শেষ পশ্চিমা সম্রাট রোমুলাস অগাস্টুলাসের পতনের পর যখন কেবল গ্রিক প্রাচ্যেই সম্রাটীয় কর্তৃত্ব টিকে ছিল, তখনই বাইজেন্টাইন যুগের পূর্ণ বিকাশ ঘটে। এমনকি সম্রাট হেরাক্লিয়াসের (৬২০ খ্রি.) সময়কালে ল্যাটিন ভাষার পরিবর্তে গ্রিক ভাষা ও সংস্কৃতির আনুষ্ঠানিক প্রবর্তনকেও অনেকে মূল ভিত্তি হিসেবে দেখেন। তবে এই পরিবর্তনগুলো ছিল অত্যন্ত ধীর ও ধারাবাহিক।

বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য তার অস্তিত্বের অধিকাংশ সময়জুড়ে ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে দাপট দেখিয়েছে এবং কনস্টান্টিনোপল ছিল মহাদেশের বৃহত্তম ও সমৃদ্ধতম নগরী। তবে এই স্বর্ণযুগে ৫৪১-৫৪২ খ্রিস্টাব্দে হানা দেয় ভয়াবহ ‘জাস্টিনিয়ানের প্লেগ’। এই মহামারীতে প্রায় ১০ কোটি মানুষ প্রাণ হারায় এবং ৫৪১ থেকে ৭০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপের জনসংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ কমে যায়। ধারণা করা হয়, এই জনতাত্ত্বিক বিপর্যয়ই পরবর্তী মুসলিম বিজয়ের পথ প্রশস্ত করতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। শেষ পর্যন্ত ১৪৫৩ সালে অটোমান তুর্কিদের হাতে কনস্টান্টিনোপলের পতনের মাধ্যমে এই হাজার বছরের প্রাচীন সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে।

আদি সামন্তযুগ

আদি সামন্তযুগ ৫০০ থেকে ১০০০ সাল পর্যন্ত প্রায় পাঁচ শতাব্দী জুড়ে বিস্তৃত। ইউরোপের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে এই সময়ে বেশ কিছু শক্তিশালী রাষ্ট্রের উত্থান ঘটে, যা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র আধিপত্যের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল আভার খাগানাতে (৫৬৭–৮২২+ খ্রি.), যা দীর্ঘ সময় ধরে এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করেছিল। একই সাথে ওল্ড গ্রেট বুলগেরিয়া (৬৩২–৬৬৮ খ্রি.) এবং খাজার খাগানাতে (আনুমানিক ৬৫০–৯৬৯ খ্রি.) তাদের বিশাল ভূখণ্ড ও সামরিক শক্তির জানান দিচ্ছিল। বিশেষ করে ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে খান আসপারুহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত দানিউব বুলগেরিয়া বাইজেন্টাইনদের সাথে দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হয়, যা বলকান অঞ্চলের ইতিহাসে এক নতুন মোড় নিয়ে আসে।

সপ্তম শতাব্দী থেকে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের ইতিহাস ইসলামি খিলাফতের উত্থান এবং তাদের রাজ্য বিস্তারের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। প্রথম খলিফা আবু বকরের আমলেই মুসলিম বাহিনী ঐতিহাসিকভাবে রোমান সিরিয়া এবং মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে প্রবেশ করে। দীর্ঘ শতাব্দী ধরে চলা পারস্পরিক যুদ্ধ—বিশেষ করে ৬০২-৬২৮ সালের বিধ্বংসী বাইজেন্টাইন-সাসানীয় সংঘাত—উভয় সাম্রাজ্যকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে চরম দুর্বল করে দিয়েছিল।

এই সুযোগে দ্বিতীয় খলিফা উমরের শাসনামলে মুসলিম বাহিনী কেবল পারস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্যেরই পতন ঘটায়নি, বরং রোমান ফিলিস্তিন, মিশর, উত্তর আফ্রিকা এবং এশিয়া মাইনরের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোও জয় করে নেয়। সপ্তম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ককেশাস অঞ্চলে ইসলামের প্রবেশ ঘটে, যার কিছু অংশ পরবর্তীতে রুশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। উমাইয়া খিলাফতের আমলে এই বিজয় অভিযান আরও বেগবান হয় এবং আইবেরিয়ান উপদ্বীপের (বর্তমান স্পেন ও পর্তুগাল) বেশিরভাগ অংশ মুসলিম শাসনাধীনে চলে আসে। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে মুসলিম বাহিনী সাইপ্রাস, মাল্টা, ক্রিট, সিসিলি এবং দক্ষিণ ইতালির বিভিন্ন অঞ্চল দখল করে ইউরোপে তাদের প্রভাব সুসংহত করে।

৭১১ খ্রিস্টাব্দে বার্বার সেনাপতি তারিক ইবনে জিয়াদের নেতৃত্বে আইবেরীয় উপদ্বীপে (বর্তমান স্পেন ও পর্তুগাল) মুসলিম বিজয়ের সূচনা হয়। ৩০শে এপ্রিল জিব্রাল্টারে অবতরণ করে তাঁর বাহিনী উত্তর দিকে অগ্রসর হয় এবং তৎকালীন খ্রিস্টান ভিসিগোথিক রাজ্য আক্রমণ করে। পরের বছর তারিক ইবনে জিয়াদ তাঁর উর্ধ্বতন আরব সেনাপতি মুসা ইবনে নুসাইরের বাহিনীর সাথে মিলিত হন।

তৎকালীন ভিসিগোথিক হিস্পানিয়া সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে চরম অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সংকটে নিমজ্জিত ছিল। মুসলিম বাহিনী এই রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তাদের আধিপত্য বিস্তার করে। মাত্র আট বছরের ঝটিকা অভিযানের মাধ্যমেই উত্তর-পশ্চিমের আস্তুরিয়াস এবং পিরেনিসের বাস্ক অঞ্চল ছাড়া প্রায় পুরো আইবেরীয় উপদ্বীপ মুসলিম শাসনের অধীনে চলে আসে। আরবী ভাষায় ‘আল-আন্দালুস’ নামে পরিচিত এই অঞ্চলটি বিশাল উমাইয়া সাম্রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়।

৭১৭ খ্রিস্টাব্দে কনস্টান্টিনোপলের দ্বিতীয় অবরোধের সময় বুলগেরিয়ার রাজা টেরভেলের শক্তিশালী হস্তক্ষেপ মুসলিম বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করে। এই ব্যর্থতা উমাইয়া রাজবংশের সামরিক মর্যাদা ও প্রভাবকে ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ণ করে। এর কিছুদিন পর, ৭২২ খ্রিস্টাব্দে আইবেরীয় উপদ্বীপে ডন পেলায়ো মাত্র ৩০০ আস্তুর সৈন্য নিয়ে মুসলিম সেনাপতি মুনুজার বাহিনীর মুখোমুখি হন। ঐতিহাসিক কোভাডোঙ্গার যুদ্ধে আস্তুরীয়দের কাছে আরব-মুর বাহিনী পরাজিত হয়ে পিছু হটে। এই জয় কেবল আস্তুরিয়াস রাজ্যই প্রতিষ্ঠা করেনি, বরং খ্রিস্টানদের হারানো ভূমি পুনরুদ্ধারের দীর্ঘ লড়াই বা ‘রিকনকুইস্তা’-র সূচনা করে, যার প্রথম সার্বভৌম শাসক ছিলেন ডন পেলায়ো।

ইউরোপের আরও গভীরে প্রভাব বিস্তারের লক্ষে মুসলিম বাহিনী পিরেনিজ পর্বতমালা পেরিয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হতে থাকে। তবে ৭৩২ খ্রিস্টাব্দে পোয়েটিয়ার যুদ্ধে (ব্যাটল অফ ট্যুরস) ফ্রাঙ্কিশ নেতা চার্লস মার্টেলের অসামান্য প্রতিরোধের মুখে তারা পরাজিত হয়। পরবর্তীতে ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে দামেস্কে আব্বাসীয়রা উমাইয়া খিলাফতকে উৎখাত করলে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে। তবে উমাইয়া রাজবংশের উত্তরসূরীরা ৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে আইবেরিয়ান উপদ্বীপে কর্ডোভাকে কেন্দ্র করে একটি স্বাধীন আমিরাত প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।

সামন্তবাদী খ্রিস্টধর্ম

৮০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে ইউরোপের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়, যখন পোপ তৃতীয় লিও ফ্রাঙ্কদের রাজা এবং ক্যারোলিঞ্জিয়ান রাজবংশের শ্রেষ্ঠ শাসক শার্লেমেনকে ‘রোমান সম্রাট’ হিসেবে অভিষিক্ত করেন। এর মাধ্যমেই আত্মপ্রকাশ করে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য (Holy Roman Empire)। বর্তমান ফ্রান্স, জার্মানি এবং নিম্ন দেশসমূহকে (Low Countries) কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই বিশাল সাম্রাজ্য আধুনিক হাঙ্গেরি, ইতালি, বোহেমিয়া, স্যাক্সনি এবং স্পেনের কিছু অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। শার্লেমেন এবং তাঁর পিতা পেপিন দ্য শর্ট লম্বার্ডদের হাত থেকে পোপকে সুরক্ষা দেওয়ার বিনিময়ে চার্চের সাথে এক শক্তিশালী রাজনৈতিক জোট গড়ে তুলেছিলেন, যা তাঁদের ক্ষমতাকে বৈধতা প্রদান করে।

তবে ৮১৪ খ্রিস্টাব্দে শার্লেমেনের মৃত্যুর পর এই রাজবংশের গৌরব ম্লান হতে থাকে এবং ৮৮৮ সালের মধ্যে বিশাল এই সাম্রাজ্য সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়ে। ক্ষমতার এই বিকেন্দ্রীকরণ ও খণ্ডবিখণ্ড অবস্থা অঞ্চলগুলোতে আধা-স্বায়ত্তশাসনের পথ প্রশস্ত করে। ঐতিহাসিকদের মতে, এই বিভাজনই ছিল আধুনিক ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো গঠনের অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ সূচনাবিন্দু।

ইউরোপের ইতিহাসে নবম ও দশম শতাব্দী ছিল বিভিন্ন জাতিসত্তার উত্থান এবং সাংস্কৃতিক বিবর্তনের এক অনন্য সময়। ৬৮১ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত বুলগেরিয়া প্রথম স্লাভিক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং বলকান অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। নবম শতাব্দীতে প্রেস্লাভ সাহিত্য বিদ্যালয়ে সিরিলিক লিপি উদ্ভাবনের মাধ্যমে বুলগেরিয়া স্লাভিক ইউরোপের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। বিশেষ করে সম্রাট প্রথম সিমিওনের (৮৯৩–৯২৭) শাসনামলে দেশটি তার সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির এক অনন্য ‘স্বর্ণযুগ’ প্রত্যক্ষ করে।

একই সময়ে স্লাভিক জনপদগুলোতে গ্রেট মোরাভিয়া এবং কিয়েভান রুশ নামে দুটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটে। অন্যদিকে, উত্তর ও পশ্চিম ইউরোপে তখন ভাইকিংদের দাপট তুঙ্গে। তাদের উন্নত ‘লংশিপ’ ব্যবহার করে তারা দ্রুতগতিতে আক্রমণ, বাণিজ্য এবং বসতি স্থাপনের মাধ্যমে অ্যাংলো-স্যাক্সন, ফ্রাঙ্ক ও স্কটদের ওপর গভীর সাংস্কৃতিক প্রভাব ফেলে। ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে তখন হাঙ্গেরিয়ানদের লুণ্ঠন এবং পেচেনেগদের আক্রমণ এক অস্থির পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল।

দশম শতাব্দীর শেষভাগে মধ্য ইউরোপে পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরি এবং বলকান অঞ্চলে ক্রোয়েশিয়া স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই সময়কালটি অর্থাৎ ১০০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে ইউরোপে সামন্তবাদের ব্যাপক বিস্তার ঘটে, যা পরোক্ষভাবে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় শক্তিকে দুর্বল করে দিয়েছিল।

পূর্ব ইউরোপের ইতিহাসে দশম শতাব্দী এক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে আছে। ৯২১ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফার দূত আহমেদ ইবনে ফাদলানের কূটনৈতিক ও ধর্মপ্রচারক প্রচেষ্টায় ভোলগা বুলগেরিয়ার শাসক আলমিস ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমেই ভোলগা বুলগেরিয়া একটি সুসংগঠিত ইসলামি রাষ্ট্রে পরিণত হয়, যা উত্তর ও পূর্ব ইউরোপের সাথে মুসলিম বিশ্বের বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

পশ্চিম ইউরোপে মধ্যযুগের শুরুর দিকের দাসপ্রথা ১০০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং এর স্থলাভিষিক্ত হয় ভূমিদাসত্ব বা সার্ফডোম। তবে ইংল্যান্ড এবং মুসলিম বিশ্বের সাথে সরাসরি বাণিজ্যিক বা ভৌগোলিক যোগাযোগ ছিল এমন প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে দাসপ্রথার অস্তিত্ব আরও দীর্ঘকাল বজায় ছিল। এই বিবর্তনে খ্রিস্টীয় চার্চের বিশেষ ভূমিকা ছিল; গির্জার কঠোর নিয়মকানুন খ্রিস্টানদের মধ্যে দাসপ্রথা নিরুৎসাহিত ও দমন করতে সহায়তা করে। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, এই সামাজিক পরিবর্তনটি ১০০০ খ্রিস্টাব্দের আশেপাশে অত্যন্ত দ্রুত বা আকস্মিকভাবে ঘটেছিল। তবে অন্য একদল গবেষক মনে করেন, ৩০০ থেকে ১০০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে এক দীর্ঘ ও ধীর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই রূপান্তরটি সম্পন্ন হয়েছিল।

মধ্য সামন্তযুগ

১০৫৪ খ্রিস্টাব্দে খ্রিস্টধর্মের ইতিহাসে এক অপূরণীয় বিচ্ছেদ ঘটে, যা ‘গ্রেট শিজম’ বা পূর্ব-পশ্চিম বিভেদ নামে পরিচিত। দীর্ঘদিনের ধর্মতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক মতপার্থক্যের জেরে রোমের ক্যাথলিক চার্চ এবং কনস্টান্টিনোপলের (বর্তমান ইস্তাম্বুল) অর্থোডক্স চার্চের মধ্যে এই চূড়ান্ত বিভাজন তৈরি হয়। এর ফলে খ্রিস্টীয় বিশ্ব স্থায়ীভাবে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে, যা ইউরোপের ধর্মীয় ও ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রকে চিরতরে বদলে দেয়।

একাদশ থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সামন্ততান্ত্রিক যুগে ইউরোপে এক অভূতপূর্ব জনতাত্ত্বিক বিস্ফোরণ ঘটে। এই দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি তৎকালীন সমাজ ও রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তনের সূচনা করে। ১২৫০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ এই জনসংখ্যা বৃদ্ধি অর্থনীতিতে এতটাই ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল যে, ১৯শ শতাব্দীর শিল্প বিপ্লবের আগে ইউরোপের অনেক অঞ্চলে এমন সমৃদ্ধি আর দ্বিতীয়বার দেখা যায়নি।

১০০০ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তী সময়ে পশ্চিম ইউরোপে দীর্ঘকাল ধরে চলা যাযাবর বা ‘বর্বর’ আক্রমণের চূড়ান্ত পর্যায় শেষ হয় এবং অঞ্চলটি রাজনৈতিকভাবে আরও সুসংগঠিত হতে শুরু করে। ভাইকিংরা ব্রিটেন, আয়ারল্যান্ড ও ফ্রান্সসহ বিভিন্ন স্থানে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে এবং তাদের মূল স্ক্যান্ডিনেভিয়ান জন্মভূমিতে শক্তিশালী খ্রিস্টান নর্স রাজ্যের বিকাশ ঘটে।

দশম শতাব্দীতে ম্যাগয়ারদের রাজ্য বিস্তার থমকে যায় এবং ১০০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মধ্য ইউরোপে রোমান ক্যাথলিক ‘হাঙ্গেরি অ্যাপোস্টোলিক রাজ্য’ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়। পরবর্তীকালে মঙ্গোল আক্রমণের মতো কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদ দিলে, ইউরোপে বড় ধরনের বহিরাগত উপজাতিদের আক্রমণের ধারা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে মহাদেশটিতে স্থিতিশীলতা আসে এবং আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের পথ প্রশস্ত হয়।

১১৮৫ সালে বাইজেন্টাইন শাসনের বিরুদ্ধে বুলগেরিয়ান এবং ভ্লাচদের এক সফল বিদ্রোহের মাধ্যমে বুলগেরিয়ার সার্বভৌমত্ব পুনপ্রতিষ্ঠিত হয়। এর পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় ক্রুসেডাররা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের ওপর আক্রমণ চালায় এবং ১২০৪ সালে কনস্টান্টিনোপল দখল করে সেখানে একটি ‘ল্যাটিন সাম্রাজ্য’ স্থাপন করে। তবে ১২০৫ সালের ১৪ এপ্রিল আদ্রিয়ানোপলের যুদ্ধে বুলগেরিয়ার শাসক কালোয়ান ল্যাটিন সম্রাট প্রথম বাল্ডউইনকে পরাজিত করে এক অভাবনীয় সামরিক সাফল্য অর্জন করেন।

বুলগেরিয়ার ইতিহাসে দ্বিতীয় ইভান আসেনের রাজত্বকাল ছিল ভৌগোলিক সীমানা বিস্তারের অনন্য এক সময়। অন্যদিকে, ইভান আলেকজান্ডারের শাসনামলে বুলগেরিয়ান শিল্প ও সংস্কৃতিতে যে নবজাগরণ ঘটেছিল, তাকে ‘বুলগেরিয়ার দ্বিতীয় স্বর্ণযুগ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ল্যাটিন শাসনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ১২৬১ সালে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য পুনরায় পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়।

একাদশ শতাব্দীতে ইউরোপের জনতাত্ত্বিক ও ভৌগোলিক মানচিত্রে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন সূচিত হয়। আল্পস পর্বতমালার উত্তরাঞ্চলীয় জনপদগুলো তখন থেকেই নতুন নতুন এলাকায় বসতি স্থাপন শুরু করে। চাষাবাদের উপযোগী ভূমি তৈরির লক্ষ্যে ইউরোপের বিশাল বনাঞ্চল এবং জলাভূমিগুলো পরিষ্কার করা হয়, যা কৃষিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

এই বসতি স্থাপনের প্রক্রিয়াটি ফ্রাঙ্কিশ সাম্রাজ্যের প্রথাগত সীমানা ছাড়িয়ে এলবে নদীর ওপারে ইউরোপের নতুন সীমান্তে ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে জার্মানির ভৌগোলিক আয়তন প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পায়। একই সময়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও পুনর্বাসনের এই জোয়ারে ক্রুসেডাররা লেভান্ট অঞ্চলে ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপন করে। আইবেরিয়ান উপদ্বীপে মুসলিম শাসনের অবসান ঘটিয়ে অধিকাংশ অঞ্চল পুনরায় জয় করা হয় এবং নরম্যানরা দক্ষিণ ইতালিতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে। মূলত এই সামগ্রিক বিস্তার মধ্যযুগীয় ইউরোপের শক্তি ও স্থিতিশীলতার এক বহিঃপ্রকাশ ছিল।

মধ্য সামন্ত যুগ ছিল ইউরোপীয় সভ্যতার এক অনন্য শৈল্পিক, বৌদ্ধিক ও আধ্যাত্মিক জাগরণের সময়। এই যুগের স্থাপত্যশৈলীতে রোমানেস্ক রীতির বিবর্তন ঘটে এবং জন্ম নেয় বিশ্ববিখ্যাত গথিক স্থাপত্য, যার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে ইউরোপজুড়ে সুবিশাল ও কারুকার্যময় ক্যাথেড্রালগুলো নির্মিত হয়। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এই সময়েই পশ্চিম ইউরোপে আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের প্রাথমিক ভিত্তি রচিত হয় এবং ইতালিতে ফ্লোরেন্স ও ভেনিসের মতো সমৃদ্ধ নগর-রাষ্ট্রগুলোর উত্থান ঘটে।

ধর্মীয় ও সামরিক ইতিহাসে এই যুগটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ; কারণ পবিত্র ভূমি দখলকারী সেলজুক তুর্কিদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে ক্যাথলিক পোপদের আহ্বানে ইউরোপজুড়ে ক্রুসেডারদের বিশাল স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠিত হয়। একই সময়ে জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের কালজয়ী কাজগুলোর পুনরাবিষ্কার থমাস অ্যাকুইনাসের মতো চিন্তাবিদদের অনুপ্রাণিত করে, যা মধ্যযুগীয় দর্শনে ‘স্কলাস্টিকিজম’ (Scholasticism) বা যুক্তিবাদী ধর্মতত্ত্বের বিকাশে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

ক্রুসেড ও অন্যান্য যুদ্ধসমূহ

১০৫৪ সালের পূর্ব-পশ্চিম বিভেদের পরবর্তী সময়ে মধ্য ইউরোপের নবগঠিত রাজ্যগুলো—যেমন পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি এবং বোহেমিয়া—পশ্চিমা খ্রিস্টধর্ম বা রোমান ক্যাথলিক মতাদর্শ গ্রহণ করে। এর ফলে রোমান ক্যাথলিক চার্চ ইউরোপের একটি প্রধান রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিতে পরিণত হয়, যা কালক্রমে পোপ এবং সম্রাটের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে উসকে দিয়েছিল।

এই যুগে ক্যাথলিক চার্চের ভৌগোলিক পরিধি নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। স্ক্যান্ডিনেভিয়া, লিথুয়ানিয়া, পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরির মতো অঞ্চলের পৌত্তলিক রাজাদের ধর্মান্তরকরণ, আইবেরিয়া উপদ্বীপে মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে খ্রিস্টানদের ‘রিকনকুইস্টা’ (Reconquista) অভিযান এবং পবিত্র ভূমি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে পরিচালিত ক্রুসেডগুলো এই প্রসারে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। ফলে ১৫শ শতাব্দী নাগাদ ইউরোপের বিশাল একটি অংশ রোমান ক্যাথলিক বিশ্বাসের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হয়।

একাদশ শতাব্দী থেকে পশ্চিম ইউরোপে আধুনিক সভ্যতার পুনর্জাগরণের প্রাথমিক লক্ষণগুলো স্পষ্ট হতে শুরু করে। ইতালিতে বাণিজ্য ও সামুদ্রিক কার্যক্রম পুনরায় প্রাণ ফিরে পাওয়ায় ভেনিস ও ফ্লোরেন্সের মতো স্বাধীন নগর-রাষ্ট্রগুলো অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছাতে থাকে। একই সময়ে ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, স্পেন এবং পর্তুগালের মতো অঞ্চলে আধুনিক ‘জাতি-রাষ্ট্র’ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। যদিও এই রাষ্ট্রগুলোর চূড়ান্ত রূপ নিতে রাজতন্ত্র, অভিজাত সামন্ত প্রভু এবং শক্তিশালী গির্জার মধ্যে কয়েক শতাব্দীব্যাপী ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও সমঝোতার প্রয়োজন হয়েছিল।

এই নবগঠিত জাতি-রাষ্ট্রগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ভাষাগত স্বকীয়তা। প্রথাগত লাতিন ভাষার পরিবর্তে তারা নিজস্ব স্থানীয় ভাষায় জ্ঞানচর্চা ও সাহিত্য রচনা শুরু করে। এই সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রপথিক হিসেবে দান্তে আলিঘিয়েরি এবং ক্রিস্টিন ডি পিজানের মতো ব্যক্তিত্বরা অমর হয়ে আছেন। তবে জার্মানি ও ইতালির বিশাল অংশ জুড়ে বিস্তৃত পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য তখন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অসংখ্য সামন্ততান্ত্রিক রাজ্য ও নগর-রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে; যেখানে সম্রাটের প্রতি স্থানীয় শাসকদের আনুগত্য ছিল নিছকই আনুষ্ঠানিক।

১৪শ শতাব্দীতে মঙ্গোল সাম্রাজ্যের অভাবনীয় উত্থানের সময়কালকে ঐতিহাসিকভাবে ‘মঙ্গোল যুগ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। বাতু খানের নেতৃত্বে মঙ্গোল বাহিনী পশ্চিম অভিমুখে তাদের বিজয় অভিযান পরিচালনা করে, যার ফলে প্রায় সমগ্র কিয়েভান রুশ এবং কিপচাক-কিউমান কনফেডারেশন তাদের পদানত হয়। তবে এই প্রবল ঝড়ের মুখেও বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি এবং পোল্যান্ড কোনোমতে নিজেদের সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিল।

মঙ্গোলীয় নথিপত্র থেকে জানা যায়, বাতু খান যখন অস্ট্রিয়া, ইতালি এবং জার্মানি আক্রমণের মাধ্যমে অবশিষ্ট ইউরোপ জয়ের চূড়ান্ত পরিকল্পনা করছিলেন, ঠিক তখনই মহান খান ওগেদেইয়ের মৃত্যুর সংবাদ আসে এবং তাঁকে মঙ্গোলিয়ায় তলব করা হয়। অধিকাংশ ঐতিহাসিক মনে করেন, ওগেদেইয়ের আকস্মিক মৃত্যু না হলে মঙ্গোলদের পক্ষে সমগ্র ইউরোপ জয় করা হয়তো সময়ের ব্যাপার ছিল। পূর্ব ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার যেসব অঞ্চল সরাসরি মঙ্গোল শাসনের অধীনে ছিল, তা ইতিহাসে ‘গোল্ডেন হোর্ড’ (Golden Horde) নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৪শ শতাব্দীর শুরুর দিকে উজবেগ খানের শাসনামলে ইসলাম এই অঞ্চলের রাষ্ট্রীয় ধর্মে পরিণত হয়।

আক্রমণকারী মঙ্গোল ও তাদের তুর্কি প্রজারা সম্মিলিতভাবে ‘তাতার’ নামে পরিচিতি পায়। রাশিয়ায় এই তাতাররা ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। অবশেষে ১৪৮০ সালে উগ্রা নদীর তীরে ঐতিহাসিক ‘গ্রেট স্ট্যান্ড’-এর মাধ্যমে রাশিয়ার ওপর থেকে দীর্ঘস্থায়ী ‘তাতার জোয়াল’ বা পরাধীনতার অবসান ঘটে।

উত্তর ইউরোপের ইতিহাসে ত্রয়োদশ শতাব্দী ছিল এক রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও ধর্মীয় পরিবর্তনের কাল। ১২২৬ সালে মাসোভিয়ার কনরাড পুরাতন প্রুশিয়ান এবং লিথুয়ানিয়ার বিরুদ্ধে ক্রুসেড পরিচালনার লক্ষ্যে চেল্মনো অঞ্চলটি টিউটোনিক নাইটদের হাতে তুলে দেন। এরই মধ্যে লিথুয়ানিয়ানদের কাছে ‘লিভোনিয়ান ব্রাদার্স অফ দ্য সোর্ড’ পরাজিত হলে, ১২৩৭ সালে পোপ নবম গ্রেগরি এই আদেশের অবশিষ্ট অংশকে টিউটোনিক নাইটদের সাথে একীভূত করে ‘লিভোনিয়ান অর্ডার’ গঠন করেন। শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে টিউটোনিক নাইটরা প্রুশিয়ানদের ওপর বিজয় সম্পন্ন করে এবং পরবর্তী দশকগুলোতে লিথুয়ানিয়ানদের খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করার প্রক্রিয়া শুরু করে।

এই নাইটরা কেবল পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধেই নয়, বরং পস্কভ ও নভগোরড প্রজাতন্ত্রের পূর্ব অর্থোডক্স চার্চের সাথেও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে লিপ্ত হয়। তবে ১২৪০ সালে ঐতিহাসিক নেভার যুদ্ধে নভগোরড সেনাবাহিনী ক্যাথলিক সুইডিশদের পরাজিত করে এবং এর দুই বছর পর ‘বরফের যুদ্ধে’ (Battle on the Ice) তারা লিভোনিয়ান অর্ডারকে চরমভাবে পরাস্ত করে। ১৩৮৬ সালের ক্রেও ইউনিয়ন (Union of Krewo) লিথুয়ানিয়ার ইতিহাসে দুটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে: প্রথমত, লিথুয়ানিয়ার ক্যাথলিক ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়া এবং দ্বিতীয়ত, পোল্যান্ডের সাথে একটি শক্তিশালী রাজবংশীয় ইউনিয়ন গঠন। এই ঐক্যের ফলেই লিথুয়ানিয়ার গ্র্যান্ড ডাচি তার ভৌগোলিক সীমানার সর্বোচ্চ বিস্তার ঘটায় এবং ১৪১০ সালে ঐতিহাসিক গ্রুনওয়াল্ডের যুদ্ধে অপরাজিত টিউটোনিক নাইটদের চূড়ান্তভাবে পরাজিত করতে সক্ষম হয়।

শেষ সামন্ত যুগ

চতুর্দশ এবং পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগ ছিল ইউরোপীয় সামন্ততান্ত্রিক যুগের সমাপনী অধ্যায়। ১৩০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে ইউরোপে দীর্ঘ কয়েক শতাব্দীর সমৃদ্ধি ও প্রবৃদ্ধির চাকা হঠাৎ থমকে যায়। ১৩১৫-১৩১৭ সালের ভয়াবহ ‘মহাদুর্ভিক্ষ’ এবং পরবর্তীকালে ‘ব্ল্যাক ডেথ’-এর মতো প্রাণঘাতী মহামারীর কবলে পড়ে মহাদেশটি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। প্লেগের প্রকোপ এতটাই তীব্র ছিল যে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে অগণিত মানুষের মৃত্যু ঘটে এবং অনেক অঞ্চলের জনসংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। এই বিভীষিকা থেকে বাঁচতে বেঁচে যাওয়া মানুষেরা দলে দলে জনপদ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়, যা মধ্যযুগীয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে আমূল বদলে দেয়।

ব্ল্যাক ডেথ ও দুর্ভিক্ষের ফলে জনসংখ্যা ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়ায় ইউরোপের শ্রমবাজারে এক অভাবনীয় পরিবর্তন আসে। শ্রমিকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বেঁচে থাকা কর্মজীবীরা আগের চেয়ে অনেক বেশি মজুরি দাবি করার সুযোগ পান, যা কৃষকদের ওপর চেপে বসা সামন্ততন্ত্রের কঠোর শৃঙ্খলকে অনেকটাই শিথিল করে দেয়। তবে এই রূপান্তর শান্তিপূর্ণ ছিল না; বরং ফ্রান্সে ‘জ্যাকেরি’ (Jacquerie) এবং ইংল্যান্ডে ‘কৃষক বিদ্রোহ’-এর মতো ভয়াবহ সামাজিক অস্থিরতা ও গণ-অভ্যুত্থান দেখা দেয়। একই সময়ে ‘গ্রেট শিজম’ বা মহান বিভাজনের ফলে ক্যাথলিক চার্চের অভ্যন্তরীণ ঐক্যও ভেঙে পড়ে। ইতিহাসের এই বহুমুখী বিপর্যয় ও পরিবর্তনের কালখণ্ডকেই সম্মিলিতভাবে ‘মধ্যযুগের শেষভাগের সংকট’ (Crisis of the Late Middle Ages) বলা হয়।

চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুতে বাল্টিক সাগর ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুট হিসেবে আবির্ভূত হয়। এই সময়ে বাণিজ্যিক শহরগুলোর একটি শক্তিশালী জোট ‘হ্যানসিয়াটিক লীগ’ (Hanseatic League) পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া এবং লিভোনিয়ার বিশাল অঞ্চলকে বাকি ইউরোপের সাথে বাণিজ্যিক সেতুবন্ধনে আবদ্ধ করে। এই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি পরবর্তীতে পোল্যান্ড-লিথুয়ানিয়া, হাঙ্গেরি, বোহেমিয়া এবং মুসকোভির মতো অঞ্চলে শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছিল।

ঐতিহাসিকভাবে ১৪৫৩ সালে অটোমান তুর্কিদের হাতে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলের পতনকে মধ্যযুগের সমাপ্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। তুর্কিরা এই শহরটিকে তাদের বিশাল অটোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে, যা ১৯২২ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল। এই সাম্রাজ্যের অধীনে মিশর, সিরিয়া এবং বলকান অঞ্চলের এক বিশাল অংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইউরোপীয় ভূখণ্ডে অটোমানদের এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এবং প্রভাব মহাদেশটির ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

পঞ্চদশ শতাব্দীর ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা হয় ১৪৩৯ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ, যখন জার্মানির মেইঞ্জ শহরে জোহানেস গুটেনবার্গ ‘মুভেবল টাইপ’ বা আধুনিক ছাপাখানা উদ্ভাবন করেন। এই উদ্ভাবনের মূলে ছিল উচ্চ মধ্যযুগে আরবদের হাত ধরে চীন থেকে ইউরোপে আসা কাগজের সহজলভ্যতা।

পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে এই প্রযুক্তি অভাবনীয় গতিতে সমগ্র মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে, যা জ্ঞানচর্চায় এক প্রকৃত বিপ্লব নিয়ে আসে। এর প্রভাব এতটাই সুদূরপ্রসারী ছিল যে, ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যেই ইউরোপের ২০০টিরও বেশি শহরে ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং প্রায় ৮০ লক্ষ থেকে ২ কোটি বই মুদ্রিত হয়ে সাধারণ মানুষের নাগালে চলে আসে। এই তথ্যের প্রবাহই মূলত মধ্যযুগীয় অন্ধকার কাটিয়ে ইউরোপকে রেনেসাঁ ও আধুনিক যুগের আলোকবর্তিকা দেখিয়েছিল।

পুঁজিবাদী যুগে ইউরোপ

আদি আধুনিক ইউরোপ

ইউরোপীয় ইতিহাসে আধুনিক যুগের সূচনালগ্ন মূলত সামন্তবাদের অবসান এবং শিল্প বিপ্লবের মধ্যবর্তী সময়কালকে নির্দেশ করে, যা আনুমানিক ১৫০০ থেকে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এই সময়কালটি ১৪৯২ সালে কলম্বাস কর্তৃক ‘নতুন বিশ্ব’ (আমেরিকা) আবিষ্কার থেকে শুরু করে ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব পর্যন্ত ধরা হয়।

এই যুগটি ছিল আধুনিক বিজ্ঞানের জয়যাত্রা এবং দ্রুত প্রযুক্তিগত অগ্রগতির এক অনন্য সন্ধিক্ষণ। রাজনীতিতে এ সময় ধর্মীয় প্রভাব কাটিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ নাগরিক শাসন এবং শক্তিশালী জাতি-রাষ্ট্রের (Nation State) উদ্ভব ঘটে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সামন্তবাদ ও ভূমিদাসত্বের পতন ঘটে এবং তার স্থলাভিষিক্ত হয় পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা। বিশেষ করে ‘বাণিজ্যবাদ’ বা মার্কেন্টিলিজম (Mercantilism) এই সময়ের প্রধান অর্থনৈতিক তত্ত্ব হিসেবে আধিপত্য বিস্তার করে।

সামগ্রিকভাবে, প্রাথমিক আধুনিক যুগটি ছিল ক্যাথলিক চার্চের একচ্ছত্র ক্ষমতা হ্রাসের কাল। এই ৩০০ বছরেই ইউরোপ প্রত্যক্ষ করেছে রেনেসাঁ বা নবজাগরণ, বৈজ্ঞানিক বিপ্লব এবং প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার আন্দোলনের মতো যুগান্তকারী ঘটনা। একই সাথে এই সময়টি ভয়াবহ ত্রিশ বছরের যুদ্ধ, আমেরিকায় ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপন এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন ‘উইচ হান্ট’ বা ডাইনি শিকারের মতো অস্থিরতারও সাক্ষী হয়ে আছে।

রেনেসাঁ বা নবজাগরণ: ইউরোপীয় আধুনিকতার ভিত্তি

রেনেসাঁ বা নবজাগরণ ছিল চতুর্দশ থেকে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত বিস্তৃত ইউরোপের এক বৈপ্লবিক বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তর। ধ্রুপদী গ্রিক ও রোমান ঐতিহ্যের পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে এই আন্দোলন মধ্যযুগীয় স্থবিরতা ভেঙে মানবতাবাদ (Humanism) ও যুক্তিবাদকে চিন্তার কেন্দ্রে স্থাপন করে। ইতালিতে সূচিত এই জাগরণ দ্রুত সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে সাহিত্য, শিল্পকলা এবং দর্শনে এক অভূতপূর্ব সৃজনশীলতা ও ইহজাগতিকতার জন্ম দেয়। [১, ২]

এই যুগে ম্যাকিয়াভেলির রাষ্ট্রচিন্তা ও সার্বভৌম জাতীয় রাষ্ট্রের উদ্ভব রাজনৈতিক কাঠামোকে আমূল বদলে দেয়। পাশাপাশি, কোপার্নিকাস ও গ্যালিলিওর সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাসের পরিবর্তে প্রাকৃতিক নিয়মের শাসন প্রতিষ্ঠা করে। রেনেসাঁর এই বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক ভিত্তিই পরবর্তীকালে ইউরোপে আলোকায়ন (Enlightenment) এবং আধুনিক শিল্প বিপ্লবের পথ প্রশস্ত করেছিল। [৩, ৪]

👉 বিস্তারিত পড়ুন: রেনেসাঁ: ইউরোপীয় আধুনিকতার উদয় ও বৌদ্ধিক রূপান্তর

অনুসন্ধান এবং বাণিজ্য

এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণেই শুরু হয় ‘ভৌগোলিক আবিষ্কারের এক স্বর্ণযুগ’। ১৪৫৩ সালে অটোমান তুর্কিদের হাতে কনস্টান্টিনোপলের পতনের ফলে প্রাচ্যের সাথে ইউরোপের প্রচলিত স্থলপথের বাণিজ্য ব্যবস্থা প্রায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। এই সংকট পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলোকে বিকল্প সমুদ্রপথ খুঁজে বের করতে বাধ্য করে।

এরই ধারাবাহিকতায় ১৪৯২ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাস আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে অজান্তেই আমেরিকার ‘নতুন বিশ্ব’ আবিষ্কার করেন। এর কয়েক বছর পর, ১৪৯৮ সালে ভাস্কো দা গামা আফ্রিকা মহাদেশ প্রদক্ষিণ করে সমুদ্রপথে ভারতের জলপথ আবিষ্কার করতে সক্ষম হন। এই অভিযানগুলো কেবল বাণিজ্যের নতুন দুয়ারই খোলেনি, বরং বিশ্ব মানচিত্র ও রাজনীতির ইতিহাসকেও চিরতরে বদলে দিয়েছিল।

ইউরোপের অভ্যন্তরীণ বিরামহীন যুদ্ধবিগ্রহ সত্ত্বেও, বিশ্বজয়ের নেশায় বুঁদ রাষ্ট্রগুলো আফ্রিকা থেকে এশিয়া এবং সদ্য আবিষ্কৃত আমেরিকা পর্যন্ত তাদের আধিপত্য বিস্তারে পিছপা হয়নি। পঞ্চদশ শতাব্দীতে পর্তুগাল ভারতের জলপথ সন্ধানে আফ্রিকার উপকূলজুড়ে ভৌগোলিক অনুসন্ধানের নেতৃত্ব দেয়। এরপর স্পেনের উত্থান ঘটলে, ১৪৯৪ সালের ঐতিহাসিক ‘তর্দেসিলাস চুক্তি’ (Treaty of Tordesillas)-এর মাধ্যমে এই দুই শক্তি অজানাকে জয় করার লক্ষে বিশ্বকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। তারাই প্রথম আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার উপকূলে ইউরোপীয় বাণিজ্য কেন্দ্র বা ‘ফ্যাক্টরি’ স্থাপন করে। ১৫১১ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ১৫১৩ সালে চীন এবং ১৫৪২ সালে জাপানের সাথে ইউরোপের প্রথম সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগ স্থাপিত হয়।

একই সময়ে ইউরেশিয়ার মূল ভূখণ্ডে রুশ সাম্রাজ্যের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। ১৫৫২ সালে রুশ জার ইভান দ্য টেরিবল কাজান ও আস্ট্রাকান নামে দুটি শক্তিশালী তাতার খানাট জয় করেন। ১৫৮০ সালে ইয়েরমাকের দুঃসাহসিক অভিযানের ফলে সাইবেরিয়ান খানাট রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয় এবং পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে রুশরা পূর্ব ও দক্ষিণে ক্রমাগত অগ্রসর হয়ে প্রায় সমগ্র সাইবেরিয়া নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। মহাসাগরীয় অভিযানের এই জোয়ারে শীঘ্রই ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডস যুক্ত হয়। তারা প্রশান্ত মহাসাগরে পর্তুগিজ ও স্প্যানিশদের বিকল্প বাণিজ্য পথ খুঁজতে গিয়ে ১৬০৬ সালে অস্ট্রেলিয়া এবং ১৬৪২ সালে নিউজিল্যান্ডের উপকূলে পৌঁছাতে সক্ষম হয়।

ধর্মসংস্কার বা রিফর্মেশন

ছাপাখানার উদ্ভাবন ইউরোপের চিন্তাজগতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূত্রপাত ঘটায়। এর মাধ্যমে নতুন নতুন ধারণা ও জ্ঞান দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে বিজ্ঞান ও ধর্মতত্ত্বের প্রচলিত রক্ষণশীল মতবাদগুলো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। এই বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের সমান্তরালে জার্মান ধর্মতত্ত্ববিদ মার্টিন লুথারের নেতৃত্বে শুরু হওয়া ‘রিফর্মেশন’ বা ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন পোপের একচ্ছত্র কর্তৃত্বকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করে।

ঐতিহাসিকভাবে ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে লুথারের বিখ্যাত ‘দ্য নাইনটি-ফাইভ থিসিস’ প্রকাশের মাধ্যমেই এই সংস্কার আন্দোলনের সূচনা বলে গণ্য করা হয়। দীর্ঘকাল ধরে চলা রক্তক্ষয়ী ধর্মীয় সংঘাতের পর ১৬৪৮ সালে ওয়েস্টফালিয়া চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপে এই অস্থিরতার অবসান ঘটে এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার নতুন এক কাঠামো তৈরি হয়।

ক্যাথলিক চার্চের অভ্যন্তরে দুর্নীতির প্রতিবাদে ষোড়শ শতাব্দীতে যে প্রটেস্ট্যান্ট সংস্কার আন্দোলনের সূচনা হয়, তা ইউরোপের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকে আমূল বদলে দেয়। এই আন্দোলন বিশেষ করে সেই সব রাজা ও সামন্ত প্রভুদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়, যাঁরা চার্চের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। 

মার্টিন লুথারের পাশাপাশি এই সময়ে আরও বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন জন ক্যালভিন, যাঁর প্রবর্তিত ‘ক্যালভিনিজম’ সুইজারল্যান্ড ছাড়িয়ে ইউরোপের অনেক দেশে ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে, ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরি পোপের কর্তৃত্ব অস্বীকার করে ক্যাথলিক চার্চ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান এবং ১৫৩৪ সালে ‘অ্যাক্টস অফ সুপ্রিমেসি’-এর মাধ্যমে অ্যাংলিকান চার্চ বা চার্চ অফ ইংল্যান্ড প্রতিষ্ঠা করেন। 

এই ধর্মীয় বিভাজন কেবল আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি ইউরোপজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের একটি ঢেউ নিয়ে আসে। একদিকে ধর্মীয় আবেগ এবং অন্যদিকে ইউরোপীয় রাজাদের ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা—এই দ্বৈত প্রভাবে মহাদেশটি এক অস্থির পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। 

প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কারের জোয়ার সামাল দিতে এবং নিজেদের অভ্যন্তরীণ শুদ্ধিকরণের লক্ষ্যে ক্যাথলিক চার্চ ‘কাউন্টার-রিফর্মেশন’ বা প্রতি-সংস্কার নামে এক শক্তিশালী আন্দোলনের সূচনা করে। এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল চার্চের অভ্যন্তরে বিদ্যমান দুর্নীতি নির্মূল করা এবং ক্যাথলিক মতবাদকে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করা।

এই সময় ক্যাথলিক চার্চের পুনরুত্থানে দুটি বিশেষ গোষ্ঠী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রথমত, জেসুইট (Jesuits) সম্প্রদায়, যারা তাদের শিক্ষা ও প্রচারণার মাধ্যমে স্পেন, পর্তুগাল এবং পোল্যান্ডের মতো দেশগুলোকে পুনরায় ক্যাথলিক আদর্শের বলয়ে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। দ্বিতীয়ত, সেন্ট ফিলিপ নেরির অনুসারীরা রোমের সাধারণ মানুষের সেবা ও আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে যিশু খ্রিস্টের প্রতিষ্ঠিত চার্চের প্রতি জনমনে হারানো আস্থা পুনরুদ্ধার করেন।

তবে এই প্রতি-সংস্কার সত্ত্বেও ক্যাথলিক চার্চের পূর্বের একচ্ছত্র আধিপত্য কিছুটা ম্লান হয়ে পড়ে। ইউরোপের একটি বড় অংশ চার্চের কর্তৃত্ব থেকে বেরিয়ে যায় এবং যেসব দেশ ক্যাথলিক থেকে গিয়েছিল, সেখানকার রাজারাও নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে গির্জার প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে শুরু করেন।

তৎকালীন অনেক ইউরোপীয় দেশের তুলনায় পোলিশ-লিথুয়ানিয়ান কমনওয়েলথ প্রোটেস্ট্যান্ট আন্দোলনের প্রতি বিরল সহনশীলতা প্রদর্শন করেছিল। একই রকম ধর্মীয় উদারতা দেখা গিয়েছিল ট্রান্সিলভেনিয়ার প্রিন্সিপ্যালিটি এবং অটোমান শাসিত হাঙ্গেরির কিছু অঞ্চলেও। এসব রাষ্ট্রে ক্যাথলিক ধর্মের প্রাধান্য বজায় থাকলেও, বিশাল ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজস্ব বিশ্বাস, রীতিনীতি ও ঐতিহ্য পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে পোলিশ-লিথুয়ানিয়ান কমনওয়েলথ হয়ে উঠেছিল ক্যাথলিক, প্রোটেস্ট্যান্ট, অর্থোডক্স এবং ইহুদিদের এক মিলনস্থল; এমনকি সেখানে একটি ক্ষুদ্র মুসলিম জনগোষ্ঠীরও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ছিল।

ইউরোপীয় ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে ‘ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্ব’ ধারণার পাশাপাশি মন্টেইনের মতো চিন্তাবিদদের হাত ধরে এক বিপরীতমুখী ভাবনারও উদয় ঘটে, যেখানে অ-ইউরোপীয়দের আরও ‘প্রাকৃতিক’ ও ‘আদিম অথচ উন্নত’ মানুষ হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়। এই সময়ে সমগ্র ইউরোপে সুসংগঠিত ডাক পরিষেবা চালু হওয়ায় ধর্মীয় বিভাজন থাকা সত্ত্বেও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে একটি মানবিক ও শক্তিশালী আন্তঃসংযোগ গড়ে ওঠে। তবে রোমান ক্যাথলিক চার্চ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক কাজ নিষিদ্ধ করায় প্রোটেস্ট্যান্ট দেশগুলো এক ধরনের বৌদ্ধিক সুবিধা লাভ করে, কারণ সেখানে বই নিষিদ্ধকরণের প্রক্রিয়াটি ছিল অনেকটাই বিকেন্দ্রীকৃত। একই সময়ে ফ্রান্সিস বেকনের মতো বিজ্ঞানীরা প্রকৃতির শাশ্বত ঐক্যের ধারণাকে কাজে লাগিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে একটি নতুন মেলবন্ধন তৈরির চেষ্টা করেন।

পঞ্চদশ শতাব্দীতে মধ্যযুগের অবসানের সাথে সাথে ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও স্পেনে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূতকারী একদল শক্তিশালী নতুন রাজতন্ত্রের আবির্ভাব ঘটে। তবে এর বিপরীত চিত্র দেখা যায় পোলিশ-লিথুয়ানিয়ান কমনওয়েলথে, যেখানে সংসদ শক্তিশালী হয়ে রাজার কাছ থেকে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা কেড়ে নেয়। রাজকীয় এই ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ইংল্যান্ডসহ অন্যান্য দেশের সংসদীয় কাঠামোগুলোও প্রভাবশালী হয়ে উঠতে থাকে। এরই ফলে এক নতুন ধরনের রাজনৈতিক কাঠামোর উদ্ভব ঘটে, যা ছিল মূলত আঞ্চলিক শাসক, শহর, কৃষক প্রজাতন্ত্র এবং নাইটদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমঝোতার এক অনন্য রূপ।

বাণিজ্যবাদ এবং ঔপনিবেশিক বিস্তারণ

ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক তৎপরতায় আইবেরিয়ান রাজ্যগুলো একক আধিপত্য বিস্তার করেছিল। ১৫ ও ১৬ শতকে পর্তুগিজরা প্রথম বিশ্ব-সাম্রাজ্য গড়ে তোলে, আর ১৬ শতক থেকে ১৭ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত ক্যাস্টিলের মুকুট (যাতে ১৫৮০-১৬৪০ পর্যন্ত পর্তুগালও অন্তর্ভুক্ত ছিল) বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

তবে ১৭ ও ১৮ শতকে ব্রিটিশ, ফরাসি, ডাচ এবং সুইডিশদের ঔপনিবেশিক অভিযান শুরু হলে আমেরিকায় স্প্যানিশদের একচ্ছত্র আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। বাণিজ্যের এই নতুন ধরন এবং প্রসারিত ভৌগোলিক দিগন্তের সঙ্গে তাল মেলাতে শাসনব্যবস্থা, আইন এবং অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনা অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে ইউরোপীয় শক্তির ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকলেও বেশ কিছু বড় রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। বিশেষ করে ব্রিটিশ আমেরিকান উপনিবেশগুলোর সফল স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং নেপোলিয়নীয় যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট অস্থিরতার সুযোগে হাইতি, মেক্সিকো, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলো স্বাধীনতা অর্জন করে। এই বিস্তৃত মানচিত্রে স্পেনের নিয়ন্ত্রণে ছিল উত্তর আমেরিকার বিশাল অংশ, সমগ্র মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা, ক্যারিবিয়ান এবং ফিলিপাইন। অন্যদিকে, ব্রিটেন তার সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিল সমগ্র অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ভারতের অধিকাংশ এলাকা এবং আফ্রিকা ও উত্তর আমেরিকার বড় একটি অংশে।

ফ্রান্সের অধীনে ছিল কানাডা ও ভারতের কিছু অংশ (যা ১৭৬৩ সালে তারা ব্রিটেনের কাছে হারায়), ইন্দোচীন, আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল এবং ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ। নেদারল্যান্ডস দখল করেছিল বর্তমান ইন্দোনেশিয়া (ইস্ট ইন্ডিজ) ও ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ। পর্তুগাল তার আধিপত্য বজায় রেখেছিল ব্রাজিল এবং আফ্রিকা ও এশিয়ার বেশ কিছু অঞ্চলে। পরবর্তীকালে জার্মানি, বেলজিয়াম, ইতালি এবং রাশিয়ার মতো উঠতি শক্তিগুলোও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নতুন নতুন উপনিবেশ স্থাপনে লিপ্ত হয়।

এই ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণ ইউরোপীয় দেশগুলোর অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন এনেছিল। সাম্রাজ্যগুলোর আপেক্ষিক স্থিতিশীলতা বিশ্ববাণিজ্যের প্রসারে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, কেবল আমেরিকা থেকে আসা রূপাই স্পেনের মোট জাতীয় বাজেটের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জোগান দিত।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফরাসি উপনিবেশ সেন্ট-ডোমিঙ্গে (বর্তমান হাইতি) ইউরোপের অন্যতম ধনী এবং লাভজনক অঞ্চলে পরিণত হয়। এই সমৃদ্ধি মূলত গড়ে উঠেছিল দাসশ্রমের ওপর ভিত্তি করে তৈরি বিশাল কৃষি বা ‘প্ল্যান্টেশন’ অর্থনীতির ওপর। ফরাসি শাসনামলে এই একটিমাত্র দ্বীপ থেকে উৎপাদিত ফসল ছিল মোট ফরাসি বাণিজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ। এছাড়া, আটলান্টিক মহাসাগরীয় চিনির বাজারের ৪০ শতাংশই এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করত সেন্ট-ডোমিঙ্গে।

১৭ শতকের সংকট

সপ্তদশ শতাব্দীকে ঐতিহাসিকভাবে প্রায়শই একটি ‘সংকটের যুগ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। যদিও কিছু ঐতিহাসিক এই ধারণাকে ভিন্নভাবে দেখেন, তবে অনেকের মতেই এই সময়টি যুদ্ধ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও শিল্পকলার বিবর্তনে এক অমূল্য অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে। বিশেষ করে ১৬১৮ থেকে ১৬৪৮ সাল পর্যন্ত চলা ত্রিশ বছরের যুদ্ধ সাধারণ মানুষের ওপর যুদ্ধের ভয়াবহতাকে চরমভাবে ফুটিয়ে তুলেছিল।

১৬৪০-এর দশকে বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর যে ভাঙন দেখা গিয়েছিল, তা লিপিবদ্ধ ইতিহাসে বিরল। ইউরোপের তৎকালীন বৃহত্তম রাষ্ট্র, পোলিশ-লিথুয়ানিয়ান কমনওয়েলথ, সাময়িকভাবে মানচিত্র থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়। অন্যদিকে, বিশ্বের প্রথম বিশ্ব-সাম্রাজ্য হিসেবে পরিচিত স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে বিচ্ছিন্নতাবাদ ও চরম অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি ব্রিটেনেও স্টুয়ার্ট রাজতন্ত্রের অধীনে থাকা ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও উত্তর আমেরিকার উপনিবেশগুলো বিদ্রোহে ফেটে পড়ে।

সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে রাজনৈতিক ও গণ-বিদ্রোহের এমন এক ঢেউ আছড়ে পড়েছিল, যা ইউরোপ ও এশিয়ার প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেয়। আধুনিক গবেষণায় দেখা যায়, এই সময়ে উত্তর গোলার্ধে মৃত্যুহার ছিল নজিরবিহীন এবং অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় এই কয়েক দশকে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।

নিরঙ্কুশতার যুগ

সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একদল অত্যন্ত প্রভাবশালী শাসকের আবির্ভাব ঘটে, যাঁদের শাসনকাল ইতিহাসে “নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের” (Absolute Monarchy) স্বর্ণযুগ হিসেবে পরিচিত। ফ্রান্সের চতুর্দশ লুই, রাশিয়ার পিটার দ্য গ্রেট, হ্যাবসবার্গ সাম্রাজ্যের মারিয়া থেরেসা এবং প্রুশিয়ার ফ্রেডেরিক দ্য গ্রেট—তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ রাষ্ট্রে ক্ষমতার একচ্ছত্র কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিলেন।

এই শাসকরা অত্যন্ত দক্ষ আমলাতন্ত্র এবং সুশৃঙ্খল শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তোলার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে সরাসরি রাজদরবারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। তাঁদের এই সুসংগঠিত এবং কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা ইউরোপের রাষ্ট্রকাঠামোকে মধ্যযুগীয় শিথিলতা থেকে বের করে এনে এক আধুনিক ও শক্তিশালী প্রশাসনিক রূপ দান করেছিল।

আধুনিক যুগের সূচনালগ্নে পশ্চিম ইউরোপের অর্থনৈতিক কাঠামোয় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়। সামন্তবাদের বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে পুঁজিবাদ (বাণিজ্যবাদ বা মার্কেন্টিলিজমের হাত ধরে) অর্থনৈতিক সংগঠনের প্রধান রূপ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ভৌগোলিক আবিষ্কার এবং ঔপনিবেশিক সীমানার বিস্তৃতি এক বিশাল বাণিজ্যিক বিপ্লবের জন্ম দেয়, যা বিশ্বজুড়ে পণ্যের আদান-প্রদানকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।

এই সময়কালটি আধুনিক বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উত্থান এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কারকে প্রযুক্তিতে প্রয়োগের জন্য ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। বিজ্ঞানের এই জয়যাত্রাই মূলত ১৭৫০ সালের পরবর্তী সময়ে শিল্প বিপ্লবের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল এবং মানবসভ্যতাকে এক আধুনিক ও যান্ত্রিক যুগের দিকে ধাবিত করেছিল।

ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন বা ‘রিফর্মেশন’ ইউরোপের সংহতির ওপর এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল। এই আন্দোলনের ফলে কেবল রাষ্ট্রগুলোই একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েনি, বরং অনেক রাজ্য অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় দ্বন্দ্বে জর্জরিত হয়ে পড়ে—যে সুযোগটি কাজে লাগিয়েছিল তাদের বহিরাগত শত্রুরা।

ষোড়শ শতাব্দীতে ফ্রান্স ‘ফরাসি ধর্মযুদ্ধ’ নামে এক দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়, যার পরিসমাপ্তি ঘটে বোর্বন রাজবংশের বিজয়ের মাধ্যমে। অন্যদিকে, ইংল্যান্ড রানী প্রথম এলিজাবেথের শাসনামলে এক ধরনের মধ্যপন্থী ‘অ্যাংলিকানবাদ’ গ্রহণের মাধ্যমে ধর্মীয় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনে। আধুনিক জার্মানির বিশাল অংশ তখন পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের তাত্ত্বিক কাঠামোর অধীনে অসংখ্য ছোট ছোট সার্বভৌম রাষ্ট্রে বিভক্ত ছিল, যেগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ফলে আরও প্রকট হয়ে ওঠে। তবে এই চরম অস্থিরতার মধ্যেও পোলিশ-লিথুয়ানিয়ান কমনওয়েলথ তার অনন্য ধর্মীয় উদারতা এবং ইউরোপীয় ধর্মীয় সংঘাতের প্রতি সাধারণ অনাক্রম্যতা বজায় রেখে এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।

ত্রিশ বছরের যুদ্ধ ১৬১৮–১৬৪৮

১৬১৮ থেকে ১৬৪৮ সালের মধ্যবর্তী সময়ে সংঘটিত ত্রিশ বছরের যুদ্ধ ছিল ইউরোপীয় ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী ও বিধ্বংসী অধ্যায়। ইংল্যান্ড ও রাশিয়া ব্যতীত তৎকালীন প্রায় সমস্ত প্রধান ইউরোপীয় শক্তি এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল, যার মূলে ছিল ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যকার তীব্র ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংঘাত।

এই যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছিল সাধারণ মানুষের ওপর। খাদ্য সংগ্রহের সন্ধানে হন্যে হয়ে ঘোরা বিশাল সেনাবাহিনীগুলো একের পর এক জনপদ ধ্বংস করে দেয়, যার ফলে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জনশূন্য হয়ে পড়ে। উপর্যুপরি দুর্ভিক্ষ, মহামারী এবং পারিবারিক কাঠামো ভেঙে পড়ার ফলে জার্মান রাজ্যগুলোসহ পার্শ্ববর্তী বোহেমিয়া, নিম্ন দেশসমূহ (Low Countries) এবং উত্তর ইতালির জনবসতি কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। একই সাথে যুদ্ধে লিপ্ত অনেক আঞ্চলিক শক্তি অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়ে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সরাসরি যুদ্ধ, রোগব্যাধি, অনাহার এবং জন্মহার হ্রাসের ফলে তৎকালীন জার্মান জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ থেকে এক-তৃতীয়াংশ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল।

১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফালিয়া শান্তি চুক্তি ইউরোপীয় ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করে। এই চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রগুলোকে নিজ নিজ ধর্মীয় আনুগত্য নির্বাচনের সার্বভৌম অধিকার প্রদান করা হয়। এর পরবর্তী সময়ে ইউরোপের অধিকাংশ অঞ্চলে ‘নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র’ বা স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এক আদর্শ কাঠামো হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এর ব্যতিক্রমও ছিল; বিশেষ করে ইংল্যান্ডে ‘গৃহযুদ্ধ’ এবং পরবর্তীতে ১৬৮৮ সালের ‘গৌরবময় বিপ্লব’ (Glorious Revolution)-এর মধ্য দিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থার এক অনন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়।

যদিও ইউরোপে সামরিক সংঘাত একেবারে থেমে যায়নি, তবে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে যুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাব আগের চেয়ে কিছুটা হ্রাস পায়। মহাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নত জনপদগুলোতে ‘আলোকায়ন’ বা এনলাইটেনমেন্ট (Enlightenment) এক নতুন দার্শনিক ভিত্তি প্রদান করে। ছাপাখানার কল্যাণে সাক্ষরতার হার বাড়তে থাকায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার ঘটে, যা মানুষের চিন্তাধারায় এক শক্তিশালী ধর্মনিরপেক্ষ ও যুক্তিবাদী চেতনার জন্ম দেয়।

১৩৮৬ সালের ক্রেও ইউনিয়নের পর থেকে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে পোল্যান্ড রাজ্য এবং লিথুয়ানিয়ার গ্র্যান্ড ডাচির একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে এই অঞ্চলটি মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের এক বিশাল রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। মূলত সুইডেন, পোলিশ-লিথুয়ানিয়ান কমনওয়েলথ এবং অটোমান সাম্রাজ্য—এই তিন পরাশক্তি একে অপরের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী ও বিধ্বংসী যুদ্ধে লিপ্ত হয়। পোল্যান্ড বিশেষ করে খমেলনিটস্কি বিদ্রোহ, রুশো-পোলিশ যুদ্ধ এবং ‘দ্য ডেলুজ’ বা জলপ্লাবনের মতো ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল।

কালের পরিক্রমায় এই তিনটি প্রাচীন শক্তির সূর্য ম্লান হতে শুরু করে এবং তাদের স্থলাভিষিক্ত হয় উদীয়মান তিনটি ‘আলোকিত স্বৈরতান্ত্রিক’ রাজতন্ত্র: রাশিয়া, প্রুশিয়া এবং অস্ট্রিয়া (হ্যাবসবার্গ রাজতন্ত্র)। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে এই নতুন শক্তিগুলো ইউরোপের ভাগ্যবিধাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়। তারা পোল্যান্ডকে নিজেদের মধ্যে বিভক্ত করে নেয় এবং সুইডেন ও তুরস্ককে রাশিয়ার ও অস্ট্রিয়ার কাছে বিশাল ভূখণ্ড হারিয়ে চরম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়।

স্প্যানিশ উত্তরাধিকার যুদ্ধ

স্প্যানিশ উত্তরাধিকার যুদ্ধ (১৭০১-১৭১৫) ছিল ইউরোপীয় ইতিহাসের এক বিশাল এবং গুরুত্বপূর্ণ সংঘাত। এই যুদ্ধে ফ্রান্সের একচ্ছত্র আধিপত্যের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, হ্যাবসবার্গ রাজতন্ত্র এবং প্রুশিয়া একটি শক্তিশালী জোট গঠন করে। ১৭০৪ সালে ঐতিহাসিক ব্লেনহাইমের যুদ্ধে ডিউক অফ মার্লবোরোর নেতৃত্বে ইংরেজ ও ডাচ বাহিনী এক অসামান্য বিজয় অর্জন করে।

এই যুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা। প্রশ্ন ছিল—সম্রাট চতুর্দশ লুইয়ের অধীনে ফ্রান্স কি স্পেনের বিশাল সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইউরোপের অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিতে পরিণত হবে, নাকি অন্যান্য প্রধান দেশগুলোর সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে বাধ্য হবে? যুদ্ধের শুরুতে মিত্রশক্তি সাফল্য পেলেও শেষ পর্যন্ত এটি একটি সামরিক অচলাবস্থায় রূপ নেয়। অবশেষে ১৭১৩ সালে ইউট্রেখ্ট চুক্তির (Treaty of Utrecht) মাধ্যমে এই সংঘাতের অবসান ঘটে, যা ইউরোপে ‘ক্ষমতার ভারসাম্য’ (Balance of Power) রক্ষার নীতিকে প্রতিষ্ঠিত করে। ইতিহাসবিদ রাসেল ওয়েইগলির মতে, যুদ্ধের পেছনে যে পরিমাণ জানমাল ও অর্থ ব্যয় হয়েছিল, তার অর্জিত ফলাফল ছিল অত্যন্ত সামান্য।

প্রুশিয়া

১৭৪০ থেকে ১৭৮৬ সাল পর্যন্ত প্রুশিয়ার সিংহাসনে আসীন রাজা ফ্রেডেরিক দ্য গ্রেট ইউরোপীয় সামরিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি প্রুশিয়ান সেনাবাহিনীকে আমূল আধুনিকীকরণ করেন এবং যুদ্ধে সম্পূর্ণ নতুন ও বৈপ্লবিক কৌশলগত ধারণার প্রবর্তন করেন। তাঁর অসামান্য রণকৌশল ও নেতৃত্বের গুণে তিনি সাইলেসিয়ান যুদ্ধ এবং সাত বছরের যুদ্ধের মতো জটিল সংঘাতগুলোতে সাফল্য অর্জন করেন। এই ধারাবাহিক বিজয়ের ফলেই প্রুশিয়ার ভৌগোলিক আয়তন প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায় এবং দেশটি ইউরোপের অন্যতম প্রধান সামরিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।

রাশিয়া

রাশিয়া তার সাম্রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্যে পূর্ব দিকে সাইবেরিয়া ও সুদূর প্রাচ্য এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকে কৃষ্ণ সাগর ও মধ্য এশিয়ায় অসংখ্য রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। এই অভিযানের ফলে রাশিয়া এক বিশাল ও শক্তিশালী সেনাবাহিনী এবং অত্যন্ত জটিল এক প্রশাসনিক আমলাতন্ত্র গড়ে তোলে। সে সময় সেন্ট পিটার্সবার্গের রাজদরবার ছিল আভিজাত্যে প্যারিস বা লন্ডনের প্রতিদ্বন্দ্বী।

তবে এই বাহ্যিক জৌলুসের আড়ালে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ অবস্থা ছিল নড়বড়ে। রাজকীয় সরকার তার আয়ের তুলনায় ব্যয় করত অনেক বেশি। ঘাটতি মেটাতে তারা গির্জার ভূসম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে শুরু করে, যা এক সময়ের শক্তিশালী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দেয়। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ১৮শ শতাব্দী জুড়ে রাশিয়ার চিত্র ছিল বৈপরীত্যে ভরা; সামরিকভাবে শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও দেশটি ছিল মূলত একটি “দরিদ্র, পশ্চাদপদ, কৃষিপ্রধান এবং নিরক্ষর রাষ্ট্র”। 

আলোকায়ন

সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগে ইউরোপে শুরু হওয়া ‘আলোকায়ন’ বা এনলাইটেনমেন্ট (Enlightenment) ছিল একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও সুদূরপ্রসারী বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন। এই আন্দোলনের মূল ভিত্তি ছিল অন্ধ ঐতিহ্যের পরিবর্তে যুক্তি ও প্রজ্ঞার জয়গান গাওয়া। আলোকায়ন বিশেষ করে বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা, বিশেষ করে আইজ্যাক নিউটনের পদার্থবিদ্যার অসামান্য সাফল্যকে সমর্থন করত এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির (বিশেষ করে তৎকালীন ক্যাথলিক চার্চের একচ্ছত্র আধিপত্যের) তীব্র বিরোধিতা করত।

যুক্তিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সমাজ বিশ্লেষণ ও সংস্কার করাই ছিল এই যুগের প্রধান লক্ষ্য। এটি বিশ্বাস ও প্রথাভিত্তিক পুরনো ধারণাগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানায় এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে মানুষের জ্ঞানকে এগিয়ে নেওয়ার পথ প্রশস্ত করে। এটি বৌদ্ধিক আদান-প্রদান, সংশয়বাদ এবং মুক্তচিন্তাকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে মানুষের চিন্তাজগতে এক অভূতপূর্ব বিপ্লব নিয়ে আসে। চিন্তাভাবনার এই নতুন পদ্ধতিটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল; এটি সুনির্দিষ্ট ও যুক্তিসঙ্গত নীতি দিয়ে শুরু হয়, সঠিক যুক্তির মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছায় এবং অর্জিত সিদ্ধান্তকে বাস্তব প্রমাণের নিরিখে যাচাই করে প্রয়োজনমতো মূল নীতি সংশোধন করে।

আলোকায়ন যুগের চিন্তাবিদগণ কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে এক আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। সে সময়কার বেশ কিছু প্রজ্ঞাবান দার্শনিক তথাকথিত ‘আলোকিত স্বৈরাচারী’ (Enlightened Despots) বা সেই সব শাসকদের সাথে হাত মিলিয়েছিলেন, যাঁরা রাষ্ট্রীয় সংস্কারের স্বার্থে আধুনিক ও প্রগতিশীল ধারণাগুলো বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সমাজে বাস্তবায়িত করতে চেয়েছিলেন। মূলত যুক্তি ও বিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই আলোকিত ধারণাগুলো ইউরোপের সংস্কৃতি, রাজনীতি এবং শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনে এক সুদূরপ্রসারী ও প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছিল।

সপ্তদশ শতাব্দীতে উদ্ভূত ‘আলোকায়ন’ বা এনলাইটেনমেন্ট ছিল মানব ইতিহাসের এক বৈপ্লবিক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন। এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন ফ্রান্সিস বেকন, বারুচ স্পিনোজা, জন লক, পিয়েরে বেইল এবং ভোল্টেয়ারের মতো প্রখ্যাত দার্শনিক ও বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন। এই মুক্তচিন্তকদের ধারণাগুলো অনেক সমসাময়িক শাসককেও গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। তাঁরা এই উদ্ভাবনী চিন্তাগুলোকে রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় প্রয়োগ করার চেষ্টা করতেন, যা ইতিহাসে ‘আলোকিত নিরঙ্কুশতাবাদ’ (Enlightened Absolutism) নামে পরিচিত। 

বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সঙ্গে এই আন্দোলনের এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক ছিল। বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কার প্রকৃতির রহস্য উন্মোচন করার পাশাপাশি প্রচলিত অনেক অন্ধবিশ্বাসকে ধুলিসাৎ করে দেয় এবং মহাবিশ্বে মানুষের অবস্থান সম্পর্কে সম্পূর্ণ নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দেয়। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই যুক্তিবাদী চেতনার জয়জয়কার থাকলেও, পরবর্তীকালে আবেগকে প্রাধান্য দেওয়া ‘রোমান্টিসিজম’ বা রোমান্টিকতাবাদের উত্থান ঘটে। এর ফলে যুক্তিনির্ভর আলোকায়নের প্রভাব কিছুটা ম্লান হতে শুরু করে এবং একটি ‘প্রতি-আলোকায়ন’ (Counter-Enlightenment) ধারা প্রাধান্য পেতে থাকে।

ফ্রান্সে আলোকায়ন বা এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল শহরের অভিজাত ‘সেলুন’গুলো, যেখানে বুদ্ধিজীবীরা সমবেত হয়ে নতুন নতুন ধারণা নিয়ে আলোচনা করতেন। এই আন্দোলনের একটি অনন্য মাইলফলক ছিল ১৭৫১ থেকে ১৭৭২ সালের মধ্যে প্রকাশিত বিশাল জ্ঞানকোষ বা ‘এনসাইক্লোপিডি’। এই নতুন চিন্তাধারা দ্রুতই ইউরোপের প্রধান নগর কেন্দ্রগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে—বিশেষ করে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, জার্মান রাজ্য, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, রাশিয়া, ইতালি, অস্ট্রিয়া ও স্পেনে। এমনকি আটলান্টিক পেরিয়ে ব্রিটেনের আমেরিকান উপনিবেশগুলোতেও এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে।

আলোকায়ন যুগের রাজনৈতিক আদর্শগুলো বিশ্ব ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিল। এটি সরাসরি প্রভাবিত করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও অধিকার বিল (Bill of Rights), ফ্রান্সের ‘মানব ও নাগরিক অধিকার ঘোষণাপত্র’ এবং ১৭৯১ সালের ৩রা মে গৃহীত ঐতিহাসিক পোলিশ-লিথুয়ানিয়ান সংবিধানকে। যুক্তি, স্বাধীনতা এবং সমানাধিকারের এই চেতনাগুলোই আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছিল।

ঐতিহাসিক নরম্যান ডেভিসের মতে, ১৭০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপে উদারনীতি এবং আলোকায়নের (Enlightenment) আদর্শ প্রচারে ফ্রিম্যাসনরি বা মুক্ত রাজমিস্ত্রি সংঘ এক অত্যন্ত প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। আলোকায়ন যুগে এই গোপন বা আধাগোপন সংগঠনটি অভাবনীয় গতিতে ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

ফ্রিম্যাসনরির প্রধান আদর্শিক ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল রোমান ক্যাথলিক চার্চ। এর ফলে ফ্রান্স, ইতালি, অস্ট্রিয়া, স্পেন এবং মেক্সিকোর মতো ক্যাথলিক প্রধান দেশগুলোতে রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াই মূলত চার্চের সমর্থক এবং সক্রিয় ফ্রিম্যাসনদের মধ্যকার দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছিল। পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীর সর্বগ্রাসী ও বৈপ্লবিক রাজনৈতিক মতাদর্শগুলো, বিশেষ করে ফ্যাসিস্ট এবং কমিউনিস্টরা, ফ্রিম্যাসনদের চরমভাবে দমন করেছিল।

বিপ্লব এবং সাম্রাজ্যবাদ

ইউরোপের ইতিহাসে ১৭৮৯ থেকে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত সময়কালটি “দীর্ঘ ঊনবিংশ শতাব্দী” হিসেবে পরিচিত, যা শিল্প বিপ্লব, ফরাসি বিপ্লব এবং নেপোলিয়নীয় যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট এক আমূল সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী। ১৮১৫ সালে ভিয়েনা কংগ্রেসের মাধ্যমে ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্র নতুন করে সাজানোর পর, মহাদেশটি জাতীয়তাবাদের প্রবল জোয়ার প্রত্যক্ষ করে। এই সময়ে একদিকে রুশ সাম্রাজ্যের নাটকীয় উত্থান ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, অন্যদিকে দীর্ঘ প্রতাপশালী অটোমান সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয়। পরিশেষে, জার্মান ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের শক্তিশালী হয়ে ওঠা এমন এক বৈশ্বিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, যা ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ দাবানল জ্বালিয়ে দেয়।

শিল্প বিপ্লব

শিল্প বিপ্লবের প্রভাবে কৃষি, উৎপাদন এবং পরিবহন ব্যবস্থায় এক আমূল পরিবর্তন সূচিত হয়, যার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ব্রিটেন। পরবর্তীতে এই বৈপ্লবিক ধারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে। এই শিল্পায়ন প্রক্রিয়ার প্রধান চালিকাশক্তি ছিল অভাবনীয় প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, বিশেষ করে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের (Steam Engine) বহুমুখী ব্যবহার।

অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডে বস্ত্রশিল্পের যান্ত্রিকীকরণ, উন্নত লোহা তৈরির কৌশল এবং প্রধান জ্বালানি হিসেবে কয়লার ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে এই বিপ্লবের সূচনা ঘটে। খালের নেটওয়ার্ক, উন্নত সড়কপথ এবং পরবর্তীতে রেলপথের উদ্ভাবন বিশ্ববাণিজ্যের প্রসারে নতুন গতিবেগ সঞ্চার করে। কয়লাচালিত বাষ্পীয় শক্তি এবং স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতির সমন্বয়ে উৎপাদন ক্ষমতা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়, যা মানবসভ্যতাকে এক নতুন আধুনিক যুগের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়।

উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশকে সম্পূর্ণ ধাতব ‘মেশিন টুল’ বা যন্ত্র তৈরির যন্ত্রের উদ্ভাবন শিল্পক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এই অগ্রগতির ফলে অন্যান্য শিল্পকারখানার জন্য প্রয়োজনীয় উৎপাদনমুখী যন্ত্রপাতি তৈরি করা অনেক সহজ ও দ্রুততর হয়ে ওঠে। এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের প্রভাব উনবিংশ শতাব্দী জুড়ে পশ্চিম ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং কালক্রমে সমগ্র বিশ্বের উৎপাদন ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দেয়।

শিল্প বিপ্লবের প্রাথমিক পর্যায়ে এবং পরবর্তী সময়ে সমগ্র ইউরোপজুড়ে দারিদ্র্য এক রূঢ় বাস্তবতা হিসেবে বিদ্যমান ছিল। তবে ঊনবিংশ শতাব্দীর অগ্রগতির সাথে সাথে এই পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ইউরোপীয়দের জীবনযাত্রার মানে এক ধারাবাহিক উন্নতি লক্ষ্য করা যায়; তাঁদের মজুরি বৃদ্ধি পায় এবং বাসস্থান ও খাদ্যাভ্যাসে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে। একই সাথে শ্রম আইনের সংস্কারের ফলে কর্মঘণ্টা হ্রাস পায়, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে কিছুটা সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তোলে।

ফরাসি বিপ্লবের যুগ

১৭৮৯ সালে ফ্রান্সে যে বিপ্লবের অগ্নিশিখা জ্বলে উঠেছিল, তা কেবল ফ্রান্স নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের ইতিহাসকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। ফরাসি বিপ্লব ছিল তৎকালীন বিপ্লবী যুগের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও যুগান্তকারী এক গণ-উত্থান। এই বিপ্লব কয়েক শতাব্দী প্রাচীন ‘পুরাতন শাসনব্যবস্থা’ (Ancien Régime) ধুলিসাৎ করে সেখানে এক ‘আধুনিক সমাজ’ ও গণতান্ত্রিক চেতনার ভিত্তি স্থাপন করে। এর চরম পর্যায়ে এই আন্দোলন এতটাই আমূল ও উগ্র রূপ ধারণ করেছিল যে, পরবর্তী সময়ের প্রায় সকল বিপ্লবী আন্দোলন একে নিজেদের পথপ্রদর্শক বা আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে ১৭৬০ থেকে ১৮৪৮ সাল পর্যন্ত সময়কালে বিশ্বরাজনীতির রঙ্গমঞ্চে ফ্রান্সের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত নির্ণায়ক ও অগ্রগণ্য।

ফরাসি বিপ্লবের উত্তাল সময় এবং পরবর্তী নেপোলিয়নীয় যুদ্ধসমূহ ইউরোপের রাজতন্ত্রের জন্য এক চরম অস্তিত্ব সংকটের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই সময়ে রাজপরিবারগুলোর ওপর দিয়ে বয়ে গিয়েছিল একের পর এক বিপর্যয়। রাশিয়ার জার প্রথম পল আততায়ীর হাতে নিহত হন; অন্যদিকে ফ্রান্সে রাজা ষোড়শ লুই এবং তাঁর রানী মেরি আঁতোয়ানেতকে গিলোটিনে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

বিপ্লবের এই ঢেউ ও নেপোলিয়নের আগ্রাসনের মুখে স্পেনের রাজা চতুর্থ চার্লস, সপ্তম ফার্দিনান্দ এবং সুইডেনের রাজা চতুর্থ গুস্তাভ অ্যাডলফকে তাঁদের সিংহাসন হারাতে হয়। এমনকি স্বয়ং সম্রাট নেপোলিয়ন এবং ইউরোপের বিভিন্ন সিংহাসনে তাঁর বসানো আত্মীয়স্বজনদেরও শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়েছিল। প্রুশিয়ার রাজা তৃতীয় ফ্রেডেরিক উইলিয়াম এবং অস্ট্রিয়ার সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রান্সিস কোনোমতে তাঁদের রাজদণ্ড রক্ষা করতে সক্ষম হন। অন্যদিকে, ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় জর্জের শাসনকালেই ব্রিটিশরা তাদের প্রথম সাম্রাজ্যের এক বিশাল অংশ (আমেরিকা) হারিয়ে চরম সংকটের মুখে পড়ে।

আমেরিকান বিপ্লব (১৭৭৫-১৭৮৩) ছিল বিশ্ব ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ঘটনা, যা কোনো ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে কোনো উপনিবেশের প্রথম সফল বিদ্রোহ হিসেবে স্বীকৃত। এই বিপ্লব প্রচলিত অভিজাততন্ত্রকে প্রত্যাখ্যান করে একটি প্রজাতন্ত্রী সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে, যা তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এর পরপরই সংগঠিত ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯-১৮০৪) ছিল আটলান্টিক অঞ্চলের একই গণতান্ত্রিক ও বৈপ্লবিক চেতনার ফসল। তবে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে ফরাসি বিপ্লবের বিস্তার ও গভীরতা ছিল আরও অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী।

আমেরিকান বিপ্লবী যুদ্ধে ফ্রান্সের অংশগ্রহণ দেশটিকে চরম আর্থিক সংকটের মুখে ঠেলে দেয় এবং রাজকোষ প্রায় দেউলিয়া হয়ে পড়ে। এই সংকট নিরসনে বারবার সংস্কার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর, রাজা ষোড়শ লুই বাধ্য হয়ে ‘এস্টেটস-জেনারেল’ (Estates-General) আহ্বান করেন। এটি ছিল যাজক (প্রথম এস্টেট), অভিজাত (দ্বিতীয় এস্টেট) এবং সাধারণ জনগণের (তৃতীয় এস্টেট) প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত একটি জাতীয় সংস্থা।

তবে অধিকারের দাবিতে সোচ্চার তৃতীয় এস্টেটের প্রতিনিধিরা অন্য দুই এস্টেটের কিছু সদস্যের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের ‘জাতীয় পরিষদ’ হিসেবে ঘোষণা করেন এবং জুলাই মাসে এটি ‘জাতীয় গণপরিষদ’-এ রূপ নেয়। এই রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই প্যারিসের উত্তেজিত জনতা বিদ্রোহ শুরু করে এবং ১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের প্রতীক বাস্তিল দুর্গ ও কারাগার আক্রমণ করে, যা ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত।

সেই সময়ে গঠিত জাতীয় পরিষদ ফ্রান্সে একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করে। পরবর্তী দুই বছরে তারা বেশ কিছু যুগান্তকারী আইন পাস করে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার ঘোষণা’সামন্তপ্রথার বিলুপ্তি এবং রাষ্ট্র ও রোমান চার্চের মধ্যকার সম্পর্কের আমূল পরিবর্তন। শুরুতে রাজা ষোড়শ লুই এই সংস্কারগুলোতে সম্মতি জানান এবং জনগণের কাছে বেশ জনপ্রিয়ও ছিলেন।

তবে ইউরোপের অন্যান্য রাজতান্ত্রিক দেশগুলোর আক্রমণের হুমকি এবং ফ্রান্সে ক্রমবর্ধমান রাজতন্ত্রবিরোধী মনোভাবের কারণে পরিস্থিতি বদলে যায়। একপর্যায়ে রাজা পালিয়ে গিয়ে ফ্রান্সের শত্রুদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি ধরা পড়েন এবং কারারুদ্ধ হন। অবশেষে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে ১৭৯৩ সালের ২১ জানুয়ারি তাঁকে গিলোটিনে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

১৭৯২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ফ্রান্সের জাতীয় সম্মেলন আনুষ্ঠানিকভাবে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে দেশটিকে একটি প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করে। যুদ্ধের চরম অস্থিরতার মুখে দেশের শাসনভার পরিচালনার জন্য ‘জননিরাপত্তা কমিটি’ (Committee of Public Safety) গঠন করা হয়। ম্যাক্সিমিলিয়েন ডি রোবেসপিয়েরের নেতৃত্বে এই কমিটি ফ্রান্সে এক বিভীষিকাময় ‘সন্ত্রাসের রাজত্ব’ (Reign of Terror) শুরু করে। এই সময়ে বিপ্লবী ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে প্রায়ই সামান্য বা দুর্বল প্রমাণের ভিত্তিতে প্যারিসে প্রায় ৪০,০০০ মানুষকে গিলোটিনে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, যাদের বড় একটি অংশ ছিল অভিজাত শ্রেণি।

প্যারিসের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপোড়েন কমিটিকে আরও বেশি উগ্রপন্থী ও সন্দেহপ্রবণ করে তোলে। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে রোবেসপিয়ের তাঁর নিজের দলের মাদাম রোল্যান্ড এবং জর্জেস ড্যান্টনের মতো বিশিষ্ট বিপ্লবী নেতাদেরও একে একে গিলোটিনে পাঠাতে শুরু করেন। দেশের অন্যান্য প্রান্তে গড়ে ওঠা প্রতিবিপ্লবী বিদ্রোহগুলোকেও অত্যন্ত নির্মমভাবে দমন করা হয়। অবশেষে ১৭৯৪ সালের ২৭ জুলাই (বিপ্লবী ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৯ থার্মিডোর) এক রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এই শাসনের পতন ঘটে এবং রোবেসপিয়েরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁর পতনের পর ফ্রান্সে দীর্ঘস্থায়ী সন্ত্রাসের অবসান ঘটে এবং চরমপন্থী নীতিগুলো শিথিল করা হয়।

নেপোলিয়ন

ফরাসি বিপ্লবী যুদ্ধের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল ও প্রভাবশালী সেনাপতি ছিলেন নেপোলিয়ন বোনাপার্ট। ১৭৯৯ সালের ৯ নভেম্বর (বিপ্লবী ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৮ ব্রুমায়ার) এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি তৎকালীন সরকারকে উৎখাত করেন এবং ‘কনস্যুলেট’ শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। গির্জার মর্যাদা পুনরুদ্ধার, করভার লাঘব, প্যারিসে প্রশাসনিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য অর্জনের মাধ্যমে তিনি ফ্রান্সে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন। ১৮০৪ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেকে সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেন।

১৮০৫ সালে নেপোলিয়ন ব্রিটেন আক্রমণের পরিকল্পনা করলেও রাশিয়া ও অস্ট্রিয়ার সাথে ব্রিটেনের নতুন জোট (তৃতীয় জোট) তাঁকে মহাদেশীয় যুদ্ধের দিকে মনোনিবেশ করতে বাধ্য করে। একই সময়ে ট্রাফালগারের যুদ্ধে ব্রিটিশ নৌবাহিনী ফরাসি নৌবহরকে ধ্বংস করে দিলে নেপোলিয়নের ব্রিটেন জয়ের স্বপ্ন চিরতরে বিলীন হয়ে যায়। তবে স্থলযুদ্ধে তিনি ছিলেন অপরাজেয়; ১৮০৫ সালের ২ ডিসেম্বর অস্টারলিটজের যুদ্ধে তিনি সংখ্যায় বিশাল অস্ট্রো-রাশিয়ান বাহিনীকে পরাজিত করেন। এই পরাজয়ের ফলে অস্ট্রিয়া যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়ায় এবং কয়েক শতাব্দী প্রাচীন পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটে।

১৮১২ সালের ১২ জুন নেপোলিয়ন প্রায় ৭,০০,০০০ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে রাশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। স্মোলেনস্ক ও বোরোডিনোর যুদ্ধে রক্তক্ষয়ী বিজয়ের পর তিনি মস্কো দখল করলেও, রুশ সেনাবাহিনী পিছু হটার সময় শহরটি জ্বালিয়ে দিয়ে তাঁকে এক জনশূন্য ধ্বংসস্তূপে ফেলে যায়। রসদহীন নেপোলিয়ন বাধ্য হয়ে পশ্চাদপসরণ শুরু করেন। ফেরার পথে কসাক বাহিনীর অতর্কিত হামলা, চরম অনাহার এবং হাড়কাঁপানো শীত ও রোগব্যাধিতে তাঁর বিশাল বাহিনী প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়; অভিযানে অংশ নেওয়া সৈন্যদের মধ্যে মাত্র ২০,০০০ জন প্রাণ নিয়ে ফিরতে সক্ষম হন।

১৮১৩ সাল থেকেই যুদ্ধের পরিস্থিতি নেপোলিয়নের প্রতিকূলে যেতে শুরু করে। ওই বছরের অক্টোবরে ‘লিপজিগের যুদ্ধে’ (ব্যাটল অফ নেশনস) সাত জাতির সম্মিলিত বাহিনীর কাছে তিনি শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। এরপর মিত্রশক্তির প্যারিস দখল ও দীর্ঘ ছয় দিনের শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানের মুখে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং ফন্টেইনব্লো চুক্তির অধীনে তাঁকে এলবা দ্বীপে নির্বাসিত করা হয়। তবে ১৮১৫ সালের ১ মার্চ তিনি নাটকীয়ভাবে ফ্রান্সে ফিরে এসে পুনরায় এক শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠন করেন। কিন্তু তাঁর এই শেষ লড়াইও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি; ১৮১৫ সালের ১৮ জুন ঐতিহাসিক ওয়াটারলুর যুদ্ধে ব্রিটিশ ও প্রুশিয়ান বাহিনীর কাছে চূড়ান্ত পরাজয়ের পর তাঁকে সুদূর আটলান্টিকের সেন্ট হেলেনা দ্বীপে চিরতরে নির্বাসিত করা হয়।

ফরাসি বিপ্লবের প্রভাব

প্রখ্যাত ইংরেজ ইতিহাসবিদ অ্যান্ড্রু রবার্টসের গবেষণায় ১৭৯৩ থেকে ১৮১৫ সাল পর্যন্ত সংঘটিত বিপ্লবী ও নেপোলিয়নীয় যুদ্ধের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। তাঁর তথ্যমতে, এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতগুলোতে প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল, যার মধ্যে ১০ লক্ষই ছিল নিরপরাধ বেসামরিক নাগরিক। এই বিপুল সংখ্যক নিহতের মধ্যে এককভাবে ফরাসিদের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৪ লক্ষ।

ফরাসি বিপ্লবের প্রভাব কেবল ফ্রান্সের সীমানায় সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এর বৈপ্লবিক আদর্শগুলো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ইতিহাসবিদ অ্যান্ড্রু রবার্টসের মতে, আধুনিক বিশ্বের অনেক মৌলিক ধারণার প্রসারে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের ভূমিকা ছিল অনবদ্য। রবার্টস যুক্তি দেখিয়েছেন যে, যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন, আইনের চোখে সবার সমান অধিকার, সম্পত্তির সুরক্ষা, ধর্মীয় সহনশীলতা এবং আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার মতো বিষয়গুলো নেপোলিয়নের ১৬ বছরের শাসনকালেই সুসংহত ও ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত হয়েছিল। এছাড়া একটি সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খল আর্থিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে তিনি আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোর যে ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তা আজও সমাদৃত।

১৭৯০ এবং ১৮০০-এর দশকে ফরাসি বাহিনীর অগ্রযাত্রা পশ্চিম ইউরোপের সামাজিক ও প্রশাসনিক কাঠামোয় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। তারা দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা সামন্তবাদী প্রথার অবশেষগুলো সরাসরি উৎখাত করে। সম্পত্তি সংক্রান্ত আইনগুলোকে উদারীকরণ করার পাশাপাশি জমিদারি শুল্কের বিলুপ্তি ঘটানো হয়। মুক্ত বাণিজ্যের পথ প্রশস্ত করতে বণিক ও কারিগরদের প্রাচীন ‘গিল্ড’ প্রথা বাতিল করা হয়, যা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়ায়।

সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কারের ক্ষেত্রেও এই সময়টি ছিল যুগান্তকারী। ফরাসি শাসনাধীন অঞ্চলে বিবাহবিচ্ছেদ বৈধ করা হয় এবং ইহুদিদের জন্য নির্দিষ্ট ‘ঘেটো’ প্রথা বিলুপ্ত করে তাঁদের নাগরিক অধিকার অন্যদের সমান করা হয়। কয়েক শতাব্দী প্রাচীন পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পাশাপাশি কুখ্যাত ‘ইনকুইজিশন’ বা ধর্মীয় বিচার ব্যবস্থারও অবসান ঘটে। গির্জা ও ধর্মীয় আদালতের ক্ষমতা হ্রাসের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় আইনে সকল মানুষের জন্য সমান অধিকার সুনিশ্চিত করা হয়।

বিপ্লব পরবর্তী সময়ে ফ্রান্স সামরিকভাবে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। তারা বেলজিয়াম জয় করে সেটিকে ফ্রান্সের একটি প্রদেশে রূপান্তরিত করে। নেদারল্যান্ডস দখল করে সেখানে একটি অনুগত ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ বা আশ্রিত রাষ্ট্র গঠন করা হয়। জার্মানির রাইন নদীর বাম তীরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পাশাপাশি তারা সেখানে ‘কনফেডারেশন অফ দ্য রাইন’ নামে একটি পুতুল রাষ্ট্রপুঞ্জ প্রতিষ্ঠা করে। একইভাবে সুইজারল্যান্ড এবং ইতালির বিশাল অংশ জয় করে সেখানেও ফ্রান্সের অনুগত রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করা হয়। এই ধারাবাহিক বিজয় ফ্রান্সের জন্য কেবল সামরিক গৌরবই বয়ে আনেনি, বরং বিজিত অঞ্চলগুলো থেকে প্রচুর অর্থ ও সম্পদের জোগান নিশ্চিত করেছিল।

তবে ফ্রান্সের এই একাধিপত্য রুখতে ১৭৯৯ সালে ব্রিটেনের নেতৃত্বে রাশিয়া, অটোমান সাম্রাজ্য এবং অস্ট্রিয়া মিলে ‘দ্বিতীয় জোট’ গঠন করে। এই মিত্রশক্তি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জয় পায়, যা ফরাসি অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে এবং মিশরে ফরাসি সেনাবাহিনীকে অবরুদ্ধ করে ফেলে। এমন এক সংকটময় পরিস্থিতিতে নেপোলিয়ন ১৭৯৯ সালের অক্টোবরে অত্যন্ত চতুরতার সাথে ব্রিটিশ নৌ-অবরোধ এড়িয়ে প্যারিসে ফিরে আসেন। সেখানে এক আকস্মিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন সরকার উৎখাত করে তিনি নিজেকে ফ্রান্সের সর্বময় শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

১৭৯৭ থেকে ১৭৯৯ সালের মধ্যে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ফরাসি বিপ্লবের আদর্শ প্রসারের নামে ইতালির বিশাল অংশ জয় করেন। তিনি অস্ট্রিয়ার দখলকৃত অঞ্চলগুলোকে বিভক্ত করে সেখানে একাধিক নতুন প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। এই রাজ্যগুলোতে তিনি নতুন আইনবিধি (Napoleonic Code) প্রবর্তন করেন এবং দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা সামন্ততান্ত্রিক সুযোগ-সুবিধা ও প্রথা বিলুপ্ত করেন।

নেপোলিয়নের এই পুনর্গঠনের ফলে মিলানকে কেন্দ্র করে সিসালপাইন প্রজাতন্ত্র গঠিত হয়; জেনোয়া পরিণত হয় একটি স্বতন্ত্র প্রজাতন্ত্রে এবং এর আশেপাশে গড়ে ওঠে ক্ষুদ্র লিগুরিয়ান প্রজাতন্ত্র। এছাড়া রোম ও নেপলসকে কেন্দ্র করে যথাক্রমে রোমান ও নেপোলিটান প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, যদিও নেপোলিটান প্রজাতন্ত্র মাত্র পাঁচ মাস স্থায়ী হয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি এই অঞ্চলগুলোকে একীভূত করে ‘ইতালি রাজ্য’ গঠন করেন এবং নিজের ভাইকে সেখানকার সিংহাসনে বসান। ইতালির বাইরেও নেপোলিয়ন নেদারল্যান্ডসকে বাটাভিয়ান প্রজাতন্ত্র এবং সুইজারল্যান্ডকে হেলভেটিক প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত করেন।

এই প্রতিটি রাষ্ট্রই ছিল ফ্রান্সের অনুগত বা ‘স্যাটেলাইট স্টেট’। প্যারিসকে নিয়মিত বড় অঙ্কের অর্থ বা ভর্তুকি দেওয়ার পাশাপাশি নেপোলিয়নের যুদ্ধাভিযানে সামরিক সহায়তা প্রদান করা ছিল এদের প্রধান দায়িত্ব। তবে এই শাসনের অধীনে অঞ্চলগুলোর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ব্যাপক আধুনিকায়ন ঘটে; চালু হয় দশমিক বা মেট্রিক পদ্ধতি এবং বাণিজ্যের পথে থাকা বাধাগুলো কমিয়ে আনা হয়। সামাজিক সংস্কারের অংশ হিসেবে ইহুদিদের জন্য নির্দিষ্ট ‘ঘেটো’ প্রথা বিলুপ্ত করা হয়। অন্যদিকে, বেলজিয়াম এবং পিডমন্ট সরাসরি ফ্রান্সের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।

ফরাসি বিপ্লব এবং নেপোলিয়নের শাসনের সবচেয়ে গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছিল খোদ ফ্রান্সের অভ্যন্তরে। ইতালি বা সুইজারল্যান্ডের মতো বিজিত অঞ্চলগুলোর পাশাপাশি ফ্রান্সেও ‘আইনি সমতা’র নীতি কঠোরভাবে প্রবর্তিত হয়। এর ফলে এক সময়ের অত্যন্ত শক্তিশালী ও সম্পদশালী ক্যাথলিক চার্চের একচ্ছত্র আধিপত্য ও প্রভাবের চূড়ান্ত অবসান ঘটে।

এই সময়ে ফ্রান্সের শাসনকাঠামোয় আমূল পরিবর্তন আসে। সমস্ত প্রশাসনিক ক্ষমতা প্যারিসে কেন্দ্রীভূত করা হয় এবং একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও দক্ষ আমলাতন্ত্র গড়ে তোলা হয়। এছাড়া দেশের সকল সক্ষম যুবককে বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে নিয়োগের (Conscription) মাধ্যমে একটি বিশাল ও অপরাজেয় সামরিক বাহিনী গড়ে তোলা সম্ভব হয়। রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও এই যুগটি এক চিরস্থায়ী পরিবর্তনের জন্ম দেয়। বিপ্লবের আদর্শের সমর্থক এবং বিরোধীদের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে ফরাসি রাজনীতিতে ‘বামপন্থী’ (Left) ও ‘ডানপন্থী’ (Right) নামক দুটি বিপরীতমুখী ধারার উদ্ভব ঘটে, যা আজ বিশ্ব রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ধর্ম

উনিশ শতকের ইউরোপে রাষ্ট্র ও ধর্মের চিরাচরিত সম্পর্কে এক আমূল পরিবর্তন আসে। এ সময় সরকারগুলো প্রথাগত ধর্মীয় ভূমিকা থেকে সরে এসে প্রশাসনিক দক্ষতা ও অভিন্ন নিয়মাবলি প্রণয়নে বেশি মনোযোগী হয়। শিক্ষার নিয়ন্ত্রণ গির্জা থেকে সরিয়ে নিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ সংস্থাগুলোর হাতে তুলে দেওয়া হয় এবং গির্জার জন্য বাধ্যতামূলক কর ও ‘দশমাংশ’ (Tithe) আদায়ের প্রথা বাতিল করা হয়। এমনকি রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও উচ্চকক্ষ থেকে বিশপদের বাদ দিয়ে শাসনব্যবস্থাকে আরও আধুনিক রূপ দেওয়া হয়।

সামাজিক ক্ষেত্রেও এই পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে। বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদের মতো বিষয়গুলো এখন থেকে ধর্মনিরপেক্ষ আইনের অধীনে চলে আসে এবং জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনের দায়িত্ব অর্পিত হয় স্থানীয় কর্মকর্তাদের ওপর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেও, ইউরোপে উচ্চশিক্ষা ছিল প্রায় একচেটিয়াভাবে একটি রাষ্ট্রীয় কাজ। তবে অভ্যন্তরীণভাবে ধর্মীয় প্রভাব কমালেও, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো এশিয়া ও আফ্রিকার উপনিবেশগুলোতে খ্রিস্টান মিশনারিদের সক্রিয় সুরক্ষা প্রদান করত।

ফ্রান্সের মতো ক্যাথলিক প্রধান দেশগুলোতে ধর্মবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনগুলো চার্চের ক্ষমতা হ্রাসে সচেষ্ট ছিল। ১৮৭০-এর দশকে জার্মানিতেও ক্যাথলিকদের বিরুদ্ধে একটি তীব্র ‘কুলটুরকাম্পফ’ (Kulturkampf) বা সংস্কৃতি যুদ্ধ শুরু হয়, যদিও ক্যাথলিকরা তা সফলভাবে মোকাবিলা করেছিল। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ক্যাথলিক চার্চ পোপের পদে আরও বেশি ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে এবং ক্রমবর্ধমান ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যায়। একই সঙ্গে তারা অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় সংস্কারের ওপর জোর দেয়, যা সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সমর্থন লাভে সহায়ক হয়েছিল।

জাতিসমূহের উত্থান

জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক বিকাশ এবং জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপের জাতিগত ও জাতীয় বিপ্লবগুলোর মাধ্যমে এক চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। এই শতাব্দীতে জাতীয়তাবাদ ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিতে পরিণত হয়, যা পরবর্তীতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়। ১৮৭১ সালের মধ্যে ইউরোপের অধিকাংশ রাষ্ট্র সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়; বিশেষ করে জার্মানি ও ইতালি তাদের অসংখ্য ক্ষুদ্র নগর-রাষ্ট্র ও অঞ্চলকে একত্রিত করে একেকটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ জাতি-রাষ্ট্রে পরিণত হয়। এর মধ্যে জার্মানি খুব দ্রুত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে ইউরোপীয় মহাদেশে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।

একই সময়ে বিশ্বমঞ্চে ব্রিটেন তার বিশাল সাম্রাজ্য, অপ্রতিদ্বন্দ্বী নৌবাহিনী এবং শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্বের প্রথম ‘বিশ্বশক্তি’ (Global Power) হিসেবে আবির্ভূত হয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এতটাই বিস্তৃত ছিল যে বলা হতো, “তার ভূখণ্ডে সূর্য কখনও অস্ত যায় না।” কেবল ভৌগোলিক দখলদারিত্বই নয়, ব্রিটিশ অর্থদাতা, উদ্যোক্তা এবং প্রকৌশলীরা ল্যাটিন আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এক ‘অনানুষ্ঠানিক সাম্রাজ্য’ গড়ে তুলেছিলেন। বিশেষ করে বিশ্বজুড়ে আধুনিক রেলপথের অর্থায়ন ও নির্মাণে ব্রিটিশদের ভূমিকা ছিল কিংবদন্তীতুল্য।

১৮০০ থেকে ১৮০৬ সালের মধ্যবর্তী সময়ে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের জার্মানি ও ইতালি বিজয় ইউরোপের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়। তাঁর এই সামরিক অভিযান ও প্রশাসনিক সংস্কারগুলো পরোক্ষভাবে এই দুই অঞ্চলের বিচ্ছিন্ন জনপদগুলোর মধ্যে জাতীয়তাবাদ ও জাতীয় ঐক্যের তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলেছিল। নেপোলিয়নের প্রবর্তিত অভিন্ন আইনকানুন ও প্রশাসনিক কাঠামো স্থানীয় জনগণকে প্রথমবারের মতো একটি ঐক্যবদ্ধ শাসনের স্বাদ দেয়, যা পরবর্তীতে জার্মানি ও ইতালির পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পথ প্রশস্ত করে।

জার্মানির একীকরণ

প্রুশিয়ার পূর্বদিকের জার্মান রাজ্যগুলোতে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট অসংখ্য প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় প্রশাসনিক প্রথার বিলুপ্তি ঘটান, যার একটি বড় উদাহরণ হলো ১৮০৬ সালে কয়েক শতাব্দী প্রাচীন পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের অবসান। তিনি এসব অঞ্চলে একটি আধুনিক ও যুক্তিসঙ্গত আইনি ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। বিশেষ করে ১৮০৬ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘রাইন কনফেডারেশন’ বিচ্ছিন্ন জার্মান রাজ্যগুলোর মধ্যে প্রথমবারের মতো জাতীয়তাবোধ ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলে।

পরবর্তীতে ১৮৬০-এর দশকে প্রুশিয়ার লৌহ চ্যান্সেলর অটো ফন বিসমার্কের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে জার্মান একীকরণের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়। ডেনমার্ক, অস্ট্রিয়া এবং ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক যুদ্ধগুলোতে জার্মানির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যগুলো প্রুশিয়ার নেতৃত্ব মেনে নেয়। এর ফলে ১৮৭০ সালে একটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ জার্মান সাম্রাজ্য আত্মপ্রকাশ করে, যা ইউরোপের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রকে চিরতরে বদলে দেয়।

ইতালির একীকরণ

ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইতালীয় জনমানসে জাতীয়তাবাদের যে প্রবাল জোয়ার সৃষ্টি হয়, তাই ছিল ইতালীয় একীকরণ বা “রিসোরগিমেন্টো” (Risorgimento)-এর মূল চালিকাশক্তি। এটি ছিল মূলত একটি রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন, যা দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ১৮৬০ সালে ইতালীয় উপদ্বীপের বিচ্ছিন্ন রাজ্যগুলোকে একীভূত করে একটি শক্তিশালী ‘ইতালি রাজ্য’ গঠন করতে সক্ষম হয়। ইতালির জাতীয়তাবাদ এবং আধুনিক ইতিহাস রচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আজও এই ‘রিসোরগিমেন্টো’ বা নবজাগরণের স্মৃতি এক অনন্য গুরুত্ব বহন করে।

সার্বিয়া

দীর্ঘ শতাব্দী ধরে অর্থোডক্স খ্রিস্টান সার্বরা মুসলিম শাসিত অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। তবে ১৮০৪ থেকে ১৮১৭ সাল পর্যন্ত চলা সার্বিয়ান বিপ্লবের সাফল্য আধুনিক সার্বিয়া রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করে। ১৮৬৭ সালে দেশটি কার্যত স্বাধীনতা অর্জন করলেও, ১৮৭৮ সালের বার্লিন কংগ্রেসে এটি আন্তর্জাতিকভাবে পূর্ণ সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি পায়।

সার্বীয় জাতীয়তাবাদীরা পরবর্তীকালে ‘প্যান-স্লাভিজম’ বা স্লাভিক ঐক্যের এক বৃহত্তর স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। রাশিয়ার প্রত্যক্ষ সমর্থনে তারা অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা অন্যান্য স্লাভিক জনগোষ্ঠীকে মুক্ত করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়। এই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে, ১৯১৪ সালে জার্মানির সমর্থনে অস্ট্রিয়া সার্বিয়াকে দমন করার চেষ্টা করলে রাশিয়া তাদের রক্ষায় এগিয়ে আসে। এর ফলেই শুরু হয় বিধ্বংসী প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, যার পরিণতিতে অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং তা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিরাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে যায়।

১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসানে ইউরোপের মানচিত্রে এক আমূল পরিবর্তন আসে। ভোজভোদিন অঞ্চলটি অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্লোভেনীয়, ক্রোয়েশীয় ও সার্বীয়দের একটি প্যান-স্লাভিক রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ঘোষণা দেয়। একই বছরের ১ ডিসেম্বর সার্বিয়া রাজ্য এই ইউনিয়নে যোগদান করলে নবগঠিত দেশটির নামকরণ করা হয় ‘সার্বীয়, ক্রোয়েশীয় এবং স্লোভেনীয়দের রাজ্য’।

পরবর্তীতে এই রাষ্ট্রটিই যুগোস্লাভিয়া নামে পরিচিতি লাভ করে। তবে দেশটি তার অভ্যন্তরীণ জাতিগত বৈচিত্র্য এবং ধর্মীয় সংঘাতগুলো কখনোই পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। দীর্ঘদিনের এই চাপা উত্তেজনা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে ১৯৯০-এর দশকে এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যুগোস্লাভিয়া ভেঙে পড়ে এবং একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে যায়।

গ্রীক স্বাধীনতা যুদ্ধ

অটোমান সাম্রাজ্যের দীর্ঘদিনের শাসন থেকে মুক্তি পেতে গ্রিকদের স্বাধীনতা আন্দোলন সমগ্র খ্রিস্টান ইউরোপে, বিশেষ করে ব্রিটেনে ব্যাপক জনসমর্থন ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল। ১৮২১ থেকে ১৮২৯/১৮৩০ সাল পর্যন্ত চলা এই রক্তক্ষয়ী গ্রিক স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে তাদের জাতীয়তাবাদী স্বপ্ন বাস্তবায়নে শেষ পর্যন্ত ফ্রান্স, রাশিয়া ও ব্রিটেন প্রত্যক্ষভাবে সামরিক ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করে। এই সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই গ্রিস একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার সুযোগ পায়।

বুলগেরিয়ার জাতীয় জাগরণ

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে অটোমান শাসনের অধীনে থাকা বুলগেরীয়দের মধ্যে আধুনিক জাতীয়তাবাদের প্রবল উন্মেষ ঘটে। এই জাগরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছিল ১৮৭০-৭২ সালে একটি স্বায়ত্তশাসিত ‘বুলগেরিয়ান এক্সার্চেট’ (Bulgarian Exarchate) বা স্বাধীন চার্চ প্রতিষ্ঠা। যেসব অঞ্চলে অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ অর্থোডক্স খ্রিস্টান এই চার্চে যোগ দিতে আগ্রহী ছিলেন, সেসব এলাকা নিয়ে এটি গঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৮৭৬ সালের ঐতিহাসিক এপ্রিল বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও তা বিশ্ববিবেকে নাড়া দেয় এবং পরোক্ষভাবে ১৮৭৮ সালে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বুলগেরিয়ার পুনর্জন্ম নিশ্চিত করে।

পোল্যান্ড

১৭৯০-এর দশকে জার্মানি (প্রুশিয়া), রাশিয়া এবং অস্ট্রিয়া সম্মিলিতভাবে পোল্যান্ডকে বিভক্ত করে মানচিত্র থেকে মুছে দেয়। তবে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের উত্থান পোলিশদের মনে জাতীয়তাবাদের নতুন আশার সঞ্চার করে এবং তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় ‘ডাচি অফ ওয়ারশ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮১৫ সালে নেপোলিয়নের পতনের পর রাশিয়া এই অঞ্চলটি দখল করে ‘কংগ্রেস পোল্যান্ড’ গঠন করে এবং রুশ জার নিজেই পোল্যান্ডের রাজা হিসেবে অভিষিক্ত হন। ১৮৩০ এবং ১৮৬৩-৬৪ সালে পোলিশরা স্বাধীনতার জন্য বিশাল জাতীয়তাবাদী বিদ্রোহ করলেও রাশিয়া তা অত্যন্ত কঠোরভাবে দমন করে। এরপর শুরু হয় তীব্র ‘রুশীকরণ’ প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে পোলিশ ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মকে বিলুপ্ত করার চেষ্টা চালানো হয়।

অবশেষে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রুশ সাম্রাজ্যের পতনের ফলে বিশ্বশক্তিগুলোর সহায়তায় একটি স্বাধীন ‘দ্বিতীয় পোলিশ প্রজাতন্ত্র’ পুনর্প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল। অন্যদিকে, জার্মানির নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলে বসবাসকারী পোলিশরা নিজেদের ভারী শিল্পের দিকে ধাবিত করে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তবে ১৮৭০-এর দশকে বিসমার্কের ‘কুলটুরকাম্পফ’ (Kulturkampf) বা সংস্কৃতি যুদ্ধের সময় পোলিশ ক্যাথলিকরা ধর্মীয় আক্রমণের শিকার হয়। এর প্রতিবাদে পোলিশরা জার্মান ক্যাথলিকদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ‘সেন্টার পার্টি’ গঠন করে এবং রাজনৈতিকভাবে বিসমার্ককে কোণঠাসা করে ফেলে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে বিসমার্ক শেষ পর্যন্ত পোলিশদের হয়রানি বন্ধ করেন এবং সেন্টার পার্টির সাথে সহযোগিতার নীতি গ্রহণ করেন।

স্পেন

স্প্যানিশ উত্তরাধিকার যুদ্ধের পর ‘নুয়েভা প্লান্টা’ (Nueva Planta) ডিক্রি জারির মাধ্যমে আধুনিক স্প্যানিশ জাতি-রাষ্ট্র গঠনের প্রথম ধাপটি শুরু হয়। এর ফলে আরাগন, ভ্যালেন্সিয়া, ম্যালোর্কা এবং কাতালোনিয়ার মতো স্বতন্ত্র রাজ্যগুলোকে ক্যাস্টিলিয়ান শাসনের অধীনে একীভূত করা হয়। এই প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীগুলোর ওপর ক্যাস্টিলিয়ান রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য আরোপ করে তাদের মূলধারায় আত্তীকরণ করা।

১৭১৪ সালের এই রাজনৈতিক একীকরণের পর থেকেই কাতালান-ভাষী অঞ্চল (কাতালোনিয়া, ভ্যালেন্সিয়া, বালিয়ারিক দ্বীপপুঞ্জ ও আরাগনের অংশ) এবং অন্যান্য জাতীয় সংখ্যালঘুদের ওপর স্প্যানিশ আত্তীকরণ নীতি একটি ঐতিহাসিক ধ্রুবক বা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়। ১৯ শতকে স্প্যানিশ জাতীয়তাবাদের উত্থানের সাথে সাথে এই জাতীয়করণ প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হয়। ক্যাস্টিলিয়ান মডেলের ওপর ভিত্তি করে একটি অভিন্ন স্প্যানিশ জাতীয় পরিচয় গড়ার এই চেষ্টা অন্যান্য ঐতিহাসিক জাতিসত্তাগুলোর সাথে সংঘাতের সৃষ্টি করে। স্প্যানিশ রাষ্ট্রযন্ত্রের এই আক্রমণাত্মক জাতীয়তাবাদী নীতিগুলো, যা আজও কোনো কোনো ক্ষেত্রে কার্যকর, স্পেনের অভ্যন্তরে বারবার আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব ও অস্থিরতার মূল বীজ হিসেবে কাজ করছে।

শিক্ষা

জাতীয়তাবাদের বিকাশে জাতির নিজস্ব ঐতিহ্য চর্চা এক অনন্য ভূমিকা পালন করেছিল, যেখানে জাতীয় ভাষা এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করা হয়। এই চেতনার মূলে ছিল আধুনিক জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার উত্থান, যা পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয়ভাবে দৃঢ় সমর্থন লাভ করে। প্রাচীন লাতিন ভাষার স্থান দখল করে নেয় নিজ নিজ জাতীয় ভাষা। আধুনিকীকরণপন্থী গোষ্ঠী ও গণমাধ্যমের জোরালো সমর্থনে জার্মানি এবং পরবর্তীকালে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে বাধ্যতামূলক শিক্ষা একটি মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

একই সময়ে ভোটাধিকারের সংস্কার সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে প্রসারিত করে। প্রতিটি দেশেই তখন ‘জাতীয় উৎস’ বা শেকড় সন্ধানের এক প্রবল আগ্রহ তৈরি হয়—যেখানে ঐতিহাসিক নির্ভুলতার চেয়ে দেশপ্রেমের আবেগই ছিল মুখ্য। প্রাথমিক স্তরে মেয়েদের জন্য সর্বজনীন বাধ্যতামূলক শিক্ষা বিস্তৃত করা হয় এবং ১৮৯০-এর দশকের মধ্যে ফ্রান্স, জার্মানি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোতে এই বাধ্যবাধকতা মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত উন্নীত করার জোরালো আন্দোলন শুরু হয়।

আদর্শিক জোট

বিপ্লবী ফ্রান্সের পরাজয়ের পর ইউরোপের প্রধান শক্তিগুলো ১৭৮৯ সালের আগের স্থিতাবস্থা ফিরিয়ে আনার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। ১৮১৫ সালের ঐতিহাসিক ভিয়েনা কংগ্রেসের মাধ্যমে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যগুলোর মধ্যে ক্ষমতার এক শান্তিপূর্ণ ভারসাম্য তৈরি করা হয়, যা ইতিহাসে ‘মেটারনিখ ব্যবস্থা’ (Metternich System) নামে পরিচিত। এই ব্যবস্থার মূল শক্তি ও সমর্থনের ভিত্তি ছিল রক্ষণশীল অভিজাত শ্রেণি।

তবে তাদের এই প্রতিক্রিয়াশীল প্রচেষ্টা ক্রমবর্ধমান বিপ্লবী আন্দোলনের জোয়ার রুখতে ব্যর্থ হয়েছিল। কারণ, তৎকালীন উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণি ফরাসি বিপ্লবের সাম্য ও স্বাধীনতার আদর্শে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত ছিল। পাশাপাশি শিল্প বিপ্লবের ফলে সৃষ্ট ব্যাপক অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনগুলো পুরনো শাসনব্যবস্থাকে ধরে রাখা অসম্ভব করে তুলেছিল।

বিদ্রোহী বুদ্ধিজীবীগণ সমাজতান্ত্রিক, কমিউনিস্ট এবং নৈরাজ্যবাদী আদর্শের ভিত্তি মজবুত করতে উদীয়মান শ্রমিক শ্রেণীর ওপর আস্থা রেখেছিলেন। এই ধারায় ১৮৪৮ সালে কার্ল মার্কস এবং ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস রচিত ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’ (The Communist Manifesto) এক বৈপ্লবিক ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করে, যা বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ আমূল বদলে দিয়েছিল।

উনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল বিবিধ আদর্শের সংঘাত ও উত্তরণে মুখর। উদীয়মান মধ্যবিত্ত এবং ব্যবসায়ী শ্রেণি উদারনীতি, মুক্ত বাণিজ্য ও পুঁজিবাদের প্রসারে প্রধান ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে, ঐতিহ্যবাহী অভিজাত শ্রেণি মূলত সরকারি উচ্চপদ, সামরিক বাহিনী এবং প্রতিষ্ঠিত গির্জার প্রভাব বজায় রাখতেই বেশি মনোযোগী ছিল।

এই সময়ে জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরিসহ বিভিন্ন অঞ্চলে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনগুলো তীব্র হয়ে ওঠে, যাদের মূল লক্ষ্য ছিল জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা অথবা বিদেশি শাসনের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি। এর ফলে ১৮১৫ থেকে ১৮৭১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে ইউরোপজুড়ে অসংখ্য বিপ্লবী অভ্যুত্থান ও স্বাধীনতা যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এরই একটি সফল উদাহরণ হলো ১৮২০-এর দশকের গ্রিক বিদ্রোহ, যার মাধ্যমে তারা দীর্ঘদিনের অটোমান শাসনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হয়।

নেপোলিয়ন তৃতীয়ের অধীনে ফ্রান্স

প্রথম নেপোলিয়নের উত্তরাধিকারী ও তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র তৃতীয় নেপোলিয়ন নিজের পারিবারিক আভিজাত্যকে কাজে লাগিয়ে সমগ্র ফ্রান্সে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ১৮৪৮ সালে নির্বাসন থেকে ফিরে এসে তিনি দেশের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত করার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি প্রথমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং পরবর্তীতে অত্যন্ত কৌশলে নিজেকে সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেন, যা ফরাসি ভোটারদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় অনুমোদিত হয়।

তাঁর সাম্রাজ্যিক শাসনের প্রথম ভাগে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সাধিত হয়েছিল। আইনসভা, সরকার এবং সশস্ত্র বাহিনীর ওপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ থাকায় তিনি দ্রুত উন্নয়নমূলক কাজ ত্বরান্বিত করতে সক্ষম হন। তবে এই ক্ষমতার আড়ালে ছিল কঠোর দমননীতি; শত শত রিপাবলিকান নেতাকে গ্রেপ্তার ও নির্বাসনে পাঠানো হয় এবং গণমাধ্যমের ওপর জারি করা হয় কঠোর সেন্সরশিপ। রাজনৈতিক স্বাধীনতার এই ঘাটতি পূরণ করতে তিনি জনগণের জন্য আধুনিক হাসপাতাল ও আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করেন। তাঁরই হাত ধরে প্যারিস শহরটি সুন্দর ও আধুনিক রূপ পায় এবং একটি শক্তিশালী রেলপথ ও উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যা বাণিজ্যের ব্যাপক উন্নতি ঘটায়।

অর্থনৈতিকভাবে ফ্রান্সের প্রবৃদ্ধি ঘটলেও শিল্পায়নের গতি ব্রিটেনের মতো দ্রুত ছিল না। আমেরিকা বা জার্মানির বৃহৎ করপোরেট সংস্কৃতির বিপরীতে ফ্রান্স মূলত ছোট ও মাঝারি পারিবারিক ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল ছিল। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ১৮৫৪-৫৬ সালের ক্রিমিয়ান যুদ্ধে ফ্রান্স বিজয়ী হলেও, ১৮৫৮ সালের পর থেকে তৃতীয় নেপোলিয়নের পররাষ্ট্রনীতি ব্যর্থ হতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত তাঁর ভুল কূটনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো ১৮৭০-৭১ সালের ফ্রাঙ্কো-প্রুশীয় যুদ্ধে ফ্রান্সের শোচনীয় পরাজয় ডেকে আনে, যার ফলে তাঁর সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটে।

১৮৭০-৭১ সালের যুদ্ধের পর ফ্রান্স পুনরায় একটি প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়, যদিও ১৮৮০ সাল পর্যন্ত সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের মধ্যে রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনার প্রবল আকাঙ্ক্ষা বিদ্যমান ছিল। এই সময়কালে ফরাসি রাজনীতির প্রধান সংকট হয়ে দাঁড়ায় ক্যাথলিক চার্চের সাথে দ্বন্দ্ব। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এই সংঘাত চরম রূপ নেয়, যেখানে একদিকে ছিল প্রগতিশীল ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি এবং অন্যদিকে ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় গোষ্ঠী। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর শেষ পর্যন্ত ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শই জয়ী হয়, যা ফ্রান্সের আধুনিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভিত্তি গড়ে দেয়। এই উত্তাল পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই ১৮৭১ সালে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘ফরাসি তৃতীয় প্রজাতন্ত্র’ (French Third Republic) প্রতিষ্ঠিত হয়।

বিসমার্কের জার্মানি

১৮৬০-এর দশকে প্রুশিয়াকে কেন্দ্র করে অটো ফন বিসমার্ক এক ধারাবাহিক সংক্ষিপ্ত ও সুনিশ্চিত সামরিক অভিযানের নেতৃত্ব দেন। তাঁর এই বিচক্ষণ রণকৌশল অস্ট্রিয়া ব্যতিরেকে প্রায় সমস্ত জার্মান রাজ্যকে একটি শক্তিশালী এবং ঐক্যবদ্ধ জার্মান সাম্রাজ্যে পরিণত করে। ১৮৭১ সালে জার্মানির এই নতুন অবস্থান সুসংহত করার পর, বিসমার্ক অত্যন্ত চতুর ‘ক্ষমতার ভারসাম্য’ (Balance of Power) কূটনীতি ব্যবহার করে ইউরোপে শান্তি বজায় রাখার চেষ্টা করেন।

নব্য প্রতিষ্ঠিত জার্মান সাম্রাজ্য অত্যন্ত দ্রুতগতিতে শিল্পায়ন সম্পন্ন করে এবং অর্থনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে সরাসরি ব্রিটেনকে চ্যালেঞ্জ জানায়। তবে ১৮৯০ সালে উচ্চাভিলাষী তরুণ কাইজার দ্বিতীয় উইলহেম বিসমার্ককে পদচ্যুত করেন। কাইজারের হঠকারী ও আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতি ইউরোপের স্থিতিশীলতা নষ্ট করে মহাদেশটিকে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরে বিভক্ত করে ফেলে। শেষ পর্যন্ত এই শক্তিসমূহের মধ্যকার চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতাই ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দাবানল জ্বালিয়ে দেয়।

অস্ট্রিয়ান এবং রাশিয়ান সাম্রাজ্য

উনিশ শতকে নতুন রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদ এক অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হয়েছিল, যার অভাব যেকোনো রাজনৈতিক কাঠামোকে ভেঙে ফেলার ক্ষমতা রাখত। অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের বিশাল ভূখণ্ড এবং শক্তিশালী সেনাবাহিনী থাকলেও এটি বেশ কিছু কাঠামোগত সংকটের সম্মুখীন ছিল: চারদিকে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী, নড়বড়ে অর্থনৈতিক অবস্থা, জাতিগতভাবে খণ্ডিত জনপদ, দুর্বল শিল্পভিত্তি এবং নগণ্য নৌ-শক্তি।

তবে প্রিন্স মেটারনিখের মতে, এই সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাদের অত্যন্ত দক্ষ কূটনীতিকরা। তাঁরা এক অসাধারণ কৌশল অবলম্বন করে বিভিন্ন শক্তির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতেন এবং প্রয়োজনীয় ‘বাফার জোন’ বা মধ্যবর্তী অঞ্চল তৈরি করতেন। এই দূরদর্শী কূটনীতির কারণেই অটোমান সাম্রাজ্য, ফ্রেডেরিক দ্য গ্রেট, নেপোলিয়ন এবং বিসমার্কের মতো প্রবল প্রতাপশালী শক্তির সাথে যুদ্ধ সত্ত্বেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত হ্যাবসবার্গ সাম্রাজ্য টিকে ছিল। পরিশেষে, জাতিগত জাতীয়তাবাদ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবির মুখে এই বিশাল সাম্রাজ্য রাতারাতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

সম্রাজ্ঞী ক্যাথরিন দ্য গ্রেটের সুদূরপ্রসারী সংস্কারের হাত ধরে রাশিয়ান সাম্রাজ্য ইউরোপের অন্যতম প্রধান শক্তিতে উন্নীত হয়। এর পরবর্তী দশকগুলোতে রাশিয়া অত্যন্ত দ্রুতগতিতে চারদিকে নিজের সীমানা বিস্তার করতে থাকে। অস্ট্রীয় সাম্রাজ্যের মতো রাশিয়াও ছিল একটি বহুভাষিক ও বহুজাতিক রাষ্ট্র। তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক বিপর্যয় এবং অভ্যন্তরীণ বিপ্লবের ফলে এই বিশাল সাম্রাজ্য খণ্ডবিখণ্ড হয়ে পড়ে। এই বিভক্তির মাধ্যমেই জন্ম নেয় স্বাধীন ফিনল্যান্ড, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, এস্তোনিয়া ও পোল্যান্ড। এমনকি সে সময় সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ইউক্রেন, আর্মেনিয়া, জর্জিয়া এবং আজারবাইজানও স্বাধীনতা লাভ করেছিল।

বলকান অঞ্চল ও ককেশাস পর্বতমালার জনগণের ওপর রাশিয়ার প্রভাব ছিল অত্যন্ত গভীর। অটোমান সাম্রাজ্যের সাথে দীর্ঘস্থায়ী আধিপত্যের লড়াইয়ে রাশিয়া মোট ১২টি রুশো-তুর্কি যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল, যা দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিয়েছিল।

দেশত্যাগ

উনিশ শতকে ইউরোপের নাটকীয় জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন, উপর্যুপরি যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে বিশ্বজুড়ে এক বিশাল অভিবাসন প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৮১৫ সালে নেপোলিয়নীয় যুদ্ধের অবসান থেকে ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ ইউরোপীয় নিজেদের ভাগ্য অন্বেষণে আমেরিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডে পাড়ি জমায়।

এই বিশাল জনস্রোতের প্রায় ৭১ শতাংশ উত্তর আমেরিকায়, ২১ শতাংশ মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় এবং ৭ শতাংশ অস্ট্রেলিয়ায় বসতি স্থাপন করে। ল্যাটিন আমেরিকায় যাওয়া প্রায় ১ কোটি ১০ লক্ষ মানুষের মধ্যে জাতিগত বৈচিত্র্য ছিল চোখে পড়ার মতো; যাদের মধ্যে ৩৮ শতাংশ ছিল ইতালীয়, ২৮ শতাংশ স্পেনীয় এবং ১১ শতাংশ পর্তুগিজ। এই দেশান্তর কেবল ইউরোপের জনসংখ্যাগত চাপই কমায়নি, বরং নতুন মহাদেশগুলোর আধুনিক সমাজ ও সংস্কৃতি গঠনেও এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছিল।

সাম্রাজ্যবাদ

পঞ্চদশ শতাব্দীর ইউরোপীয় আবিষ্কারের যুগের হাত ধরেই বিশ্বজুড়ে বিশাল ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যগুলোর ভিত্তি রচিত হয়েছিল। এই সুদূরপ্রসারী সামুদ্রিক সাম্রাজ্য এবং পরবর্তীতে গড়ে ওঠা উপনিবেশগুলোর নেপথ্যে প্রধান চালিকাশক্তি ছিল বাণিজ্যিক স্বার্থ। পর্তুগিজ এবং স্প্যানিশ সাম্রাজ্য অত্যন্ত দ্রুততার সাথে বিশ্বের প্রথম বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যাদের আধিপত্য পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বিস্তৃত ছিল।

ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক ইতিহাসে পর্তুগিজ ও স্প্যানিশদের পর প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় ফরাসি, ডাচ এবং ব্রিটিশরা। ঊনবিংশ শতাব্দীতে সমুদ্রপথে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে ব্রিটিশরা তাদের ‘দ্বিতীয় সাম্রাজ্য’ সুসংহত করে। তৎকালীন উন্নত জাহাজ নির্মাণ প্রযুক্তি এবং ইলেকট্রনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার (যেমন টেলিগ্রাম) সমন্বয়ে এটি ইতিহাসের বৃহত্তম সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। ১৯২০ সালে যখন এই সাম্রাজ্য তার শিখরে পৌঁছায়, তখন পৃথিবীর মোট ভূখণ্ডের এক-চতুর্থাংশ এবং বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ছিল।

একই সময়ে বেলজিয়াম, জার্মানি এবং ইতালির মতো অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলোও ঔপনিবেশিক প্রতিযোগিতায় যোগ দেয় এবং মূলত আফ্রিকা মহাদেশে নিজেদের ছোট ছোট সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। অন্যদিকে, রাশিয়া তার সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিল ভিন্ন পদ্ধতিতে; তারা সমুদ্রপথের বদলে পূর্ব ইউরোপ এবং এশিয়ার বিশাল ভূখণ্ডে স্থলপথে জয়লাভের মাধ্যমে রুশ সাম্রাজ্যকে এক বিশাল রূপ দান করে।

উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে প্রতাপশালী অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ইউরোপের ভূ-রাজনীতিতে এক অস্থিরতার জন্ম দেয়। এরই প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে ১৮৫৪ সালে শুরু হয় ক্রিমিয়ান যুদ্ধ, যা ইউরোপীয় সাম্রাজ্যগুলোর মধ্যে বিশ্বব্যাপী ছোটখাটো সংঘাতের এক দীর্ঘ ধারার সূচনা করে। শতাব্দীর উত্তরভাগে সার্ডিনিয়া ও প্রুশিয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত ধারাবাহিক যুদ্ধের মাধ্যমে যথাক্রমে ইতালি ও জার্মানি আধুনিক জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যা মহাদেশের চিরাচরিত ক্ষমতার ভারসাম্যকে আমূল বদলে দেয়।

১৮৭০ সাল পরবর্তী সময়ে অটো ফন বিসমার্ক ইউরোপে এক শক্তিশালী জার্মান আধিপত্য গড়ে তোলেন, যা ফ্রান্সকে এক চরম কূটনৈতিক সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। জার্মানির এই ক্রমবর্ধমান শক্তিকে রুখতে ফ্রান্স ধীরে ধীরে রাশিয়া ও ব্রিটেনের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটিয়ে একটি শক্তিশালী পাল্টা জোট গঠন করে। এর ফলে ইউরোপের রণাঙ্গন দুটি পরস্পরবিরোধী শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে: একদিকে ১৮৮২ সালের ত্রিপক্ষীয় জোট (জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ও ইতালি) এবং অন্যদিকে ১৯০৭ সালের ত্রিপক্ষীয় চুক্তি বা আঁতাত (ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়া)। এই সামরিক মেরুকরণ ও জোটবদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়াই মূলত ইউরোপকে এক বিশাল মহাযুদ্ধের দিকে ধাবিত করে।

সুন্দর যুগ (১৮৭১-১৯১৪)

১৮৭১ সালের ফ্রাঙ্কো-প্রুশীয় যুদ্ধ থেকে ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা পর্যন্ত সময়কালটি পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপে এক বিরল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য পরিচিত ছিল। যদিও আলসেস-লোরেন অঞ্চলটি জার্মানির কাছে হারানোর ক্ষত ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে উত্তেজনা জিইয়ে রেখেছিল, তবুও একগুচ্ছ সফল কূটনৈতিক সম্মেলন বিশ্বশান্তি রক্ষায় ঢাল হিসেবে কাজ করেছিল। এর মধ্যে ১৮৭৮ সালের বার্লিন কংগ্রেস, ১৮৮৪ সালের বার্লিন কঙ্গো সম্মেলন এবং ১৯০৬ সালের আলজেসিরাস সম্মেলন আন্তর্জাতিক বিরোধগুলোর শান্তিপূর্ণ মধ্যস্থতা করতে সক্ষম হয়।

প্রকৃতপক্ষে, ‘বেলে এপোক’ (Belle Époque) বা এই সুন্দর যুগের ইউরোপীয়দের কাছে, বিশেষ করে উচ্চবিত্তদের কাছে, জাতীয় পরিচয়ের চেয়েও আন্তর্জাতিক ও শ্রেণিভিত্তিক সম্পর্কগুলো বেশি গুরুত্ব পেত। সেই সময়ের একজন অভিজাত ভদ্রলোক কোনো পাসপোর্ট ছাড়াই পশ্চিম ইউরোপের প্রায় সর্বত্র ভ্রমণ করতে পারতেন এবং কোনো প্রকার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছাড়াই স্বচ্ছন্দে বিদেশে বসবাস করতে পারতেন। সীমানার চেয়ে আভিজাত্যের বন্ধনই তখন ইউরোপকে একসূত্রে গেঁথে রেখেছিল।

ইউরোপের ইতিহাসে ‘বেলে এপোক’ বা ‘সুন্দর যুগ’ ছিল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এক অভাবনীয় অগ্রগতির সময়। এই যুগে দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের অসংখ্য উদ্ভাবন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। শুরুতে হালকা গঠন ও শব্দহীন বৈশিষ্ট্যের উন্নত ঘোড়ার গাড়িগুলো বিভিন্ন ফ্যাশনেবল রূপে জনপ্রিয় হলেও, যুগের শেষ দিকে সেগুলোর স্থানাভিষিক্ত হয় আধুনিক অটোমোবাইল। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে গাড়ি ছিল মূলত ধনকুবেরদের কাছে একটি বিলাসবহুল পরীক্ষা মাত্র।

ফরাসি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে পিউজো (Peugeot), এই নতুন শিল্পে নেতৃত্বের আসনে ছিল। ১৮৯০-এর দশকে এডুয়ার্ড মিশেলিন সাইকেল ও গাড়ির জন্য সহজে খোলা যায় এমন ‘বায়ুসংক্রান্ত টায়ার’ (Pneumatic Tire) আবিষ্কার করে যাতায়াত ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটান। এছাড়া সমসাময়িক যুগের আরও দুটি জনপ্রিয় বাহন—স্কুটার এবং মোপেড—ছিল এই ‘বেলে এপোক’ বা স্বর্ণযুগেরই অনবদ্য সৃষ্টি।

সাম্রাজ্যবাদী যুগে ইউরোপ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ

উনিশ শতকের আপেক্ষিক শান্তির অবসান ঘটিয়ে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর মধ্যকার তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ক্রমবর্ধমান জাতীয়তাবাদ ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দাবানল জ্বালিয়ে দেয়। ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত চলা এই মহাযুদ্ধে প্রায় সাড়ে ৬ কোটিরও বেশি ইউরোপীয় সৈন্যকে রণক্ষেত্রে নামানো হয়েছিল, যার ফলে সৈন্য ও বেসামরিক লোকসহ প্রায় ২ কোটি মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

এই যুদ্ধে একপক্ষে ছিল জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, অটোমান সাম্রাজ্য এবং বুলগেরিয়া (কেন্দ্রীয় শক্তি); অন্যদিকে ছিল সার্বিয়া এবং ট্রিপল আঁতাত বা এন্টেন্তে (ফ্রান্স, ব্রিটেন ও রাশিয়া)। পরবর্তীতে ১৯১৫ সালে ইতালি, ১৯১৬ সালে রোমানিয়া এবং ১৯১৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই জোটে যোগ দেয়। বিশেষ করে পশ্চিম ফ্রন্টের যুদ্ধ ছিল চরম নৃশংস, যেখানে বছরের পর বছর লড়াই সত্ত্বেও কোনো পক্ষই উল্লেখ্যযোগ্য ভূমি দখল করতে পারেনি। কেবল ভার্দুন এবং সোমের মতো একক যুদ্ধগুলোতেই লক্ষ লক্ষ প্রাণ ঝরে গিয়েছিল।

১৯১৭ সাল ছিল যুদ্ধের মোড় পরিবর্তনের বছর। ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের মাধ্যমে রাশিয়ার জার শাসনের পতন ঘটে এবং জার্মানি পূর্ব ফ্রন্টে বিজয়ী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তবে আট মাসের স্বল্পস্থায়ী উদার শাসনের পর অক্টোবর বিপ্লব ভ্লাদিমির লেনিন ও বলশেভিকদের ক্ষমতায় বসায়, যা পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্ম দেয়। এদিকে ১৯১৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং ১৯১৮ সালের বসন্তে জার্মানির শেষ আক্রমণ ব্যর্থ হওয়ায় জার্মানি চরম জনবল সংকটে পড়ে। একে একে জার্মানির মিত্র রাষ্ট্র অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি এবং অটোমান সাম্রাজ্য আত্মসমর্পণ করে ও বিলুপ্ত হয়ে যায়। পরিশেষে, ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর জার্মানিও আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

১৯১৯ সালের প্যারিস শান্তি সম্মেলনে বিজয়ী শক্তিগুলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এবং বিশ্বব্যবস্থা পুনর্গঠনের লক্ষ্যে মিলিত হয়। এই সম্মেলনের প্রধান সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে ছিল আন্তর্জাতিক শান্তি বজায় রাখতে লিগ অফ নেশনস গঠন এবং পরাজিত দেশগুলোর সঙ্গে পৃথক পৃথক শান্তি চুক্তি সম্পাদন। এর মধ্যে জার্মানির ওপর চাপিয়ে দেওয়া ভার্সাই চুক্তি ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য।

এই সম্মেলনের মাধ্যমে জার্মানি ও অটোমান সাম্রাজ্যের অধিকৃত বিদেশি ভূখণ্ডগুলো ‘ম্যান্ডেট’ হিসেবে মূলত ব্রিটেন ও ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেওয়া হয়। এছাড়া ইউরোপে জাতীয়তাবাদের প্রবল জোয়ারকে স্বীকৃতি দিতে বেশ কিছু নতুন দেশের সীমানা নির্ধারণ করা হয় এবং অনেক রাষ্ট্রকে সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষা সংক্রান্ত চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। তবে ভার্সাই চুক্তির কঠোর শর্তাবলি জার্মানির সামরিক শক্তিকে পঙ্গু করে দেয় এবং যুদ্ধের সমস্ত দায়ভার এককভাবে তাদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে বিপুল অংকের ক্ষতিপূরণ ধার্য করে। জার্মানির জাতীয় জীবনে এই অপমান ও চরম অর্থনৈতিক সংকটই পরবর্তীতে নাৎসিবাদের উত্থান এবং পরোক্ষভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পথ প্রশস্ত করেছিল।

দুই মহাযুদ্ধ মধ্যবর্তী সময়কাল

১৯১৯ সালের ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে বিজয়ী শক্তিগুলো জাতিগত আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। এর ফলে ভেঙে পড়া জার্মান, অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় এবং রুশ সাম্রাজ্যের ভূখণ্ড থেকে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে একগুচ্ছ নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়—যাদের মধ্যে পোল্যান্ড, চেকোস্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, অস্ট্রিয়া, যুগোস্লাভিয়া, ফিনল্যান্ড, এস্তোনিয়া, লাটভিয়া এবং লিথুয়ানিয়া অন্যতম।

যদিও এই সময়কালে ইউক্রেনীয়-সোভিয়েত যুদ্ধ (১৯১৭-১৯২১) এবং পোলিশ-সোভিয়েত যুদ্ধের (১৯১৯-১৯২১) মতো কিছু আঞ্চলিক সংঘাত বিদ্যমান ছিল, তবুও ১৯২২ সালের পরবর্তী সময়টি ছিল আপেক্ষিক শান্তির যুগ। বিশ্বজুড়ে তখন এক অভাবনীয় সমৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে এক প্রাণবন্ত যুব সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটে, যা ইতিহাসে “রোরিং টোয়েন্টিজ” (Roaring Twenties) বা “জ্যাজ এজ” (Jazz Age) নামে স্মরণীয় হয়ে আছে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির জয়কে সমকালীন বিশ্ব ‘উদারনীতিবাদের বিজয়’ হিসেবেই দেখেছিল। ইতিহাসবিদ মার্টিন ব্লিংকহর্নের মতে, ১৯১৯ পরবর্তী সময়ে সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ, ধর্মীয় ও জাতিগত সহিষ্ণুতা, জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির মতো বিষয়গুলো এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল। প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার, অবাধ বাণিজ্য, ট্রেড ইউনিয়ন এবং বিশ্বশান্তি রক্ষায় গঠিত ‘লিগ অফ নেশনস’-এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির প্রয়াসগুলো ছিল সেই উদারপন্থী ব্যবস্থারই প্রতিফলন।

তবে এই নতুন ব্যবস্থার স্থায়িত্ব ছিল ক্ষণস্থায়ী। ১৯১৭ সাল থেকেই উদীয়মান কমিউনিস্ট আন্দোলন উদারনীতিবাদকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাতে শুরু করে। যদিও অধিকাংশ দেশে কমিউনিস্ট বিদ্রোহগুলো দমন করা হয়েছিল, তবে রাশিয়ায় বলশেভিকরা সফলভাবে ক্ষমতা দখল করে। ১৯২২ সালে ইতালিতে ‘ফ্যাসিবাদ’ নামক এক চরম কর্তৃত্ববাদী মতাদর্শের উত্থান ঘটে। ১৯৩০-এর দশকের মধ্যে নাৎসি জার্মানি থেকে শুরু করে পর্তুগাল, অস্ট্রিয়া, পোল্যান্ড, গ্রিস, বাল্টিক অঞ্চল এবং স্পেনে গণতন্ত্রের স্থান দখল করে নেয় একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। এর ফলে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায় যে, ১৯৪০ সাল নাগাদ ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে ফ্রান্স, ফিনল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড এবং সুইডেন—এই মাত্র চারটি দেশেই কেবল উদারতান্ত্রিক গণতন্ত্র টিকে ছিল।

মহামন্দা: ১৯২৯-৩৯

১৯২৯ সালের ওয়াল স্ট্রিট শেয়ার বাজারে ধসের পর সমগ্র বিশ্ব এক ভয়াবহ মহামন্দা বা গ্রেট ডিপ্রেশনের কবলে পড়ে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে পণ্যের দাম ও ব্যবসায়িক মুনাফা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পায় এবং বেকারত্ব চরম আকার ধারণ করে। এই মন্দার থাবায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ভারী শিল্প, রপ্তানিমুখী কৃষিখাত, খনি ও বনজ সম্পদ শিল্প এবং নির্মাণ খাত। স্থবির হয়ে পড়া বিশ্ব বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কমে গিয়ে এক নজিরবিহীন অর্থনৈতিক সংকটের সৃষ্টি করে।

বিংশ শতাব্দীর তিরিশের দশকে ইউরোপের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক চরম অস্থিরতা দেখা দেয়, যার ফলে অনেক দেশই গণতান্ত্রিক পথ পরিহার করে একনায়কতন্ত্র ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে ধাবিত হয়। এই ধারায় সবচেয়ে যুগান্তকারী পরিবর্তনটি ঘটে ১৯৩৩ সালে, যখন অ্যাডলফ হিটলার জার্মানিতে ক্ষমতায় আরোহণ করেন। বিশ্বজুড়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে ১৯১৯ সালে ‘লিগ অফ নেশনস’ প্রতিষ্ঠিত হলেও এটি তার মূল লক্ষ্য পূরণে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। বিশেষ করে নাৎসি জার্মানি, জাপান সাম্রাজ্য, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ফ্যাসিস্ট ইতালির ক্রমবর্ধমান সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা মোকাবিলা করতে এই সংস্থাটি অক্ষম ছিল। তদুপরি, তৎকালীন অন্যতম বৃহৎ শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুপস্থিতি লিগ অফ নেশনসকে আরও দুর্বল করে দেয়। ফলস্বরূপ, ১৯৩৭ সাল নাগাদ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় গুরুত্বহীন ও অকার্যকর হয়ে পড়ে।

১৯৩১ সালে ইতালি কর্তৃক ইথিওপিয়া বিজয় এবং ১৯৩৬ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত চলা স্পেনের গৃহযুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক গভীর অস্থিরতার জন্ম দেয়। জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী এই গৃহযুদ্ধে জয়লাভ করে। যদিও এই সংঘাত সরাসরি একটি বৃহত্তর বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয়নি, তবে এটি একটি বৈশ্বিক আদর্শিক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। একদিকে ছিল বামপন্থী, কমিউনিস্ট এবং অনেক উদারপন্থী গোষ্ঠী; অন্যদিকে ছিল ক্যাথলিক, রক্ষণশীল এবং ফ্যাসিবাদী শক্তি।

এই উত্তাল সময়ে ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিরপেক্ষতা বজায় রাখার নীতি গ্রহণ করে। ফলে বিশ্বজুড়ে প্রচলিত শান্তিবাদের আদর্শ ম্লান হতে থাকে এবং একটি নতুন বিশ্বযুদ্ধ যে অনিবার্য, সেই ধারণা জনমানসে প্রবল হয়ে ওঠে। স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধকে অনেক ঐতিহাসিক ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মহড়া’ হিসেবে অভিহিত করেন, কারণ এখানে আধুনিক যুদ্ধকৌশল ও আদর্শিক মেরুকরণ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ

১৯৩৮ সালে অ্যাডলফ হিটলার চেকোস্লোভাকিয়ার সুডেটেনল্যান্ড দখল করলে ইউরোপের রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা দেখা দেয়। তৎকালীন মিউনিখ চুক্তিতে ব্রিটেন ও ফ্রান্স যুদ্ধের ঝুঁকি এড়াতে হিটলারের প্রতি ‘তুষ্টির নীতি’ (Appeasement Policy) গ্রহণ করে, কিন্তু জার্মানি সেই সুযোগে দ্রুতই পুরো চেকোস্লোভাকিয়া দখল করে নেয়। এরপর জাপানের সাথে ‘কমিন্টার্ন-বিরোধী’ চুক্তি এবং ইতালির বেনিটো মুসোলিনির সাথে ‘স্টিল অফ প্যাক্ট’-এ আবদ্ধ হওয়ার পর হিটলার এক অভাবনীয় কূটনৈতিক চাল চালেন। ১৯৩৯ সালের আগস্টে তিনি চিরশত্রু সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে একটি ‘অ-আগ্রাসন চুক্তি’ স্বাক্ষর করেন।

এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর পোল্যান্ড আক্রমণের মধ্য দিয়ে হিটলার আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করেন। ব্রিটেন ও ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেও শুরুর দিকে ‘ফোনি ওয়ার’ (Phony War) বা ছদ্ম-যুদ্ধের কারণে বড় কোনো সংঘাত হয়নি। তবে ১৯৪০ সালের বসন্তে নাৎসি বাহিনীর বিধ্বংসী ‘ব্লিটজক্রিগ’ বা ঝটিকা আক্রমণের মুখে ডেনমার্ক, নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম এবং খোদ ফ্রান্সের পতন ঘটে। এরপর হিটলার ব্রিটেন আক্রমণের চেষ্টা করলেও ‘ব্যাটল অফ ব্রিটেন’-এ ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর অদম্য সাহসিকতার কাছে জার্মান লুফটওয়াফে পরাজিত হয়। হিটলারের মূল লক্ষ্য ছিল পূর্ব ইউরোপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, কিন্তু রাশিয়ার ওপর তাঁর আক্রমণ ১৯৪১ সালের জুন পর্যন্ত পিছিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ১৯৪১ সালের ডিসেম্বরে হাড়কাঁপানো শীতে মস্কোর দোরগোড়ায় এসে অপরাজেয় জার্মান ‘ওয়েহরমাখ্ট’ বাহিনী থমকে যেতে বাধ্য হয়।

১৯৪১ সালের পর থেকে নাৎসি জার্মানি যুদ্ধক্ষেত্রে একের পর এক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে শুরু করে। বিশ্বজুড়ে সংঘাতটি মূলত অক্ষশক্তি (জার্মানি, ইতালি ও জাপান) এবং মিত্রশক্তির (ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) মধ্যে এক বিশাল মরণপণ লড়াইয়ে রূপ নেয়। মিত্রশক্তি উত্তর আফ্রিকায় গুরুত্বপূর্ণ বিজয় অর্জনের পর ১৯৪৩ সালে ইতালি আক্রমণ করে এবং ১৯৪৪ সালে সফল অভিযানের মাধ্যমে ফ্রান্স পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়।

১৯৪৫ সাল নাগাদ যুদ্ধের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরে যায়। জার্মানি তখন উভয় সংকটে পড়ে—পূর্ব দিক থেকে ধেয়ে আসা শক্তিশালী সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পশ্চিম দিক থেকে অগ্রসর হওয়া মিত্রশক্তির সম্মিলিত আক্রমণের মুখে তারা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ঐতিহাসিক বার্লিনের যুদ্ধে সোভিয়েত ‘লাল বাহিনী’ (Red Army) যখন নাৎসি ক্ষমতার প্রতীক রাইখস্ট্যাগ ভবন দখল করে নেয়, তখন পরাজয় নিশ্চিত জেনে অ্যাডলফ হিটলার আত্মহত্যা করেন। এর পরপরই জার্মানি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত। এই যুদ্ধে আনুমানিক ৫ থেকে ৮ কোটি মানুষ প্রাণ হারান, যার মধ্যে সিংহভাগই ছিলেন সাধারণ বেসামরিক নাগরিক (প্রায় ৩ কোটি ৮০ লক্ষ থেকে ৫ কোটি ৫০ লক্ষ)। এই ধ্বংসলীলা আধুনিক বিশ্বের রাজনীতি ও মানচিত্রকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই বিভীষিকাময় সময়টি ইতিহাসে পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত গণহত্যার এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে যুদ্ধের প্রত্যক্ষ হতাহতের বাইরেও নাৎসিরা তাদের চরমপন্থী আদর্শ বাস্তবায়নে ১ কোটি ১০ লক্ষেরও বেশি নিরপরাধ বেসামরিক মানুষকে হত্যা করে। তারা আইবিএম-এর তৎকালীন প্রযুক্তিনির্ভর আদমশুমারি ব্যবহার করে সুনির্দিষ্টভাবে ইউরোপের অধিকাংশ ইহুদি, জিপসি (রোমা), লক্ষ লক্ষ পোলিশ ও সোভিয়েত স্লাভ, সমকামী, যিহোবার সাক্ষী, প্রতিবন্ধী এবং রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের চিহ্নিত করে নির্মূল করেছিল।

অন্যদিকে, ১৯৩০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নেও বিপরীত ধরনের মানবিক উন্নতি দেখা দিয়েছিল। জোসেফ স্তালিনের শাসনামলে শিল্প, কলকারখানা, ইস্পাত ও অন্যান্য শিল্পের বিকাশ লক্ষ লক্ষ মানুষকে উন্নত সাম্যবাদী সমাজের দিকে নিয়ে যেতে থাকে। এই সময়ে ইউরোপে রাজনৈতিক ও জাতিগত কারণে কোটি কোটি মানুষের জোরপূর্বক স্থানান্তরের ফলে সাধারণ বেসামরিক নাগরিকরা চরম দুর্দশার শিকার হন।

স্নায়ু যুদ্ধের যুগ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিশ্বমঞ্চে ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং জার্মানির দীর্ঘদিনের শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রভাবশালী অবস্থানের অবসান ঘটায়। ১৯৪৫ সালের ইয়াল্টা সম্মেলনের মাধ্যমে ইউরোপ মহাদেশটি যুদ্ধের বিজয়ীদের মধ্যে দুটি বিশেষ ‘প্রভাববলয়ে’ বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই বিভাজনই খুব দ্রুত পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশ এবং কমিউনিস্ট ব্লকের মধ্যে এক স্নায়ুযুদ্ধের (Cold War) জন্ম দেয়, যেখানে ইউরোপ হয়ে ওঠে প্রধান ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দু।

নিজেদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের বেশিরভাগ উদারপন্থী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র মিলে ন্যাটো (NATO) সামরিক জোট গঠন করে। এর প্রতিক্রিয়ায় ১৯৫৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন তার অনুগত রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে ওয়ারশ প্যাক্ট (Warsaw Pact) প্রতিষ্ঠা করে। যদিও ওয়ারশ জোটের স্থল বাহিনীর সংখ্যা ন্যাটোর তুলনায় অনেক বেশি ছিল, কিন্তু আমেরিকা, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের সম্মিলিত ‘পারমাণবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা’ বা নিউক্লিয়ার আমব্রেলা ন্যাটোকে যেকোনো বড় ধরনের আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রেখেছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ইউরোপের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র দুই বিপরীতমুখী আদর্শে বিভক্ত হয়ে পড়ে। পূর্ব ইউরোপে সোভিয়েত লাল সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ প্রভাবে সাম্যবাদী বা কমিউনিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার জয়যাত্রা শুরু হয়। অন্যদিকে, পশ্চিম ইউরোপে আধিপত্য বিস্তার করে উদারপন্থী ও পুঁজিবাদী বুর্জোয়া গণতন্ত্র

অধিকাংশ ইতিহাসবিদের মতে, এই আদর্শিক মেরুকরণের সফলতার মূলে ছিল দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এবং ফ্যাসিবাদী শাসনের ফলে সৃষ্ট জনমানসের চরম ক্লান্তি। মানুষ তখন স্থিতিশীলতা খুঁজছিল এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে দেওয়া নিরবচ্ছিন্ন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি এই নতুন ব্যবস্থাগুলোকে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল।

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার

১৯৪৫ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘মার্শাল প্ল্যান’ এবং অন্যান্য প্রকল্পের আওতায় পশ্চিম ইউরোপের পুনর্গঠনে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার অনুদান প্রদান করে। ইতিহাসবিদ মাইকেল জে. হোগানের মতে, যুদ্ধবিধ্বস্ত পশ্চিম ইউরোপের অর্থনীতি ও রাজনীতি স্থিতিশীল করতে এই মার্কিন সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এই অনুদানের হাত ধরে আধুনিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির প্রবর্তন ঘটে, যা শিল্প উৎপাদনশীলতা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি করে এবং শ্রমিক, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

রাজনৈতিকভাবে এই পরিকল্পনা স্থানীয় সাম্যবাদী দলগুলোর প্রভাব খর্ব করতে সহায়ক ছিল; ফলে তারা সরকারে তাদের মর্যাদা ও সক্রিয় ভূমিকা হারাতে শুরু করে। কৌশলগত দিক থেকে মার্শাল পরিকল্পনা পশ্চিম ইউরোপকে সাম্যবাদী উত্থান বা রাজনৈতিক দখলের হাত থেকে রক্ষা করে একটি শক্তিশালী ঢাল হিসেবে কাজ করেছিল। তবে ইউরোপের দ্রুত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে এই পরিকল্পনার একক ভূমিকা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। অনেক গবেষকই একে কেবল একটি ‘অলৌকিক সমাধান’ হিসেবে মানতে নারাজ; কারণ বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ নির্দেশ করে যে, মার্কিন সহায়তা পৌঁছানোর আগেই ইউরোপে স্বাভাবিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া দানা বাঁধতে শুরু করেছিল।

সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে নিজের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি পুনর্গঠনে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছিল। এর অংশ হিসেবে তারা পূর্ব জার্মানির অধিকাংশ শিল্প-কারখানা দখল করে তা নিজেদের ভূখণ্ডে সরিয়ে নেয়। এছাড়া যুদ্ধবিধ্বস্ত পূর্ব জার্মানি, হাঙ্গেরি, রোমানিয়া এবং বুলগেরিয়া থেকে যুদ্ধের বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ আদায় করে। মস্কো অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে একটি বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল, যা একচেটিয়াভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করত। একই সময়ে মস্কো তার পার্শ্ববর্তী ‘উপগ্রহ রাষ্ট্র’ বা স্যাটেলাইট স্টেটগুলোতে শাসনকারী কমিউনিস্ট দলগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই প্রেক্ষাপটে ইতিহাসবিদ মার্ক ক্র্যামার তাঁর পর্যবেক্ষণে এক গুরুত্বপূর্ণ উপসংহার টেনেছেন:

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথম দশকে পূর্ব ইউরোপ থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নে সম্পদের নিট বহির্গমন ছিল প্রায় ১৫ বিলিয়ন থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার, যা মার্শাল পরিকল্পনার অধীনে পশ্চিম ইউরোপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত মোট সাহায্যের প্রায় সমান।

১৯৭০-এর দশকে পশ্চিম ইউরোপের শিল্পোন্নত দেশগুলো এক গভীর বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটের সম্মুখীন হয়। এই সংকটের মূলে ছিল অপ্রচলিত হয়ে পড়া ভারী শিল্প, জ্বালানির আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি ও এর ফলে সৃষ্ট তীব্র মুদ্রাস্ফীতি। এছাড়া অদক্ষ রাষ্ট্রায়ত্ত রেলপথ, কম্পিউটার প্রযুক্তিতে পিছিয়ে পড়া, বিশাল সরকারি ঘাটতি এবং শক্তিশালী শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর লাগাতার আন্দোলন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছিল।

এই সংকট উত্তরণে জার্মানি ও সুইডেন সামাজিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে ধীরে ধীরে পুনর্গঠনের পথ বেছে নেয়, যা জার্মানির ক্ষেত্রে অত্যন্ত সফল প্রমাণিত হয়। অন্যদিকে, ব্রিটেনে প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের নেতৃত্বে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ‘শক থেরাপি’ পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। তিনি উচ্চ সুদের হার নির্ধারণ, কঠোর ব্যয় সংকোচন নীতি (Austerity), অদক্ষ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও সরকারি আবাসন বিক্রি করে দেওয়ার মতো আমূল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। থ্যাচারের এই কঠোর নীতিগুলো ব্রিটেনে সামাজিকভাবে ব্যাপক উত্তেজনা ও অস্থিরতা তৈরি করলেও, শেষ পর্যন্ত তিনি বিরোধীদের দমনে সফল হন এবং ব্রিটিশ অর্থনীতির কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আনেন। তবে তাঁর এই বিতর্কিত সংস্কারের প্রভাব নিয়ে আজও নানা আলোচনা ও সমালোচনা জারি রয়েছে।

স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী ইতিহাস

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ইউরোপের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মানচিত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়। পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো নিজেদের সুরক্ষা ও ঐক্য নিশ্চিত করতে কয়লা ও ইস্পাত সম্প্রদায় এবং ইউরোপ কাউন্সিলের মতো সংগঠনের মাধ্যমে একীকরণের যাত্রা শুরু করে। আশির দশকে পোল্যান্ডের ‘সলিডারনোশ’ (Solidarity) আন্দোলন কমিউনিস্ট শাসনের ভিত নাড়িয়ে দেয়। একই সময়ে সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভ প্রবর্তিত ‘পেরেস্ত্রোইকা’ (পুনর্গঠন) ও ‘গ্লাসনস্ত’ (স্বচ্ছতা) নীতি ইউরোপে সোভিয়েত প্রভাবকে শিথিল করে ফেলে।

১৯৮৯ সালে প্যান-ইউরোপীয় পিকনিকের ধারাবাহিকতায় ঐতিহাসিক বার্লিন প্রাচীর ও ‘লোহার পর্দা’ (Iron Curtain) ভেঙে পড়ে, যার ফলে সোভিয়েত বলয়ের বাইরে থাকা কমিউনিস্ট সরকারগুলো ক্ষমতাচ্যুত হয়। ১৯৯০ সালে পূর্ব জার্মানি পশ্চিম জার্মানির সাথে একীভূত হয় এবং ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মাধ্যমে ইউএসএসআর ১৫টি স্বাধীন রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে যায়। তবে এই বিভাজন সবচেয়ে সহিংস রূপ নেয় যুগোস্লাভিয়ায়; সেখানকার ছয়টি প্রজাতন্ত্রের মধ্যে চারটি স্বাধীনতা ঘোষণা করলে দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়, যা ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত জারি ছিল। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে মন্টিনিগ্রো এবং ২০০৮ সালে কসোভো একতরফাভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে, ইউরোপীয় অর্থনৈতিক সম্প্রদায় (EEC) নিজেদের পরিধি বাড়িয়ে প্রাক্তন কমিউনিস্ট ও নিরপেক্ষ দেশগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করতে শুরু করে। ১৯৯৩ সালে মাস্ট্রিক্ট চুক্তির মাধ্যমে জন্ম নেয় আধুনিক ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU)। অস্ট্রিয়া, ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের মতো দেশগুলো এতে যোগ দেয় এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অবাধ যাতায়াতের জন্য শেনজেন চুক্তি কার্যকর করা হয়। ১৯৯৯ সালে সাধারণ মুদ্রা হিসেবে ‘ইউরো’ প্রবর্তিত হয়, যা ২০০২ সাল নাগাদ অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রাকে প্রতিস্থাপন করে শক্তিশালী ‘ইউরোজোন’ গঠন করে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সরাসরিভাবে যুগোস্লাভ যুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণ করেনি। পরবর্তীতে ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত চলা ইরাক যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়েও ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে গভীর মতভেদ ও বিভক্তি লক্ষ্য করা যায়। অন্যদিকে, ন্যাটো (NATO) আফগানিস্তানের যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় তাদের সামরিক উপস্থিতির মাত্রা ছিল অনেক কম।

স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইউরোপের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে এক বড় ধরনের পরিবর্তন আসে, যখন ন্যাটো (NATO) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) একে একে প্রাক্তন ‘ওয়ারশ প্যাক্ট’-এর সদস্য দেশগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করতে শুরু করে। এই সম্প্রসারণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ২০০৪ সালে ইইউ ১০টি নতুন সদস্য রাষ্ট্র গ্রহণ করে, যার মধ্যে ছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত বাল্টিক দেশসমূহ (এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়া), পাঁচটি প্রাক্তন কমিউনিস্ট দেশ (চেক প্রজাতন্ত্র, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়া ও স্লোভেনিয়া) এবং ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপ রাষ্ট্র মাল্টা ও সাইপ্রাস। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে বুলগেরিয়া ও রোমানিয়াও এই জোটের অন্তর্ভুক্ত হয়।

তবে রাশিয়ার বর্তমান শাসনব্যবস্থা এই পূর্বমুখী বিস্তারকে ১৯৯০ সালে ন্যাটোর দেওয়া “এক ইঞ্চিও পূর্বে না এগোনোর” প্রতিশ্রুতির চরম লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করে। এর ফলে রাশিয়ার সাথে পশ্চিমের উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়, যা বেলারুশ ও ইউক্রেনের সাথে গ্যাস সরবরাহ নিয়ে দ্বিপাক্ষিক বিরোধে রূপ নেয় এবং ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে। এই অস্থিরতার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০০৮ সালে জর্জিয়ার সাথে রাশিয়ার যুদ্ধের মধ্য দিয়ে।

একই সময়ে ইইউ-এর অভ্যন্তরেও জনমত জোটের অতিরিক্ত সম্প্রসারণের বিপক্ষে যেতে শুরু করে—বিশেষ করে তুরস্ককে সদস্যপদ প্রদানের সম্ভাবনার বিষয়টি অনেক দেশই নেতিবাচকভাবে দেখে। প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের কারণে ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসে প্রস্তাবিত ‘ইউরোপীয় সংবিধান’ প্রত্যাখ্যাত হয়। পরবর্তীতে আয়ারল্যান্ডেও এটি ‘লিসবন চুক্তি’ হিসেবে শুরুতে প্রত্যাখ্যাত হলেও ২০০৯ সালের দ্বিতীয় গণভোটে তা অনুমোদিত হয়।

২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট এবং পরবর্তীতে সৃষ্ট ‘মহামন্দা’ (Great Recession) ইউরোপের দেশগুলোকে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের সরকার কঠোর ব্যয় সংকোচন নীতি বা ‘অস্টারলিটি’ (Austerity) ব্যবস্থা গ্রহণ করে। তবে গ্রিসের মতো ছোট ইইউ দেশগুলোর ঋণ পরিশোধের সীমিত ক্ষমতার কারণে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে পড়ে। এর ফলে গ্রিসসহ বেশ কিছু দেশে ব্যাপক সামাজিক অস্থিরতা, কঠোরতা-বিরোধী আন্দোলন এবং এমনকি আর্থিক দেউলিয়া হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। 

২০১০ সালের মে মাসে ইউরোজোন এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) মধ্যস্থতায় একটি উদ্ধার পরিকল্পনা বা ‘বেলআউট’ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। এরই অংশ হিসেবে জার্মান সংসদ গ্রিসকে পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে ২২.৪ বিলিয়ন ইউরো ঋণ দিতে সম্মত হয়। তবে এই ঋণের বিনিময়ে গ্রিসকে সরকারি ব্যয় ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনা এবং কর বৃদ্ধির মতো অত্যন্ত কঠোর ও বিতর্কিত কিছু শর্ত মেনে নিতে হয়েছিল। 

২০১৪ সাল থেকে ইউক্রেন এক গভীর রাজনৈতিক বিপ্লব ও দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। সেই বছরের ১৬ মার্চ ক্রিমিয়া উপদ্বীপে একটি অত্যন্ত বিতর্কিত গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যার প্রেক্ষাপটে অঞ্চলটি ইউক্রেন থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে রাশিয়া ক্রিমিয়াকে নিজের ভূখণ্ডের সাথে সংযুক্ত করে নিলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই সংযুক্তিকে স্বীকৃতি দেয়নি এবং একে অবৈধ হিসেবে গণ্য করে।

২০১৬ সালের জুন মাসে যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সদস্যপদ নিয়ে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক গণভোটে ৫২% ভোটার বিচ্ছেদের পক্ষে রায় দেন। এই জনমত বিশ্বজুড়ে ‘ব্রেক্সিট’ (Brexit) নামে পরিচিতি পায় এবং এর ফলে যুক্তরাজ্য ও ইইউ-এর মধ্যে এক দীর্ঘ ও জটিল আলোচনা ও বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই বিবর্তনটি উভয় পক্ষের জন্যই গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের পথ প্রশস্ত করে। অবশেষে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করে। তবে এই ঐতিহাসিক বিচ্ছেদের রেশ কাটতে না কাটতেই সেই বছরের শেষের দিকে সমগ্র ইউরোপ প্রাণঘাতী কোভিড-১৯ মহামারীর কবলে পড়ে এক নজিরবিহীন সংকটের সম্মুখীন হয়।

২০১৪ সালে শুরু হওয়া রুশ-ইউক্রেনীয় যুদ্ধের এক চরম ও বিধ্বংসী পর্যায় হিসেবে, ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় সামরিক অভিযান শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের মাটিতে এটিই বৃহত্তম ও সবচেয়ে ভয়াবহ প্রচলিত সামরিক সংঘাত। এই আক্রমণের ফলে মহাদেশের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা কাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়ে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত ফিনল্যান্ড ও সুইডেন ২০২২ সালের ১৮ মে আনুষ্ঠানিকভাবে ন্যাটো (NATO) সদস্যপদ লাভের জন্য আবেদন জানায়। কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার পর, ২০২৩ সালের ৪ এপ্রিল ফিনল্যান্ড এবং ২০২৪ সালের ৭ মার্চ সুইডেন ন্যাটোর পূর্ণ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়, যা উত্তর ইউরোপের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রকে আমূল বদলে দিয়েছে।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র

১. সমগ্র প্রবন্ধটি ইংরেজি উইকিপিডিয়ার লেখার ধারা অনুসরণ করে রচিত এবং অনুপ্রাণিত।

Leave a Comment