বাংলাদেশের সংগীত হচ্ছে এই জনপদের হাজার বছরের ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতিফলন

বাংলাদেশের সংগীত বা বাংলাদেশের গান (ইংরেজি: Music of Bangladesh) অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ, যা এই জনপদের হাজার বছরের সংগীতের ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটায়। বাংলাদেশের সঙ্গীতের মূল ভিত্তি হলো এর লোক সংগীত, যেখানে পল্লীগীতি, লালন গীতি, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালী এবং মুর্শিদী গানের মতো ধারাগুলো মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখ এবং বস্তুবাদী ও ভাববাদী চেতনাকে তুলে ধরে। ধ্রুপদী বা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও রবীন্দ্র-নজরুল গীতির পাশাপাশি আধুনিক বাংলা গান ও ব্যান্ড সঙ্গীতও এ দেশে অত্যন্ত জনপ্রিয়। একতারা, দোতারা, বাঁশি ও তবলার মতো দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের সুর বাংলাদেশের সঙ্গীতকে এক মায়াবী রূপ দান করে, যা প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে গভীর আবেগ সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশের মানুষের আনন্দ বেদনা, মিলন বিচ্ছেদ, উৎসব রিক্ততা, প্রেম বিদ্বেষ, ক্রোধ প্রশান্তি, আশা হতাশা ইত্যাদি যেসব গানে ফুটে ওঠে তাই হাজার বছরের বাংলাদেশের গান। দুঃখ বিষাদ ঔদাস্য শূন্যতা; কুণ্ঠা লজ্জা দ্বিধা; পুলক শিহরণ রোমাঞ্চ; ফুর্তি উচ্ছাস উল্লাস ছড়িয়ে আছে বাংলাদেশের গানে। বাংলা ভাষী অঞ্চলের মানুষের জীবনের সমস্ত অনুভূতিকে, সমস্ত অভিব্যক্তিকে শুধু প্রকাশ করেই তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের সংগীত।[১]

রাগসংগীত, লোক সংগীত, লঘুসংগীত বা বাংলাদেশের আধুনিক বাংলা গানে নান্দনিকতা ফুটে উঠেছে মানুষের চেষ্টায়। সৌন্দর্য পিপাসু বাংলা ভাষী জনগণের বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশলগ্ন থেকেই এই গান নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছে তার সুর আর কথার ডালি নিয়ে।

বাংলাদেশের আঞ্চলিক সংগীত

বাংলাদেশের সংগীত অঞ্চলভেদে হচ্ছে পূর্ব বঙ্গ, দক্ষিণ বঙ্গ ও উত্তরবঙ্গের মানুষের হাজার বছরের সংগীতের ধারা। উত্তর বাংলার ভাওয়াইয়া, পূর্ব বাংলার ভাটিয়ালি, দক্ষিণবাংলার সারি হচ্ছে এই অঞ্চলের আঞ্চলিক স্বাতন্ত্রে উজ্জ্বল সংগীতের তিনটি প্রধান ধারা।

বাংলাদেশের সংগীত ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের কারণে অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ও বৈশিষ্ট্যে বিকশিত হয়েছে। প্রধান আঞ্চলিক সঙ্গীত ধারাগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

উত্তরাঞ্চলের সংগীত: বাংলাদেশের রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী অঞ্চলের প্রধান সঙ্গীত হলো ভাওয়াইয়া, যা মূলত মইষাল ও গাড়িয়ালদের গান। এছাড়া গম্ভীরা (চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী) গান সামাজিক অসঙ্গতি তুলে ধরার জন্য জনপ্রিয়, যা নানা-নাতির সংলাপের মাধ্যমে পরিবেশিত হয়।

দক্ষিণাঞ্চলের সংগীত : চট্টগ্রাম অঞ্চলে আধ্যাত্মিক ধারা ও সুফিবাদের প্রভাবে ভাণ্ডারী গান অত্যন্ত জনপ্রিয়। এছাড়া বরিশালসহ সমুদ্র উপকূলীয় এই অঞ্চলে সাম্পানওয়ালাদের গানে আঞ্চলিক জীবনের প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়।

নদীমাতৃক অঞ্চল ও নিম্নাঞ্চল: ঢাকা, ময়মনসিংহ এবং ফরিদপুর অঞ্চলে নদী ও মাঝিদের জীবনের সাথে মিশে আছে ভাটিয়ালী ও সারি গান। সারি গান মূলত দলবদ্ধভাবে কর্মব্যস্ততার সময় (যেমন নৌকা বাইচ বা ছাদ পেটানো) গাওয়া হয়।

পূর্বাঞ্চলের সংগীত: বৃহত্তর সিলেটের প্রধান সম্পদ হলো হাসন রাজার গান এবং ধামাইল। হাসন রাজার গান আধ্যাত্মিক চিন্তাধারায় পুষ্ট, অন্যদিকে ধামাইল গান ও নাচ উৎসব-পার্বণে বিশেষভাবে সমাদৃত।

পশ্চিমাঞ্চলের সংগীত: বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল অর্থাৎ কুষ্টিয়া-নদীয়া অঞ্চল বিশ্বজুড়ে বাউল গানের জন্য পরিচিত, যা লালন শাহের আধ্যাত্মিক দর্শনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।

বাংলা গানের ইতিহাস

বিশ শতকে আধুনিক বাংলা কবিতার সাথে উদ্ভব ঘটে আধুনিক বাংলা গানের। স্নায়ুযুদ্ধ পূর্বকালীন বঙ্গ দেশে লিখিত ও চর্চিত গানের, যাকে কেতাবি ভাষায় বলা হয় আধুনিক বাংলা গান, নির্মাণ ও চর্চা শুরু হলে এবং কলের গানের ভূমিকায় বাংলাদেশের সব ধরনের গান পায় তার নির্মাণ ও সংরক্ষণের উপায়। সামন্ত যুগের বাংলা গান ভেঙ্গে চুরে বেরিয়ে আসে দুটি গানের ধারা। বিশ শতকের শুরুর দিকে পুরনো ধারাটি নাম পায় গ্রাম্য গীতি বা লোকসংগীত হিসেবে। নতুন ধারাটি এগিয়ে আসে আধুনিক বাংলা গান নামে।

বাংলাদেশে আধুনিক বাংলা গানের তিনটি ধারা পরিলক্ষিত হয়। এই তিনটি ধারা হচ্ছে বিপ্লবী গান, জীবনমুখী গান এবং পপ ও রক সংগীত তাদের গতি এখনো প্রবহমান রেখেছে।

বাংলাদেশের বিপ্লবী গানের ভেতরে আছে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের গান বা বাংলাদেশের মুক্তির গান। এছাড়াও এই ধারায় আছে বাংলাদেশের প্রতিবাদী গান এবং বাংলাদেশের গণসংগীত। মুক্তির গানসমূহকে বাংলাদেশের মানুষ দেশাত্মবোধক গান হিসেবেও সম্বোধন করে থাকেন। দেশপ্রেম ও দেশাত্মবোধক গানগুলো সাধারণত দেশকে মাতা হিসেবে কল্পনা করে দেশকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা এবং দেশের জন্য কাজ করার প্রেরণায় রচিত।

বাংলাদেশের ১৯৭০-৭১ সালের গণযুদ্ধের পর পাশ্চাত্য প্রভাবিত রক এন্ড রোল নির্ভর একটি ধারা প্রাবল্য লাভ করে। একে কেউ পপসংগীত, কেউ ব্যান্ড সংগীত ইত্যাদি নানা নামে অভিহিত করে থাকেন। একদিকে নতুন কিছু করার উদগ্র বাসনা অন্যদিকে স্বাধীনতার পর প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধান জনিত হতাশা এবং পাশাপাশি সেই হতাশাকে পুঁজি করে এক শ্রেণির মানুষের তরুণ সমাজকে বিভ্রান্ত ও নেশাগ্রস্ত করার সচেতন অপপ্রয়াস; এমনি জটিল রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশে পপ সংগীতের এই ধারাটির সূচনা। শুরু হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা আজম খান, ফিরোজ সাঁই, লাকি আকন্দ প্রমুখ শিল্পীদের হাত ধরে। এই পপ সংগীতের শুরুটা ছিল নিম্নমানের বাণী আশ্রয়ী চিৎকার দিয়ে। ‘ওরে সালেকা, ওরে মালেকা’ গানটির কাব্যবিচার করতে যাওয়া নিরর্থক। কিন্তু এর জনপ্রিয়তা ছিলো আকাশস্পর্শী। ‘ইস্কুল খুইলাছে রে মাওলা’ গানটি একটি ভাণ্ডারি ভাবাপন্ন গান, গিটার ও ড্রাম সহযোগে গায়নের কারণে এটি উদ্দাম জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। প্রারম্ভিক এলোমেলো অবস্থা কাটিয়ে এই ধারাটি পরবর্তিকালে ধীরে ধীরে সংহত হতে থাকে।[২]

একে একে রক অ্যান্ড রোল, কান্ট্রি, ল্যাটিন, স্প্যানিশ, ফ্লামিংগো, সালসা, সাম্বা, হিপ হপ, ব্লুজ, জ্যাজ প্রভৃতি বিভিন্ন পশ্চিমা সংগীতের প্রকরণ এই তরুণ সমাজের হাত ধরে বাংলা গানের ভুবনে এলোমেলো শিকড়হীনতাকে উদ্দাম ন্যাংটা করে ছেড়ে দেয়। এসবের এত্তা জঞ্জাল থেকেও বাছাই করে বিশ ত্রিশটি উল্লেখযগ্য গান আমরা পাবো যা কালজয়ী হতে প্রেছে।

তাছাড়া তরুণ প্রজন্মের শিল্পীরা এমন বহু কাব্যগুণ সম্পন্ন গান রচনা করেছেন যা বাংলা আধুনিক গানের ধারাকেও সমৃদ্ধ করেছে। সমকালীন বাংলা গানের জগতে আধুনিক ধারার একই পংক্তিতে পাশ্চাত্য প্রভাবিত ধারার গানও তার স্থান করে নিয়েছে।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র

১. অনুপ সাদি, ২ জুলাই ২০২০; রোদ্দুরে.কম, “বাংলাদেশের সঙ্গীত পূর্ববঙ্গ, দক্ষিণবঙ্গ ও উত্তরবঙ্গের হাজার বছরের সংগীতের ধারা”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/art/music/bangla-music/
২. মাহমুদ সেলিম, সাপ্তাহিক একতা, তারিখহীন, ঢাকা, “সমকালীন বাংলা গান : প্রগতির প্রত্যাশা”; http://www.weeklyekota.net/?page=details&serial=6843।

Leave a Comment

error: Content is protected !!