অস্তিত্বের জন্য যুদ্ধ চাই
আমি জানি মিথিলাও একদিন
পা দেবে নষ্টের দুয়ারে
বাসন্তীও হয়ে যাবে পরস্ত্রী
সেজন্যই সংসার থেকে পলায়মান
এক বিপ্লবী অর্থনীতির হিসাব কষে
একজন কবি ভলোবাসার কষ্টে
দিশেহারা জীবন বয়ে ছুটছে।
গর্ভবতী কলমগুলো প্রসব করে
নষ্টের তরঙ্গায়িত শব্দমালা।
খেটে খাওয়া মানুষগুলোর
তাতে কিছু যায় আসে না।
ওরা বিপ্লব বুঝে না, অর্থনীতি বুঝে না ,
ওরা বুঝে অস্তিত্বের জন্য ঘাম।
ওদের কে বুঝাতে হবে অস্তিত্বের যুদ্ধ,
নইলে মিথিলাও পা দেবে নষ্টের দুয়ারে,
বাসন্তীও পড়ে নেবে সোনার শিকল।
তোমার জন্যই
— গণতন্ত্রের জন্য যুদ্ধ
— জীবনের জন্য ঘাম
— সর্বহারার রাজত্ব কায়েম
— স্বপ্নের জন্য বিপ্লব
— আগুনের কৃষ্ণচূড়া গাছ
— অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম
— কবিতার নামে শব্দের মিছিল
— একটি সুন্দর গোলাপের হাসি
এতোসব প্রয়োজনীয় আয়োজন
শুধু মাত্র তোমার জন্যই।
হাওর
জলজ বিস্তারে কেঁপে উঠে হাওর
পাহাড়ী ঢলের তোরে ধুয়ে যায়
বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো খাসিকোণা গ্রাম।
প্রবল ঢেউয়ের মাঝে দোলে
সংগ্রামী কেরায়ার দেহ
বিল থেকে উঠে আসে ইজারার মাছ
ইজারার হাতগুলো ছিনিয়ে আনে
অপুষ্ট শরীরগুলোর গ্রাস।
এখানে হানা দেয় বন্যা ও মহামারী
এখানে রোদের তেজে ফেটে যায় জমি
এখানে দাদন ব্যবসায়ী ফুলে উঠে
এখানে রক্ত ঘাম শুকায় মাটিতে
অথচ এখানেই প্রাণগুলো সবুজ সতেজ
এখানেই হৃদয়গুলো পরিশুদ্ধ মানবিক।
পৃথিবী এখন
পৃথিবী এখন কাঁদছে এই বিষণ্ণ রাত্রিতে
মেঘে ঢাকা মহাশূন্যে তমিস্রার আঁধার
সচেতন বিশ্বাসে জেগে উঠে ধূ ধূ বালুচর
জলের আত্মজ ওরা আপন মহিমায়
পলির মূল্য শোধে বিভীষিকা হয়ে
গলিত হৃদয় বেয়ে নামে অবিশ্বাসের পুঁজ।
হৃদয় বিদ্যা
বাসন্তী নিশ্চয় এই মধ্য রাতে ঘুমাচ্ছে
কিংবা রাত্রির অন্ধকারে খোয়াচ্ছে যৌবন
আর আমি উদ্ভিদের নাম মুখস্ত
করতে করতে উদ্ভিদ একজন…
‘হিবিসকাসরোসা সাইনেনসিস,
নিলাম্বু নিউসিফেরা, ধুতুরা মেটেল,
ম্যাংগিফেরা ইন্ডিকা…।’
উদ্ভিদের প্রাণ আছে
ভালোবাসা আছে সীমাহীন তার
জানতে হলে প্রাণিবিদ্যা চর্চা প্রয়োজন…
অ্যানিলিডা, প্রটোজোয়া, মোলাস্কা,
হোমো কর্ডাটা…।
অথচ কেমন দেখো আফসোস
হৃদয় বিদ্যা পড়ে না প্রাণিবিদ্যায়
এই বিদ্যা বহির্ভূত সকল বিদ্যার।
মানব জমিন
জন্ম:
বীর্য থেকে সৃষ্ট এক প্রাণের সন্তরণ
কাম কিংবা প্রেম প্রদত্ত মানবিক জীবন
মৃত্যু:
শরীর থেকে বিতাড়িত জৈবিক স্পন্দন
আজন্ম সংগ্রামে ক্ষয়িষ্ণু নিরুত্তাপ একজন
বিয়ে:
হয় তো বা প্রেম কিংবা প্রয়োজন
দাসত্ব শৃংখল পরে সুখের আয়োজন।
আমরা এবং ফেরেশতা বর্জিত রাস্তা
আগাছা পরিষ্কার করতে করতে
রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেছে একপাল শুয়োর
ফেরেশতা বর্জিত একটি রাস্তা দিয়ে আমরা যাচ্ছি
ভাবছি একপাল শুয়োরর উপরে ফেলেছে
মাটির রস শুষে নেওয়া দূরন্ত ঝোপ এবং
রাস্তাটা খুব পরিস্কার দেখাচ্ছে
এই পরিষ্কার রাস্তাটি ফেরেশতা বর্জিত
আমরা ফেরেশতা বর্জিত রাস্তা দিয়ে হাঁটছি…।
লাল আকাশ এবং চারটি তারা
চেতনার আকাশটা এখানে লাল
এখানে জ্বলছে চারটে উজ্জ্বল তারা।
সাম্যের পতাকায় শ্রমের মুষ্টিবদ্ধ হাত
এই হাত বোনে শস্যের বীজ
এই হাতের কাস্তেরা গায় সুন্দরের গান
এই হাত হাতুড়িকে ঠেলে দেয় শৈল্পিক শাসনে
কাস্তে এবং হাতুড়ি তখন গায় সৃষ্টির গান।
এই মুষ্টিবদ্ধ হাতে আমাদের চেতনার আকাশ
এবং এই আকাশে জ্বলছে চারটে উজ্জ্বল তারা ।
অন্য কবিতা
একজন ভালো বাসতে বাসতে
ফতুর হয়ে যায়,
অন্যজন সেই ভালোবাসা গ্রহণ করে
নিজেকে সাজায়।
ভালোবেসে আমরা অসম জীবন গড়ি
সর্বহারা কবি আর বুর্জোয়া নারী।
প্রাগৈতিহাসিক
আমার খুব ইচ্ছে করে
ফিরে যেতে ডাইনোসর যুগে,
সেই যুগে যখন পৃথিবীতে
রাজত্ব করতো সরীসৃপ।
আমার খুব ইচ্ছে করে জানতে
ডাইনোসররা মানুষের মতো
স্ব-জাতীর রক্ত চুষে বড় হতো কিনা-
সুন্দর নিষ্পেষিত হতো কিনা-
তখন কি পৃথিবীতে ফুটতো কোন ফুল –
পাখির কলরবে হতো কিনা সূর্যবরণ –
অথবা নিঃস্তব্ধ বিন্যাসে পৃথিবীটা
শব্দহীন কেটেছিলো কতো কাল
আমার খুব ইচ্ছে করে জানতে
সরীসৃপ রাজারা যৌবন কে
নষ্ট করে দিত কিনা।
আরো পড়ুন
- অস্তিত্বের জন্য যুদ্ধ চাই — এনামূল হক পলাশের কাব্যগ্রন্থ
- বিপ্লবী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য: জীবন, কবিতা ও সাম্যবাদী চেতনা
- কাহিনী কাব্য বা বর্ণনামূলক বা আখ্যানমূলক কবিতা কী? সাহিত্যে কাহিনী কাব্যের বৈশিষ্ট্য ও বিবর্তন
- বাংলা কবিতার সমৃদ্ধ ধারার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও কালানুক্রমিক পরিবর্তন
- কবিতার বিশ্লেষণ: শিল্পরূপ ও নিগূঢ় অর্থ উন্মোচনের পথ
- কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা মূলত বিদ্রোহ, দেশপ্রেম ও মানবতার জয়গানে মুখর
- চর্যাপদ হচ্ছে তান্ত্রিক থেকে বৌদ্ধধর্মের ঐতিহ্যের রহস্যময় গানের একটি সংগ্রহ
- ‘তেলের শিশি ভাঙল বলে’: অন্নদাশঙ্কর রায়ের ছড়ায় লুকানো গভীর সামাজিক শ্লেষ ও বিশ্লেষণ
- ‘সত্যপীরের পাঁচালি’-র আদি রূপকার: মধ্যযুগের বিস্ময় কবি কঙ্ক
- দেশভাগের ক্ষত ও শূন্য দশকের রাজনীতির কাব্যিক আখ্যান হচ্ছে উন্মাদনামা
- অনুপ সাদির কবিতা তুলে এনেছে শ্রমঘনিষ্ঠ রাজনীতির স্বপ্নকাহন
- কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও সঙ্গীতজ্ঞ
- হুমায়ুন আজাদ ছিলেন নিরাশার কর্দমে ডুবে থাকা বাঙলার হাহাকারের কবি
- সুকুমার রায় ছিলেন বাংলা শিশু সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক
- জীবনানন্দ দাশ চিত্ররূপময় বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি
- হাজার বছরের বাংলা কবিতা: প্রধান কবিদের জীবন ও শিল্পদর্শনের আলোকে আকর নিবন্ধ

এনামূল হক পলাশ কবি, লেখক এবং সংগঠক। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন সময় কয়েকটি জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকার সাথে যুক্ত থেকে সাংবাদিকতা করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কাব্য গ্রন্থগুলো হচ্ছে “অস্তিত্বের জন্য যুদ্ধ চাই”, “জীবন এক মায়াবী ভ্রমণ”, “অন্ধ সময়ের ডানা”, “অন্তরাশ্রম”, “মেঘের সন্ন্যাস”, “পাপের শহরে”, “জল ও হিজল”। ১৯৭৭ সালের ২৬ জুন নেত্রকোণা জেলার বারহাট্টা উপজেলার বাদে চিরাম গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক নিবাস একই উপজেলার বামনগাঁও গ্রামে। তিনি লেখাপড়া করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ইন্টারমিডিয়েট কলেজ, সরকারী তিতুমীর কলেজ, নেত্রকোণা সরকারী কলেজ এবং গুরু দয়াল সরকারী কলেজে। ছাত্রাবস্থায় ১৯৯৮ সালে প্রগতিশীল বামপন্থী বিপ্লবী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। কবি, লেখক ও সংস্কৃতি কর্মীদের ব্যবহারের জন্য তিনি নেত্রকোনা শহরের মালনী এলাকায় গড়ে তুলেছেন অন্তরাশ্রম নামে একটি প্রতিষ্ঠান। তিনি এর প্রতিষ্ঠাতা ও আচার্য। সেই সাথে তিনি “অন্তরাশ্রম” নামে একটি সাহিত্যের ছোট কাগজ প্রকাশ করেন।