চর্যাপদ বা চর্যাগীতি (ইংরেজি: Charyapada) হচ্ছে আসাম, বাংলা, বিহার এবং ওড়িশার তান্ত্রিক ঐতিহ্য থেকে বৌদ্ধধর্মের বজ্রযান ঐতিহ্যের রহস্যময় কবিতা, উপলব্ধির গানের একটি সংগ্রহ। চর্যাপদের সিদ্ধাচার্যরা যে ধর্মবোধের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন তাতে ধর্মের বহিরঙ্গের চেয়ে তার মনোময় বা আত্মগত উপাদানগুলির আকর্ষণ ছিল বেশি। তাতে আত্মপ্রতিষ্ঠা এবং আত্মপ্রসারেরই প্রাধান্য। ধর্মকে যখন এই আত্মবোধের প্রয়োজনে নিয়োগ করা হয়, তখনই তা ভাবময় রহস্যময় কাব্যময় রূপ গ্রহণ করে। এইরকম হয়েছে উপনিষদের ক্ষেত্রে, চর্যাপদেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। চর্যাপদ তাই ধর্মাচরণের নির্দেশ হলেও তাতে সাহিত্যিকগুণের অভাব নেই এবং সেজন্যই চর্যাপদ মূলত ধর্মগ্রন্থ হলেও তা কাব্যের মাধ্যমে ব্যক্ত বলেই তাকে সাহিত্যগ্রন্থ বলে সমাদর করতে বাধা নেই।
তবে একটা কথা প্রথমেই বলে নেওয়া উচিত, চর্যাপদ যে সময়ে রচিত তখন বাংলা ভাষার নিতান্ত অপরিণত অবস্থা। সবেমাত্র সে অপভ্রংশের গর্ভ থেকে বহির্গত হয়ে নতুন আলো হাওয়ায় নিঃশ্বাস নিতে শুরু করেছে। আজ যে ভাষায় আমরা কথা বলি, মনের ভাব প্রকাশ করি এবং সাহিত্যগ্রন্থ রচনা করি সে ভাষার সঙ্গে চর্যাপদের ভাষার এত বিরাট পার্থক্য যে চর্যার ভাষা বাংলা কিনা তাই নিয়েই এককালে পণ্ডিতে পণ্ডিতে খুব মতান্তর হয়ে গেছে। পূর্বভারতের বিভিন্ন ভাষাভাষী জনসম্প্রদায় চর্যার ভাষাকে নিজেদের ভাষার আদিরূপ বলে দাবি করেছিলেন। চর্যাপদের ভাষাকে এবং তাকে অবলম্বন করে সমগ্র চর্যাপদকে নিজেদের আদিপুরুষদের রচনা বলে যাঁরা দাবী করেছিলেন তাঁদের মধ্যে উড়িষ্যার এবং মিথিলার অধিবাসীরাই ছিলেন প্রধান।
দীর্ঘদিন চর্যাপদ কোন ভাষার এই নিয়ে দ্বন্দ্বটি সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় নিঃসংশয়ে মেটাবার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, চর্যার ভাষা বাংলা এবং হাজার বছর আগেকার বাংলা ভাষার প্রধানতম নিদর্শন। এই প্রমাণ এবং সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয় এই কারণে যে, চর্যার ভাষার অর্থ বোঝাই মুশকিল; সংস্কৃত টীকা এবং তিব্বতি অনুবাদের সাহায্যে তার অর্থ বুঝতে হয়। আবার শৌরসেনী প্রাকৃতের প্রভাব চর্যায় বেশি, যদিও বাংলা ভাষা মাগধী প্রাকৃত থেকে উৎপন্ন এই বিশ্বাস পণ্ডিতদের মধ্যে দৃঢ়। অবশ্য দ্বিতীয় সন্দেহটা মিটলেও অর্থাৎ লোকসাহিত্যের ভাষায় শৌরসেনী প্রাকৃতের প্রভাব বিস্তৃত এবং ব্যাপক ছিল এই তথ্যটি প্রমাণিত হওয়ার পর তবুও চর্যার ভাষা বাংলা কিনা এই সন্দেহটা অনেক দিন বজায় ছিল। সেই বিষয়ে সব গোলমাল মিটিয়ে দিলেন সুনীতিকুমার। যখন তিনি দেখিয়ে দিলেন চর্যাপদের ভাষায় এবং সেই ভাষার ব্যাকরণগত দিকটায় এমন কতকগুলি বিশেষত্ব আছে যেগুলি কেবল বাংলা ভাষাতেই ব্যবহৃত হয়, আজও হচ্ছে। কতকগুলি শব্দ নিঃসন্দেহে বাংলা। কতকগুলি বাকভঙ্গি বাংলার নিজস্ব এবং যে সমস্ত উপাদানকে রূপক ও উপমা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে ধর্মতত্ত্ব বোঝানোর জন্য, ঐতিহাসিক ও সামাজিক বিচারে সেগুলি বাংলার সমাজ জীবনে দীর্ঘকাল ধরে প্রাধান্য পেয়ে আসছে। এইসব যখন নিঃসংশয়ে প্রমাণিত হলো, তখনই চর্যাপদের ভাষাকে বাংলা বলে স্বীকার করে নিতে আর কোন বাধা কোন দিকেই রইল না। কিন্তু এ বিষয়ে আজও দ্বিমত নেই যে, চর্যাপদের সাহিত্যিক গুণ যা থাক, চর্যাপদের ভাষাটি বড় কঠিন। সেই ভাষার অনুধাবনের বাধাই চর্যাপদের রসগ্রহণের প্রধান অন্তরায়। আচার্য হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তাই ঠিকই বলেছেন চর্যাপদের ভাষা ‘সন্ধ্যাভাষা’ কারণ সন্ধ্যাবেলার আলো আঁধারীতে যে রহস্যময়তা সেই অপরিচয়ের আলো-অন্ধকারে চর্যাপদ অস্পষ্ট।
চর্যাপদের সাহিত্যগুণ বিচারের সময় তাই এই ভাষার অসুবিধাটার কথা মনে রাখতে হবে। তবে এই ভাষার বিরোধিতাকে যদি আমরা বশে আনতে পারি তা হলে চর্যাপদে যে সুগভীর কাব্যরস আছে তাকে আমাদের উপলব্ধির জগতে নিয়ে আসতে কোন অসুবিধা হবে না। চর্যাপদের অসংখ্য জায়গায় যে লৌকিক রূপের জগতের বর্ণনা আছে সেই বর্ণনাগুলিই সব আগে আমাদের মোহিত করে। এই বর্ণনার চিত্রময়তা আমাদের মনকে দোলা দেয় তার বাস্তবতাবোধে এবং কাব্যগুণে। এর কতকগুলি উদাহরণ পাঠকের সামনে উপস্থিত করি।
আকাশের নিচে শূন্যতার অনুসন্ধানে উন্নতমস্তকে পর্বতে যে শবরী বালিকাটি বাস করে তার কথাই ধরা যাক। সেই শবরী বালিকা লীলাময়ী, একটি আরণ্য সৌন্দর্য তার সর্বাঙ্গে। তার খোঁপায় গোঁজা শিখীপুচ্ছ, বুকের উপর দুলে দুলে উঠছে গলার গুজার মালা। তার কানের কুণ্ডল সকালের রোদে উঠছে ঝিকমিকিয়ে-আর নির্জন পার্বত্য প্রদেশ জুড়ে তার সরল সহজ সৌন্দর্যটি আলোর মতই সর্বত্র ছড়িয়ে গেছে। এই শবরী বালিকাকে যে পরিবেশে পাঠকের সামনে আনা হয়েছে সেই পরিবেশটিও কত সুন্দর। শবরীর সামনে পিছনে চারদিকে নানাবৃক্ষে কত অগণিত বিচিত্র ফুল, গাছের ডালে ডালে আকাশ যেন ছেয়ে গেছে, আর সেই উদার বিস্তৃত মধুর সৌন্দর্যের মাঝখানে একলা দাঁড়িয়ে আছে শবরী পুষ্পিত একটি লতার মত (চর্যা-২৮)। এই যে বালিকাটি এবং তার আদিম কৌমসমাজসুলভ সাজপোশাকটি আর তার পরিবেশটি একটি দুটি তুলির টানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে রূপদক্ষ শিল্পীর মত। এই শবরী কিসের প্রতীক, গাছ, ডালপালা, ময়ূরের পাখা, গুঞ্জার মালা, ফুল এগুলির গূঢ় অর্থ কি তা যদি না-ও জানি, তাহলেও এই মধুর আলেখ্যটি হৃদয় দিয়ে উপভোগ করতে বাধা হচ্ছে না।
সমজাতীয় আর একটি সুন্দর চিত্র ফুটে উঠেছে ৫০নং চর্যাটিতে। সেখানেও শবরী বালিকা নীল মহাশূন্যের নিচে পাহাড়ের উপরে উদার বিস্তৃতির মাঝখানে চাঁচড়ের বেড়ার ঘরে বাস করে। বাড়ির সামনে ছোট্ট একটি ক্ষেত। এই ক্ষেতে ফুটেছে কার্পাসফুল, কালো মাটির বুকে ছোট ছোট হীরকখণ্ডের মত সাদা ফুলগুলি শিশুর আনন্দে বিহ্বল। পিছনে আরো একটি ছোট ক্ষেত, সেখানে কঙ্গুচিদানা বা কঙ্গুচিনা ফলের গাছ। সেই গাছের ফল পাকলে শবরী আর শবর হাঁড়িয়া তৈরি করে পানে উন্মত্ত হয়। সারাদিনের পর রাত্রি আসে, আকাশে স্নিগ্ধ আশীর্বাদের মত দেখা দেয় পূর্ণচন্দ্র, আর সেই চাঁদের আলোয় সেই বেড়া-বাঁধা বাড়িটি একটি বড় সাদা ফুলের মত অবাক উল্লাসে হেসে ওঠে, শোকের মত বিষণ্ণ অন্ধকার কোথায় মিলিয়ে যায় সেই চাঁদের হাসির বাঁধভাঙা জোয়ারে। আবার অন্ধকার রাত্রিতে সমস্ত পৃথিবী মৃত্যুর মত কালো হয়ে ওঠে, দূরে শশ্মশান ঘাটের এক প্রান্তে ধূ-ধূ করে জ্বলে চিতার সিদুর রঙের লাল আগুনের শিখা-ডুকরে ডুকরে কাঁদে শেয়াল আর শকুন। এখানেও সেই আগের চর্যাটির মত স্বল্পকথায় পরিমিত বাকপ্রয়োগে সংক্ষিপ্ততম তুলির আঁচড়ে একটি আদিবাসী পরিবারের সহজ সুখ দুঃখ আনন্দ বেদনার শিল্পময় রূপায়ণ।
এই ছবি আঁকার দিকে চর্যাপদের সিদ্ধাচার্যদের একটি সহজ স্বাভাবিক দক্ষতার নানা নিদর্শন চর্যাপদের প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। পাঠককে কবি-সিদ্ধাচার্য নিয়ে গেছেন সেই নদীর ধারে, যে নদী গহন গম্ভীর এবং প্রবল স্রোতের বেগে নিয়ত ধাবমান। তরঙ্গসংকুল এই নদীর জলে কী যেন রহস্য নিত্যই ঢেউয়ের দোলায় দোলায় দোলায়িত দূরে দেখা যায় নদীর পাড়। তীরভূমি ঢালু হয়ে নেমে এসেছে নদীর জলের মধ্যে, কর্দম অনুলিপ্ত সেই তীরভূমি দুরধিগম্য। বর্ষার প্রবল জলধারায় ক্ষিপ্ত এই কীর্তিনাশাকে দেখে ভয় লাগে? তবে চল সেই যুক্তবেণীতে যেখানে গঙ্গা-যমুনার মাঝখানে শান্ত গম্ভীর নদীর জলে অবহেলায় নৌকা বেয়ে চলেছে এক ডোম্বী, দাঁড়ে হালে কাছিতে সাবলীল নিরুদ্বেগে। তার নদী এত চেনা যে সে ডান বাঁ কোন দিকেই তাকাচ্ছে না। কোন সংশয় ভয় মনে না রেখে সে যাত্রী নিয়ে চলেছে এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে। সেবাই তার ধর্ম, তাই কড়ি না নিয়ে স্বেচ্ছায় সে সবাইকে নদী পার করে দিচ্ছে। চল সেই নদীর ধারে যেখানে থরে থরে পার্থিব সম্পদ পূর্ণ করা হচ্ছে তরণীতে, আর ঠাঁই নাই। এবার নৌকা ছেড়ে দেবে অজানা অচেনা সেই তীরভূমির দিকে যার জন্য পসারীর মন ব্যাকুল। দেখ ঐ মাঝিকে সে খুঁটি উপড়িয়ে ফেলে নৌকার বাঁধন মলিন কাছিটি খুলে দিল। সাবধানে এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে সে দাঁড় বেয়ে চলল এক পাড় থেকে আরেক পাড়ে, চেনা জগতের তীরভূমি থেকে অচেনা রহস্যের দিকে (চর্যা-৮)। আবার এসো এইখানে, এইপাড়ে যেখানে ওপাড় থেকে নৌকাটি বেয়ে খেয়ামাঝি সবে ঘাটে লাগিয়েছে। যাত্রীরা একে একে নেমে আসছে মাটির উপরে। পাটনী তীরে দাঁড়িয়ে সকলের কাছে খেয়াপার করে দেবার মজুরী আদায় করে নিচ্ছে। কারো হয়তো পারের সম্বল নেই, তার কাপড় চোপড় হাতড়ে পুঁটলি বটুয়া খুঁজে খুঁজে একটি কি দুটি কড়ি বার করতে চাইছে একটা লোভের হাত।
এই আশ্চর্য বাস্তব অথচ কাব্যময় নিখুঁত দৃশ্য ছায়াছবির মত পাঠকের মনের চোখের উপর দিয়ে ভেসে যায়। প্রকৃতি এবং মানুষকে কত নিবিড়ভাবে চিনলে এবং ভালবাসলে এই ছবিগুলি আঁকা যায় তা সহজেই বোঝা যায়। ঐ যে টিলার উপর ঘরটি যেখানে হাঁড়িতে ভাত নেই, নিত্য তবু যেখানে অতিথি; ঘরের আঙ্গিনায় তেঁতুল গাছটি যার ফলভোগে বৃক্ষ-স্বামীর অধিকার নেই; নতুন বধূটি যার কানের কানেটটি রাত্রিতে চোরে নিয়ে গেছে-শ্বশুর ঘুমাচ্ছেন জানেনওনা কী সর্বনাশ হয়ে গেছে অর্ধরাত্রে সেই বধূর বিষণ্ণ মুখটি: একতারা বাজিয়ে যে যোগী মনের আনন্দে নেচে চলেছে পথে পথে অব্যক্তভাবে বিভোর হয়ে; মাদল বাজিয়ে জাঁকজমক করতে করতে বর চলেছে নতুন সঙ্গিনী আনতে, সেখানে মেয়েলি আচার বাসর ঘর নতুন বন্ধু, রমণীপরিবৃত একটি অচেনা রহস্য-তার ছবিটি কত নিখুঁতভাবে সামান্য দুটি চারটি কথায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এমনি অজস্র কাব্যময় চিত্র চর্যাপদের ছত্রে ছত্রে। অরণ্যের নিকৃত অন্ধকার মৃত্যুর মত ভয়ংকর, শিকারীর জাল বিছিয়ে হরিণ ধরা, ভীত সন্ত্রস্ত হরিণের জল গ্রহণ না করা, তৃণ বর্জন করা, আবার হঠাৎ একটু যুক্তির অবকাশে দ্রুতগমনে দিগন্তের দিকে নিরুদ্দেশ হওয়া; শান্ত পাহাড়, পুষ্পিত গাছ, স্রোতময়ী নদী, বিহবল জ্যোৎত্মা, দীপ্ত মন্দির, দীপ-ধূপময় তার অভ্যন্তর, সুগন্ধ মিশ্রিত তার ভিতরের বাতাস; অন্ধকার ঘরে চঞ্চল মূষিক; তিন ধাতুর খাটে পান-মুখে বক্ষলগ্না বধূর সাহচর্যে মিলনবিধুর প্রেমিক: শান্ত সন্ধ্যায় আরতির ঘণ্টা, গোয়ালে গরু এবং গরুর দুধ দোয়ানো এবং ফেনময় দুধের উষ্ণ সুগন্ধ-কাছে থেকে দেখা দৈনন্দিন জীবনের কত সূক্ষ্ম চিত্র এই চর্যাপদের বিভিন্ন শ্লোকে। এই বস্তুময় অথচ কাব্যমধুর চিত্রগুলি ধর্মের উপাদান কিন্তু কাব্যের সামগ্রী। একদিক দিয়ে বাংলা কাব্যের উপাদান হিসেবে বাস্তবতার প্রথম উদ্বোধন হয়েছে চর্যাপদে। তাই চর্যাপদের সাহিত্যিক মূল্য নগণ্য নয়।
শুধু বাস্তব প্রেমিকতা নয় ভাবের জগতেও পাঠককে নিয়ে যেতে সিদ্ধাচার্যরা ব্যর্থ হননি। এই বাস্তব উপাদানগুলির সাহায্যেই সিদ্ধাচার্যরা পাঠককে ভাবের জগতে নিয়ে যেতে চেয়েছেন, কারণ যে ধ্যানের আকার নেই, বর্ণনা নেই, তাকে পাঠকের মনে ধরিয়ে দেবার জন্য সেই উপকরণগুলি দরকার যাকে ইন্দ্রিয় দিয়ে বোঝা যায়, চেনা যায়।
তাই যখন বলা হচ্ছে চিত্ত এবং চিত্তজমোহের কথা- তখন উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে গাছ এবং তার ডাল বা ফল। সেই গাছ ত চিরজীবী নয়। একদিন না একদিন তার ধ্বংস হবে, তেমনি চিত্তজমোহ নিয়ে মানুষ চিরকাল বেঁচে থাকতে পারেনা, বাসনা কামনা তাকে পরম সুখ দিতে পারবেনা। আবার মিথ্যা ধ্যানে মিথ্যা মন্ত্র উচ্চারণে মহামূল্য নৈবেদ্য সাজিয়েই কি মূঢ় হৃদয় সেই পরম সুখের সন্ধান পেতে পারবে। এইসব বাইরের জিনিস দিয়ে সেই অন্তরতমের সন্ধান পাবে কে। ‘নয়ন মেলে দেখ দেখি তুই চেয়ে দেবতা নাই ঘরে।’
এই বাইরের আড়ম্বরটাই যে জীবনের বড় নয়, বাইরের রাস্তাটি ভিতরে যাওয়ার প্রবেশপথ মাত্র, এই তত্ত্বটি সুগভীর কাব্যময় বোধের দ্বারা চর্যাপদে প্রকাশিত। সেই নিরাত্মা নিরাবয়ব পরমপ্রিয়ই সিদ্ধাচার্যদের চরম কামনা। তাঁকে পাবার জন্য, তাঁদের যে ব্যাকুলতা তা অনেক সময় কৃষ্ণের জন্য শ্রীরাধার আকুণ তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। যেমন গুণ্ডুরীপাদের এই চর্যাটি
তিঅড্ডা চাপী জোইনি দে অঙ্কবালী
কমলকুলিশ ঘান্টি করহ বিআলী।
জোইনি তই বিনু খনহি ন জীবমী
তো মুহ চুম্বী কমলরস পিবমি।
খেপই জোইনি লেপ ন জাঅ
মণিকুলে বহিআ ওড়িআনে সমাঅ। (চর্যা-৪)
এই আলোচনায় চর্যাপদের সাহিত্যিক মূল্য বিচার প্রসঙ্গে আমরা সাধারণত যে সমস্ত মাপকাঠিতে কাব্যের মূল্য নির্ণয় হয় অর্থাৎ ভাব ভাষা ছন্দ অলঙ্কার ইত্যাদি-তাই দিয়েই চর্যাপদের সাহিত্যগুণ বিচার করবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কাব্যবিচারে এই সমস্ত মাপকাঠিই সব নয়। সবচেয়ে বড় মাপকাঠি পাঠকের অনুভূতি। যদি সেই অনুভূতিকে কোন কাব্য নাড়া দিতে পারে তবে তার ভাষা ছন্দ অলঙ্কার প্রয়োগের অসম্পূর্ণতা থাকলেও তাই সত্যিকার কাব্য। ভাষা ছন্দ অলঙ্কারের দিকে চর্যাপদ নিশ্চয় ত্রুটিমুক্ত নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও চর্যাপদকে সুষ্ঠু সুন্দর কাব্য বলে স্বীকার করতে দ্বিধা করি না এই কারণে যে, চর্যাপদে আছে সুগভীর মানবতাবোধের নির্মল অনুভূতিপ্রবণ নির্ঝর এবং প্রেমভক্তির সমন্বয়েই তার সাহিত্যমূল্য। বাংলা কাব্যের আদি লগ্নে এই অপূর্ব সমন্বয়ের সূচনাই বাংলা গীতিকবিতার মুক্তির দূত। চর্যাপদ সেই দিক দিয়ে একটি অমূল্য সৃষ্টি।
আরো পড়ুন
- কাহ্নপা বা কাহ্নপাদ হাজার বছর আগের বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য ও চর্যাপদকর্তা
- চর্যাপদ হচ্ছে তান্ত্রিক থেকে বৌদ্ধধর্মের ঐতিহ্যের রহস্যময় গানের একটি সংগ্রহ
- তেলের শিশি ভাঙল বলে, খুকুর পরে রাগ করো
- কঙ্ক ছিলেন মধ্যযুগের বিখ্যাত কবি
- উন্মাদনামা কবিতাগ্রন্থের পর্যালোচনা
- অনুপ সাদির কবিতা তুলে এনেছে শ্রমঘনিষ্ঠ রাজনীতির স্বপ্নকাহন
- কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও সঙ্গীতজ্ঞ
- হুমায়ুন আজাদ ছিলেন নিরাশার কর্দমে ডুবে থাকা বাঙলার হাহাকারের কবি
- সুকুমার রায় ছিলেন বাংলা শিশু সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক
- জীবনানন্দ দাশ চিত্ররূপময় বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি
- সুকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রধান বিপ্লবী কবি
- বাংলা কবিতা হচ্ছে বাংলা ভাষায় রচিত কবিতার সমৃদ্ধশালী ঐতিহ্যবাহী ধারা
তথ্যসূত্র
১. অতীন্দ্র মজুমদার, মাহবুবুল আলম সম্পাদিত, সমালোচনা সংগ্রহ, খান ব্রাদার্স এ্যান্ড কোম্পানি, ঢাকা, সেপ্টেম্বর ২০০১, পৃষ্ঠা ১-১৪।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।