আমলাতন্ত্র (ইংরেজি: Bureaucracy) হচ্ছে এমন একটি সংগঠিত ব্যবস্থা যেখানে আইন বা নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ বেসামরিক কর্মচারীদের (অ-নির্বাচিত কর্মকর্তাদের) দ্বারা বাস্তবায়িত হয়। ঐতিহাসিকভাবে, আমলাতন্ত্র ছিল একটি সরকারি প্রশাসন যা অ-নির্বাচিত কর্মকর্তাদের দ্বারা পরিচালিত বিভাগ দ্বারা ব্যবস্থাপনা করা হয়। ইদানিংকালে, আমলাতন্ত্র হচ্ছে প্রশাসনিক ব্যবস্থা যা যেকোনো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনা করে, তা সে সরকারি মালিকানাধীন হোক বা ব্যক্তিগত মালিকানাধীন। অনেক বিচারব্যবস্থায় জনপ্রশাসন আমলাতন্ত্রের একটি উদাহরণ, যেমন কর্পোরেশন, সমাজ, অলাভজনক সংস্থা এবং ক্লাব সহ একটি প্রতিষ্ঠানের যেকোনো কেন্দ্রীভূত শ্রেণিবদ্ধ কাঠামো।[১]
অর্থাৎ আমলাতন্ত্র হচ্ছে প্রশাসনিক দপ্তরের কর্তৃত্ব। আমলাতন্ত্রে আইনের দৃষ্টিতে রাজা ও প্রজা তথা সর্বোচ্চ সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ যথা রাজা, প্রেসিডেন্ট, আইনসভা ইত্যাদি এবং জনসাধারণের মধ্যবর্তী স্থানের কর্মসম্পাদনকারী ও আধিকারিকদের হাতে শাসনক্ষমতা ন্যস্ত থাকে। সচরাচর সিভিল সারভ্যান্ট অর্থাৎ জনপালন নির্বাহি সরকারি কর্মচারী ও সামরিক বাহিনীর পদস্থ ব্যক্তিরা কি উচ্চ কর্তৃপক্ষ, কি সাধারণ লোকের কাজ আপন মর্জিমাফিক ত্বরান্বিত তথবা বিলম্বিত করতে পারেন, যাতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাজে তাঁরাই যে প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী সে কথা প্রতিপন্ন হয়।
আমলাতন্ত্রের দুটি মূল দ্বিধা (ইংরেজি: Dilemma) রয়েছে। প্রথম দ্বিধাটি হলো আমলাদের স্বায়ত্তশাসিত হওয়া উচিত নাকি তাদের রাজনৈতিক প্রভুদের কাছে সরাসরি দায়বদ্ধ থাকা উচিত। দ্বিতীয় দ্বিধাটি হলো আমলাদের পূর্বনির্ধারিত নিয়ম মেনে চলার দায়িত্ব এবং আগে থেকে অজানা পরিস্থিতির জন্য উপযুক্ত সমাধান নির্ধারণে তাদের কতটা সুযোগ থাকতে পারে তা নিয়ে।
আধুনিক সমাজে আমলাতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তার পক্ষে বিভিন্ন ভাষ্যকার যুক্তি দিয়েছেন। জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার যুক্তি দিয়েছিলেন যে আমলাতন্ত্র হচ্ছে সবচেয়ে দক্ষ এবং যুক্তিসঙ্গত উপায় যার মাধ্যমে মানবিক কার্যকলাপ সংগঠিত করা যায় এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য, দক্ষতা সর্বাধিক করার জন্য এবং পক্ষপাতিত্ব দূর করার জন্য নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং সংগঠিত শ্রেণিবিন্যাস প্রয়োজন। অন্যদিকে, ওয়েবার নিরবচ্ছিন্ন আমলাতন্ত্রকে ব্যক্তি স্বাধীনতার জন্য হুমকি হিসেবেও দেখেছিলেন, যার ফলে ব্যক্তিদের নিয়ম-ভিত্তিক, যুক্তিসঙ্গত নিয়ন্ত্রণের একটি নৈর্ব্যক্তিক “লোহার খাঁচায়” আটকে রাখার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রশাসকেরা তাঁদের কাজকর্মে ক্রমে বিপুল অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অর্জন করেন। তারা সরকারি কাজে দীর্ঘকাল বহাল থাকেন, ক্ষমতা ভোগ করেন, যে-সুযোগ অধিকাংশ রাজনীতিক ও মন্ত্রীরা পান না। প্রশাসকদের কাজকর্মের মধা দিয়ে একের পর এক সরকারের মধ্যে একটা ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়; যুক্তরাজ্যের মতো দেশে যেখানে লিখিত সংবিধান নেই, সেখানে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের হাতে উপদেষ্টা ও আধিকারিক নিয়োগের ক্ষমতা থাকায় প্রশাসনিক অমলাতন্ত্রের তাগ্রাধিকার ভাঙা যায়।[২]
সাম্যবাদ অভিমুখী দেশে সরকার ও প্রশাসন অভিন্ন; শাসক দলের অনুসৃত রীতি অনুসারে পার্টি ও প্রশাসনে আধিকারিক নির্বাচিত করা হয়। এই অর্থে সাম্যবাদ অভিমুখী দেশসমূহ হচ্ছে আমলাতন্ত্রবিরোধী। এতে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা ও রাজনৈতিক মতিগতি প্রাধান্য পায়। পার্টির সিদ্ধান্ত পলিটবুরো থেকে কলকারখানার স্তর অবধি প্রতিফলিত হয়।
আরো পড়ুন
- রাজনীতি হচ্ছে রাষ্ট্র ও সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন শ্রেণির সম্পর্ক
- আধুনিক সংশোধনবাদ মার্কসবাদী লেলিনবাদী তত্ত্বে একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী ধারণা
- স্বৈরতন্ত্র এমন সরকার যেখানে একটি একক সত্তা নিরঙ্কুশ ক্ষমতার সাথে শাসন করে
- আমূল পরিবর্তনবাদ ছিল ১৮ থেকে ২০ শতকের উদারনীতির বামপন্থী আন্দোলন
- অভিজাততন্ত্র মুষ্টিমেয় সংখ্যক ব্যক্তিদের দ্বারা চালিত গণবিরোধী শাসন
- অন্তর্দলীয় গণতন্ত্র হচ্ছে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাবাদের নীতি
- বিজয়ী ফ্যাসিবাদ জনগণের জন্য কী বহন করে আনে?
- ফ্যাসিবাদের শ্রেণি চরিত্র
- উদারতাবাদের ইতিহাস চার শতক মানুষের দাসত্বের ইতিহাস
- বর্ণবাদ কাকে বলে
- হার্বার্ট মারকুস মার্কসবাদবিরোধী আবর্জনা সৃষ্টিকারী জার্মান-মার্কিন দার্শনিক
- দ্বন্দ্ববাদের উদাহরণ
- মার্কসীয় তত্ত্বের মূলনীতি হচ্ছে মার্কসের রচনায় অনুসৃত কতিপয় মৌলিক নীতি
- বিপ্লবের মার্কসবাদী তত্ত্ব হচ্ছে আজ পর্যন্ত উঠে আসা সব থেকে স্পষ্ট বৈপ্লবিক চিন্তা
- বিপ্লব সম্পর্কে তত্ত্ব কয়েক ধরনের তত্ত্ব প্রসঙ্গে আলোচনা
- বিপ্লব কেন হয় বা বিপ্লব সংঘটিত হবার কারণ প্রসঙ্গে
- বিপ্লব হচ্ছে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সংগঠনের মৌলিক ও আকস্মিক পরিবর্তন
- সংশোধনবাদ প্রসঙ্গে লেনিনবাদী মত এবং তা কেন প্রতিরোধ করতে হবে
- লেনিনবাদী সংগ্রামের রূপ হচ্ছে লেনিন কর্তৃক রচিত সংগ্রামের বিভিন্ন সূত্রাবলি
- লেনিনবাদী বলশেভিকবাদী কমিউনিস্ট পার্টি হচ্ছে সাম্যবাদ অভিমুখী সংগঠন
- ভ্যানগার্ডবাদ বা ভ্যানগার্ড পার্টি গঠন সম্পর্কে লেনিনবাদী দৃষ্টিভঙ্গি
- মার্কসবাদী তত্ত্বের বিকাশে লেনিনের সৃজনশীল অবদান
- মার্কসবাদে লেনিনের অবদান সৃজিত হয়েছে ছয়টি প্রধান ক্ষেত্রে
- সাম্যবাদী প্রচারণা হচ্ছে রাজনৈতিক সচেতনতা ও প্রভাব বৃদ্ধির প্রক্রিয়া
- পার্টি শৃঙ্খলা সম্পর্কে লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টির নীতি ও সে সম্পর্কিত ধারণা
- গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতাবাদ কমিউনিস্ট পার্টির সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নীতিনির্ধারণ প্রণালী
- গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাবাদ লেনিনবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর কাঠামোগত নীতি
- উদারতাবাদ বা উদারনীতিবাদ জনগণ গণতন্ত্র ও স্বাধীনতাবিরোধী জান্তব মতবাদ
- সাম্যের বিভিন্ন রকমের প্রকারভেদ হচ্ছে স্বাভাবিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি
- সামাজিক সাম্য হচ্ছে নির্দিষ্ট সমাজের সমস্ত লোকের সমান অধিকার
- স্বাধীনতা প্রসঙ্গে মিলের ধারণা হচ্ছে কর্তৃত্ব ও স্বাধীনতা সমস্যার সমাধান
- সুখবাদ মানুষের সর্বোচ্চ মঙ্গলার্থক শব্দ হিসাবে নীতিশাস্ত্রের একটি মতবাদ
- বামপন্থা পরিচয়ধারী ব্যক্তি বা সংগঠন কেন মার্কসবাদী লেনিনবাদী নয়?
- স্বাধীনতা সম্পর্কে মন্টেস্কুর ধারণা দ্য স্পিরিট অফ ল গ্রন্থের স্বাধীনতার আলোচনা
- ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি হচ্ছে মন্টেস্কুর আইন, শাসন ও বিচার ক্ষমতার পৃথকীকরণ
- মন্টেস্কুর আইনতত্ত্ব হচ্ছে দ্য স্পিরিট অব লজ গ্রন্থে প্রদত্ত আইনের ব্যাখা
- মন্টেস্কুর রাষ্ট্রচিন্তা যুক্তিবাদ ও অভিজ্ঞতাবাদের সংমিশ্রণে গড়া সমাজতাত্ত্বিক পদ্ধতি
- চার্লস লুই দ্য মন্টেস্কু স্বৈরতন্ত্র ও রাজতন্ত্রবিরোধী একজন পুঁজিবাদী দার্শনিক
- মেকিয়াভেলিবাদ ভীতি সঞ্চার ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার নীতি
- মেকিয়াভেলি রচনাবলী হচ্ছে তাঁর রচিত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি গ্রন্থ
- মেকিয়াভেলি ইতালীয় রেনেসাঁর কূটনীতিক, দার্শনিক এবং জাতীয়তাবাদী লেখক
- জাঁ জ্যাক রুশোর সাধারণ ইচ্ছা তত্ত্ব হচ্ছে সামাজিক চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যয়
- জাঁ জ্যাক রুশো ফরাসি বিপ্লবের তাত্ত্বিক এক পুঁজিবাদী দার্শনিক, লেখক ও সুরকার
- জন লক ছিলেন সপ্তদশ শতকের ইংরেজ বস্তুবাদী দার্শনিক ও রাজনৈতিক লেখক
- রাষ্ট্রদর্শন বা রাজনৈতিক দর্শন রাষ্ট্র ও রাজনীতির প্রকৃতি ও বিকাশের আলোচনা
- সর্বহারা একনায়কত্ব থেকেই নির্মিত হয়েছে সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের পথ
- মার্কসবাদ-লেনিনবাদ হচ্ছে সর্বহারা শ্রেণির মুক্তির পদ্ধতি সংক্রান্ত মতবাদ
তথ্যসূত্র
১. অনুপ সাদি, ২৬ নভেম্বর ২০১৮; রোদ্দুরে.কম, “আমলাতন্ত্র কাকে বলে”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/encyclopedia/what-is-bureaucracy/
২. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ৩৭।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।