একাধিপত্য হচ্ছে আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক, অন্য রাষ্ট্রের উপর একটি রাষ্ট্রের প্রাধান্য

একাধিপত্য বা একক আধিপত্য বা হেজেমনি (ইংরেজি: Hegemony) হচ্ছে আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক, অন্য রাষ্ট্রের উপর একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক প্রাধান্য। অর্থাৎ একাধিপত্য হচ্ছে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামরিক প্রাধান্য অথবা অন্য রাষ্ট্রের উপর কোনো একটি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ।[১]

প্রাচীন গ্রিসে (প্রায় ৮ম খ্রিস্টপূর্বাব্দ – ৬ষ্ঠ খ্রিস্টাব্দ), একাধিপত্য বলতে অন্যান্য নগর-রাষ্ট্রের উপর আধিপত্যবাদী নগর-রাষ্ট্রের রাজনৈতিক-সামরিক আধিপত্যকে বোঝাত। একাধিপত্য শব্দটি গ্রিক ভাষায় হেগেমন থেকে উৎপন্ন ইংরেজি হেজেমনির বাংলা প্রতিশব্দ।

১৯ শতকে, একাধিপত্য বলতে বোঝানো হতো “সামাজিক বা সাংস্কৃতিক প্রাধান্য বা উত্থান; একটি সমাজ বা পারিপার্শ্বিক পরিবেশের মধ্যে একটি গোষ্ঠীর প্রাধান্য” এবং “একটি গোষ্ঠী বা শাসন যা একটি সমাজের মধ্যে অযৌক্তিক প্রভাব বিস্তার করে”।

সাম্রাজ্যবাদের তত্ত্বগুলিতে, একাধিপত্যবাদী ব্যবস্থা অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং অধস্তন রাষ্ট্রগুলির সামাজিক চরিত্রকে নির্দেশ করে যা আধিপত্যবাদী প্রভাবের ক্ষেত্র গঠন করে এবং এই আধিপত্যের প্রভাব হয় একটি অভ্যন্তরীণ, পৃষ্ঠপোষক সরকার দ্বারা অথবা একটি বহিরাগত, প্রতিষ্ঠিত সরকার দ্বারা চালিত হয়।

একাধিপত্যবাদ (ইংরেজি: hegemonism) শব্দটি অন্য দেশের উপর একটি দেশের ভূ-রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক প্রাধান্যকে নির্দেশ করে, যেমন, আফ্রিকা, এশিয়া এবং ল্যাটিন আমেরিকায় ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বৃহৎ শক্তিগুলোর আধিপত্য।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তত্ত্বে, একাধিপত্যকে সাম্রাজ্য থেকে আলাদা করা হয়, যা কেবল অন্যান্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয় বরং বাহ্যিক বিষয়গুলিকে শাসন করে।

একাধিপত্য প্রত্যয়টির অর্থ জটিল। দুটি বিপরীত অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হয়—একটি হলো জবরদস্তিমূলক আধিপত্য। অপরটি নেতৃত্ব, যার ভিতরে সম্মতি প্রচ্ছন্ন থাকে। কোনও শ্রেণির দ্বারা অন্যান্য শ্রেণি বা রাষ্ট্র দ্বারা রাষ্ট্রের উপর প্রভুত্ব বা একক আধিপত্য করা।[২] 

উনিশ শতকে ইউরোপে এক রাষ্ট্রের উপর অপর রাষ্ট্রের প্রভাব অর্থে হেজেমনিজম বা প্রভুত্ববাদ কথাটির প্রচলন ঘটে। সেই সময় কথাটির তাৎপর্য ছিল যে এক রাষ্ট্র কীভাবে তার উপর নির্ভরশীল অথবা প্রতিবেশী অন্য দুর্বল রাষ্ট্রকে প্রভুত্বে দাবিয়ে রাখে তারই রাজনীতি। বিশ শতকে সামরিক বাজেট বাড়িয়ে নিপীড়িত দেশগুলোর উপর প্রভুত্ব করা হয়। ন্যাটোভুক্ত দেশগুলি বিশ্বের মোট সামরিক বাজেটের ৭০% এরও বেশি সামরিক ব্যয় করে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একমাত্র ২০০৮ সালে ৪২% বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় হিসাব করেছিল।[৩]

মার্কসীয় ধারায় একটি রাষ্ট্র আর একটি রাষ্ট্রের উপর যে আধিপত্য চালায় সেটা প্রকৃত অর্থে সাম্রাজ্যবাদী নয়। নেতৃত্বের অর্থে প্রত্যয়টির ব্যবহার মার্কসীয় রাজনীতিতে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে। লেনিন ও মেনশেভিকরা এই প্রত্যয়টির দ্বারা বোঝাতেন কীভাবে গণতান্ত্রিক বিপ্লবে কৃষকদের সঙ্গে মিতালি ও শ্রমিকদের নেতৃত্বের প্রভাবাধীনে কৃষকদের নিয়ে আসা হবে। বুখারিন এবং স্তালিনও বিশ শতকের কুড়ির দশকে প্রত্যয়টিকে ব্যবহার করতেন। তবে প্রত্যয়টিকে পুরোপুরি মার্কসীয় দৃষ্টিতে দাঁড় করিয়েছিলেন আন্তোনিও গ্রামসি।

রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপে ভিন্ন অর্থে গ্রামসি শব্দটির উপর যে ব্যঞ্জনা আরোপ করেন তার মর্মার্থ হলো অর্থনৈতিক ক্ষেত্র ছাড়াও সামাজিক, রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত বাপারে একটি শ্রেণির উত্থান, যে শ্রেণি তার উত্থানের অনুকূলে অন্যান্য শ্রেণিকে প্রবৃত্ত করতে সক্ষম। অর্থাৎ সামাজিক ও মতাদর্শগত সংগ্রামের মাধ্যমে একটি মৈত্রীবন্ধন তৈরি ও অক্ষুণ্ণ রাখার মাধ্যমে অন্যান্য শ্রেণি ও সামাজিক শক্তির সম্মতি লাভকারী প্রধান শ্রেণিটিই হচ্ছে একটি আধিপত্যকারী। অর্থাৎ এক কথায় আধিপত্য হলো প্রধান শ্রেণি ও অন্যান্য সামাজিক শক্তির মধ্যকার সম্পর্ক।[৪]

কারাগারে লিখিত নিবন্ধে তিনি প্রত্যয়টিকে বুর্জোয়া রাষ্ট্রের উৎখাতের জন্য শ্রমিক শ্রেণির অন্যান্য শ্রেণির সঙ্গে মিতালি পাতানোর এক কৌশল হিসেবে উল্লেখ করেছেন; তার জন্য তিনি সোভিয়েত দেশের শ্রমিকদের নিজ স্বার্থে কৃষকদের অনুকূলে ত্যাগ স্বীকারের কথা বলেন। সাম্যবাদী আন্তর্জাতিকের সমসাময়িক অধিবেশনে গ্রামসি তাঁর তত্ত্ব সবিস্তারে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর মতে একটি শ্রেণি কেবল তার সাংগঠনিক শক্তি দ্বারাই আধিপত্য করে না; সেই শ্রেণি তার সংকীর্ণ সাংগঠনিক স্বার্থের উর্ধ্বে নৈতিক ও মননশীল নেতৃত্বের সাহায্যে প্রভাব বিস্তার করে; সেজন্য প্রয়োজনে সীমিত আপোস করতে হয় বিচিত্র শক্তি সমুচয়ের সঙ্গে, যাকে গ্রামসি ঐতিহাসিক গোষ্ঠী হিসাবে অভিহিত করেন।[৪]

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র

১. অনুপ সাদি, ৩ নভেম্বর ২০১৮; রোদ্দুরে.কম, “আধিপত্য হচ্ছে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক প্রাধান্য বা অন্য রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/encyclopedia/marxist-glossary/on-hegemony/
২. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ৩৩।
৩. Unknown. “Th e 15 Majo r Spender Cou Ntries in 2008.” Http://Www.sipri.org, Stockholm International Peace Research Institute, 2008, www.sipri.org/research/armaments/milex/resultoutput/15majorspenders. Military expenditure: SIPRI Yearbook 2008: Armaments, Disarmament and International Security (Oxford University Press: Oxford, 2008), Appendix 5A.
৪. ফকরুল চৌধুরী, “হেজেমনি: সংজ্ঞা ও বিবেচনা” কর্ষণ, ড. মিজান রহমান সম্পাদিত, বর্ষ ২০, সংখ্যা ১৫, ফেব্রুয়ারি ২০২০, ঢাকা, পৃষ্ঠা ১০।

Leave a Comment

error: Content is protected !!