উত্তরা সিনেমার লাল মাটির গান: ‘ফুল গাছটি লাগইছিলাম’ ও ‘কালো জলে কুচলা তলে’ লিরিক্স ও বিশ্লেষণ

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত পরিচালিত কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘উত্তরা’র গানগুলো বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক অনন্য সৃষ্টি। এই সিনেমার গানগুলোর মূল শক্তি হলো সাঁওতালী লোকগীতির প্রভাব এবং বাঁকুড়া, বর্ধমান ও বীরভূমের ‘লাল মাটির দেশ’-এর খাঁটি মাটির সুর। প্রতিটি গানের ভেতরে লুকিয়ে আছে এক তীব্র অন্তর্নিহিত হাহাকার, যা শ্রোতার হৃদয়কে গভীরভাবে ছুঁয়ে যায়। অসামান্য কণ্ঠশিল্পী অভিজিৎ বসুর অনন্য গায়কীতে প্রাণ পেয়েছে দুটি অসাধারণ গান, আর তৃতীয় গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন গুণী শিল্পী প্রশান্ত চ্যাটার্জি। এই অঞ্চলের মাটি থেকে উৎসারিত অসাধারণ সুর ও কালজয়ী কথার সেই গানগুলোর লিরিক্স (Lyrics) নিয়ে আমাদের আজকের এই আয়োজন।

‘ফুল গাছটি লাগইছিলাম’ গানের বিশ্লেষণ

‘ফুল গাছটি লাগইছিলাম’ গানটি রাঢ় অঞ্চলের অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি ঐতিহ্যবাহী লোকগান, যা সহজ সরল উপমায় গভীর জীবনবোধ ফুটিয়ে তোলে। গানটিতে ধুলা-মাটি দিয়ে পরম মমতায় রোপণ করা ফুল গাছটি যখন ‘অগম দইরার মাঝারে’ (অকূল দরিয়ায়) ফুটে ওঠে, তখন তা মানুষের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা ও জীবনের নিয়তিকে নির্দেশ করে। বাঁকুড়া বাজারের প্রেক্ষাপটে রচিত এই গানে লোকায়ত প্রেম, না পাওয়ার আকুতি এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অদ্ভুত মেলবন্ধন রয়েছে। বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ‘উত্তরা’ চলচ্চিত্রে এই গানের অন্তর্নিহিত সরলতা ও মাটির সুর শ্রোতাদের অবচেতনে এক নস্টালজিক বিষণ্ণতা তৈরি করে।

১. ‘ফুল গাছটি লাগইছিলাম’ গানের কথা

ফুলগাছটি লাগই ছিলাম ধুলা মাটি দিয়া রে,
সে ফুল ফুটিয়া রইলো অগম দইরার মাঝারে।

গাছে আইল বড় আম, ছ আনা সাত আনা দাম
বড় আম বড় মিঠা লাগে রে,
বাঁকুড়া বাজারে লাজ লাগে রে।

আম গাছে আম নাই, কুটা কেন লাড় রে
তুমার দেশে আমি নাই আঁখি কেন ঠার রে ?

কদমতলে মোহনচূড়া, দাঁড়ায় আছে নবীন ছুড়া
ওরে ছুড়া মোদের পাড়ায় যাবি লো
গাঁথে দিব বিনি সুতোর মালা।

সরপে সরপে যাব বাছে বাছে টুপা লিব
সেই টুপায় চালভাজা খাব রে,
সফল জনম আর কি পাব ?

ফুলগাছটি লাগই ছিলাম ধুলা মাটি দিয়া রে,
সে ফুল ফুটিয়া রইলো অগম দইরার মাঝারে।।

গানটি ইউটিউব থেকে শুনুন

‘কালো জলে কুচলা তলে’ গানের বিশ্লেষণ

সাঁওতালী ও রাঢ় অঞ্চলের ঝুমুর ঘরানার এক অনবদ্য সৃষ্টি হলো ‘কালো জলে কুচলা তলে’ গানটি। গানের কথায় কুচলা বনের আদিম রূপ, বারো মাস বয়ে চলা নদী আর হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জন ‘সনাতন’-এর খোঁজ না পাওয়ার হাহাকার মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। চিংড়ি মাছ বা মেদিনীপুরের আয়না-চিরনের মতো লৌকিক উপাদানের আড়ালে এখানে মূলত প্রকাশ পেয়েছে মানুষের জীবনের চিরন্তন একাকীত্ব এবং তীব্র বিরহচেতনা। ‘উত্তরা’ চলচ্চিত্রে এই গানটির মধ্য দিয়ে রাঢ় বাংলার রুক্ষ লাল মাটির বুক চিরে এক পরম শূন্যতা ও দীর্ঘশ্বাসের সুরকে জীবন্ত করে তোলা হয়েছে।

২. ‘কালো জলে কুচলা তলে’ গানের কথা

কালো জলে কুঁচলাতলে ডুবলো সনাতন
আজ সাড়া না, কাল সাড়া না, পাই যে দরশন।
নদীধারে চাষে বধু মিছাই করো আশ
ঝিরিহিরি বাঁকা লদী বইছে বারো মাস।

চিংড়ি মাছের ভিতর করা, তায় ঢালেছি ঘী,
নিজের হাতে ভাব ছাড়েছি ভাবলে হবে কি?
চালর চুলা লম্বা কোঁচা কুলি কুলি যায়
দেখি শ্যামের বিবেচনা কার ঘরে শ্যাম আয়?

মেদিনীপুরের আয়না চিরণ বাঁকুড়ার ওই ফিতা
যতন করে বাঁধলি মাথা, তাও যে বাঁকা সিঁতা।
পেছ পারিয়া রাজকুমারী গলায় চন্দ্রহার
দিনে দিনে বাড়ছে তোমার চুলেরই বাহার।

কলি কলি ফুল ফুলেছে লীল কালো আর সাদা
কোন ফুলেতে কিষ্ট আছেন কোন ফুলেতে রাধা?

কালো জলে কুঁচলাতলে ডুবলো সনাতন
আজ সাড়া না, কাল সাড়া না, পাই যে দরশন।
নদীধারে চাষে বধু মিছাই করো আশ
ঝিরিহিরি বাঁকা লদী বইছে বারো মাস।

গানটি ইউটিউবে শুনুন

৩. এক দিনকার হলুদ বাটো তিন দিনকার বাসী,

এক দিনকার হলুদ বাটো তিন দিনকার বাসী,
চৌদ্দলং চৌদ্দলং ফুরায় গেল হে, গঙ্গাজল কী হলুদ মাখামাখি,
কি এই দেখাদেখি কী হলুদ মাখামাখি ২
রবিধানের কাশি, তাই ঘুরে দেখতে আসি,
ও আমার চাঁদফুলকে মইলে দিবি হে,
গঙ্গাজল কী বড়ই সুখে আসি, ২
ছেমড়ানিলো ওলো তুই যাইস না খালের ধারে… … ,

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র ও টিকা

১. বর্তমান লেখাটি প্রথম ১ জুলাই ২০১৩ তারিখে প্রাণকাকলি ব্লগে প্রকাশিত হয়। পরে লেখাটি রোদ্দুরে.কমে ৩০ জুন ২০১৮ তারিখে প্রকাশিত হয়। সবশেষে ফুলকিবাজ.কম-এ লেখাটি ৪ জুন ২০২৬ তারিখে সংস্কার করে প্রকাশ করা হলো।

Leave a Comment