বেনিতো মুসোলিনি: ফ্যাসিবাদের উত্থান এবং ইতালির একনায়কতন্ত্রের ইতিহাস

বেনিতো আমিলক্যার আন্দ্রেয়া মুসোলিনি (১৮৮৩–১৯৪৫) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর ইউরোপীয় রাজনীতির এক বিতর্কিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তিনি কেবল একজন ইতালীয় রাজনীতিবিদ বা সাংবাদিক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন আধুনিক ফ্যাসিবাদের (Fascism) প্রধান প্রবক্তা ও স্থপতি। ১৯১৯ সালে তিনি ‘ইতালীয় লড়াকু লীগ’ (ইতালিয় ভাষা: Fasci Italiani di Combattimento) গঠনের মাধ্যমে একটি চরমপন্থী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূচনা করেন, যা পরবর্তীতে ১৯২১ সালে ‘জাতীয় ফ্যাসিবাদী দল’ (PNF)-এ রূপান্তরিত হয়।[১]

১৯২২ সালের ঐতিহাসিক ‘রোমে মার্চ’ (March on Rome)-এর পর মুসোলিনি ইতালির ক্ষমতা দখল করেন এবং ক্রমান্বয়ে একটি সর্বগ্রাসী একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। যদিও তিনি সাংবিধানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হয়েছিলেন, কিন্তু দ্রুতই তিনি গণতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে দিয়ে নিজেকে ‘ইল দুচে’ (Il Duce) বা অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে ঘোষণা করেন। তাঁর এই স্বৈরতান্ত্রিক আদর্শ পরবর্তীতে অ্যাডলফ হিটলারের মতো অন্যান্য একনায়কদের অনুপ্রাণিত করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির অক্ষশক্তির মিত্র হিসেবে ইতালির বিপর্যয়কর অংশগ্রহণের নেপথ্যে ছিল তাঁরই একক সিদ্ধান্ত, যার পরিণতিতে ১৯৪৫ সালে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়।

শৈশবকাল

প্রথম জীবনের একজন স্কুল শিক্ষক নাকি সেনাবাহিনীতে যােগদানের ভয়ে সুইজারল্যান্ডে পালিয়ে সেই লোকটি যে কিনা আবার সাংবাদিকতাও করেছে। পরবর্তী জীবনের সাথে শুরুর দিকের মুসোলিনির সাথে অন্য কারো তুলনা করা কঠিন। ১৯০২ সালে যে মুসোলিনি সুইজারল্যান্ডে চলে যান আবার ২ বছরের মাথায় ১৯০৪ সালেই ফিরে আসেন দেশে।

প্রায় ১০ বছর সাংবাদিকতা করে সম্পাদক বনে যান অ্যাভান্তি নামে একটি পত্রিকার।

ইতালীয় সমাজতান্ত্রিক দল থেকে বহিষ্কার

১৯১৪ সালের আগস্টে যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, তখন বিশ্বব্যাপী অনেক সমাজতান্ত্রিক দল ক্রমবর্ধমান জাতীয়তাবাদী স্রোতকে অনুসরণ করে এবং যুদ্ধে তাদের দেশের হস্তক্ষেপকে সমর্থন করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হঠকারীভাবে মিত্র বাহিনীর পক্ষাবলম্বন তাঁকে হতাশ করে, তিনি সমাজতান্ত্রিক থেকে পুরোদস্তুর ডানপন্থী হয়ে যান। এরপর ১৯১৫ সালে তাকে সমাজতান্ত্রিক দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

সে সময় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে দক্ষতা দেখিয়ে একজন কর্পোরাল পদে পদোন্নতি হয় তার। জার্মান নেতা হিটলারের মত তিনিও যুদ্ধ চলাকালীন আহত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসেন মিলানে। তারপর বিভিন্ন ডানপন্থী দলের সদস্যদের একত্রিত করে গঠন করেন ফ্যাসিস্ট পার্টি। 

১৯২২ সালে ইতালিতে সমাজতান্ত্রিকদের দাপট কমাতে রাজা তৃতীয় ইমানুয়েল ফ্যাসিস্ট পার্টিকে সরকার গঠনের সুযােগ করে দেয়। ক্ষমতায় গিয়ে দোর্দণ্ডদাপটের সাথে মুসোলিনি বামপন্থীদের ওপর চড়াও হন। এ সময় ১৯২৪ সালে হত্যা করা হয় গিয়াকমো মিত্তিওতিকে। তার ঠিক পাঁচ বছরের মাথায় ১৯২৯ সালে একদলীয় সরকার হিসেবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় ফ্যাসিস্ট পার্টি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বেনিতো মুসোলিনি

মুসোলিনির প্রত্যক্ষ প্রভাবে ১৯৩৬ সালের দিকে জার্মানির সাথে ইতালি একটি মিত্ৰতা চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। বলতে গেলে এর পরবর্তী ৫ বছর না যেতে ১৯৪১ সাল নাগাদ ইতালি পুরোপুরি জার্মানির ওপর নির্ভরশীল একটি বন্ধুরাষ্ট্রে পরিণত হয়। তবে একজন শক্তিশালী নেতা হিসেবে মুসোলিনির উত্থান নিশ্চিত হয়ে যায় ১৯৪০ এর মধ্যেই। ১০ জুন পরলোকগত পোপ দ্বিতীয় পলের স্মৃতির উদ্দেশ্যে রোমে যে ফলক নির্মাণ করা হয় তার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ছিল। সেদিন ইতালি ইঙ্গ-ফরাসি জোটের বিরুদ্ধে ইতালির সংগ্রামে লিপ্ত হওয়ার তীব্র আশাবাদ ব্যক্ত করেন। জনতা মুসোলিনির এ ঘোষণাকে হর্ষধ্বনি দিয়ে স্বাগত জানালে অনেকটাই সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন তিনি।

ইঙ্গ-ফরাসি জোটের অতিরিক্ত বাড়াবাড়ির সাথে কোনো ধরনের আপস না করে উপরন্তু তাদের দাঁতভাঙা জবাব দিতে শুরু করেন জার্মান নেতা হিটলার। এর ফলে শুরু হয়ে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। তবে যুদ্ধ শুরুর প্রথম ১০ মাস তেমন কোনো উচ্চবাচ্য করেনি ইতালি। তারা এককথায় বলতে গেলে নীরব থেকে যায়। তবে পরিস্থিতি হঠাৎ করে বদলে যাওয়ায় জার্মানির সমর্থনে রণাঙ্গনে আবির্ভূত হয় ইতালি।

ইতালি যুদ্ধ ঘোষণা করলে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের সামনে অনেক সমস্যা এসে হাজির হয়। তারা নিরাপত্তা প্রশ্নে অনেকটা ভূমধ্যসাগর, আফ্রিকা ও নিকটপ্রাচ্যে সৈন্য মোতায়েন করে যা ইতালির যুদ্ধে যোগদানকে অনেক দিক থেকে বৈধতা দিতে পারে। ইতালির রণতরী থেকে শুরু করে ডেস্ট্রয়ার ও ক্রুজারগুলো নৌপথে তাণ্ডব তুলে। তাদের যুদ্ধ ঘোষণার ঠিক পরদিন ব্রিটিশ বোমারু বিমান থেকে আসমারা ও মাসোয়াতে বেপরোয়া বোমাবর্ষণ শুরু করে। যুদ্ধ চলে সিসিলিসহ আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে। তবে যুদ্ধে মার্কিনিদের অংশগ্রহণ একে একে সিরাকিউস, পালাজ্জলো, অগাস্টা এবং ভিজনির পতন নিশ্চিত করে। শেষ পর্যন্ত ফিল্ড মার্শাল মন্টেগোমারির বাহিনী আক্রমণ চালিয়ে জার্মান ও ইতালির বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করে।

জার্মান বাহিনী দ্রুত ভেঙে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে ২৭ এপ্রিল পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন মুসোলিনি ও তার বান্ধবী ক্লারা পাত্তাসি। ক্যাস্ট্রোয় জেনারেল কার্ল উলফ আত্মসমর্পণ করার পর তাদের হত্যা করে চৌরাস্তায় টাঙিয়ে রাখা হয় ক্ষতবিক্ষত লাশ।[২]

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র:

১. অনুপ সাদি, ২৫ ডিসেম্বর ২০১৯; রোদ্দুরে.কম, “বেনিতো মুসোলিনি ছিলেন ইতালীয় জাতীয় ফ্যাসিবাদী দলের নেতা ও সাংবাদিক”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/biography/benito-mussolini/
২. মো. আদনান আরিফ সালিম, আধুনিক বিশ্বের ইতিহাস, [Pdf]. বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, জানুয়ারি ২০১৯. সানজিদা মুস্তাফিজ ও সুমা কর্মকার. সম্পা. পৃষ্ঠা ৭৮-৭৯; Retrieved from http://www.ebookbou.edu.bd/wp/OS/hsc4_2.php#hsc2855

Leave a Comment

error: Content is protected !!