বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিবি মৌলভীবাজার জেলা শাখার ইতিহাস এ অঞ্চলের প্রগতিশীল ও মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত।
সিপিবি মৌলভীবাজার জেলার সূচনা ও প্রেক্ষাপট
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময় থেকেই তৎকালীন সিলেট অঞ্চলে বামপন্থী রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়। ১৯৪৮ সালে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি) প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মৌলভীবাজারেও এর কার্যক্রম বিস্তৃত হতে থাকে। মূলত চা শ্রমিক আন্দোলন, কৃষক সংগ্রাম এবং ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জেলায় দলটির শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে ওঠে।
মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী সময়
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সিপিবির নেতা-কর্মীরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। মৌলভীবাজারের কমিউনিস্টরা সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে সামরিক শাসনামলে দলটি দমন-পীড়নের শিকার হয়, তবে ১৯৮৪ সালে মৌলভীবাজার মহকুমা থেকে জেলায় উন্নীত হওয়ার পর সিপিবি সাংগঠনিকভাবে জেলা কমিটি পুনর্গঠন করে।
চা শ্রমিক ও গণআন্দোলন
মৌলভীবাজার জেলায় সিপিবির রাজনীতির অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হলো চা বাগানসমূহ। চা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, ভূমি অধিকার এবং উন্নত জীবনযাত্রার দাবিতে সিপিবি এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলো ধারাবাহিকভাবে সংগ্রাম চালিয়ে আসছে। এছাড়া ১৯৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনেও জেলা সিপিবি রাজপথে সক্রিয় ছিল।
বর্তমান নেতৃত্ব ও সম্মেলন
সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও দলটি জেলায় তার সাংগঠনিক ধারা বজায় রেখেছে। ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত জেলা কমিটির একাদশ সম্মেলনে খন্দকার লুৎফুর রহমানকে সভাপতি এবং অ্যাডভোকেট নিলিমেষ ঘোষ বলুকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করে ২৩ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। বর্তমানে দলটি বাম গণতান্ত্রিক জোটের মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্থানীয় পর্যায়ে সোচ্চার রয়েছে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখা সিপিবি
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখা মৌলভীবাজার জেলার একটি সক্রিয় রাজনৈতিক ইউনিট, যা মূলত চা-শ্রমিক এবং মেহনতী মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়ে থাকে।
সাংগঠনিক কার্যক্রম ও সম্মেলন
শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখা সিপিবির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট হিসেবে নিয়মিত কাউন্সিল ও সম্মেলন আয়োজন করে। ২০১৯ সালের মার্চ মাসে শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে সমিরণ পাল-কে আহ্বায়ক করে নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, যেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় নেতা সৈয়দ আবু জাফর আহমদ। দলটির স্থানীয় কার্যক্রম মূলত চা বাগানের শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, ভূমির অধিকার এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের ওপর জোর দেয়।
আন্দোলন ও জনস্বার্থ রক্ষা
উপজেলা শাখাটি জাতীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিয়মিত বিক্ষোভ সমাবেশ পালন করে। বিশেষ করে, স্থানীয় পর্যায়ে চা-শ্রমিকদের মজুরি আন্দোলন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় তারা সোচ্চার থাকে। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও দলটি তাদের “বাম গণতান্ত্রিক বিকল্প” গড়ে তোলার লক্ষ নিয়ে কাজ করছে।
নেতৃত্ব ও সমন্বয়
শ্রীমঙ্গল শাখাটি মৌলভীবাজার জেলা কমিটির নির্দেশনায় পরিচালিত হয়, যার বর্তমান জেলা সভাপতি খন্দকার লুৎফুর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নীলিমেষ ঘোষ বলু। স্থানীয় পর্যায়ে জাবেদ ভূঁইয়া ও বেলাল হোসেন রাজুর মতো তরুণ ও অভিজ্ঞ নেতৃবৃন্দ সাংগঠনিক সংহতি বজায় রাখতে ভূমিকা রাখছেন।
শ্রীমঙ্গলে মে দিবসের আলোচনা
মহান মে দিবসের আলোচনা গত শুক্রবার ৩ মে ২০১৯ তারিখ বিকালে শ্রীমঙ্গলের মিশন রোড এলাকায় অনুষ্টিত হয়েছে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখার আয়োজনে একক বক্তা ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক প্রভাষক কমরেড জলি পাল। জাবেদ ভূঁইয়ার সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন কমরেড সমীরণ পাল। পরে সাংস্কৃতিক ইউনিয়নের বন্ধুরা প্রতিবাদি গান পরিবেশন করেন।
কমরেড জলি পাল তাঁর বক্তব্যে বলেন যে, মে দিবস এলে দেশের কলকারখানার মালিকেরা মাথায় লাল পতাকা বেঁধে শোষকের চেহারা আড়াল করতে চায়। তারা শ্লোগান তুলে মালিক শ্রমিকের ঐক্য চায় যা কখনই বৈষম্য বিরাজিত সমাজে সম্ভব নয়।
তিনি আরো বলেন, মালিকেরা শ্রমিকদের একটি অংশকে বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে দালাল সুবিধাবাদী একটি গোষ্ঠী পয়দা করছে। মালিকরাই তাদের শোষণ বজায় রাখার জন্য দালাল তৈরী করে শ্রমিকদের ভিতরে পাঠিয়ে শ্রমিকদের ঐক্য নষ্ট করে । এতে ফলে মালিকরা অধিক লাভবান হয়। বিপ্লবী শ্রমিকদের কাজ হচ্ছে দালালদের চিনে তাদের প্রতিরোধ করা, এবং দালাল তৈরির প্রক্রিয়াগুলো ধ্বংস করা।[১]
সিপিবির জেলা নেতৃবৃন্দ
জহর লাল দত্ত
কমরেড জহর লাল দত্ত মৌলভীবাজারের একজন বিশিষ্ট বামপন্থী রাজনীতিবিদ এবং মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের এক নিবেদিতপ্রাণ নেতা। তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়েছিল এরশাদবিরোধী গণআন্দোলনের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে।
মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলা নিয়ে গঠিত মৌলভীবাজার-৩ আসনে তিনি একাধিকবার সংসদ নির্বাচনে ‘কাস্তে’ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। শ্রমিক শ্রেণির অধিকার রক্ষা, নারী আন্দোলন, ছাত্র-যুব-কৃষক আন্দোলন এবং জাতীয় সম্পদ (তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ-বন্দর) রক্ষার সংগ্রামে তিনি রাজপথে সম্মুখ সারিতে ভূমিকা পালন করে আসছেন। রাজনীতি করতে গিয়ে তিনি বারবার পুলিশি নির্যাতন ও কারাবরণের শিকার হলেও সাধারণ মানুষের অধিকারের প্রশ্নে কখনো আপস করেননি। বিশেষ করে চা-শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও জীবনমান উন্নয়নে তার ভূমিকা স্থানীয়ভাবে অত্যন্ত প্রশংসিত।
আরো পড়ুন
- উপমহাদেশে নকশাল আন্দোলনের বিবর্তন: তাত্ত্বিক ভিত্তি ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
- নয়াগণতান্ত্রিক গণমোর্চা: বাংলাদেশের প্রগতিশীল ও সাম্যবাদী রাজনীতির ধারা
- শহীদ কমরেড রাবেয়া আখতার বেলী: নকশালবাড়ি আন্দোলনের এক নির্ভীক নারী বিপ্লবী
- তসলিমা নাসরিন ও বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর: মুক্তমনাদের সংকীর্ণতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতার ব্যবচ্ছেদ
- বাংলাদেশে সাম্যবাদ হচ্ছে বিভিন্ন সংগঠনে কার্যকর বিভিন্ন পন্থার রাজনীতি
- সিপিবির জাতীয়তাবাদ অভিমুখি বিচ্যুতি প্রসঙ্গে
- সিপিবির মোদীতোষণ এবং ক্ষুদে-বুর্জোয়া নির্বোধদের সিপিবিতোষণ
- বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো বনেদী বামপন্থী দল
- সিপিবি মৌলভীবাজার জেলার ইতিহাস শ্রমিক, কৃষক ও মেহনতি মানুষের ইতিহাস
- সিপিবি সিলেট জেলার ইতিহাস শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ মেহনতি মানুষের সংগ্রামের পথ
- নয়াগণতান্ত্রিক গণমোর্চার ২০২৬ সালের নির্বাচনের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ
- মার্কিন-বাংলাদেশ ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’ বাতিলের আহ্বান বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর
- বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল) কর্তৃক আসন্ন ভোট বর্জনের আহবান
- নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা প্রদানের বিরুদ্ধে সমাবেশ
- ধনিক শ্রেণির ক্ষমতা ভাগাভাগির ভোট প্রত্যাখ্যানের আহ্বান
- অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ২০২৫ সালেই সংসদ নির্বাচন করতে হবে
- সাম্যবাদী দলসমূহের বিবৃতিতে হাসিনা সরকারের পদত্যাগ দাবি
- জনগণতান্ত্রিক ছাত্র সঙ্ঘ স্বৈরাচারী আওয়ামী সরকারের পদত্যাগ দাবি করেছে
- ছাত্র-জনতার খুনী হাসিনা সরকারের অবিলম্বে পদত্যাগ দাবি
- বাংলাদেশে মার্কসবাদ চর্চা
- ফুলবাড়ি উন্মুক্ত কয়লাখনি বিরোধী আন্দোলন হচ্ছে এক মহান কৃষক সংগ্রাম
- আলতাব আলী ছিলেন প্রগতিশীল রাজনীতিক ও শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের নেতা
- বাংলাদেশের গণযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে স্বাধীনতার জন্য চালিত সশস্ত্র সংগ্রাম
- বিপ্লবী চেতনার অগ্নিপুরুষ: কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তম
- বাঙালির আত্মপরিচয় ও নবজাগরণ সম্পর্কে আবুল কাসেম ফজলুল হক
- রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিতে ঘরে বাইরে একটি গোষ্ঠী অপেক্ষায় আছে
- মধ্যবিত্ত কেন রাজনীতিবিমুখ?
তথ্যসূত্র
১. বিশেষ প্রতিবেদক, ৪ মে ২০১৯, “মালিকেরা শোষকের কদাকার নোংরা চেহারা আড়াল করতে চায়”, রোদ্দুরে.কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/news/may-day-at-srimangal/
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।