ঘুম ভুলেছি নিঝুম এ নিশীথে: শচীন দেববর্মণের কালজয়ী বিরহী গানের এক গভীর বিশ্লেষণ

‘ঘুম ভুলেছি নিঝুম এ নিশীথে জেগে থাকি’ গানটি বাংলা আধুনিক সংগীতের ইতিহাসে এক অনন্য ও চিরকালীন আবেদনময় সৃষ্টি। প্রখ্যাত গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের হৃদস্পর্শী কথা এবং শচীন দেববর্মণের অনবদ্য সুর ও দরদি কণ্ঠের সংমিশ্রণে এটি এক বিষণ্ণ মায়াজাল তৈরি করেছে। নিশুতি রাতের নিঃসঙ্গতা, প্রিয়জনের জন্য অন্তহীন প্রতীক্ষা আর হৃদয়ের গভীর হাহাকার গানটির প্রতিটি চরণে অত্যন্ত সজীবভাবে ফুটে উঠেছে। এর ধীর অথচ করুণ সুর শ্রোতাকে এক অদ্ভুত একাকীত্বের আবহে নিয়ে যায়, যা কয়েক দশক ধরে সংগীতপ্রেমীদের মনে এক বিশেষ আবেগের জায়গা দখল করে আছে।

গানের বিশ্লেষণ

গানটির আবেদন কেবল বিরহের সুরে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি নিস্তব্ধ রজনীর এক অনন্য কাব্যিক প্রতিফলন। গভীর রাতের নিঝুম পরিবেশে মানুষের মনের গহীনে জমে থাকা সুপ্ত স্মৃতিগুলো যেভাবে মূর্ত হয়ে ওঠে, এই সৃষ্টিতে সেই সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোই চমৎকারভাবে ধরা দিয়েছে। এখানে ‘নিশীথ’ বা রাত কেবল সময়ের কোনো একক নয়, বরং তা একাকী হৃদয়ের দীর্ঘশ্বাস ও নীরবতার এক বিশ্বস্ত সঙ্গী হিসেবে চিত্রিত হয়েছে। শচীন দেববর্মণের নিজস্ব গায়কী এবং গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের অসাধারণ শব্দশৈলী গানটিকে বাংলা সংগীতের স্বর্ণযুগের এক কালজয়ী মাস্টারপিস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

গানের শুরুতেই রাত জাগার কথা বলা হয়েছে এবং আমার মতোই দুটি পাখার সারারাত জেগে থাকার কথা বলা হয়েছে, একই সাথে “কথা দিয়েছিলে আসিবে গো ফিরে” পঙক্তিটির মাধ্যমে প্রিয়জনের সেই অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির কথা গভীর আবেগে স্মরণ করা হয়েছে। আকাশপ্রান্তে চাঁদের জেগে থাকা এই গানে যেমন রোমান্টিকতা ছড়ায়, ঠিক তেমনি এক বিষণ্ণ পরিবেশের জন্ম দেয়—যেখানে চাঁদ যেন সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার এক নীরব সাক্ষী। শিল্পী যখন ব্যাকুল হয়ে গেয়ে ওঠেন “বারে বারে পিছু ডাকি”, তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে তাঁর মন জাগতিক যুক্তির চেয়ে হৃদয়ের আবেগের কাছেই বেশি সমর্পিত। প্রিয়জন আর ফিরবে না জেনেও এক তৃষ্ণার্ত হৃদয় বারবার হারানো স্মৃতিকেই আঁকড়ে ধরতে চায়।

“একে একে ওই ডুবে গেল তারা”—এই চরণটি সময়ের নিরন্তর বয়ে চলাকেই ইঙ্গিত করে। রাত যখন ক্রমশ গভীর হয়ে ভোরের দিকে এগিয়ে যায়, তখন প্রতীক্ষার প্রহর ফুরিয়ে আসার এক বিষণ্ণ বার্তা পাওয়া যায়। অথচ দীর্ঘ এই অপেক্ষার শেষেও সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষের কোনো সাড়া মেলেনি। গানের শেষে “আলেয়া যেন আলো হয়ে দিল ফাঁকি” উপমাটি অসাধারণ এক দ্যোতনা সৃষ্টি করেছে। আলেয়া যেমন দিগভ্রান্ত পথিককে ভুল পথে চালিত করে, তেমনি প্রিয়জনের দেওয়া প্রতিশ্রুতিও শিল্পীর কাছে কেবল এক মরীচিকা বা মিথ্যে সান্ত্বনা হয়ে ধরা দিয়েছে। এটি একদিকে যেমন পাওয়ার তীব্র ব্যাকুলতা প্রকাশ করে, অন্যদিকে তেমনি শেষ বিচারে শূন্য হাতে ফেরার এক করুণ হাহাকার।

গানটি ইউটিউবে শুনুন শচীন দেববর্মণের কণ্ঠে

গানের কথা

ঘুম ভুলেছি নিঝুম এ নিশীথে জেগে থাকি,
আর আমারই মতো জাগে নীড়ে দুটি পাখি।।
কথা দিয়েছিলে আসিবে গো ফিরে,
চাঁদ জাগে দূরে আকাশের তীরে—
তাই তোমারেই আমি বারে বারে পিছু ডাকি।।
একে একে ওই ডুবে গেল তারা,
তবু তুমি ওগো দিলে না তো সাড়া—
হায়, আলেয়া যেন আলো হয়ে দিল ফাঁকি।।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, এই গানটি কেবল সুর আর শব্দের মেলবন্ধন নয়, বরং বিচ্ছেদের এক জীবন্ত দলিল। সময়ের বিবর্তনে রুচির পরিবর্তন হলেও এই সৃষ্টির আবেদন আজও অম্লান। প্রতিটি বিরহী হৃদয়ের অব্যক্ত কথাগুলোই যেন শচীন দেববর্মণের কণ্ঠে এক মহাকাব্যিক হাহাকার হয়ে ফুটে উঠেছে। যারা নিস্তব্ধ রাতে নস্টালজিয়ায় ডুব দিতে ভালোবাসেন, তাদের কাছে ‘ঘুম ভুলেছি নিঝুম এ নিশীথে’ গানটি চিরকাল এক পরম আশ্রয় হয়ে থাকবে।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র ও টিকা

১. লেখাটি ৩ জুলাই ২০১৯ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো। গানের কথা নেয়া হয়েছে শিশির চক্রবর্তী সংকলিত পত্রভারতী কলকাতা প্রকাশিত দ্বিতীয় মুদ্রণ ডিসেম্বর ২০১৮পাঁচদশকের আধুনিক বাংলা গানের গীতবিতান এ শুধু গানের দিন গ্রন্থের ৩১০ পৃষ্ঠা থেকে।

Leave a Comment