উৎপাদন সম্পর্ক পণ্যের উৎপাদন, বণ্টন ও বিনিময়ের প্রক্রিয়ায় যুক্ত মানুষের সম্পর্ক

উৎপাদন সম্পর্ক (জার্মান: Produktionsverhältnisse ইংরেজি: Relations of production) হচ্ছে একটি ধারণা যা কার্ল মার্কস এবং ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস তাদের ঐতিহাসিক বস্তুবাদ তত্ত্ব এবং পুঁজি গ্রন্থে প্রায়শই ব্যবহার করেছেন। এটি প্রথম স্পষ্টভাবে মার্কসের প্রকাশিত বই দর্শনের দারিদ্রে ব্যবহৃত হয়, যদিও মার্কস এবং এঙ্গেলস ইতিমধ্যেই জার্মান ভাবাদর্শতে এই শব্দটি সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। উল্লেখ্য জার্মান ভাবাদর্শ ১৯৩২ সালে মরণোত্তর প্রকাশিত হয়েছিল।

“উৎপাদন সম্পর্ক” বলতে মার্কস এবং এঙ্গেলস বোঝাতে চেয়েছিলেন সামাজিক সম্পর্কের সমষ্টি যা মানুষকে বেঁচে থাকার, উৎপাদন করার এবং তাদের জীবনযাত্রার উপকরণ পুনরুৎপাদনের জন্য প্রবেশ করতে হয়। যেহেতু মানুষকে এই সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে প্রবেশ করতে হয়, অর্থাৎ যেহেতু এতে অংশগ্রহণ স্বেচ্ছাসেবী নয়, তাই উৎপাদিকা শক্তির সাথে এই সম্পর্কের সামগ্রিকতা একটি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল এবং স্থায়ী কাঠামো, “অর্থনৈতিক উপরিকাঠামো” বা উৎপাদন ব্যবস্থা গঠন করে।

মার্কস এবং এঙ্গেলস সাধারণত একটি নির্দিষ্ট যুগের বৈশিষ্ট্যগত আর্থ-সামাজিক সম্পর্ক বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহার করেন; উদাহরণস্বরূপ: একজন পুঁজিপতির সাথে মূলধনের সাথে একচেটিয়া সম্পর্ক, এবং অনুবর্তীতে একজন মজুরি শ্রমিকের সাথে পুঁজিপতির সম্পর্ক; একজন সামন্ত প্রভুর সাথে একটি জায়গিরের সম্পর্ক, এবং অনুবর্তীতে ভূমিদাসের সাথে প্রভুর সম্পর্ক; একজন প্রভুর সাথে তাদের দাসের সম্পর্ক; ইত্যাদি। মার্কসের ধারণা উৎপাদন সম্পর্কের সাথে উৎপাদন শক্তির সম্পর্ক বৈপরীত্যপূর্ণ এবং এর দ্বারা প্রভাবিতও হয়।

উৎপাদন সম্পর্ক ধারণায় পণ্যের উৎপাদন, বণ্টন ও বিনিময়ের প্রক্রিয়ায় যুক্ত মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের কথা বলা হয়ে থাকে। মার্কস যে সম্পর্কগুলির কথা উল্লেখ করেছেন তা সামাজিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক, অথবা প্রযুক্তিগত সম্পর্ক হতে পারে। উৎপাদনী যন্ত্র বা মাধ্যমের মালিকানার প্রকৃতির উপর উৎপাদন সম্পর্ক নির্ভর করে।

মার্কস কীভাবে ধারণাটি ব্যবহার করেন

উৎপাদন ব্যবস্থার দুটি উপাদান হলো উৎপাদিকা শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্ক। উৎপাদিকা শক্তির নিরন্তর উন্নয়নের দরুন এবং শ্রমযন্ত্রের উৎকর্ষ সাধনের ফলে পুরানাের পরিবর্তে নতুন উৎপাদন সম্পর্কের প্রয়ােজন হয়, যা উচ্চস্তরের উৎপাদিকা শক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে। উন্নত উৎপাদিকা শক্তি এবং সাবেকি উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যে ক্রমবর্ধিষ্ণু সংঘর্ষের অনিবার্য পরিণাম হলো সমাজ বিপ্লব, যেটা নতুনটির দ্বারা পুরানাে উৎপাদন সম্পর্কের অবসান ঘটায় এবং উৎপাদিকা শক্তির উত্তরােত্তর বিকাশের পথ সুগম করে।

প্রাক-সমাজতন্ত্রী শ্রেণীবিভক্ত সমাজে উৎপাদন সম্পর্কের স্বরূপ হলো আধিপত্য, অবদমন, শােষণ ও পীড়ন। সমাজতন্ত্রী উৎপাদন সম্পর্ক শিল্প-বাণিজ্যে ব্যক্তিগত মালিকানার পরিবর্তে জনসাধারণের মালিকানা কায়েম করে।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র

১. অনুপ সাদি, ২২ ডিসেম্বর ২০১৮; রোদ্দুরে.কম, “উৎপাদন সম্পর্ক কাকে বলে”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/encyclopedia/marxist-glossary/production-relations/
২. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ৪৯-৫০।

Leave a Comment