খুলিয়া কুসুমসাজ শ্রীমতি যে কাঁদে: শচীন দেববর্মণের কালজয়ী বিরহী গান

কিংবদন্তি শিল্পী শচীন দেববর্মণের কণ্ঠে ‘খুলিয়া কুসুম সাজে শ্রীমতি যে কাঁদে’ গানটি বাংলা সংগীতের এক অমূল্য সম্পদ। প্রখ্যাত গীতিকার গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের নিপুণ লেখনীতে গানটি সুরারোপ করেছেন স্বয়ং শচীন কর্তা। তাঁর সেই চিরচেনা দরদী এবং লোকজ ঢঙের কণ্ঠের জাদুতে গানটি কয়েক দশক ধরে সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে বিরহের এক অনন্য হাহাকার তৈরি করে চলেছে।

এই গানটি মূলত রাধা-কৃষ্ণের চিরন্তন প্রেমের বিরহী রূপ নিয়ে রচিত। প্রিয়তমের অপেক্ষায় কুসুম সাজে সেজেও যখন শ্রীমতীর দেখা মেলে না, সেই আকুলতা ও অশ্রুসিক্ত অনুভূতির চিত্র এখানে ফুটে উঠেছে। শচীন দেববর্মণের অনবদ্য গায়কী এবং অসাধারণ সুরের মূর্ছনা রাধার এই বিরহী আর্তনাদকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যা আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে এক অলৌকিক প্রেমের জগৎ তৈরি করে।

গানের কথা

খুলিয়া কুসুমসাজ শ্রীমতী যে কাঁদে,
অলখে রহিয়া কানু, ফুল বেণু সাধে—
আহা বিনোদিনী কাঁদে।
সুরভি ঝরানো মালা দিল প্রাণে এ কী জ্বালা,
যার লাগি হারাল কূল তারে কী দিয়ে গো বাঁধে—
বিরহিনী কাঁদে, শ্রীরাধিকা কাঁদে।।

অঙ্গের লাবণি হলো নয়নের জল,
প্রেমের যমুনা কূল হয়েছে কি ছল?
সে যে শুধু ফুলবাণে পরান বিধিতে জানে—
বিষভরা ফুলবাণে এ কি জ্বালা দিল প্রাণে।
কলঙ্কিনী হলো যে নাম কি বা অপরাধে—
হায় বিনোদিনী কাদে, বিরহিনী কাদে,
মরমী যে কাঁদে, শ্রীমতী যে কাঁদে।।

শচীন দেববর্মণের কণ্ঠে গানটি শুনুন ইউটিউব থেকে

গানের গভীর বিশ্লেষণ: বিরহ, প্রেম ও আধ্যাত্মিকতা

গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের এই কালজয়ী গানের গভীরে লুকিয়ে থাকা আবেগ ও দর্শনের মূল দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

  • বিরহ ও অভিমানের বহিঃপ্রকাশ: গানের শুরুতেই রাধার সাজসজ্জা ত্যাগের মাধ্যমে তাঁর গভীর যন্ত্রণার চিত্র ফুটে ওঠে। যার জন্য তিনি ‘কুসুম সাজ’ বা পুষ্প অলংকারে সেজেছিলেন, সেই কৃষ্ণের অনুপস্থিতিতে সেই সাজই এখন তাঁর কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষ্ণ সামনে না এসে আড়াল থেকে বাঁশি বাজাচ্ছেন (ফুল বেণু সাধে), যা রাধার বিরহ-জ্বালাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
  • বৈপরীত্যের উপমা: গানে সুগন্ধি ফুলের মালার সঙ্গে ‘জ্বালা’র তুলনা করা হয়েছে। সাধারণত ফুল সুখ ও সৌন্দর্যের প্রতীক হলেও বিরহিনী রাধার কাছে তা দহন সৃষ্টি করছে। ‘অঙ্গের লাবণি হলো নয়নের জল’—এটি একটি চমৎকার উপমা, যেখানে রাধার শারীরিক সৌন্দর্য আজ চোখের জলে বিলীন হয়ে যাওয়ার করুণ দৃশ্য ফুটে উঠেছে।
  • প্রেমের ত্যাগ ও সামাজিক লাঞ্ছনা: ‘যার লাগি হারাল কূল তারে কী দিয়ে গো বাঁধে’—এই চরণের মাধ্যমে রাধার কুলত্যাগ বা সামাজিক মর্যাদা বিসর্জনের কথা বলা হয়েছে। সর্বস্ব ত্যাগ করেও তিনি কৃষ্ণকে ধরে রাখতে পারছেন না, এই অসহায়ত্ব এখানে প্রকট। ‘কলঙ্কিনী’ শব্দটি এখানে রাধার নিঃস্বার্থ প্রেমের সামাজিক পরিণাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
  • কৃষ্ণের নিঠুরতা ও যমুনার ছলনা: এখানে কৃষ্ণকে কিছুটা নিঠুর হিসেবে দেখানো হয়েছে। তাঁর বাঁশির সুর রাধার কাছে ‘বিষভরা’ মনে হচ্ছে। এক সময় যমুনার কূল যে মিলনের পবিত্র স্থান ছিল, বিরহের এই লগ্নে তা রাধার কাছে কেবল ‘ছলনা’ বা মিথ্যে মনে হচ্ছে।
  • মরমী ও আধ্যাত্মিক আর্তনাদ: গানটি কেবল পার্থিব প্রেম নয়, বরং এক গভীর আধ্যাত্মিক আকুলতার প্রতীক। রাধা এখানে কেবল একজন নারী নন, তিনি পরমাত্মার (ঈশ্বর) জন্য ব্যাকুল জীবাত্মার প্রতিচ্ছবি। তাঁর প্রতিটি চোখের জল এবং কলঙ্ক সওয়ার আকুলতা মূলত কৃষ্ণের প্রতি তাঁর নিঃশর্ত সমর্পণেরই সাক্ষ্য দেয়।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, শচীন দেববর্মণের এই অনন্য সৃষ্টিটি কেবল একটি গান নয়, বরং এটি বাংলা সংগীতের এক চিরন্তন সম্পদ। গানটি প্রেম, বিরহ, সামাজিক লাঞ্ছনা এবং অলৌকিক আকর্ষণের এক সংমিশ্রণ; যেখানে মিলনের চেয়ে বিরহের দহনই বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। শিল্পী ও স্রষ্টার নিখুঁত কারুকার্যে গানটি আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে এক গভীর হাহাকার ও ভালোবাসার অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র ও টিকা

১. লেখাটি ৩ জুলাই ২০১৯ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো। গানের কথা নেয়া হয়েছে শিশির চক্রবর্তী সংকলিত পত্রভারতী কলকাতা প্রকাশিত দ্বিতীয় মুদ্রণ ডিসেম্বর ২০১৮পাঁচদশকের আধুনিক বাংলা গানের গীতবিতান এ শুধু গানের দিন গ্রন্থের ৩১০ পৃষ্ঠা থেকে।

Leave a Comment