অনুপ সাদি: যিনি আমাকে বাংলাদেশ ও বাঙালির সাথে পরিচয় করিয়েছেন

ঘটনাটি আজ থেকে ৪ বছর আগের। হঠাৎ একটা ফোন আসে। “হ্যালো নমস্কার, আমি বিপ্লব আনন্দ, আপনি কি হিমাল সুবেদী?” ওহ! দাই (দাদা) ভালো আছেন? হ্যাঁ, আমি হিমাল, আমি আপনার সাথে আগে থেকেই যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিলাম। ধন্যবাদ। আপনার দেওয়া আবেদন আমরা দেখেছি, আপনি লহান শহরে আসতে পারেন। এখানে ‘উইকি-কর্মশালা ২০১৮’ আয়োজিত হতে যাচ্ছে। মংসির মাসের শেষ দিকে তিন দিন ব্যাপী। আমি উনার সাথে আগে থেকেই যোগাযোগে ছিলাম কিন্তু এই কর্মসূচিতে আমিও অংশগ্রহণ করছি সেটা আমার জানা ছিল না। তবে যাই হোক—নতুন বন্ধু, নতুন মুখ, দেশ-বিদেশের উইকিপিডিয়ার প্রতিনিধিদের সাথে দেখা হবে ভেবে আমি নিশ্চিত হলাম। আমি এবং ভাই পর্বত বিক্রম সংবৎ ২০৭৫ এর মংসির ৭ (২৩ নভেম্বর ২০১৮) তারিখে লহান গেলাম।

চিতবন ভরতপুর থেকে ৬ ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রা শেষে আমরা সিরাহা জেলার লহান শহরে পৌঁছালাম। ওহ! একদমই নতুন শহর, নতুন জায়গা, নতুন সব মানুষ। আমরা লহানের হোটেল সিম্রিকে গেলাম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কয়েকজন নেপালি উইকিপিডিয়া সম্পাদকের সাথে আমার যোগাযোগ ছিল, সেখানে তাঁদের সাথে দেখা হলো। প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে হিন্দি উইকিপিডিয়া ব্যবহারকারী এবং পাঞ্জাবি উইকিপিডিয়া ব্যবহারকারী বন্ধুদের উপস্থিতিও সেখানে দেখা গিয়েছিল। কিছু বন্ধুদের সাথে সাধারণ কথাবার্তা ও পরিচয় হয়েছিল আমাদের। তবে আমি ভাগ্যবান ছিলাম যে এরকম একটি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পেরেছি। প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে কিছু বন্ধু এবং বাংলাদেশ থেকে একজনের অংশগ্রহণ ছিল। তিনি আর কেউ নন—লেখক ও কবি অনুপ সাদি। বাঙালি উইকিপিডিয়ার পক্ষ থেকে একজন প্রতিনিধি।

স্বাভাবিকভাবেই অন্যদের মতো আমারও মনে হয়েছিল তিনি হয়তো ভারতীয়, কিন্তু আমি ভুল ছিলাম। তিনি ছিলেন বাংলাদেশি। তিন দিনের কর্মসূচিতে আমাদের দলটি কিছু পর্যটন এলাকা ভ্রমণের সুযোগও পেয়েছিল। সেখানে উনার সাথে আমাদের দেখা হয়। “আপনার নাম?” “জ্বি, আমি অনুপ সাদি।” “আপনি কোথা থেকে এসেছেন?” “জ্বি, আমি বাংলাদেশ থেকে।”

আমি অবাক হয়ে গেলাম! ওহ! আমি তো নেপালি ভাষায় কথা বলছি, কিন্তু তিনি নেপালি খুব ভালোভাবে বুঝতে পারছেন। ওহ! কী আশ্চর্য, এটা কীভাবে সম্ভব? একজন বাংলাদেশি কীভাবে নেপালি ভাষা বুঝতে পারেন? না বাঙালির সাথে নেপালি ভাষার লিপি মেলে, না ভাষা—তবে এটা তো আশ্চর্যের বিষয় হলো। পুরোপুরি না হলেও, আমরা যা বলছিলাম তিনি তা বুঝতে পারছিলেন এবং ইংরেজিতে উত্তর দিতে সক্ষম ছিলেন। শুধু আমার নয়, সবারই খুব অবাক লাগল। অন্য বন্ধুরাও খুব কৌতূহল নিয়ে উনার সাথে কথা বলতে চাচ্ছিলেন।

আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মসূচি শুরু হলো, কিছু মন্ত্রীর উপস্থিতিও দেখা গেল। মূলত ওখানকার একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী কর্তৃক প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। সবাই একে একে নিজেদের পরিচয় দিতে ব্যস্ত। পরে আমারও পালা এলো। আমি নিজের পরিচয় দিলাম, সবাই আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। সম্ভবত আমিই ছিলাম বয়সে সবচাইতে ছোট সেখানে। ইংরেজিতে কথা হচ্ছিল। আমি অতটা ভালো ইংরেজি জানি না, তবে সাধারণ কথাবার্তা ইংরেজিতে চালিয়ে নিতে পারব বলে আমার মনে হয়। আনুষ্ঠানিক শুরুর পর আমি উনার পাশে গিয়ে বসলাম।

আমি তাঁকে কৌতূহলের সাথে দেখি। “বাংলাদেশে আপনি কোথায় থাকেন?” — “ময়মনসিংহে।” আমাদের মাঝে আরও কিছু কথা হয়। তাঁকে দেখে আমি অবাক হয়ে যাই। উনি বললেন “আপনি নেপালের কোথায় থেকে?” আমি বললাম, “নেপালের চিতবন জেলার ভরতপুর মহানগর থেকে”। আমি তাকে জিঞ্জস করেছি, “আপনি নেপালি ভাষা কীভাবে শিখলেন?” “আমি কয়েক বছর আগে কাঠমান্ডুতে ছিলাম, সেখানে থাকার সময় কিছু শেখার সুযোগ পাই। আসলে নেপালি এবং বাংলা ভাষার মধ্যে খুব বেশি বড় পার্থক্য দেখা যায় না। দুটোই ইন্দো-আর্য ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষা।”

এরপরের কর্মসূচিতে তাঁর একটি উপস্থাপনা ছিল। তিনি বলছিলেন, উইকিপিডিয়ার গভীরতা কীভাবে বাড়ানো যায় এবং একে কীভাবে সমৃদ্ধ করা যায়। অন্য কেউ মনোযোগ দিয়ে শুনছিল কি না জানি না, তবে আমি খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম। চেয়ারগুলো গোল করে সাজানো ছিল, ঘরটি নানা সাজসজ্জায় সজ্জিত। বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতির সংযোগ দেখা যাচ্ছিল; সেটি ছিল একটি বড় হল ঘর, তবে খুব বেশি বড়ও নয়। তিনি এক জায়গায় বসে আছেন আর আমি তাঁকে দেখছি। আমি তাঁর কাছে গিয়ে কথা বলতে চেয়েছিলাম এবং তাই করলাম। আমি দেখলাম তিনি তাঁর ল্যাপটপে মহাকবি লক্ষ্মীপ্রসাদ দেবকোটার ওপর বাংলা উইকিপিডিয়ায় একটি নিবন্ধ তৈরি করছেন। বাহ! সত্যিই আমাদের জন্য এটি একটি গর্বের বিষয়।

সেখান থেকে আমি নতুন শক্তি পাই। তিনি যদি নেপাল সম্পর্কে এত আগ্রহ রাখেন, তবে আমাদেরও আমাদের পক্ষ থেকে কিছু করা উচিত। বাংলাদেশ এবং বাঙালি জাতি সম্পর্কে এখানে তেমন কেউ কিছু জানে না। হয়তো ভাষা ও লিপিতে মিল না থাকার কারণে এমন হতে পারে। তিনিই সেই ব্যক্তি ছিলেন যিনি আমাকে সেখানে এক নতুন ধরনের শক্তি প্রদান করেছিলেন। আমি সেদিন থেকে সংকল্প করলাম যে—যেকোনো মূল্যে আমি বাংলা ভাষা শিখেই ছাড়ব। এরপর আমার পড়াশোনা চলতে থাকল। যদি কেউ আমার মাতৃভাষার প্রতি আগ্রহ দেখায় এবং তা শিখতে চায়, তবে আমাদের উচিত তাকে সহযোগিতা করা। মাতৃভাষী হওয়ার সুবাদে সেই দায়িত্ব আমাদের। একইভাবে বাংলা ভাষা শেখার আমার এই প্রতিশ্রুতিকে অনেক বন্ধু সমর্থন জানিয়েছেন এবং আমাকে সাধ্যমতো সাহায্য করছেন—যা আজ পর্যন্ত অব্যাহত।

আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করি, “এটা কী লেখা? বেশ আঁকাবাঁকা, এমনকি ভূতের মতো দেখাচ্ছে।” তিনি হাসতে হাসতে বলেন, “ভয় পাওয়ার কিছু নেই, এটা তো বেশ সহজ।” শুরুতে আমার তেমনটা মনে হয়নি। খুব কষ্টে একটা অক্ষরও চিনতে পারতাম না। অন্যদিকে তিনি সাধারণ অক্ষর পড়তে পারতেন, নেপালি বলা বুঝতে পারতেন। এছাড়া খুব সামান্য নেপালি বলার চেষ্টাও করতেন। তিনি শুরুতে বলা একটি কথা আমার সব সময় মনে থাকে—“এটি বাংলা ভাষার ‘র’ বর্ণ, দেখতে নেপালি ‘ব’ (ब) এর মতো।”

এরপর আমি বাংলাদেশ এবং বাংলা সম্পর্কিত নিবন্ধ তৈরিতে লেগে পড়ি। সেটা আমার জন্য নতুন বিষয় ছিল, যা আগে কোনোদিন জানতাম না, খুঁজিনি এবং আগ্রহও ছিল না। তিনি আমাকে বাংলাদেশের জেলাগুলোর নামের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে দিতে এক এক করে উচ্চারণ করছিলেন। আমি লেখা বুঝতে পারতাম না, তবে সেই উচ্চারণগুলো মোবাইলের নোটপ্যাডে শুরুতে কিছু জেলার নাম সেভ করে রাখলাম। আমি নিবন্ধ বানাচ্ছি, এক এক করে সবগুলো শেষ করতে হবে। আমাদের এই সাক্ষাৎ আমার এবং তাঁর জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে রইল।

পরের দিনগুলোতেও আমি তাঁকে অনুসরণ করছিলাম। কর্মসূচিতে যা হচ্ছিল, তিনি তা হুবহু লিখে যাচ্ছিলেন। যাই হোক, বাড়ি ফেরার সময় এক নতুন এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতার সাথে ফিরলাম। সেদিন থেকে বাংলা ভাষার প্রতি আমার আগ্রহ ও কৌতুহলকে আমি কখনো কম হতে দিইনি। এখনো নতুন নতুন শব্দ এবং শব্দভাণ্ডার বাড়াতে কাজ করে যাচ্ছি। তবে একটা কথা হলো, নেপালি মাধ্যমে বাংলা ভাষার কোনো ক্ষেত্র নেই, কারো এই বিষয়ে তেমন আগ্রহও নেই। কিন্তু অন্য কেউ আগ্রহ দেখায় না বলেই আমি আমার সংকল্প থেকে পিছিয়ে যেতে চাইনি এবং কখনো পিছাইনি।

পরবর্তী দিনগুলোতে অনেক বন্ধুর সাথে আমার কথা ও পরিচয় হয়। তাঁরাও অবাক হচ্ছিলেন। কিছু বন্ধু বলছিলেন, “আপনি নিশ্চিতভাবেই নেপালি নন, আর হলেও আপনি নিশ্চয়ই কোনো বাঙালি বংশোদ্ভূত।” কিন্তু সেটি সম্পূর্ণ ভুল ছিল। যেভাবে আমি অনুপ স্যারকে দেখে অবাক হয়েছিলাম, তাঁরাও আমার বাংলা ভাষা শেখা এবং বলতে পারার ক্ষমতায় অবাক হচ্ছিলেন। ৪ বছর আগের কথা। তবে ভালোভাবে খেয়াল করলে এতে অবাক হওয়ার মতো কিছু নেই, অসম্ভবও কিছু নেই—যে কেউ যে কোনো ভাষা শিখতে পারে। পার্থক্য শুধু এটুকুই যে, কার প্রতি কোন ভাষার টান বেশি।

কিন্তু আজ পর্যন্ত অনুপ সাদিই সেই ব্যক্তি, যিনি আমাকে বাংলাদেশ ও বাঙালিদের মাঝে পরিচিত করিয়েছেন। আমি তাঁর এই ঋণ কখনো ভুলব না। তিনি একজন অসাধারণ মানুষ, সবার সাথে মিশুক এবং অত্যন্ত ভদ্র। আরও বলতে গেলে, তিনি নিজের মাতৃভাষায় কলম চালানোর চেষ্টাও করেন, কিছু নিবন্ধ ও কবিতাও লিখেছেন। আমি তাঁর লেখাগুলো পড়ার পরিকল্পনা করেছি। নেপালি অনুবাদ করলে আরও ভালো হতো। আমি আশা করি, নিকট ভবিষ্যতে আমাদের আবার দেখা হবে।

২ অক্টোবর ২০২২, কাঠমাণ্ডু

আরো পড়ুন

বিশেষ দ্রষ্টব্য: অনুপ সাদি সম্পর্কিত এই মূল্যায়নটি এনামূল হক পলাশ সম্পাদিত সাহিত্যের ছোট কাগজ অন্তরাশ্রম-এর অনুপ সাদি সংখ্যা, সংখ্যা ৪, পৃষ্ঠা ৮৮-৯০, ময়মনসিংহ থেকে ৩০ নভেম্বর ২০২২ তারিখে নেপালী ভাষায় প্রকাশিত হয় এবং সেখান থেকে লেখাটি অনুবাদ করে ফুলকিবাজ.কমে প্রকাশ করা হলো।

Leave a Comment

error: Content is protected !!