সুভাষচন্দ্র বসুর রাষ্ট্রচিন্তা হচ্ছে স্বাধীনতা, সমাজতন্ত্র, ফ্যাসিবাদ ও জাতীয় মুক্তি

সুভাষচন্দ্র বসুর রাষ্ট্রচিন্তা (ইংরেজি: Political thoughts of Subhas Chandra Bose) হচ্ছে স্বাধীনতা, সমাজতন্ত্র, ফ্যাসিবাদ ও জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম। জাতীয় মুক্তি অর্থে তিনি স্বাধীনতা এনে দিতে চেয়েছিলেন রক্তের বিনিময়ে। তিনি বলতেন, তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদেরকে স্বাধীনতা দেব। রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতার কথাটি আমরা ছোটবেলায় শুনতাম নেতাজি সম্পর্কে। তিনি হয়তো তাই ভেবেছিলেন এবং একদা এক রাতে স্বাধীনতা আনার জন্য সেই যে গোপনে বাড়ি থেকে বের হলেন, আর ফিরলেন না।[১]

বাঙলার একাংশ আজ আংশিক স্বাধীন, আরেক অংশ দিল্লির নখরের আঁচড়ে আহত, স্বাধীনতা কোনো অংশেই কার্যকর নেই; অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দুই বাংলাতেই সুদূরপরাহত। ফ্যাসিবাদের অনুরাগী এই রাজনীতিবিদ ফ্যাসিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, ও সাম্যবাদের পার্থক্যগুলোকে ঠিকঠাক উপলব্ধি করতে করতে পারেননি। চিন্তাধারায় মাঝারি স্তরের এই নেতা স্বাধীনতা সংগ্রামে কিছুটা ভূমিকা রাখতে সমর্থ হন, যদিও স্বাধীনতার শত্রু ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে বহুদিন রাজনীতি করে শেষ জীবনে ফরোয়ার্ড ব্লক নামে একটি আধা-ফ্যাসিবাদী সংগঠন তৈরি করেন।

সুভাষ বসুর রাষ্ট্রচিন্তা

সুভাষ বসু তার আত্মজীবনীমূলক রচনা An Indian Pilgrim এবং রাজনৈতিক গ্রন্থ The Indian Struggle-এ নিজস্ব ভাবধারার পরিচয় তুলে ধরেছেন। ভারতের অফুরন্ত চিত্তশক্তির উপর তার অগাধ বিশ্বাস ছিল। এই চিত্তশক্তিই ভারতীয় সভ্যতাকে এক অনন্য গৌরব দান করেছে। মানুষের ন্যায় মানব সভ্যতারও বৃদ্ধি ও মৃত্যু ঘটে; তবে কোনো কোনো সভ্যতার পুনর্জন্ম ঘটে তার অন্তর্নিহিত শক্তির জোরে। ভারতের অন্তর্জগতেও এমন এক শক্তি বিদ্যমান যার বলে ভারতীয় সভ্যতার বিপর্যয় মাঝে মাঝে ঘটলেও তার পুনরুজ্জীবন ঘটেছে বারবার। এ কারণেই ভারতীয় সভ্যতা অত্যন্ত প্রাচীন হওয়া সত্ত্বেও কোন কালে এর নবীনতা ও সজীবতা বিনষ্ট হয়নি।[২] ভারতীয় সমাজে যেসব সামাজিক রাজনীতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে তা এই সভ্যতারই ফসল। কাজেই গণতন্ত্র বলতে যা বুঝায় তাকে পাশ্চাত্য সভ্যতার অবদান বলা যায় না।

আরো পড়ুন:  রাজা রামমোহন রায় ছিলেন একজন ভারতীয় সমাজ সংস্কারক

গণতন্ত্র এমন এক শাসনব্যবস্থা, যাকে সুসভ্য মানবসমাজ গড়ে তুলেছে। মানুষ যখনি তার রাজনৈতিক কাঠামো নির্মাণের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করেছে, প্রকৃতপক্ষে তখনই গণতন্ত্রের ধারণা তার অন্তরে জাগ্রত হয়েছে। প্রাচীন যুগেও ভারতীয় সমাজে বিভিন্ন প্রকার গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। বিভিন্ন গোত্রীয় সমাজে প্রচলিত ছিল গোত্রপতি নির্বাচনের প্রথা এবং নগর ও গ্রামসরকার ব্যবস্থাও গণতান্ত্রিক আদর্শের ভিত্তিমূলে প্রতিষ্ঠিত ছিল। বিশেষত পঞ্চায়েত সরকারও গঠিত হতো নির্বাচনের ভিত্তিতে।

স্বাধীনতা প্রসঙ্গে সুভাষ বসু

এরিস্টটলের ন্যায় সুভাষ বসুও মানুষকে সামাজিক জীব হিসাবে দেখেছেন। এরিস্টটল বলেছেন, সমাজবিচ্ছিন্ন মানুষ দেবতা, নয়তো পশু। সুভাষচন্দ্রের মতেও একমাত্র সমাজবাদী বা যুথবদ্ধ মানুষের পক্ষেই আত্মবিকাশ লাভ করা সম্ভব।

“জীবনের সর্বাঙ্গীণ উন্নতি, সার্থক পরিণতি ও পরিপুষ্টির জন্য ব্যক্তি সমাজের উপর নির্ভরশীল। পক্ষান্তরে সমাজও ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে চলতে পারে না। কিন্তু সমাজের উন্নতি ব্যতিরেকে উন্নতি অর্থহীন। সমাজজীবনের প্রেরণা ও আদর্শ হলো স্বাধীনতা। স্বাধীনতার অর্থ সকল প্রকার বন্ধন থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি। মানুষ নির্বিশেষে সকলেরই একটি অধিকার আছে – সে অধিকার হলো নিজেকে বিকশিত করে তোলার অবাধ সুযোগ। সেই সুযোগ দেওয়াটাকেই তিনি স্বাধীনতা বলে মনে করতেন।”[৩]

ভারতের শাসনপদ্ধতির প্রশ্নে সুভাষ বসুর ধারণা স্বচ্ছ ছিল সত্য, কিন্তু তিনি মনে। করতেন যে এ বিষয়ে চিন্তাভাবনার পূর্বে নিজেদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের অধিকার ও স্বাধীনতা অর্জন করা চাই। তিনি স্বাধীনতাকে ব্যাপক অর্থে ব্যবহার করেন। স্বাধীনতা একদিকে যেমন একটি মহান আদর্শ, যা, আমাদের গোটা আত্মাকে শক্তিদান করে, অপরদিকে এর অর্থ সার্বিক মুক্তি অর্থাৎ ব্যক্তির স্বাধীনতা, সমাজের স্বাধীনতা, বিত্তবান ও দরিদ্রের স্বাধীনতা, পুরুষ ও নারীর স্বাধীনতা এবং মানবগোষ্ঠী ও শ্রেণীর স্বাধীনতা। স্বাধীনতা বলতে শুধু রাজনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্তি বুঝায় না, এ দ্বারা আরো বুঝায় সম্পদের সমবণ্টন, বর্ণভেদ ও সামাজিক বৈষম্যের অবসান এবং সাম্প্রদায়িকতা ও পরধর্ম অসহিষ্ণুতার উচ্ছেদ। এই স্বাধীনতা আপাতদৃষ্টিতে ইউটোপিয়ান বা কল্পনাবিলাস মনে হতে পারে, তবে এই আদর্শই আত্মার ক্ষুধা মিটাতে পারে। এই স্বাধীনতাই রাজনৈতিক গণতন্ত্রের সহায়ক। তাছাড়া রাজনৈতিক গণতন্ত্র শুধু গণতান্ত্রিক সমাজে বিকশিত হয়। সমাজে জন্মগত, ধর্ম ও বর্ণগত বৈষম্য বিদ্যমান থাকলে আদর্শ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। এই বৈষম্য দূর করে সকলকে সমান অধিকার দেওয়া আবশ্যক।

আরো পড়ুন:  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাষ্ট্রচিন্তা হচ্ছে বিপ্লববিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল জাতীয়তাবাদী

সংবিধানের রূপরেখা

স্বাধীন ভারতের সংবিধান সম্পর্কে সুভাষচন্দ্র বসু তার মনোভাবের কিছুটা আভাস দিয়েছেন। সুভাষচন্দ্র বসুর রাষ্ট্রচিন্তা মতে স্বাধীন ভারত হবে একটি ফেডারেল রিপাবলিক। নতুন সংবিধানে মানবাধিকারের পবিত্রতা ও অলঘনীয়তার স্বীকৃতি দেওয়া হবে। সংবিধানের ভূমিকায় মানুষের মৌলিক অধিকারসমূহের উল্লেখ থাকবে এবং প্রত্যেক নাগরিক সংবিধানের নির্দেশ অনুযায়ী আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ভোগ করবে। স্বাধীন ভারতে দমনমূলক আইন বলে কিছু থাকবে না। সাধারণ নির্বাচন পরিচালিত হবে যুক্তনির্বাচন পদ্ধতির ভিত্তিতে, তবে সাময়িকভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সমূহের জন্য আইনসভায় আসন সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তিনি অস্বীকার করেন নি। তবে স্বতন্ত্র নির্বাচনকে তিনি একটি স্থায়ী ব্যবস্থা হিসাবে গ্রহণের পক্ষপাতী নন, কারণ তিনি এই পদ্ধতিকে জাতীয় সংহতির পরিপন্থী মনে করেন।

সুভাষ বসু মনে করেন, আমলাতন্ত্রের আধিপত্য কখনো রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের জন্য কল্যাণকর হয় না। সাধারণ নাগরিক সমাজ যাতে সরকারি আমলার হাতে নির্যাতিত না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। এজন্য যা করণীয় তা হলো আমলাতন্ত্রের দুর্গ চূর্ণ করা। সুভাষ বসুর মতে আমলাতন্ত্রের আধিপত্য স্বাধীনতার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে। স্বাধীনতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনবোধে হরতাল অসহযোগ, বয়কট, প্রতিরোধ আন্দোলন এবং এমন কি সংগ্রামের পথ অনুসরণীয়।

কুসংস্কারের বিরোধীতা

কলেজজীবন থেকেই তিনি ছিলেন কুসংস্কারের বাইরে গিয়ে মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী। তিনি সমাজে বিদ্যমান ধর্মীয় কুসংস্কারের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করতে কখনো কুণ্ঠিত হন নি এবং তা করতে গিয়ে যত বেশি বাধাপ্রাপ্ত হয়েছেন ততই বিদ্রোহী হয়ে উঠেছেন। এ সময়ে শ্রী অরবিন্দের গুঢ় অতীন্দ্রিয় দর্শন তার চিন্তা-চেতনায় কিছুটা প্রভাব ফেলেছিল বটে, তবে ইংরেজশাসিত ভারতের বিপন্নদশা তাকে অধিক মাত্রায় পীড়িত করে।[২] তিনি বলেছিলেন, “ধর্মের নামে, দেশের নামে বা রাজনীতির নামে কোনো প্রকার গোঁড়ামি যেন আমাদের শিক্ষা মন্দিরে প্রবেশ করিতে না পারে, সেদিকে আমাদের দৃষ্টি রাখা উচিত।”

তিনি ছিলেন বহুধাবিভক্ত শিক্ষার পরিবর্তে বিজ্ঞানভিত্তিক একমুখী শিক্ষার পক্ষপাতী। তাঁর মানসিকতা বোঝার জন্য আমরা পড়তে পারি এই কথাটুকু যেখানে তিনি লিখছেন,

“ধর্মনিরপেক্ষ ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার আর একদিক দিয়া উপযোগিতা রহিয়াছে— ইহা অর্থনৈতিক চেতনা জাগ্রত করিতে সহায়তা করে। অর্থনৈতিক চেতনার প্রভাব গোঁড়ামির মৃত্যু ঘোষণা করে। একটি মুসলমান কৃষকের সহিত মুসলমান জমিদারের যে মিল, তাহা অপেক্ষা অনেক বেশি মিল রহিয়াছে একটি হিন্দু কৃষকের সহিত একটি মুসলমান কৃষকের। জনসাধারণের অর্থনৈতিক স্বার্থ কোথায় নিহিত রহিয়াছে, তাহা তাহাদের শিখাইতে হইবে এবং একবার তাহা উপলব্ধি করিতে পারিলে তাহারা কখনো সাম্পদায়িক বিরোধে দাবার ছক হইতে সম্মত হইবে না।”

তথ্যসূত্র

১. অনুপ সাদি, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮, “সুভাষচন্দ্র বসু ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/biography/subhas-chandra-bose/
২. Selected Speeches of Subhas Chandra Bose (Intro. S. A. Ayer) (Govt of India, Delhi. 1962) p. 31
৩. সুভাষচেন্দ্র বসু, নতুনের সন্ধান, সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায় কর্তৃক উদ্ধৃত, বাঙালির রাষ্ট্রচিন্তা, দ্বিতীয় খণ্ড, জি এ ই পাবলিশার্স, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৯৬৮, পৃষ্ঠা ১৯২।
৪. সৈয়দ মকসুদ আলী, রাজনীতি ও রাষ্ট্রচিন্তায় বাংলাদেশ, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, দ্বিতীয় পুনর্মুদ্রণ জানুয়ারি ১৯৯৬, পৃষ্ঠা ১৭৬-১৮৩।

Leave a Comment

error: Content is protected !!