ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস বা কংগ্রেস (ইংরেজি: Indian National Congress) হচ্ছে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ভারতের আধুনিক বর্বর রাজনীতিবিদদের একটি গণহত্যাকারী, স্বাধীনতাবিরোধী, প্রতিক্রিয়াশীল, মানবতাবিরোধী অবৈধ সন্ত্রাসী সংগঠন। কংগ্রেসের রাজনৈতিক দর্শনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রতি অবিচল আনুগত্য। তাদের রাজনীতির মূল ভিত্তি ছিল সাম্রাজ্যবাদের চাপিয়ে দেওয়া পরাধীনতাকে মেনে নিয়ে আবেদন, নিবেদন ও সংস্কারের পথে হাঁটা—যার চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শোষণ ও শাসনের পথকে নিষ্কণ্টক করা। প্রকৃতপক্ষে, কংগ্রেস কখনোই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেনি কিংবা ব্রিটিশ শক্তিকে কোনো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেনি; বরং ব্রিটিশ শাসনের সাথে আপস, সহযোগিতা ও সহাবস্থানের মাধ্যমেই তারা তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল।[১]
মূলত ব্রিটিশদের কেনা দাসেরা এই সংগঠনে নেতা হতো। উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, দাদাভাই নওরোজি, বর্বর মোহনদাস গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, সরদার বল্লভভাই প্যাটেলম, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, গণহত্যাকারী জওহরলাল নেহরু, পিশাচিনী ইন্দিরা গান্ধী, সোনিয়া গান্ধী, মল্লিকার্জুন খাড়গে এই দলের নেতা ছিল।
১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের ২৮ ডিসেম্বর বোম্বাইতে প্রধানত অ্যালান অকটেভিয়ান হিউম (১৮২৯-১৯১২) নামে একজন অবসরপ্রাপ্ত সিভিলিয়ানের উদ্যোগে আহুত প্রথম সম্মেলনে কংগ্রেস (সংক্ষেপে) দল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সভাপতিত্ব করেন ব্যারিস্টার উমেশচন্দ্র ব্যানার্জী। কংগ্রেসের চারটি উদ্দেশ্যের কথা তিনি বলেন: ১. বিভিন্ন প্রদেশে দেশোন্নয়নে যুক্ত ব্যক্তিদের পারস্পরিক সংযোগ; ২. জাতিধর্মবর্ণের ঊর্ধ্বে ঐক্যসাধন; ৩. আলোচনার মাধ্যমে দেশের নানাবিধ সমস্যার সমাধানের পথ নিরূপণ ও ৪. রাজনৈতিক উন্নয়নে পরবর্তী বছরের নীতিনির্ধারণ। ৭২ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পশ্চাৎপট সম্পর্কে বিভিন্ন অভিমত আছে, তার অন্যতম হল যে প্রারম্ভিক প্রয়াস হিসেবে বোম্বাই, মাদ্রাজ ও বঙ্গদেশে যে সব আঞ্চলিক দল গঠিত হয়েছিল সেগুলির সমন্বয়ে একটি সর্বভারতীয় দল গঠনের চিন্তা অনেকের মনে দেখা দেয় ; বাস্তবে সেটাই রূপায়িত করেন হিউম। তিনি চেয়েছিলেন নিয়মতান্ত্রিক পথে সরকারের সমর্থনে লোকের রাজনৈতিক চেতনা ও সংঘবদ্ধতা গড়ে তুলতে । হিউমকে পরোক্ষে উৎসাহ দেন ভাইসরয় লর্ড ডাফরিন। কংগ্রেসের প্রথম বাইশ বছর (১৮৮৫-১৯০৮) হিউম তার জেনারাল সেক্রেটারি ছিলেন। পুরোমাত্রায় রাজভক্তি থাকা সত্ত্বেও কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা ইংল্যান্ডের অনেকের মনে একটি বিদ্রোহের সংকেত বলে মনে হয়েছিল। কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পূর্ব ইতিহাসসূত্রে একথাও বলা হয় যে সুরেন্দ্রনাথের নেতৃত্বে কলকাতায় ১৮৮৩ খ্রি ভারত সভা (ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন)-এর আমন্ত্রণে যে জাতীয় সমিতির (ন্যাশনাল কনফারেন্স) অধিবেশন হয় সেটি বঙ্গের বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বিবর্তনধারায় উদ্ভূত হয়। তাতে অন্যান্য প্রদেশের প্রতিনিধিরাও যোগদান করেন। ১৮৮৫ খ্রি বোম্বাইতে প্রথম কংগ্রেস অধিবেশনের একদিন পূর্বে কলকাতায় জাতীয় সমিতির দ্বিতীয় অধিবেশন হয়। জাতীয় সমিতি ছিল কংগ্রেসের আদর্শ। অচিরেই জাতীয় সমিতি কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে যায়।
জাতীয় আন্দোলনের ধারক ও বাহক কংগ্রেসের প্রাক স্বাধীনতা আমলের ইতিহাস মোটামুটি চারটি পর্যায়ে বিভক্ত:
১. ১৮৮৫-১৯০৪: নরমপন্থী (মডারেট) ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পর্ব।
২. ১৯০৫-১৯২০: চরমপন্থীদের উত্থান, স্বদেশী ও হোম রুল আন্দোলন। রৌলট আইন ও সত্যাগ্রহ। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড । মন্টফোর্ড শাসন সংস্কারের মাধ্যমে প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের আংশিক স্বীকৃতি ।
৩. ১৯২০-১৯২৯: গান্ধী প্রদর্শিত খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন। স্বরাজ্য দলের উত্থান। পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব গ্রহণ।
৪. ১৯৩০-১৯৪৭: আইন অমান্য আন্দোলন। লবণ সত্যাগ্রহ। ভারত ছাড় আন্দোলন।
কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশনে সরকারের কাছে দাখিলের জন্য ন’টি সুপারিশ গৃহীত হয়। তন্মধ্যে নিম্নলিখিত পাঁচটি উল্লেখযোগ্য:
১. ভারতের শাসনব্যবস্থার উন্নয়নকল্পে তদন্তের জন্য একটি রয়াল কমিশন নিয়োগ; ২. সেক্রেটারি অব স্টেটের পরামর্শ সভার অবলুপ্তি; ৩. কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইনসভাগুলির ক্ষমতাবৃদ্ধি ও অধিকতর ভারতীয় সদস্য নিয়োগ ৪. ভারতের সামরিক ব্যয় হ্রাস ও ইংল্যান্ডের সঙ্গে সমহারে ব্যয়বণ্টন; ৫. উচ্চপদে কর্মচারী নিয়োগকালে ভারত ও ইংল্যান্ডে একযোগে পরীক্ষা গ্রহণ ও প্রার্থীর ন্যূনতম বয়স বৃদ্ধি করা।
সরকার কংগ্রেসের সুপারিশগুলি অগ্রাহ্য করেন। তা হলেও দেশের ক্রমবর্ধিষ্ণু রাজনৈতিক চিন্তা ও চেতনায় সেগুলি সাড়া জাগায়। কংগ্রেসের কলকাতায় অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় অধিবেশন যথার্থ প্রতিনিধিত্বমূলক হয় ; উপস্থিতির সংখ্যা ছিল ৪৩৪ জন। সভাপতিত্ব করেন দাদাভাই নওরোজি। এবারও কয়েকটি আবেদনমূলক সুপারিশ গৃহীত হয়। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশেষ করে দারিদ্র্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। মাদ্রাজে ১৮৮৭ খ্রি কংগ্রেসের তৃতীয় অধিবেশন হয়। সভাপতি ছিলেন বদরুদ্দীন তৈয়বজি। এই অধিবেশনে স্থির হয় যে কংগ্রেসের কর্মসূচি ও আলোচ্য বিষয়সমূহের খসড়া প্রস্তুতির জন্য একটি ছোট সমিতি গঠিত হবে। উত্তরকালে সেটাই বিষয় নির্বাচনী সমিতিতে পরিণত হয়। দলের একটি নিয়মাবলি প্রস্তুতিরও সিদ্ধান্ত হয়েছিল, কিন্তু সেটা পরবর্তী দু’দশক কালেও সম্পন্ন হয়নি। বদরুদ্দিন তৈয়বজি দেশের মুসলমান সম্প্রদায়কে কংগ্রেসে যোগদানের আহ্বান জানান। কিন্তু সৈয়দ আহমদ, কলকাতার আমির আলি প্রমুখ প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রতিবন্ধকতায় সে আহ্বান বিশেষ ফলপ্রসূ হয়নি ।
আবেদন-নিবেদনের মধ্যে দিয়েই বার্ষিক অধিবেশন সাঙ্গ হত। সারা বছর কংগ্রেসের আর কোনও কাজ থাকত না। যে কারণে বঙ্কিমচন্দ্র, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ অনেকেই কংগ্রেসের সমালোচনা করেন। পশ্চিমি শিক্ষিত উচ্চবিত্ত, কিছু মানুষের মধ্যে কংগ্রেস আবদ্ধ থাকায় হিউম প্রস্তাব করেন যে অতঃপর জন-আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে জনসাধারণকে উৎসাহিত করে তুলতে হবে। ফলে ইংরেজ আমলাবর্গ আরও রুষ্ট হয়ে পড়েন। কারণ সরকার কংগ্রেসকে ইংরেজ শাসনের বিরোধী বলে মনে করত। অবশ্য কংগ্রেসের বিভিন্ন প্রস্তাবের আংশিক স্বীকৃতি ১৮৯২ খ্রি কাউন্সিল সংস্কারের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয় ।
কংগ্রেসের অনুসৃত এতদিনকার নিরুত্তাপ কর্মপন্থায় লোকে ক্রমেই অধৈর্য হয়ে পড়েছিল— নবীনপন্থীদের মধ্যে একটা উগ্র জাতীয়তাবাদী মনোভাব গড়ে উঠতে শুরু করেছিল, যার পিছনে ছিল স্বামী বিবেকানন্দের আধ্যাত্মিক পুনর্জাগরণের আদর্শ এবং মহারাষ্ট্রে টিলকের নেতৃত্বে মুক্তি-আন্দোলনের অনুরূপ কর্মপন্থা। বিপ্লবী চিন্তার পরিচয় অরবিন্দ ঘোষের ‘ইন্দপ্রকাশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত লেখাগুলিতে (১৮৯৩-৯৪) ফুটে ওঠে। উনিশ শতকের শেষ দশক থেকে চরমপন্থী চিন্তার বিস্তার ঘটে। মহারাষ্ট্র ও বঙ্গের ‘জাতীয়তাবাদী’ নামে পরিচিত কর্মীরা মডারেট (নরমপন্থী) নীতির বিপরীত সংগ্রামী কর্মসূচির ভিত্তিতে কংগ্রেসেরই ভিতর থেকে ১৯০৬ খ্রি প্রকাশ্যে একটি গোষ্ঠী গঠন করেন।
নরমপন্থীরা আবেদন নিবেদনের মধ্য দিয়ে ইংরেজেরই পক্ষপুটে ঔপনিবেশিক স্বায়ত্তশাসনের প্রবর্তন চাইতেন । তাঁদের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক আদর্শ, উদারনৈতিক মনোভাব, তথ্যনির্ভর চিত্তা ও বাস্তববোধের প্রাধান্য ছিল। নওরোজি, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, ফিরোজশাহ মেটা, গোপালকৃষ্ণ গোখলে প্রমুখ নেতৃবৃন্দ তাদের পুরোভাগে ছিলেন। পক্ষান্তরে লাজপত রায়, বাল গঙ্গাধর টিলক, বিপিনচন্দ্র পাল (লাল-বাল-পাল) ও অরবিন্দ প্রমুখ চরমপন্থীরা ছিলেন খাঁটি স্বাদেশিকতায় অনুপ্রাণিত ; তাঁরা চাইতেন আপসহীন প্রতিরোধ ও পূর্ণ স্বাধীনতা। আধ্যাত্মিক জাতীয়তাবাদকে তাঁরা হিন্দু পুনর্জাগরণে পরিমিশ্রিত করেন।
বোম্বাই কংগ্রেসে (১৯০৪) চরমপন্থীদের অস্তিত্ব প্রথম অনুভূত হয়; তাঁরা চেয়েছিলেন জাতীয় আবেগের ভিত্তিতে আরও প্রত্যক্ষ ও সংগ্রামী কর্মপন্থা; কিন্তু তখন তাঁরা সংখ্যায় নগণ্য, শক্তিতে ক্ষীণ। কলকাতা কংগ্রেসে (১৯০৬) চরমপন্থীরা অধিবেশন ছেড়ে বেরিয়ে এলেও তাঁদের চাপে চারটি বিষয়ের অনুমোদনে নরমপন্থীরা সম্মত হন, যথা স্বরাজ, জাতীয় শিক্ষা, স্বদেশি পণ্যের ব্যবহার ও বিদেশি বস্তু বয়কট । সুরাট কংগ্রেসে (১৯০৭) নরম ও চরমপন্থীদের বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) বিরোধী আন্দোলনের ফলে দেশের যুবশক্তি সন্ত্রাসবাদ ও বিপ্লবী কর্মনীতি গ্রহণ করে । সরকারি দমননীতি ও নিপীড়নও বৃদ্ধি পায়। অরবিন্দ কারারুদ্ধ হন। টিলক বর্মায় কারারুদ্ধ, লাজপৎ ও বিপিনচন্দ্র পাল দেশ থেকে নির্বাসিত হন । সরকার ফৌজদারি আইন সংস্কার ও চরমপন্থী রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার করে (১৯০৮)। এরপর মর্লে-মিন্টো শাসনব্যবস্থা (১৯০৯) প্রবর্তিত হয় ।
সুরাট অধিবেশনের (১৯০৭) পর কংগ্রেসে ভাঙন ধরেছিল। চরমপন্থী গোষ্ঠীর অস্তিত্ব যেমন নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, তেমনই নরমপন্থী চালিত কংগ্রেস হীনবল হয়ে পড়েছিল। কিন্তু ১৯১৬ খ্রি লখনৌ কংগ্রেসে আবার ঐক্য দেখা দেয়। নরম ও চরমপন্থীদের মধ্যে সৌহার্দ ফিরে আসে। এই সময় টিলক ও অ্যানি বেসান্ত প্রবর্তিত হোম রুল আন্দোলন-এর ফলে বেসান্তের উপর অন্তরীণ আদেশ জারি হয় । তখন প্রথম বিশ্ব-মহাযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) চলছিল, দেশের জাতীয় চেতনাও ক্রমশ উন্মোচিত হচ্ছিল। নরমপন্থী নেতৃত্বের শক্তিও ক্ষীণ হয়ে এসেছিল। জাতীয় আন্দোলনের মত ও পথও নতুনতর রূপ পরিগ্রহ করে। ১৯১৯ খ্রি রৌলট আইন, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যা ও মন্টেগু-চেমসফোর্ড শাসন সংস্কারের ত্রিবিধ অভিঘাতে জাতীয়তাবাদী শক্তি নবোদ্যমে দানা বাঁধে ।
১৯২০ খ্রি মহাত্মা গান্ধী খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেন । ‘সহযোগিতা বর্জন নীতি’র অন্যতম বিষয় জাতীয় বিদ্যালয় স্থাপন, সালিশি আদালত প্রতিষ্ঠা ও কাউন্সিল বর্জন নীতি চিত্তরঞ্জন দাশ, বিপিনচন্দ্র পাল প্রমুখ অনেকে প্রথমে মেনে নিতে পারেননি। কংগ্রেসের ওই বছরে নাগপুর অধিবেশনের পর অসহযোগ আন্দোলন ব্যাপক হয়ে ওঠে। স্কুলকলেজ বর্জন, বিদেশি পণ্য বয়কট প্রভৃতি বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ সমালোচনা করেন। চৌরিচৌরা হত্যাকাণ্ড (১৯২২) ও বিপথগামিতার জন্য গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন। গয়া কংগ্রেসে (১৯২২) সভাপতি চিত্তরঞ্জন দাশ কাউন্সিল প্রবেশের প্রস্তাব করেন। সে প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায় ও কংগ্রেসের ভিতর অসহযোগ নীতির পক্ষে ও বিপক্ষে দুটি প্রবল গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। বিপক্ষ গোষ্ঠীর প্রধান নেতা চিত্তরঞ্জন, মোতিলাল নেহরু, লাজপত রায় কংগ্রেসেরই ভিতর স্বরাজ পার্টি গঠন করেন। ১৯২৪ খ্রি প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় আইনসভায় স্বরাজ পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কোকোনাদ কংগ্রেসে (১৯২৩) স্থির হয় যে স্বরাজ পার্টি কংগ্রেসের অঙ্গ হিসেবে কাউন্সিলে তার কর্মসূচি অনুসরণ করে চলবে। কুড়ির দশকের মাঝামাঝি সময়ে কংগ্রেস তথা জাতীয় আন্দোলনে ভাঁটা পড়ে। তবে এই দশকে বামপন্থী শক্তির প্রসার ঘটে। ট্রেড ইউনিয়নের ক্রমবিস্তার ও কৃষক আন্দোলন গড়ে উঠতে থাকে। মানবেন্দ্রনাথ রায় বার্লিন থেকে পত্রপত্রিকা ও চিঠিপত্রের মাধ্যমে এবং দূত মারফৎ ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলন সংগঠিত করেন ।
১৯২৭ খ্রি ব্রিটিশ সরকার প্রেরিত সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলনের ফলে কংগ্রেস আবার প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। ওই বছরে কংগ্রেসের মাদ্রাজ অধিবেশনে জওহরলাল-এর প্রস্তাবে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি উত্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই সময়ের কিছু আগে জওহরলাল ইউরোপে সমাজতন্ত্রীদের সম্মেলনে যোগদান ও সোভিয়েত দেশ ভ্রমণ করে নতুন উদ্যম নিয়ে স্বদেশে ফিরে আসেন, পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাবে গান্ধীজির সায় ছিল না। তাই পরবর্তী কলকাতা অধিবেশনে (১৯২৮) কংগ্রেস ডোমিনিয়ন স্টেটাস অর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। ব্রিটিশ সরকারের অনমনীয়তা ও যুবকর্মীদের অসন্তোষের ফলে লাহোর অধিবেশনে (১৯২৯) পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব গৃহীত হয়। গান্ধীজি বড়লাট আরউইনের কাছে ১১ দফার একটি দাবি সনদ প্রেরণ করেন (৩০ জানুয়ারি ১৯৩০)। সেগুলি ছিল মাদকবস্তু নিষিদ্ধকরণ, ১৬ পেন্সে ১ টাকার বিনিময় হার প্রবর্তন, ভূমি রাজস্বের ৫০ শতাংশ হ্রাস, লবণ শুল্ক রদ, ৫০ শতাংশ সামরিক ব্যয় হ্রাস, সরকারি ব্যয় ও আমলাদের বেতন হ্রাস, বিদেশি বস্ত্রের উপর আমদানি শুল্ক আরোপ, উপকূলবর্তী পরিবহণে কেবল ভারতীয় জাহাজ ব্যবহার, রাজবন্দিদের মুক্তি ও ইন্ডিয়ান পেনাল কোডের সংশোধন, গোয়েন্দা বিভাগের অবলুপ্তি ও আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অধিকার প্রদান ।
সরকার উল্লিখিত দাবিসমূহ মানতে অস্বীকার করেন। ১৯৩০ খ্রি ২ মার্চ তারিখের এক চিঠিতে গান্ধীজি সত্যাগ্রহ ও আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করবেন বলে জানান । ১২ মার্চ তিনি ৭৮জন সঙ্গীকে নিয়ে লবণ আইন ভাঙার জন্য ডাণ্ডি অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করেন। অতঃপর সারা দেশে লবণ আইন ভঙ্গ শুরু হয়ে যায়। গান্ধী গ্রেপ্তার হন। মধ্যস্থদের প্রয়াসে গান্ধী এবং ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যরা ১৯৩১ খ্রি ২৫ জানুয়ারি জেল থেকে মুক্তি পান। বড়লাট আরউইনের সঙ্গে কংগ্রেস নেতাদের আলোচনার পর ৫ মার্চ গান্ধি-আরউইন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় । তাতে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে ছিল সাত দফা চুক্তিতে সমস্ত রাজবন্দির মুক্তি, অর্ডিন্যান্সগুলির প্রত্যাহার, বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি মালিকদের প্রত্যার্পণ এবং কিছু কিছু অঞ্চলে লবণ আইন শিথিল হবে। কংগ্রেস সত্যাগ্রহ প্রত্যাহার করে।
২৩ মার্চ ১৯৩১ বিপ্লবী ভগৎ সিং, শুকদেব ও রাজগুরুর ফাঁসি হয়। ২৯ মার্চ করাচিতে অস্বস্তিকর পরিবেশে কংগ্রেসের অধিবেশন বসে। মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার ও অর্থনৈতিক বিধিব্যবস্থা সংক্রান্ত প্রস্তাবাবলি গৃহীত হয়। এরপর গান্ধীজি লন্ডনে দ্বিতীয় রাউন্ড টেবল কনফারেন্সে যোগদান করেন। গান্ধীজির বক্তব্য বিশেষ করে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি ফলপ্রসূ হয়নি। ১৯৩২ খ্রি ১০ জানুয়ারি ওয়ার্কিং কমিটি আইন অমান্য আন্দোলনের ১২ দফা কর্মসূচি গ্রহণ করে। সরকার সত্যাগ্রহীদের গ্রেপ্তার করে দমননীতি চালায়। ১৯৩২ খ্রি এপ্রিল পর্যন্ত ৮০,০০০ সত্যাগ্রহী গ্রেপ্তার হন। তার মধ্যে ৫০০০ জন ছিলেন নারী সত্যাগ্রহী ।
ইতিমধ্যে ৪ অগস্ট ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী র্যামসে ম্যাকডোনাল্ড পুরানো সম্প্রদায়ভিত্তিক পৃথক নির্বাচক মণ্ডলীর নীতি বজায় রেখে হরিজনদের জন্যও ওই একই প্রথা প্রসারের সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। গান্ধীজি তখন পুনায় কারারুদ্ধ। নব্যনীতির প্রতিবাদে ২০ সেপ্টেম্বর থেকে আমরণ অনশন শুরু করেন। ২৫ সেপ্টেম্বর জাতীয় নেতৃবৃন্দ ও তফসিলিদের মুখপাত্র বি আর অম্বেডকরের সমবেত প্রচেষ্টায় মিটমাট হয়। হরিজনদের জন্য প্রস্তাবিত আসনসংখ্যা দ্বিগুণ নির্ধারিত হয়, কিন্তু যৌথ নির্বাচকমণ্ডলীর ভিত্তিতে। এদিকে আইন অমান্য আন্দোলনও চলেছিল। সরকারি দমনমূলক ব্যবস্থা তীব্র হয়ে ওঠে। গান্ধীজি ১৯৩৩ খ্রি ৮ মে তারিখ থেকে আত্মশুদ্ধিকল্পে অনশন শুরু করেন। ওই দিনই সরকার তাঁকে জেল থেকে মুক্তি দেয়। জেলের বাইরে তিনি আমরণ অনশন চালিয়ে যান। ১৪ জুলাই আইন অমান্যের গণ-আন্দোলন মুলতুবি রেখে ব্যক্তিগত সত্যাগ্রহ চালানোর সিদ্ধান্ত হয় । সে অধিকার কেবল গান্ধীকেই দেওয়া হয়। তাতে কংগ্রেসের যুবকর্মীরা রুষ্ট হন। ১৯৩৪ থ্রি মে মাসে পাটনায় অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির অধিবেশনে নিয়মতান্ত্রিক পথ অনুসরণ ও নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত হয় ।
১৯৩৪ খ্রি শেষ দিকে গান্ধীজি কংগ্রেসের সদস্যপদ ত্যাগ করে হরিজনদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৃত হন। ভারত শাসন আইন (১৯৩৫) অনুযায়ী ১৯৩৭ খ্রি সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেস সাতটি প্রদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও মন্ত্রিসভা গঠনের বিষয়ে কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট জওহরলাল ও বামপন্থী গোষ্ঠী সমূহের আপত্তি ছিল। ব্যতিক্রম মানবেন্দ্রনাথ, তিনি চাইতেন আইনসভার ভিতরে থেকে অচলাবস্থার সৃষ্টি। গান্ধীজির প্রভাব ও বড়লাটের হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দেবার ফলে মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। ১৯৩৪ খ্রি মে মাস থেকে ১৯৪০ খ্রি অবধি কংগ্রেসের কোনও সংগ্রামী ভূমিকা ছিল না। বামপন্থীরা চাইতেন আন্দোলন অবিলম্বে শুরু হোক, কিন্তু সংগ্রামবিমুখ গান্ধীজির নেতৃত্বে। মানবেন্দ্রনাথ চাইতেন গান্ধী ও দক্ষিণপন্থীদের বিকল্প বাম নেতৃত্ব গড়ে তুলতে। ১৯৩৯ খ্রি দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হয়ে সুভাষচন্দ্র যখন গান্ধীজির মতামত অনুসারে ওয়ার্কিং কমিটি গঠনে বার্থ হন, তখন মানবেন্দ্রনাথ সুভাষচন্দ্রকে নিজ ক্ষমতা ও পরিস্থিতি অনুযায়ী অগ্রসর হবার পরামর্শ দেন। সুভাষচন্দ্র তার পরিবর্তে পদত্যাগ করে ফরওয়ার্ড ব্লক গড়লেন । রায় লিগ অব র্যাডিক্যাল কংগ্রেসমেন গড়লেন। ১৯৩৯ খ্রি অক্টোবরে কংগ্রেস সাতটি প্রদেশ থেকে মন্ত্রিসভা প্রত্যাহার করে নেয় সরকারের যুদ্ধনীতির প্রতিবাদে। এ ব্যাপারেও মানবেন্দ্রনাথ বলেছিলেন যে প্রাদেশিক শাসনের ক্ষমতায় থেকে ইংরেজদের সঙ্গে সংগ্রাম বেশি কার্যকর হবে। মন্ত্রিসভা ছাড়ার ফলে ইংরেজ সরকার মুসলিম লিগের উপর যুদ্ধের প্রয়োজনে নির্ভর করতে বাধ্য হয়। লিগের তখন শক্তি ও সমর্থন ছিল নগণ্য।
দ্বিতীয় বিশ্ব মহাযুদ্ধে কংগ্রেস প্রথম দিকে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। জওহরলাল, আজাদ প্রমুখ কিছু নেতা নিঃশর্তে ফ্যাসিবিরোধী মিত্রশক্তির পক্ষ গ্রহণের সমর্থক ছিলেন । গান্ধী দোলাচল চিন্তায় আশু স্বাধীনতার দাবিতে ব্যক্তিগত সত্যাগ্রহের নির্দেশ দিলেন । অনেক নেতাই গ্রেপ্তার হলেন। কংগ্রেস সোসালিস্ট পার্টি, কমিউনিস্ট ও অন্যান্য বামপন্থী দল দ্বিতীয় বিশ্বমহাযুদ্ধকে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ হিসেবে বিচার করে মুক্তি সংগ্রামের পক্ষপাতী ছিলেন। যুদ্ধের সুযোগে ও বৈদেশিক সাহায্যের আশায় সুভাষচন্দ্র গোপনে জার্মানি চলে যান এবং পরে জাপানের সাহায্যে আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। যুদ্ধের ফ্যাসিবিরোধী চরিত্রে বিশ্বাসী মানবেন্দ্রনাথ মিত্রপক্ষকে সমর্থন করেন। যুদ্ধে মিত্রপক্ষের পরাজয় বিশ্বে গণতন্ত্রের সমাধি রচনা করবে এবং জয় হলে যুদ্ধের শেষে ভারতের জাতীয় স্বাধীনতা অনিবার্য বলে তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন। মিত্রপক্ষকে অনুরূপ সমর্থনের পক্ষপাতী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, শ্রীঅরবিন্দ, রাজাগোপালাচারি, অম্বেডকর প্রমুখ ব্যক্তি।
১৯৪২ খ্রি মার্চ মাসে ব্রিটিশ সরকার যুদ্ধে কংগ্রেসের সহযোগিতার আশায় স্ট্যাফোর্ড ক্রিপসকে ভারতে পাঠান। শাসনব্যবস্থায় অধিকতর সুযোগ-সুবিধা সংবলিত যে সব প্রস্তাব ক্রিপস উপস্থাপিত করেন সেগুলি নিয়ে কংগ্রেস, মুসলিম লিগ, হিন্দু মহাসভা প্রভৃতি দল পৃথকভাবে ক্রিপসের সঙ্গে সবিস্তারে আলোচনা করেন। কিন্তু যুদ্ধ সমাপ্তির পূর্বে যথার্থ ক্ষমতা হস্তান্তরের সম্ভাবনা না থাকায় ক্রিপসের সঙ্গে কংগ্রেসের আলোচনা ভেঙে যায়। ক্রিপস প্রস্তাব মেনে নেওয়ার জন্য মানবেন্দ্রনাথ জওহরলালকে অনুরোধ করেছিলেন । সে অনুরোধ রক্ষিত হলে যুদ্ধোত্তর ভারত বিভাগ হয়তো এড়ানো যেত। ১৯৪২ খ্রি ৮ অগস্ট বোম্বাইতে নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির অধিবেশনে অবিলম্বে দেশব্যাপী অহিংস সংগ্রাম শুরু করার সিদ্ধান্ত এবং গান্ধীকে সেই ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলন পরিচালনের নেতৃত্ব প্রদত্ত হয়। সারা দেশের অনেক জায়গায় শাসন ক্ষমতা সরকারের আয়ত্বের বাইরে চলে যায়। জনগণ বিক্ষোভ, ধর্মঘট ও ধ্বংসাত্মক ক্রিয়াকলাপে লিপ্ত হয়। এদিকে জাপানি বাহিনী তখন পূর্ব সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করছে। ইংরেজ সরকার কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ সমেত ষাট হাজার ব্যক্তিকে কারারুদ্ধ করেন। মাস তিনেক পরে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে। জয়প্রকাশ নারায়ণের উক্তি অনুযায়ী প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও নেতৃত্বের অভাবে ভারত ছাড় কার্যত ব্যর্থ হয়ে যায়। ১৯৪৪ খ্রি মে মাসে গান্ধীজি মুক্তি পান। অন্যেরা যুদ্ধ শেষ হবার পর মুক্ত হন । তার অনতিকাল পরে আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনানীদের বিচার ও নৌবিদ্রোহ সূত্রে দেশে প্রবল আন্দোলন দেখা দেয়। ১৯৪৬ খ্রি গোড়ায় সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেস সফল হয়, কিন্তু মুসলিমদের সংরক্ষিত আসনে লিগ সাফল্য লাভ করে।
যুদ্ধের পর ব্রিটেনের নির্বাচনে শ্রমিক দল ক্ষমতাসীন হয়। ১৯৪৫ খ্রি জুন মাসে নতুন ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেল সিমলায় এক সর্বদলীয় বৈঠকে বড়লাটের একজিকিউটিভ কাউন্সিলের পুনর্গঠনের প্রস্তাব দেন। কংগ্রেস ও লিগের ঐকমত্যের অভাবে ওয়াভেল প্রস্তাব ভেস্তে যায়। ১৯৪৬ খ্রি ২৩ মার্চ ব্রিটেন থেকে তিন সদস্যের এক ক্যাবিনেট মিশন ভারতে আসে এবং দীর্ঘমেয়াদী একটি ফেডারেশন গঠন ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার—এই দু ধরনের শাসন ব্যবস্থার প্রস্তাব করে, মিশনের প্রস্তাবানুসারে ১৯৪৬ খ্রি জুলাই মাসে গণপরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন হয়। ক্যাবিনেট মিশনের মূল প্রস্তাবে লিগের খুব বেশি আপত্তি ছিল না। কিন্তু জওহরলাল এক সাংবাদিক সম্মেলনে মূল প্রস্তাবের দীর্ঘমেয়াদী ফেডারেশনের বিষয় গণপরিষদে নিষ্পত্তি হবে বলে মন্তব্য করায় লিগ রুষ্ট হয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে যোগদান থেকে বিরত থাকে এবং প্রত্যক্ষ সংগ্রামের কর্মসূচি গ্রহণ করে। ফলে দেশব্যাপী তীব্র সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। অবশেষে অক্টোবরে লিগ অন্তর্বর্তী সরকারে যোগ দেয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী প্রস্তাব অনুসারে গণপরিষদের ব্যাপারে প্রদত্ত সম্মতি প্রত্যাহার করে। ডিসেম্বর মাস থেকে গণপরিষদ বসে, লিগ তাতে যোগ দেয়নি। ওয়াভেল, নেহরু, জিন্না ও বলদেব সিং সেক্রেটারি অব স্টেটের আমন্ত্রণে লণ্ডনে যান। লিগ দেশবিভাগের দাবি তোলে । কংগ্রেস আপত্তি জানায়।
১৯৪৭ খ্রি ফেব্রুয়ারি মাসে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যাটলি ভারতে পরবর্তী বছরের মধ্যে শাসনক্ষমতা হস্তান্তরের কথা ঘোষণা করেন। মার্চ মাসে ওয়াভেলের জায়গায় ভাইসরয় পদে মাউন্টব্যাটেন যোগ দেন এবং জুন মাসে ঘোষণা করেন যে, ১৫ অগস্ট তারিখে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রে দেশ বিভক্ত হবে। কংগ্রেস সে প্রস্তাব মেনে নেয়। স্বাধীন ভারতের শাসনক্ষমতা কংগ্রেস দলের হাতে প্রদত্ত হয়। ১৯৪৮ খ্রি জানুয়ারি মাসে গান্ধীজি প্রস্তাব করেন যে কংগ্রেসের রাজনৈতিক আদর্শ চরিতার্থ হয়ে যাবার পর দলের অস্তিত্ব বজায় রাখা নিষ্প্রয়োজন, কংগ্রেস তুলে দিয়ে তার সদস্যদের গঠনমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করা বাঞ্ছনীয়। গান্ধীর সে নির্দেশ নিষ্ফল হয়।
কংগ্রেস এযাবৎকাল একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করত। অতঃপর তার মতাদর্শ ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা নষ্ট হতে শুরু করে। কমিউনিস্ট ও কংগ্রেস সোসালিস্ট ও অন্যান্য বামপন্থী দল কংগ্রেস থেকে পৃথক হয়ে যায়। প্রায় একই সময়ে কংগ্রেসে ব্যক্তিত্বের লড়াই, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও আদর্শগত সংঘাত মাথা চাড়া দেয়। আচার্য কৃপালনী, প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ, রফি আহমেদ কিদোয়াই প্রমুখ প্রবীণ নেতারা সর্দার প্যাটেলের একাধিপতো পর্যুদস্ত হয়ে কংগ্রেস ছেড়ে কৃষক প্রজা মজদুর পার্টি গঠন করেন। প্যাটেলের মৃত্যুর (১৯৫১) পর জওহরলালের একাধিপত্যের অধ্যায় শুরু হয়। ১৯৫৫ খ্রি কংগ্রেসের আবাদি অধিবেশনে সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কর্মসূচি গৃহীত হয়। জওহরলাল তাঁর পথকে নিষ্কণ্টক করার জন্য কামরাজ প্ল্যান নাম দিয়ে কিছু সংখ্যক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীকে গদিচ্যুত করেন।
১৯৬৬ খ্রি শুরু হয় ইন্দিরা গান্ধীর যুগ। মোরারজি দেশাইকে প্রতিহত করার জন্য কামরাজের নেতৃত্বে সিন্ডিকেট নামে অভিহিত কিছু সংখ্যক নেতার এক গোষ্ঠী ইন্দিরাকে প্রধানমন্ত্রী ও মোরারজিকে উপপ্রধানমন্ত্রী করেন। মোরারজির অর্থদপ্তর সরিয়ে নিয়ে ইন্দিরা ১৯৬৯ খ্রি জুলাই মাসে ১৪ টি ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ করেন। অতঃপর কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট নিজলিঙ্গাপ্পা তথা সিন্ডিকেটের সঙ্গে ইন্দিরার বিরোধ শুরু হয়। কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি দু’ ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। ইন্দিরা বিরোধী সিণ্ডিকেট নেতৃবৃন্দ কংগ্রেস থেকে তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে কংগ্রেস মনোনীত প্রার্থী সঞ্জীব রেড্ডির পরাজয়ের জন্য ১৯৬৯ খ্রি ১২ নভেম্বর বহিষ্কৃত করে। কিন্তু দুই তৃতীয়াংশ সমর্থনের অভাবে লোকসভায় তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়নি। অচিরে কংগ্রেস দল বন্ধনীতে সংগঠন ও ইন্দিরা সমর্থকেরা বন্ধনীতে শাসকদল হিসেবে দু টুকরো হয়ে যায়। লোকসভা ভেঙে দিয়ে ১৯৭১ খ্রি নির্বাচনে গাইবাছুর প্রতীক চিহ্নে ইন্দিরা নিরঙ্কুশ ক্ষমতা লাভ করেন। সত্তরের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে ইন্দিরা বিরোধী পরিবেশ প্রবল হয়ে ওঠে। শ্রীমতী গান্ধী ১৯৭৫ খ্রি ২৬ জুন দেশে এমার্জেন্সি ঘোষণা করেন এবং ১৬ জুলাই থেকে বিশ দফা এক কর্মসূচি গ্রহণ করেন। ১৯৭৭ খ্রি নির্বাচনে দিল্লীর মসনদ থেকে কংগ্রেস প্রথম ক্ষমতাচ্যুত হয়। ইন্দিরাবিরোধী কংগ্রেসের যে অংশ বন্ধনীতে সংগঠন শব্দটি ব্যবহার করত অর্থাৎ কংগ্রেস (স) সেটি নবগঠিত জনতা পার্টিতে মিশে গিয়েছিল। কেন্দ্রীয় সরকার থেকে ক্ষমতাচ্যুত ইন্দিরা পক্ষীয় কংগ্রেসের (শাসক) সভাপতি ব্রহ্মানন্দ রেড্ডি ও ওয়ার্কিং কমিটি বিভিন্ন কারণ দর্শিয়ে দল থেকে ইন্দিরাকে বহিষ্কার করে। কিন্তু লোকসভায় দলের সাংসদেরা ছিলেন ইন্দিরার পক্ষে। প্রধানত তাদের নিয়ে দিল্লিতে ১৯৭৮ খ্রি ২ জানুয়ারি এক জাতীয় কনভেনশনে অপর একটি কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়। ইন্দিরা তার সভাপতি পদে নির্বাচিত হন। ইন্দিরার নাম বন্ধনীতে যুক্ত হয়ে দলের নামকরণ হয় কংগ্রেস (ই)। নির্বাচন কমিশন থেকে স্বীকৃতি ও নির্বাচনী প্রতীক পাঞ্জা চিহ্ন প্রদত্ত হয়। ১৯৮০ খ্রি ১৪ জানুয়ারি ৩৩ মাস পরে কংগ্রেস (ই) লোকসভায় দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা পেয়ে ইন্দিরার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে।
১৯৮৪ খ্রি ৩১ অক্টোবর দেহরক্ষীদের হাতে ইন্দিরা নিহত হবার পর তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হন; তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বে কংগ্রেস (ই) ১৯৮৯ খ্রি নভেম্বর মাস অবধি কেন্দ্রীয় শাসনক্ষমতায় থাকে। তারপর ১৯৯১ খ্রি জুন অবধি প্রায় উনিশ মাস ছেদ পড়ে। জুলাই মাসে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে কংগ্রেস দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফিরে এল, এবারে অবশ্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছাড়াই। সর্বসম্মতিক্রমে প্রধানমন্ত্রী পদে নির্বাচিত হয়েছেন দক্ষিণ ভারতীয় পি. ভি. নরসিমা রাও। কংগ্রেস যে শুধু একটি পারিবারিক কুক্ষি থেকে বেরিয়ে এসেছে তাই নয়, দেশের ভগ্নপ্রায় অর্থনৈতিক জীবনের পুনরুজ্জীবনের জন্য দল নেহরুপন্থী সমাজতন্ত্রী পথ কার্যত পরিত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জাতীয় স্বাধীনতার পর কংগ্রেস থেকে অনেক গোষ্ঠী ও প্রবীণ ব্যক্তি দল আগ করে নতুন দল তৈরি করেন। অথবা ভিন্ন দলে যোগ দেন। কিন্তু ১৯৬৯ খ্রি ইন্দিরা গান্ধী যখন কংগ্রেসে ভাঙন ধরান, তখন তাঁর গোষ্ঠী ছিল শাসক গোষ্ঠী এবং সেটাই ক্রমে জাতীয় কংগ্রেসে পরিণত হয়। এরপর যাঁরা ভাঙন ধরান তাঁরা কংগ্রেসের পরিচিতি হারান। ১৯৭৭ খ্রি জগজীবন রামের নেতৃত্বে যে কংগ্রেস ফর ডেমোক্রেসি গঠিত হয় সেটি পরে জনতা পার্টিতে মিশে যায়। ১৯৭৮ খ্রি দেবরাজ আরসের নেতৃত্বে যে কংগ্রেস (আরস) গঠিত হয় সেটি পরে কংগ্রেস (স) নামে অস্তিত্ব রক্ষা করে। ১৯৮৮ খ্রি ভি পি সিং, অরুণ নেহরু, আরিফ মহম্মদ প্রমুখ নেতারা কংগ্রেস ছেড়ে জনমোর্চা গঠন করেন ও জনতা দলে যোগ দেন। ১৯৯৫ খ্রি বিভিন্ন রাজ্যে কংগ্রেসের বিক্ষুব্ধ বহু গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়। অর্জুন সিং ও নারায়ণ দত্ত তেওয়ারির নেতৃত্বে পালটা এক গোষ্ঠী নিজেদের আসল কংগ্রেস হিসেবে দাবি করছে। তাতেও কিছু অনৈক্যের লক্ষণ ফুটে উঠছে। তবে দল ও শাসনক্ষমতা নিজেদের হাতে না থাকায় তাঁদের পাল্লা বেশি ভারী নয়।[২]
আরো পড়ুন
- তসলিমা নাসরিন ও বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর: মুক্তমনাদের সংকীর্ণতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতার ব্যবচ্ছেদ
- সিপিআই হচ্ছে ভারতের ভুয়া কমিউনিস্ট গণতন্ত্রবিরোধী সংগঠন
- কংগ্রেস সােসালিস্ট পার্টি ছিলো কংগ্রেসের মধ্যে একটি সমাজতান্ত্রিক দল
- সিপিআই (এম) সাম্য ও স্বাধীনতাবিরোধী গণশত্রুদের পার্টি
- গদর আন্দোলন ছিলো একটি বিপ্লবী আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক আন্দোলন
- এসইউসিআই (সি) ভারতের সমাজ-গণতন্ত্রী রাজনৈতিক সংগঠন
- এআইএডিএমকে ভারতের তামিলনাড়ুর প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দল
- ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস হচ্ছে স্বাধীনতাবিরোধী গণশত্রুদের সংগঠন
- অকালি দল বা শিরোমণি অকালি দল ভারতের একটি রাজনৈতিক দল
- বিজেপি ভারতের জনগণ, গণতন্ত্র ও মানবতা বিরোধী সংগঠন
- জনতা দল ছিল ভারতীয় প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দল
- যুগান্তর দল বা যুগান্তর সমিতি ছিল বাংলার গোপন বিপ্লববাদী সংস্থা
- অনুশীলন সমিতি ছিল বাংলার বিপ্লববাদী রাজনৈতিক সংগঠন
তথ্যসূত্র:
১. সৈয়দ আবুল কালাম, রাজনীতির রবীন্দ্রনাথ, বাঙ্গালা গবেষণা, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০২৫, পৃষ্ঠা ৩২
২. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, প্রথম সংস্করণ, জানুয়ারি ১৯৯৭, পৃষ্ঠা ২২২-২২৯।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚