আইনশাস্ত্র বা বিধিশাস্ত্র (ইংরেজি: Jurisprudence), যা আইন তত্ত্ব বা আইনের দর্শন নামেও পরিচিত, হচ্ছে আইন কী এবং এটি কী হওয়া উচিত তার একটি সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে পরীক্ষা। এটি আইনের সংজ্ঞা; আইনি বৈধতা; আইনি নিয়ম ও মূল্যবোধ; এবং আইন ও অর্থনীতি, নীতিশাস্ত্র, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান এবং রাজনৈতিক দর্শনসহ অধ্যয়নের অন্যান্য ক্ষেত্রগুলির মধ্যে সম্পর্কের মতো বিষয়গুলি অন্বেষণ করে। অর্থাৎ আইনশাস্ত্র হচ্ছে আইনের উৎপত্তি, প্রকৃতি ও বিকাশ সংক্রান্ত তত্ত্বগত বিদ্যা।[১]
ত্রয়ােদশ থেকে উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত প্রত্যয়টিকে প্রাকৃতিক আইন হিসেবে দেখা হতো এবং মনে করা হতো যে প্রাকৃতিক আইনের পিছনে থাকে দিব্য নির্দেশ।
আধুনিক আইনশাস্ত্র আঠারো শতকে শুরু হয়েছিল এবং প্রাকৃতিক আইন, নাগরিক আইন এবং জাতিসমূহের আইনের প্রথমদিকের নীতিগুলির উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীতে নানারকম তত্ত্ব গড়ে ওঠে যে আইনের ভিত্তি সার্বভৌম কর্তৃত্বের বিধিবিধান।
সমসাময়িক আইনের দর্শন আইন এবং আইনি ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলি সমাধান করে এবং একই সাথে আইনের সমস্যাগুলিকে একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিবেচনা করে। আবার এসব আইনের সমস্যা বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের সাথে সম্পর্কিত থাকে।
আবার অন্যমতে আইন হলো সংস্কৃতি ও প্রথাগত বিধান যার পিছনে ধর্ম বা নৈতিকতার কোনও ভূমিকা থাকে না। আইন সম্পর্কে অন্যান্য তাত্ত্বিকেরা কেউ কেউ মনে করেন যে আইনের পিছনে থাকে ঐতিহাসিক কার্যকারণ, অর্থাৎ বিবর্তনের ধারায় আইন রচিত হয়। কারও দৃষ্টিতে সমাজতাত্ত্বিক কার্যকারণ, অর্থাৎ জাতি ও সমাজের আধিপত্যশীল ধারায় আইন গড়ে ওঠে।[২]
আইনশাস্ত্রের কাজ আইন নিয়ে নয়, আইনের দার্শনিক ভিত্তিভূমির বর্ণনা ও বিশ্লেষণ, অর্থাৎ আইনের অন্তর্নিহিত অধিকার, বাধ্যবাধকতা, দায়দায়িত্ব, ন্যায়বিচার ইত্যাদি প্রত্যয়ের অর্থ ও সঙ্গতি প্রদর্শন করা।
প্রাকৃতিক আইন
প্রাকৃতিক আইন বিশ্বাস করে যে শাসকদের ক্ষমতার যুক্তিসঙ্গত বস্তুনিষ্ঠ সীমা রয়েছে, আইনের ভিত্তি প্রজ্ঞার মাধ্যমে সুগমযোগ্য, এবং প্রকৃতির এই নিয়মগুলি থেকেই মানব আইনগুলি শক্তি লাভ করে। প্রাকৃতিক আইনের নৈতিক তত্ত্ব দাবি করে যে আইন প্রকৃতির অন্তর্নিহিত এবং নৈতিকতার গঠনকারী, অন্তত আংশিকভাবে, এবং মানব আইনি ব্যবস্থার বাইরে একটি বস্তুনিষ্ঠ নৈতিক ব্যবস্থা প্রাকৃতিক আইনের ভিত্তি। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, যদিও আইনসভার সদস্যরা অনৈতিক আইন প্রণয়ন করতে পারেন এমনকি সফলভাবে প্রয়োগ করতে পারেন, এই ধরনের আইন আইনত অবৈধ।
আরো পড়ুন
- সিসেরোর রাষ্ট্রদর্শন: প্রাকৃতিক আইন, মানবতাবাদ ও মানবিক দাসপ্রথা
- তদবির আইনসভার সদস্যদের উপর কাজের অনুকূলে প্রভাব বিস্তার বা চাপ সৃষ্টির পদ্ধতি
- আন্তর্জাতিক আইন কাকে বলে
- আইনসভা হচ্ছে রাষ্ট্র, জাতি বা শহরের আইন প্রণয়ন ও আইনি কর্তৃত্বের পরিষদ
- আইনশাস্ত্র হচ্ছে আইনের উৎপত্তি, প্রকৃতি ও বিকাশ সংক্রান্ত তত্ত্বগত বিদ্যা
- আইন অমান্য আন্দোলন হচ্ছে নাগরিক কর্তৃক সরকারের আইন মানতে অস্বীকৃতি
- আইন হচ্ছে মানুষের বহির্মুখ আচরণ নির্দেশনা সংক্রান্ত নিয়মাবলির গুচ্ছ
- অধিকার হচ্ছে স্বাধীনতা বা অধিকারের আইনি, সামাজিক, অথবা নৈতিক নীতি
- আইনের শাসন কাকে বলে
- মন্টেস্কুর আইনতত্ত্ব হচ্ছে দ্য স্পিরিট অব লজ গ্রন্থে প্রদত্ত আইনের ব্যাখা
- হেগেলের আইনতত্ত্ব: পরম সত্তার বস্তুনিষ্ঠ প্রকাশ এবং সমাজ-রাষ্ট্রীয় কাঠামোর তাত্ত্বিক ভিত্তি
তথ্যসূত্র:
১. অনুপ সাদি, ২ নভেম্বর ২০১৮; রোদ্দুরে.কম, “আইনশাস্ত্র হচ্ছে আইনের উৎপত্তি, প্রকৃতি ও বিকাশ সংক্রান্ত তত্ত্বগত বিদ্যা”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/encyclopedia/on-jurisprudence/
২. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ২৮-২৯।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।