আইনের শাসন (ইংরেজি: Rule of Law) হচ্ছে সেই ব্যবস্থা যেখানে রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় বিধিবদ্ধ আইন, রীতিনীতি, বাধানিষেধ ব্যতিরেকে ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয় না। আইনের শাসনে নাগরিকেরা যে-কোনও ক্ষমতাশালী ব্যক্তি ও সরকারি আমলার বিরুদ্ধে সুবিচারের দাবিতে অভিযোগ দায়ের করতে পারেন, যদি অভিযুক্তেরা আইন ভেঙে কিছু না করে থাকেন। এটি হচ্ছে এমন একটি রাজনৈতিক দর্শন যেটি একটি দেশ, রাষ্ট্র বা সম্প্রদায়ের মধ্যে সমস্ত নাগরিক এবং প্রতিষ্ঠান একই আইনের কাছে দায়বদ্ধ। সমস্ত নাগরিক ও প্রতিষ্ঠান বলতে আইন প্রণেতা এবং নেতাদেরকেসহ সবাইকে বুঝতে হবে।
এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকায় আইনের শাসনকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে “যে কলকব্জা, প্রক্রিয়া, প্রতিষ্ঠান, অনুশীলন বা প্রথা যা আইনের সামনে সকল নাগরিকের সমতাকে সমর্থন করে, সরকারের একটি স্বেচ্ছাচারহীন রূপ সুরক্ষিত করে এবং আরও সাধারণভাবে ক্ষমতার স্বেচ্ছাচারী ব্যবহারকে প্রতিরোধ করে।”[১] আইনের শাসন শব্দটি সাংবিধানিকতার সাথে সাথে ন্যায়ের রাষ্ট্রের (Rechtsstaat ) সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত এবং এটি একটি রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে বোঝায়, কোন নির্দিষ্ট আইনি নিয়মের সাথে নয়।
আইনের শাসনের ইতিহাস
শব্দগুচ্ছের ব্যবহার ষোড়শ শতকের ব্রিটেনে সনাক্ত করা যেতে পারে। পরবর্তী শতাব্দীতে, স্কটিশ ধর্মতাত্ত্বিক স্যামুয়েল রাদারফোর্ড রাজাদের ঐশ্বরিক অধিকারের বিরুদ্ধে তর্ক করার জন্য এটি ব্যবহার করেছিলেন। জন লক লিখেছেন যে সমাজে স্বাধীনতা মানে শুধুমাত্র একটি আইনসভা দ্বারা প্রণীত আইনের অধীন হওয়া যা প্রত্যেকের জন্য প্রযোজ্য, একজন ব্যক্তি অন্যথায় স্বাধীনতার উপর সরকারী এবং ব্যক্তিগত উভয় বিধিনিষেধ থেকে মুক্ত। “আইনের শাসন” কথাটি উনবিংশ শতকে ব্রিটিশ আইনবিদ এ. ভি. ডাইসি দ্বারা আরও জনপ্রিয় হয়েছিল। যাহোক, নীতি অর্থে শব্দগুচ্ছটি প্রাচীন চিন্তাবিদদের দ্বারা স্বীকৃত ছিল। অ্যারিস্টটল লিখেছেন:
“এটি আরও উপযুক্ত যে আইনটি নাগরিকদের মধ্যে যে কোনও একজনের চেয়ে শাসন করা উচিত: একই নীতির ভিত্তিতে, যদি কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে সর্বোচ্চ ক্ষমতা স্থাপন করা সুবিধাজনক হয় তবে তাদের কেবল অভিভাবক এবং আইনের দাস হিসাবে নিয়োগ করা উচিত।”[২]
অবশ্য আইন সবার উপরে একথা যে-কোনও সংবিধানই ঘোষণা করে থাকুক, তার সার্থক রূপায়ণ নির্ভর করে সর্বস্তরের নাগরিকের উপর। সেজন্যে চাই বিচারালয়ের স্বাধীনতা, বিশেষ করে যদি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনও আইন প্রয়োগের প্রয়োজন ঘটে। অবশ্য ক্ষমতার পৃথকীকরণের উপর সেটা নির্ভর করে। সব কিছু সত্ত্বেও শেষাবধি সেই রাষ্ট্রই বিচারপতি নিয়োগ ও ছাঁটাই-এর কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। আর রাষ্ট্রই আইন প্রণয়ন ও সংশোধন করে।
দেশের স্থিতাবস্থা নষ্ট হয়ে গেলে, আইন ও শৃঙ্খলা ভেঙে পড়লে, সন্ত্রাসবাদীদের দাপট দেখা দিলে আইনের শাসন আর থাকে না। সেজন্যে প্রতিষেধক কিছু আইন বিধিবদ্ধ হয়। তাতে স্বভাবতই সন্ত্রাসবাদী ও অনুরূপ আসামিদের দমনের সময়ে মৌলিক অধিকার বিঘ্নিত হয়, তাতে তথাকথিত আইনের শাসনের সায় থাকে। সেজন্যে কি ব্যক্তিমানুষ, কি সরকার সকলকেই আইনের প্রক্রিয়ার উপর আনুগত্য রক্ষা করতে হবে। একই আইনের প্রয়োগ-পরিধির মধ্যে সকলের থাকা চাই। আইনসভা ও কার্যনিবাহি সরকারের নিয়ন্ত্রণ থেকে বিচারালয়ের স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতার বিষয়কে যথোচিত গুরুত্বদান করা প্রয়োজন। ব্যক্তিকে টমাস হবস কল্পিত লেভিয়াথানরূপী রাষ্ট্রদানবের কবল থেকে বাঁচানোর দায়িত্ব হলো বিচারালয়ের।[৩]
একটি ভিডিও দেখুন
আইনের শাসন প্রসঙ্গটির সমালোচনা
আইনের শাসনের ব্যাপারটির ক্ষেত্রে কার্ল মার্কসের নির্দিষ্ট সমালোচনা আছে। যেমন এক চুরি ডাকাতি বা অন্যান্য অপরাধ ঠেকাতে গিয়ে রাষ্ট্র কী আকাম করে দেখুনঃ পুলিশ, বিচারের জন্য কোর্ট কাচারি বিচারক, শাস্তির জন্য জেল জেলপুলিশ, জরিমানা। এসবের জন্য তিন রকমের বাহিনী। আবার বিচারের কাজে আছে উকিল ব্যারিস্টার। আইন তৈরির জন্য আছে আইন বিভাগ এবং তার বিশাল কর্মচারী। অর্থাৎ আইনের শাসনের নামে লক্ষ লক্ষ পরজীবী পোষা হচ্ছে রাষ্ট্রের কাজ। আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরজীবী শ্রেণী থাকবেই। অনুতপাদনশীল পরজীবীদের পোষা হয় শ্রেণী শোষণ রক্ষার জন্য। ফলে আইনের শাসনের মধ্য দিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয় না। আমাদের শ্লোগান হওয়া উচিত, সর্বহারা ও কৃষকের মিলিত গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব চাই।
আরো পড়ুন
- আন্তর্জাতিক আইন কাকে বলে
- আইনসভা হচ্ছে রাষ্ট্র, জাতি বা শহরের আইন প্রণয়ন ও আইনি কর্তৃত্বের পরিষদ
- আইনশাস্ত্র হচ্ছে আইনের উৎপত্তি, প্রকৃতি ও বিকাশ সংক্রান্ত তত্ত্বগত বিদ্যা
- আইন অমান্য আন্দোলন হচ্ছে নাগরিক কর্তৃক সরকারের আইন মানতে অস্বীকৃতি
- আইন হচ্ছে মানুষের বহির্মুখ আচরণ নির্দেশনা সংক্রান্ত নিয়মাবলির গুচ্ছ
- অধিকার হচ্ছে স্বাধীনতা বা অধিকারের আইনি, সামাজিক, অথবা নৈতিক নীতি
- আইনের শাসন কাকে বলে
- মন্টেস্কুর আইনতত্ত্ব হচ্ছে দ্য স্পিরিট অব লজ গ্রন্থে প্রদত্ত আইনের ব্যাখা
- হেগেলের আইনতত্ত্ব হচ্ছে আইনের প্রকৃতি সম্পর্কে হেগেলের ধারণাগুলির মর্ম
তথ্যসূত্র:
১. Naomi Choi, এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, ইউআরএল: https://www.britannica.com/topic/rule-of-law
২. এরিস্টটল, পলিটিক্স, খণ্ড ৩, অধ্যায় ষোল।
৩. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ৩০-৩১।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।