আইন অমান্য আন্দোলন বা বেসামরিক অবাধ্যতা বা বেসামরিক নাগরিক অমান্যতা (ইংরেজি: Civil disobedience movement) হচ্ছে নাগরিক কর্তৃক সরকার অথবা অন্য কোনও কর্তৃপক্ষের নির্দিষ্ট আইন, দাবি, আদেশ বা নির্দেশ মানতে সক্রিয় এবং পূর্বঘোষিত অস্বীকৃতি। কিছু সংজ্ঞা অনুসারে, “বেসামরিক” আইন অমান্যতাকে অহিংস হতে হবে ধরা হয়। তাই, আইন অমান্যকে কখনও কখনও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বা অহিংস প্রতিরোধের সাথে সমতাসূচক বিবেচনা করা হয়। আইন অমান্যতা হচ্ছে আন্দোলনের একটি প্রতিক্রিয়াশীল সুবিধাবাদী ধারা।
আফ্রিকা ও ভারতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, আমেরিকান নাগরিক অধিকার আন্দোলন এবং অনেক দেশে শ্রমিক, যুদ্ধবিরোধী এবং অন্যান্য সামাজিক আন্দোলনের একটি প্রধান কৌশল এবং দর্শন হচ্ছে আইন অমান্য আন্দোলন। এতে রাষ্ট্রের সমগ্র ব্যবস্থার প্রত্যাখ্যান নয় বরং আইনের প্রতীকী বা রীতিগত লঙ্ঘনকে বোঝানো হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃতিবাদী দার্শনিক হেনরি ডেভিড থোরো (১৮১৭-৬২) তাঁর ‘অন দ্য ডিউটি অব সিভিল ডিসওবিডিয়েন্স’ (১৮৪৯) নামে একটি প্রবন্ধে গণপ্রতিবাদ ও আন্দোলনের এই পদ্ধতিটি তুলে ধরেন। যে-সরকার ক্রীতদাস প্রথা অনুমোদন করে সে সরকারকে কর না দেবার সিদ্ধান্তকে তিনি ওই প্রবন্ধে ব্যক্ত করেন।
উল্লিখিত প্রত্যয়টিকে ভারতের প্রতিক্রিয়াশীল গণবিরোধী নেতা মোহনদাস গান্ধী তার রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপায়িত করেছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় জোহান্সবার্গে ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে গান্ধীর নেতৃত্বে নানা বিষয়ের প্রতিবাদে সর্বপ্রথম সত্যাগ্রহ ও কিছুটা আইন অমান্য আন্দোলন শুরু হয়ে ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দ অবধি চলেছিল। দ্বিতীয়বার তিনি আইন অমান্য পরিচালনা করেন ভারতে প্রত্যাবর্তনের পর ১৯১৯ খ্রি রাউলাট আইনের প্রতিবাদে। বই ও পত্রপত্রিকার নিষিদ্ধকরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে অসহযোগ আন্দোলনের গোড়াতে গান্ধী গুজরাতের বড়দৌলি তালুকে আইন অমান্যের সিদ্ধান্ত ১ ফেব্রুয়ারি তারিখে লেখা এক চিঠিতে ভাইসরয়কে জানিয়ে দেন। কিন্তু চৌরিচৌরায় হিংসাত্মক ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় উভয় আন্দোলন প্রত্যাহার করেন।
ইংরেজ সরকার ভারতে শাসনতন্ত্রের মূল্যায়ন ও নতুন বিধিব্যবস্থা প্রবর্তনকল্পে সাইমন কমিশন (১৯২৭) নিয়োগ ও গোল টেবিল বৈঠকের আয়োজনে ক্রমে অগ্রসর হতে থাকলে সেই সময়ে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস তার লাহোর অধিবেশনে (১৯২৯) পূর্ণ স্বাধীনতার লক্ষ্যের প্রস্তাব গ্রহণ করে। কংগ্রেস গান্ধীকে এই দাবি আদায়ের উদ্দেশ্যে অহিংস আইন অমান্য আন্দোলন পরিচালনের জন্যে দায়িত্ব অর্পণ করে। গান্ধী তার রীতি অনুযায়ী ভাইসরয়ের কাছে লেখা কয়েকটি দাবি সমন্বিত এক পত্রে তাঁর সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেন। দাবিসমূহ প্রত্যাখ্যাত হয়। ফলে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ৬ এপ্রিল গান্ধী সমুদ্রকূলে ডাণ্ডি নামক স্থানে ৭৯ জন সহকর্মীকে নিয়ে লবণ আইন ভঙ্গ করেন। ক্রমে সেই আন্দোলন দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। সেই সঙ্গে বিদেশি পণ্য বয়কট, পিকেটিং, সভাসমিতির আয়ােজন যুক্ত হয়।
সরকারও আন্দোলনে ব্যাপক দমননীতি গ্রহণ করে। ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দের মার্চে ভাইসরয় আরউইনের সঙ্গে গান্ধীর এক চুক্তির ফলে আন্দোলন স্থগিত থাকে। গান্ধী গোল টেবল বৈঠকে যোগদান করেন। তাতে কোনও রাজনৈতিক মীমাংসা না হওয়ায় ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাস থেকে আন্দোলন নতুন উদ্যমে শুরু হয়। গান্ধী সহ বহু নেতা ও কর্মী কারারুদ্ধ হন। ১৯৩৪ খ্রি কংগ্রেস অধিবেশনে আন্দোলন প্রত্যাহার করা হয়।[২]
গান্ধীর উদাহরণ অনুসরণ করে, ১৯৫০-এর দশকে প্রসিদ্ধি লাভকারী আমেরিকান নাগরিক অধিকার আন্দোলন দক্ষিণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণগত বিভেদের অবসান ঘটাতে উত্তর ক্যারোলিনায় ১৯৬০ সাধারণাব্দের “গ্রিনসবোরো অবস্থান” এবং ১৯৬১ সাধারণাব্দের “ফ্রিডম রাইডস”-এর মতো বিক্ষোভের মাধ্যমে বেসামরিক নাগরিক অবাধ্যতার কৌশল এবং দর্শন গ্রহণ করে। ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ১৯৬৮ সালে তাঁর হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র অহিংস প্রতিবাদের কৌশলের একজন স্পষ্ট সমর্থক ছিলেন। পরবর্তীতে নারী আন্দোলন, পারমাণবিক শক্তি বিরোধী ও পরিবেশগত আন্দোলন এবং বিশ্বায়ন বিরোধী ও অর্থনৈতিক সমতা আন্দোলন সহ বিভিন্ন আন্দোলনের মধ্যে অনেক প্রতিবাদী গোষ্ঠী বেসামরিক অবাধ্যতার কৌশল ব্যবহার করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির নুরেমবার্গে যুদ্ধাপরাধের বিচারের মাধ্যমে বেসামরিক অবাধ্যতার নীতি আন্তর্জাতিক আইনে কিছুটা মর্যাদা অর্জন করেছে। এই নীতি নিশ্চিত করেছে যে, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে, ব্যক্তিগণ তাদের দেশের আইন মান্য করতে ব্যর্থতার জন্য দায়ী করা যেতে পারে।[৩]
আরো পড়ুন
- আন্তর্জাতিক আইন কাকে বলে
- আইনসভা হচ্ছে রাষ্ট্র, জাতি বা শহরের আইন প্রণয়ন ও আইনি কর্তৃত্বের পরিষদ
- আইনশাস্ত্র হচ্ছে আইনের উৎপত্তি, প্রকৃতি ও বিকাশ সংক্রান্ত তত্ত্বগত বিদ্যা
- আইন অমান্য আন্দোলন হচ্ছে নাগরিক কর্তৃক সরকারের আইন মানতে অস্বীকৃতি
- আইন হচ্ছে মানুষের বহির্মুখ আচরণ নির্দেশনা সংক্রান্ত নিয়মাবলির গুচ্ছ
- অধিকার হচ্ছে স্বাধীনতা বা অধিকারের আইনি, সামাজিক, অথবা নৈতিক নীতি
- আইনের শাসন কাকে বলে
- মন্টেস্কুর আইনতত্ত্ব হচ্ছে দ্য স্পিরিট অব লজ গ্রন্থে প্রদত্ত আইনের ব্যাখা
- হেগেলের আইনতত্ত্ব হচ্ছে আইনের প্রকৃতি সম্পর্কে হেগেলের ধারণাগুলির মর্ম
তথ্যসূত্র:
১. অনুপ সাদি, ১ নভেম্বর ২০১৮, রোদ্দুরে.কম, “আইন অমান্য আন্দোলন প্রসঙ্গে”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/history/civil-disobedience-movement/
২. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ২৮।
৩. এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার সম্পাদকগণ, civil disobedience, এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে সংগৃহীত, ইউআরএল: https://www.britannica.com/topic/civil-disobedience
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।