রাষ্ট্র ও বিপ্লব: অধ্যায় ৩ (৪) — জাতীয় ঐক্যের সংগঠন

‘…জাতীয় সংগঠনের যে সংক্ষিপ্ত রূপরেখাটাকে আরো বিকশিত করে তোলার সময় কমিউনের ছিল না, তার মধ্যেই সুস্পষ্ট করে বলা আছে যে কমিউনকেই হতে হবে… সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম গ্রামটিরও রাজনৈতিক রূপ…’ কমিউন থেকেই  নির্বাচিত হওয়ার কথা ছিল প্যারিসে ‘জাতীয় প্রতিনিধিমন্ডলীর’।

‘…কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে অল্পসংখ্যক কিন্তু অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ তখনো রয়ে গেল, সেগুলো খারিজ করার কথা ছিল না—ইচ্ছাকৃত জালিয়াতিতে যা বলা হয়েছে—সেগুলোকে তুলে দেওয়ার কথা ছিল কমিউনের, অর্থাৎ, কঠোরভাবে জবাবদিহিতে বাধ্য কর্মচারীদের হাতে।

‘…জাতীয় ঐক্য বিলুপ্তির কথা ছিল না, বরং কমিউন ব্যবস্থায় তা সংগঠিত হতো। যে রাষ্ট্রক্ষমতাটা নিজেকেই জাতীয় ঐক্যের রূপায়ণ বলে জাহির করত কিন্তু চাইত জাতি থেকে স্বাধীন হতে, তার উর্ধ্বে দাঁড়াতে, তাকে ধ্বংস করা মারফত জাতীয় ঐক্য হতো বাস্তব। প্রকৃতপক্ষে এই রাষ্ট্রক্ষমতাটা ছিল জাতির দেহে একটা পরগাছা উপবৃদ্ধি … কর্তব্য ছিল সাবেকী সরকারি ক্ষমতার নিছক পীড়নমূলক সংস্থাগুলিকে ছেঁটে দেওয়া এবং তার ন্যায়সঙ্গত কাজগুলিকে সমাজের উর্ধ্বে দাড়াঁতে-চাওয়া এক ক্ষমতার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে সমাজের কাছে দায়িত্বশীল সেবকদের হাতে তুলে দেওয়া।’

সাম্প্রতিক সোশ্যাল ডেমোক্রাসির সুবিধাবাদীরা মার্কসের এই বক্তব্য কী পরিমাণে বোঝেন নি, বোধহয় বললে সঠিক হবে যে বুঝতে চান নি, সেটা সবচেয়ে ভালো দেখা যাবে বেইমান বের্নস্তাইনের ‘সমাজতন্ত্রের পূর্বশর্ত ও সোশ্যাল ডেমোক্রাসির কর্তব্য’ নামক হেরোস্ত্রাৎ-মার্কা খ্যাতির[১] গ্রন্থে। মার্কসের উদ্ধৃত ঠিক এই কথাগুলি সম্পর্কেই বের্নস্তাইন লিখেছেন যে, এই কর্মসূচিটায় ‘তার রাজনৈতিক সারবস্তুর দিক থেকে প্রুধোঁর ফেডারেলবাদের সঙ্গে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারেই সাতিশয় সাদৃশ্য প্রকাশ পাচ্ছে… মার্কসের সঙ্গে ‘পেটি বুর্জোয়া’ প্রুধোঁর (‘পেটি বুর্জোয়া’ কথাটা বের্নস্তাইন দিয়েছেন উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে, যেটা তাঁর মতে, শ্লেষাত্মক হওয়ার কথা) অন্য সমস্ত মতপার্থক্য থাকলেও এই পয়েন্টগুলিতে ওঁদের ভাবনা যথাসম্ভব কাছাকাছি।’ বলাই বাহুল্য, বের্নস্তাইন বলেছেন, মিউনিসিপ্যালিটিগুলির তাৎপর্য বাড়ছে, কিন্তু ‘মার্কস ও প্রুধোঁ যা কল্পনা করেছেন, আধুনিক রাষ্ট্রগুলির অমন বিলোপ(Auflosung — আক্ষরিক অর্থে ভেঙে দেওয়া, গলিয়ে দেওয়া) এবং তার সংগঠনের অমন বদল (Umwandlung — ওলটপালট) — জাতীয় সভা হবে প্রাদেশিক অথবা আঞ্চলিক সভার প্রতিনিধি দিয়ে, এবং সেগুলি আবার হবে কমিউনের প্রতিনিধি দিয়ে, যাতে জাতীয় প্রতিনিধিত্বের সমস্ত পূর্বতন ধরনই একেবারে অদৃশ্য হচ্ছে—এটাই গণতন্ত্রের প্রথম কর্তব্য কিনা আমার সন্দেহ আছে।’ (বের্নস্তাইন, পূর্বশর্ত, পৃষ্ঠা-১৩৪ ও ১৩৬ পৃ, ১৮৯৯ সালের জার্মান সংস্করণ)।

প্রুধোঁর ফেডারেলবাদের সঙ্গে মার্কসের ‘পরগাছা রাষ্ট্রক্ষমতা ধ্বংসের’ মতবাদকে গুলিয়ে ফেলা এক পৈশাচিক ব্যাপার! কিন্তু সেটা আকস্মিক কিছু নয়, কারণ সুবিধাবাদীদের মাথাতেই ঢোকে না যে, মার্কস এখানে আদৌ কেন্দ্রিকতার বিপরীতে ফেডারেলবাদের কথা বলছেন না, বলছেন সমস্ত বুর্জোয়া রাষ্ট্রেই যা বর্তমান, সেই সাবেকী রাষ্ট্রযন্ত্রটিকে চূর্ণের কথা।

সুবিধাবাদীদের মাথায় ঢোকে কেবল এইটুকু যা সে তার চারিপাশে, পেটি বুর্জোয়া গতানুগতিকতা ও সংস্কারবাদী অচলতার পরিবেশ দেখে, অর্থাৎ শুধু ‘মিউনিসিপ্যালিটি’! প্রলেতারীয় বিপ্লবের কথাটা ভাবতে পর্যন্ত সুবিধাবাদীরা ভুলে গেছে।

এটা হাসির কথা। কিন্তু লক্ষণীয় এই যে এই পয়েন্টটায় কেউ বের্নস্তাইনের প্রতিবাদ করেননি। অনেকেই বের্নস্তাইনকে খণ্ডন করেছেন, বিশেষ করে রুশ সাহিত্যে প্লেখানভ, ইউরোপীয় সাহিত্যে কাউৎস্কি, বের্নস্তাইনের এই মার্কস বিকৃতি নিয়ে এঁদের কেউ কোনো কথা বলেননি।

বিপ্লবীর মতো ভাবতে ও বিপ্লব নিয়ে মাথা ঘামাতে সুবিধাবাদীরা এতই ভুলে গেছেন যে, নৈরাজ্যবাদের প্রতিষ্ঠাতা প্রুধোঁর সঙ্গে মার্কসকে গুলিয়ে ফেলে তাঁর ওপর ‘ফেডারেলবাদ’ চাপিয়ে দিয়েছেন। এবং নৈষ্ঠিক মার্কসবাদী হতে ইচ্ছুক, বৈপ্লবিক মার্কসবাদের মতবাদ রক্ষায় আগ্রহী কাউৎস্কি ও প্লেখানভ সে প্রসঙ্গে চুপ করে থাকছেন! এইখানেই রয়েছে মার্কসবাদের সঙ্গে নৈরাজ্যবাদের পার্থক্য বিষয়ক মতবাদের সেই চূড়ান্ত স্থূলীকরণের একটি মূল, যা কাউৎস্কিপন্থী তথা সুবিধাবাদীদের বৈশিষ্ট্য, যা নিয়ে পরে আরও বলব।

কমিউনের অভিজ্ঞতা নিয়ে মার্কসের যে বক্তব্য তুলে দিয়েছি, তাতে ফেডারেলবাদের চিহ্ন মাত্র নেই। প্রুধোঁর সঙ্গে মার্কসের মিল ঠিক এমন একটা জায়গায় যা সুবিধাবাদী বের্নস্তাইনের চোখে পড়ছে না। প্রুধোঁর সঙ্গে মার্কসের গরমিল ঠিক সেই জায়গাটায় যেখানে বের্নস্তাইন দেখছেন মিল।

প্রুঁধোর সঙ্গে মার্কসের মিল এখানে যে, উভয়েই আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্র ধ্বংসের পক্ষে। নৈরাজ্যবাদের সঙ্গে (তথা প্রুধোঁ, তথা বাকুনিনের সঙ্গে) এই মিলটা সুবিধাবাদীরা বা কাউৎস্কিপন্থীরা কেউ দেখতে চাইছেন না, কেননা এই পয়েন্টে তাঁরা মার্কসবাদ থেকে সরে গেছেন।

প্রুধোঁ এবং বাকুনিন উভয়ের সঙ্গেই মার্কসের গরমিল ঠিক ফেডারেলবাদের প্রশ্নেই (প্রলেতারীয় একনায়কত্বের কথা ছেড়েই দিলাম)। নৈরাজ্যবাদের পেটি বুর্জোয়া দৃষ্টি থেকে ফেডারেলবাদ আসে একটা নীতি হিসেবে। মার্কস কেন্দ্রবাদী। তাঁর উদ্ধৃত বক্তব্যে কেন্দ্রিকতা থেকে কোনো বিচ্যুতি নেই। রাষ্ট্রের প্রতি মধ্যবিত্তসুলভ ‘সংস্কারাচ্ছন্ন বিশ্বাসে’ যারা পরিপূর্ণ কেবল তাদের পক্ষেই বুর্জোয়া রাষ্ট্রযন্ত্রের ধ্বংসটাকে কেন্দ্রিকতা ধ্বংস বলে ভাবা সম্ভব।

কিন্তু প্রলেতারিয়েত ও গরিব কৃষক যদি রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে নেয়, কমিউনে কমিউনে স্বাধীনভাবে সংগঠিত হয় এবং সমস্ত কমিউনের ক্রিয়াকর্ম ঐক্যবদ্ধ করে পুঁজির ওপর আঘাত হানায়, পুঁজিপতিদের প্রতিরোধ ধ্বংসে, রেলপথ, কলকারখানা, ভূমি প্রভৃতির ব্যক্তিমালিকানা সমগ্র জাতি, সমগ্র সমাজকে প্রদানে, তাহলে সেটা কি কেন্দ্রিকতা হবে না? সবচেয়ে সুসঙ্গত গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা হবে না। তদুপরি প্রলেতারীয় কেন্দ্রিকতা?

বের্নস্তাইনের মাথায় একথা আদপেই ঢুকতে পরে না যে, স্বেচ্ছামূলক কেন্দ্রিকতা সম্ভব, কমিউনগুলির জাতি হিসাবে স্বেচ্ছামূলক ঐক্য সম্ভব, বুর্জোয়া প্রভুত্ব ও বুর্জোয়া রাষ্ট্রযন্ত্র ধ্বংসের ব্যাপারে প্রলেতারীয় কমিউনগুলির স্বেচ্ছামূলক মিলন সম্ভব। যে-কোনো কূপমণ্ডূকের মতো বের্নস্তাইনের কাছেও কেন্দ্রিকতা কল্পনীয় কেবল ওপর থেকে আসা একটা জিনিস হিসাবে, যা কেবল আমলাতন্ত্র ও সমরচক্র দিয়েই চাপিয়ে দেওয়া ও বজায় রাখা সম্ভব।

মার্কস তাঁর মতের ভবিষ্যৎ বিকৃত উপস্থাপনা দেখেই যেন ইচ্ছে করে এই কথায় জোর দিয়েছিলেন যে, কমিউন নাকি জাতীয় ঐক্য ধ্বংস ও কেন্দ্রীয় ক্ষমতা খারিজ করতে চেয়েছিল, এ অপবাদ একটা ইচ্ছাকৃত জালিয়াতি। বুর্জোয়া সামরিক, আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার বিপরীতে সচেতন গণতান্ত্রিক, প্রলেতারীয় কেন্দ্রিকতাকে দাঁড় করানোর জন্য মার্কস ইচ্ছে করেই ‘জাতীয় ঐক্য গঠন’ কথাটা ব্যবহার করেছেন।

কিন্তু … যে শুনতে চায় না সে কালারও অধম। আর রাষ্ট্রক্ষমতা ধ্বংস, পরগাছা ছাঁটাইয়ের কথা শুনতে বর্তমান সোশ্যাল ডেমোক্রাসির সুবিধাবাদীদের ইচ্ছেই নেই।[২]

ফুলকিবাজ সংস্করণের পাদটিকা:

১. হেরোস্ত্রাৎ — গ্রিক, খ্রিস্ট পূর্ব ৩৫৬ সালে নাম ছড়াবার আশায় এথেন্সে আর্তেমিদার মন্দির পুড়িয়ে দেন।
২. বর্তমান অনুবাদটি সামান্য সংস্কারকৃত এবং অনুবাদটি নেয়া হয়েছে প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, অনূদিত বাংলা সংস্করণ ১৯৭৬-এর পৃষ্ঠা ৫১-৫৪ হতে।

🔗 লেনিন সংগ্রহশালা: গুরুত্বপূর্ণ রচনাবলী

Leave a Comment