রাষ্ট্র ও বিপ্লব: অধ্যায় ৩ (২) — ভেঙে-ফেলা রাষ্ট্রযন্ত্রের বদল হবে কী দিয়ে?

১৮৪৭ সালে ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারে’ মার্কস ও এঙ্গেলস এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন খুবই বিমূর্তভাবে, আরও সঠিকভাবে বললে, সে উত্তরে কর্তব্যের উল্লেখ ছিল কিন্তু তা সাধনের উপায় দেখানো হয়নি। বদল করতে হবে ‘শাসক শ্রেণিরূপে প্রলেতারিয়েতের সংগঠন দিয়ে, গণতন্ত্র জয় করে’ — এই ছিল ‘কমিউনিস্ট ইশতেহারের’ জবাব।

শাসক শ্রেণি রূপে প্রলেতারিয়েতের সে সংগঠন কী মূর্ত নির্দিষ্ট রূপ নেবে, ঠিক কী উপায়ে সর্বাধিক পরিপূর্ণ ও সুসংহত ‘গণতন্ত্র জয়ের’ সঙ্গে এ সংগঠনের সাযুজ্য ঘটবে এ প্রশ্নের জবাবের জন্য মার্কস ইউটোপিয়ায় না ভেসে গিয়ে গণআন্দোলনের অভিজ্ঞতার অপেক্ষায় ছিলেন।

কমিউনের অভিজ্ঞতা যত অল্পই হোক, ‘ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ’ গ্রন্থে মার্কস অতিশয় মনোযোগে তার বিশ্লেষণ করেন। এ রচনা থেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলি তুলে দিচ্ছি:

“মধ্যযুগ থেকে উদ্ভূত হয়ে ঊনিশ শতকে বিকশিত হয়ে ওঠে ‘তার সর্বত্র বিরাজমান সংস্থা: স্থায়ী সৈন্য বাহিনী, পুলিশ, আমলাতন্ত্র, পুরোহিত সম্প্রদায়, বিচারক শ্রেণি সমেত কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রক্ষমতা’। পুঁজি ও শ্রমের সঙ্গে শ্রেণি বৈরিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রক্ষমতা ক্রমশই শ্রম-পীড়নের একটি সামাজিক ক্ষমতা, শ্রেণি প্রভুত্বের একটি যন্ত্রের চরিত্র গ্রহণ করতে থাকে। শ্রেণিসংগ্রামের এক একটা অগ্রপদক্ষেপসূচক প্রতিটি বিপ্লবের পর রাষ্ট্রক্ষমতার নিছক পীড়নমূলক চরিত্রটা ক্রমেই খোলাখুলি প্রকট হয়ে ওঠে।’ ১৮৪৮-১৮৪৯ সালের বিপ্লবের পর রাষ্ট্রক্ষমতা হয়ে দাঁড়ায় ‘শ্রমের বিরুদ্ধে পুঁজির জাতীয় যুদ্ধাস্ত্র।’ দ্বিতীয় সাম্রাজ্য তাকে জোরদার করে।

‘কমিউন ছিল সাম্রাজ্যের সরাসরি প্রতি-বিশ্লেষণ[anti-thesis] ।’ শ্রেণি প্রভুত্বের রাজতান্ত্রিক রূপটা শুধু নয়, খোদ শ্রেণি প্রভুত্বকেই যাতে দূর করতে হবে, কমিউন ছিল ‘এমন প্রজাতন্ত্রের ‘নির্দিষ্ট রূপ’…..’

প্রলেতারীয় সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের এই নির্দিষ্ট রূপটি ঠিক কী ছিল? যে রাষ্ট্র তা করতে শুরু করেছিল সেটা কেমন?

‘….কমিউনের প্রথম ডিক্রিই হলো স্থায়ী সৈন্যবাহিনীর বিলোপ ও সশস্ত্র জনগণ দিয়ে তার স্থান পূরণ….’

সমাজতান্ত্রিক বলে অভিহিত হতে ইচ্ছুক সমস্ত পার্টির কর্মসূচিতে আজকাল এ দাবিটা স্থান পেয়েছে। কিন্তু তাদের কর্মসূচির মূল্য কতটুকু তা সবচেয়ে ভাল দেখা যাবে আমাদের সোশ্যালিস্ট-রেভলিউশানারি ও মেনশেভিকদের আচরণ দিয়ে, যারা ২৭ ফেব্রুয়ারির বিপ্লবের পর ঠিক এই দাবিটিকে কার্যকরী করতে অস্বীকার করেন!

‘….কমিউন গঠিত হয় প্যারিসের বিভিন্ন পল্লীতে সর্বজনীন ভোটে নির্বাচিত পৌর পরিষদ সভ্যদের নিয়ে। তারা ছিলেন জবাবদিহিতে বাধ্য এবং যে কোনো সময়ে অপসারণীয়। স্বভাবতই তাদের অধিকাংশ ছিল শ্রমিক, অথবা শ্রমিক শ্রেণির স্বীকৃত প্রতিনিধি….’

‘….এতদিন পর্যন্ত যা ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের হাতিয়ার সেই পুলিশের সমস্ত রাজনৈতিক বৃত্তি অবিলম্বেই খারিজ হয় এবং তাকে পরিণত করা হয় কমিউনের কাছে জবাবদিহিতে বাধ্য যে কোনো সময়ে অপসারণীয় একটি সংস্থায়…. প্রশাসনের অন্য সমস্ত শাখার আমলাদের ক্ষেত্রেও তাই হয়…. কমিউন সভ্যদের থেকে শুরু করে ওপর থেকে নিচু পর্যন্ত সমস্ত সামাজিক কাজ চালাতে হবে শ্রমিকের বেতনে। রাষ্ট্রের বড় চাকুরেদের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সমস্ত বিশেষ সুবিধা ও প্রতিনিধিত্ব ভাতাও দূর হলো…. পুরনো সরকারের ঐহিক ক্ষমতার অস্ত্র — স্থায়ী সৈন্যবাহিনী ও পুলিশ দূর করার সঙ্গে সঙ্গে কমিউন অবিলম্বেই আত্মিক পীড়নের অস্ত্র, যাজকশক্তি ভাঙার কাজে নামে…. আদালতের কর্তারা তাদের বাহ্যিক স্বাধীনতা হারাল…. এবার থেকে তাদের হতে হলো প্রকাশ্য নির্বাচিত, জবাবদিহিতে বাধ্য ও অপসারণীয়….’[১]

এইভাবে, বিচূর্ণ রাষ্ট্রযন্ত্রটার স্থান কমিউন পূরণ করে ‘কেবল’ আরও পরিপূর্ণ গণতন্ত্র দিয়ে: স্থায়ী সৈন্যবাহিনীর বিলোপ, সমস্ত পদাধিকারীর নির্বাচন ও অপসারণ শর্তে। কিন্তু আসলে এই ‘কেবল’টুকুর অর্থ এক ধরনের প্রতিষ্ঠানের স্থলে নীতিগতভাবে অন্য ধরনের প্রতিষ্ঠান দিয়ে বিপুল একটা বদল। এখানে দেখা যাচ্ছে ‘পরিমাণ গুণে রূপান্তরিত হবার’ একটি ঘটনা: আদৌ যতটা চিন্তনীয় তেমন পরিপূর্ণতা ও সুসঙ্গতিতে প্রবর্তিত গণতন্ত্র পরিণত হচ্ছে বুর্জোয়া গণতন্ত্র থেকে প্রলেতারীয় গণতন্ত্রে, রাষ্ট্র (=নির্দিষ্ট একটি শ্রেণিকে দমনের বিশেষ শক্তি) পরিণত হচ্ছে এমন কিছুতে যা আর প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্র নয়।

বুর্জোয়া ও তার প্রতিরোধ দমন করা তখনও প্রয়োজন। কমিউনের পক্ষে তা ছিল বিশেষ করে প্রয়োজন, এবং তার পরাজয়ের একটা কারণ এই যে, সে কাজটা সে যথেষ্ট দৃঢ়ভাবে করেনি। কিন্তু দমনের সংস্থাটা এখানে জনগণের অধিকাংশ; দাসপ্রথায়, ভূমিদাসত্বে ও মজুরি-দাসত্বে সর্বদাই যা হয়ে এসেছে, সেভাবে জনগণের অল্পাংশ নয়। আর জনগণের অধিকাংশ যখন নিজেরাই নিজেদের উৎপীড়কদের দমন করছে, তখন দমনের ‘আলাদা শক্তির’ আর দরকার পড়ে না! এই অর্থে রাষ্ট্র শুকিয়ে মরতে শুরু করছে। বিশেষ সুবিধাভোগী অল্পাংশের বদলে (বিশেষ সুবিধাভোগী আমলা, স্থায়ী সৈন্যবাহিনীর বড় কর্তারা) অধিকাংশ জনগণ নিজেরাই এসব কাজ চালাতে পারে, এবং রাষ্ট্রক্ষমতার কাজগুলো যত চালাবে সর্বজনগণ, ততই হ্রাস পাচ্ছে সে ক্ষমতার প্রয়োজনীয়তা।

এদিক থেকে মার্কস কমিউনের যে ব্যবস্থায় জোর দিয়েছেন তা খুবই লক্ষণীয়: সর্ববিধ প্রতিনিধিত্ব ভাতা, কর্মকর্তাদের সমস্ত আর্থিক সুবিধা নাকচ, রাষ্ট্রের সমস্ত পদাধিকারীর বেতন হবে ‘মজুরের বেতনের’ সমান। ঠিক এই ব্যাপারটাতেই সবচেয়ে জাজ্বল্যমানরূপে মোড় নেওয়াটা দেখা যাচ্ছে — বুর্জোয়া গণতন্ত্র থেকে প্রলেতারীয় গণতন্ত্রে, উৎপীড়ক গণতন্ত্র থেকে উৎপীড়িত শ্রেণিদের গণতন্ত্রে, নির্দিষ্ট একটি শ্রেণিকে দমনের ‘আলাদা শক্তি’ স্বরূপ রাষ্ট্র থেকে জনগণের, শ্রমিক ও কৃষকদের অধিকাংশের সর্বজনীন শক্তিতে উৎপীড়ক দমনে। এবং রাষ্ট্রের প্রশ্নে এই বিশেষ জাজ্বল্যমান, বলা যেতে পারে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টেই মার্কসের শিক্ষাগুলি ভুলে বসা হয়েছে সবচেয়ে বেশি! জনবোধ্য যে টিকাগ্রন্থগুলি সংখ্যায় নগণ্য তাতে এসব কথা কিছু নেই। এনিয়ে চুপ করে থাকাই ‘শোভন’, যেন এটা অচল হয়ে যাওয়া একটা ‘সরলতা’,— রাষ্ট্রীয় ধর্মের প্রতিষ্ঠা পেয়ে খৃষ্টধর্ম যেভাবে তার গণতান্ত্রিক-বৈপ্লবিক প্রেরণার আদি খৃষ্টীয় ‘সরলতাগুলোকে’ ‘ভুলে যায়’।

রাষ্ট্রের বড় কর্তাদের বেতন হ্রাসটা মনে হবে ‘নিতান্তই’ সহজসরল, আদিম গণতন্ত্রের একটা দাবি। সাম্প্রতিক সুবিধাবাদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, ভূতপূর্ব সোশ্যাল ডেমোক্রাট এ. বের্নস্তাইন ‘আদিম’ গণতন্ত্র নিয়ে ইতর বুর্জোয়া উপহাসের পুনরাবৃত্তির অনুশীলন চালিয়েছিলেন একাধিকবার। সমস্ত সুবিধাবাদীদের মতো, বর্তমানে কাউৎস্কিপন্থীদের মতো, তিনিও একেবারেই বোঝেননি যে, প্রথমত, কিছুটা পরিমাণে ‘আদিম’ গণতন্ত্রে ‘প্রত্যাবর্তন’ ছাড়া পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে উৎক্রমণ অসম্ভব (তা নইলে জনগণের অধিকাংশ এবং তাদের প্রত্যেককে দিয়ে রাষ্ট্রের কাজ চালানোর ব্যবস্থায় যাওয়া যায় কীভাবে?), দ্বিতীয়ত, পুঁজিবাদ আর পুঁজিবাদী সংস্কৃতির ভিত্তিতে ‘আদিম গণতান্ত্রিকতা’ আর আদিম বা প্রাকপুঁজিবাদী কালের আদিম গণতান্ত্রিকতা এক নয়। পুঁজিবাদী সংস্কৃতিতে গড়ে উঠেছে বৃহৎ উৎপাদন, কলকারখানা, রেলপথ, ডাক, টেলিফোন ইত্যাদি, এবং এই ভিত্তির ওপর সাবেকী ‘রাষ্ট্রযন্ত্রের’ বিপুল পরিমাণ কাজ এত সরল হয়ে গেছে যে, তাকে রেজিস্ট্রি, রিপোর্ট ও যাচাইয়ের মতো কতকগুলো সরলতম প্রক্রিয়ায় পর্যবসিত করা যায়, সাক্ষর যে কোনো লোকের পক্ষেই এসব কাজ পুরোপুরি সাধ্যায়ত্ত, সাধারণ ‘মজুরের বেতনে’ তা পুরোপুরি করা সম্ভব, এবং এসব কাজ থেকে বিশেষ সুবিধাভোগীর, ‘কর্তাব্যক্তির’ সমস্ত ছায়া দূর করা সম্ভব (ও উচিত)।

বিনা ব্যতিক্রমে সমস্ত পদাধিকারীর নির্বাচন ও যে কোনো সময়ে তাকে অপসারণের ব্যবস্থা, তাদের বেতনকে ‘মজুরের’ সাধারণ ‘বেতনে’ নামানো — এই সব সরল ও ‘স্বতঃবোধগম্য’ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হলো শ্রমিক ও অধিকাংশ কৃষকদের স্বার্থকে পুরোপুরি ঐক্যবদ্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে যাবার সেতুস্বরূপ। ব্যবস্থাগুলি সমাজের রাষ্ট্রিক, নিছক রাজনৈতিক পুনর্গঠন নিয়ে, কিন্তু বলাই বাহুল্য, তা অর্থময় ও তাৎপর্যপূর্ণ হয় কেবল ‘উচ্ছেদকারীদের উচ্ছেদ’ সম্পন্ন বা প্রস্তুত করা প্রসঙ্গে, অর্থাৎ উৎপাদন উপকরণের ওপর পুঁজিবাদী ব্যক্তি-মালিকানা থেকে সামাজিক মালিকানায় উৎক্রমণ প্রসঙ্গে।

মার্কস লেখেন, ‘ফৌজ ও আমলাতন্ত্র, মোটা খরচের এই দুই খাত দূর করে কমিউন সমস্ত বুর্জোয়া বিপ্লবের সুলভ প্রশাসন ধ্বনিটিকে সত্য করে তোলে।’[১]

কৃষকদের মধ্য থেকে, তথা অন্যান্য পেটি বুর্জোয়া স্তরের মধ্য থেকে মাত্র নগণ্য অল্পসংখ্যক লোকেই ‘ওপরে ওঠে’, বুর্জোয়া অর্থে ‘মানুষ হয়ে যায়’, অর্থাৎ পরিণত হয় ধনবান ব্যক্তিতে, বুর্জোয়ায়, নয় মোটা টাকার বিশেষ সুবিধাভোগী চাকুরিয়ায়। যেখানে কৃষক আছে এমন সমস্ত পুঁজিবাদী দেশেই (আর তেমন পুঁজিবাদী দেশই অধিকাংশ) সরকার কৃষকদের বিপুল অধিকাংশকেই পীড়ন করে তাই তারা সরকার উচ্ছেদের জন্য আকুল, ‘সুলভ’ সরকারের জন্য আকুল। সেটা কার্যকরী করতে পারে কেবল প্রলেতারিয়েত, এবং তা করতে গিয়ে সে সেই সঙ্গে রাষ্ট্রের সমাজতান্ত্রিক পুনর্গঠনের দিকে পা বাড়ায়।[২]

ফুলকিবাজ সংস্করণের পাদটিকা:

১. কার্ল মার্কসের ‘ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ’ দ্রষ্টব্য।
২. বর্তমান অনুবাদটি সামান্য সংস্কারকৃত এবং অনুবাদটি নেয়া হয়েছে প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, অনূদিত বাংলা সংস্করণ ১৯৭৬-এর পৃষ্ঠা ৪১-৪৫ হতে।

🔗 লেনিন সংগ্রহশালা: গুরুত্বপূর্ণ রচনাবলী

Leave a Comment