আধুনিকতা হচ্ছে একটি ঐতিহাসিক সময়কাল ও নবজাগরণের পরে উদ্ভূত সংস্কৃতি

মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের একটি বিষয় হিসেবে আধুনিকতা (ইংরেজি: Modernity) হচ্ছে একটি ঐতিহাসিক সময়কাল (আধুনিক যুগ) এবং নবজাগরণের পরে — সপ্তদশ শতকের চিন্তাপদ্ধতির যুক্তির যুগ এবং অষ্টাদশ শতকের আলোকায়নের যুগে — উদ্ভূত বিশেষ সামাজিক-সাংস্কৃতিক রীতিনীতি, মনোভাব ও অনুশীলনের সমষ্টি।

অভিধা হিসেবে ‘আধুনিকতা’র বহুবিধ অর্থ হয়ে থাকে। এর প্রয়োগক্ষেত্রও হতে পারে নানা রকম। ধর্মীয় আন্দোলন ও সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে কিংবা শিল্প সাহিত্য স্থাপত্য ভাস্কর্য ও সংস্কৃতির আরো নানা ক্ষেত্রে ‘আধুনিকতা’ শব্দের বিভিন্ন মাত্রা লক্ষ করা যেতে পারে। তবে এই শব্দ প্রয়োগের এক প্রধান ক্ষেত্র নিশ্চয়ই সমাজ রূপান্তর।

পাশ্চাত্য সমাজের ইতিহাস আলোচনায় পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে মোটামুটি আধুনিকতার সূত্রপাত বলে ধরা হয়। ইউরোপীয় রেনেসাঁসকে অনেকেই এই আধুনিকতার প্রথম দিক চিহ্ন বলে মনে করেন। কিন্তু রেনেসাঁস ঠিক আধুনিকতার অন্তর্গত, না তার সমীপবর্তী, এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তার কারণ যে সব প্রধান চরিত্রলক্ষণ দিয়ে আধুনিকতাকে সাধারণত চিহ্নিত করা হয়ে থাকে, তার অনেক কিছুর আভাস হয়তো রেনেসাঁস পর্বে টের পাওয়া যায়, তবে তখনো সেগুলি তেমন পূর্ণ বিকশিত চেহারা অর্জন করেনি।

প্রাগাধুনিক যুগে ব্যক্তির নিজস্ব বিকাশের পথ ছিল অবরুদ্ধ; তখন সমাজ সংগঠন ও সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে ব্যক্তির চেয়ে গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের প্রাধান্যই ছিল অবিসংবাদিত। কৌম জীবনের কঠোর আচার-আচরণ ও বিধিনিষেধের মাধ্যমেই তখন সমাজ জীবন নিয়ন্ত্রিত হতো, যেখানে ব্যক্তির স্বাধীন সিদ্ধান্ত প্রয়োগের সুযোগ ছিল না বললেই চলে। স্বাভাবিকভাবেই, সেই পরিবেশে ব্যক্তির মৌলিক অধিকারের ধারণাটিও প্রসার লাভ করতে পারেনি এবং মানুষ তখনও তার সমাজসত্তায় পূর্ণাঙ্গ ‘ব্যক্তি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হয়নি।[১]

আধুনিকতার সংজ্ঞা

রাজনৈতিকভাবে, আধুনিকতার প্রাথমিক পর্যায় শুরু হয় নিকোলো ম্যাকিয়াভেলির রচনার মাধ্যমে, যারা নাগরিক সরকারে আচরণ সম্পর্কে নতুন এবং মৌলিক চিন্তাভাবনার পক্ষে রাজনীতির ধ্রুপদী তত্ত্বগুলিকে প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের ধ্রুপদী পদ্ধতির সাথে বাহ্যিকভাবে দ্বিমত পোষণ করেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, ম্যাকিয়াভেলি যুক্তি দিয়েছিলেন যে রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে সহিংস বিভাজন অনিবার্য, তবে এটি শক্তির উৎসও হতে পারে যার জন্য আইন প্রণেতা ও নেতাদের জবাবদিহি করা উচিত এবং এমনকি কিছু উপায়ে তাদের উৎসাহিত করা উচিত।

আধুনিকতার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা। সমাজ কাঠামোর একক হিসেবে গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের পরিবর্তে ব্যক্তির এই স্বতন্ত্র স্বীকৃতি আধুনিকতায় উত্তরণের পথে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। পূর্ণাঙ্গ ‘ব্যক্তি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ ও রূপান্তরের ক্ষেত্রে যুক্তিবাদের প্রতিষ্ঠা ছিল অপরিহার্য। বিশেষ করে প্রকৃতিবিজ্ঞানের অগ্রগতি এবং প্রযুক্তির বিস্তার মানুষের মনে যুক্তিবাদী চিন্তা-চেতনাকে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। অন্ধ প্রথা, লোকজ প্রচলন কিংবা শাস্ত্রবচনের পরিবর্তে গুরুত্ব পেতে শুরু করে যুক্তি, তথ্য, প্রমাণ ও নিবিড় পরীক্ষা-নিরীক্ষা। আধুনিক মননের এই যৌক্তিক ভিত্তি থেকেই জন্ম নেয় নতুন আদলের জ্ঞানবিজ্ঞান ও বিশ্ববীক্ষা।

আধুনিক সমাজের বিবর্তন ও রূপান্তর

ব্যক্তির স্বতন্ত্র উত্তরণে শিল্পায়ন, নগরায়ন, শ্রম বিভাজন এবং একটি সর্বজনীন আইনি কাঠামোর প্রতিষ্ঠা ছিল অন্যতম সহায়ক চালিকাশক্তি। সময়ের পরিক্রমায় এইসব উপাদানের সমন্বয়ে যে নতুন জীবনবোধ ও সমাজকাঠামো গড়ে উঠল, তাকেই আমরা আধুনিক সমাজের মূল বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করি। এই বিবর্তনের ফলে সনাতন কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ জীবনের পরিবর্তে শিল্প ও প্রযুক্তি নির্ভর নগরজীবন ক্রমশ প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।

রূপান্তরের এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও গোষ্ঠীর আপেক্ষিক অবস্থান এবং ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। চিরায়ত গ্রামীণ সমাজে যেখানে জমি ও ভূস্বামীর একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল এবং সমাজের অন্য স্তরগুলো ছিল একান্তই অধস্তন, আধুনিকতায় উত্তরণের পর্বে সেই শ্রেণি-বিন্যাসে আমূল পরিবর্তন ঘটে। ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব এই পরিবর্তনের ধারায় এক নতুন ও শক্তিশালী মাত্রা যোগ করে।

পুঁজিবাদ

অবশ্য এত বড় একটি সামাজিক রূপান্তর রাতারাতি কোনো একটি বৈপ্লবিক ঘটনার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়নি। বরং দীর্ঘদিনের ক্রমবিবর্তনের মধ্য দিয়ে ভূস্বামী শ্রেণির রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য খর্ব হয়। সেই শূন্যস্থানে প্রথমে আবির্ভূত হয় বণিক শ্রেণি এবং পরবর্তীতে তাদেরই পথ ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় শিল্পপুঁজির অবিসংবাদিত প্রভাব। তবে পরিবর্তনের এই পুরো প্রক্রিয়াটি কখনোই খুব সহজ বা নির্দ্বন্দ্ব ছিল না।

আধুনিকতার বিবর্তন পথ বিভিন্ন দেশে ও বিভিন্ন সমাজে নানা বৈচিত্র্যে ভরা। আধুনিকতার সময়কালও বিভিন্ন সমাজে বিভিন্ন রকমের। কোনো সমাজেই এই রূপান্তর খুব নিরুপদ্রব ও মসৃণ ছিল না। আধুনিকতার যাত্রাপথে দেখা দিয়েছে নানা সংকট ও সংঘর্ষ। দেশে দেশে সেখানেও আছে নানা ভিন্নতা।

উপনিবেশবাদ

আধুনিক শিল্পোন্নত বিশ্বের ইতিহাসে উপনিবেশবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী অধ্যায়। পাশ্চাত্য শক্তিগুলোর উপনিবেশ বিস্তারের ফলে অধিকৃত দেশগুলোতে আধুনিকতার অনুপ্রবেশ ঘটেছিল মূলত এক বহিঃস্থ অভিঘাত হিসেবে। আধুনিক শিল্প-কারখানার পত্তন, রেলপথের বিস্তার এবং ডাক ও তারের মতো উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে যে আধুনিকায়ন শুরু হয়, তা উপনিবেশিত সমাজের চিরায়ত শিক্ষা, ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতিতে গভীর টানাপোড়েন তৈরি করে।

প্রথাগত ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সামাজিক রীতিনীতির উচ্ছেদ ও সংস্কারকে কেন্দ্র করে আধুনিকতায় উত্তরণের এই পর্যায়ে ব্যাপক সামাজিক ও আদর্শিক সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছিল। আমাদের এই ভূখণ্ডে সতীদাহ প্রথা বিলোপ, বিধবাবিবাহের প্রচলন এবং ইংরেজি শিক্ষার প্রসারের মতো ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়ে সেই পরিবর্তনের পথ ও সংকটের ইতিহাস স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।

আধুনিকতা, আধুনিকতাবাদ ও তার প্রতিক্রিয়া

সমাজের বিবর্তনে একটি বিশেষ কালখণ্ডকে যদি ‘আধুনিক’ বলা হয় এবং সেই সময়ের বৈশিষ্ট্যগুলোকে ‘আধুনিকতা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তবে সেই লক্ষণগুলোকে যখন আমরা আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করি, তাকে বলা হয় ‘আধুনিকতাবাদ’। এই চিন্তাধারায় আধুনিকতাকে যখন প্রাগাধুনিকের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হিসেবে দেখা হয়, তখন সময়ের নিরিখে একটি ‘ভালো-মন্দের’ বিচার সামনে চলে আসে। শুধু সময়ের ব্যবধানেই নয়, একই সময়ের আধুনিক ও অনাধুনিক চিন্তার মধ্যেও এই শ্রেষ্ঠত্ব ও নিকৃষ্টতার বিভাজন টানা সম্ভব। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আধুনিক মননের কাছে প্রাগাধুনিক বা অনাধুনিক সমাজব্যবস্থা প্রগতির পথে অন্তরায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

আধুনিকতাবাদের এই প্রয়োগের মধ্যে এক ধরনের আধিপত্য বা ‘দাপটের’ সম্ভাবনা সুপ্ত থাকে। শ্রেষ্ঠত্বের এই মানদণ্ডটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে সমাজকাঠামোতে আধুনিকতাকে বলপূর্বক চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা অত্যন্ত স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়। আধুনিকতা প্রতিষ্ঠার এই আগ্রাসী প্রক্রিয়ায় প্রাগাধুনিক সমাজের অনেক ঐতিহ্য বা মানবিক অনুষঙ্গ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যেতে পারে। যখন আধুনিকতার দাপটে অন্য কোনো বিকল্প জীবনধারা বা চিন্তার স্বীকৃতি থাকে না, ঠিক তখনই জন্ম নেয় আধুনিকতার বিরুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা। এই কারণেই আধুনিকতা এবং তার সমালোচনা সমান্তরালভাবে পথ চলেছে। এককালের রোমান্টিকতাবাদ থেকে শুরু করে সমসাময়িক উত্তর-আধুনিকতাবাদ পর্যন্ত এই সমালোচনা ও প্রতিরোধের ধারাটি অত্যন্ত বিস্তৃত ও সুদূরপ্রসারী।[২]

আরো পড়ুন

পেইন্টিঙয়ের ইতিহাসঃ নিবন্ধে ব্যবহৃত পেইন্টিংটি অঁরি মাতিসের (১৮৬৯ – ১৯৫৪) ডান্স বা নাচ যেটি আঁকা মুক্তি, যেটি আঁকা হয়েছিল ১৯১০ সালে।

তথ্যসূত্র ও টিকা

১. লেখাটি ৬ মে ২০১৮ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো।
২. সৌরীন ভট্টাচার্য, “আধুনিকতা ও আধুনিকতাবাদ প্রসঙ্গে”, সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত, বুদ্ধিজীবীর নোটবই, নবযুগ প্রকাশনী, বাংলাবাজার, ঢাকা, প্রথম সংস্করণ, ফেব্রুয়ারি ২০১০, পৃষ্ঠা, ৫৮-৫৬। ২.

Leave a Comment

error: Content is protected !!