কাহ্নপা বা কাহ্নপাদ হাজার বছর আগের বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য ও চর্যাপদকর্তা

কাহ্নপা বা কাহ্নপাদ (আনু. ১০ম শতক; ইংরেজি: Kanhapa বা Kanhapada বা Krishnacharya) হাজার বছর আগের বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য ও চর্যাপদকর্তা। তার প্রকৃত নাম কৃষ্ণাচার্য পাদ, অপভ্রংশে হয়েছে কাহ্নপা, কনহপা, কাহিল পা ইত্যাদি। কাহ্নপা (আনু. ৬৭৫-৭৭৫ সাধারণাব্দ) বাঙলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদের অন্যতম কবি। চর্যাপদের মোট ৫১টি পদের মধ্যে সাড়ে ছেচল্লিশটি পদ অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে। এগুলোর মধ্যে নষ্ট হয়ে যাওয়া একটি পদ-সহ মোট ১৩টি পদই রচনা করেন কাহ্নপা। তিনি বাঙালী ছিলেন, তবে উড়িষ্যাবাসী বলেও অনেকে দাবি করেন।[১]

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস গবেষক প্রখ্যাত বৌদ্ধ ধর্মীয় অধ্যক্ষ জিতেন্দ্র লাল বড়ুয়া ‘নেত্রকোণা: অতীত ও বর্তমান’ শীর্ষক এক গবেষণামূলক রচনায় কাহ্নপাকে নেত্রকোণার আটপাড়া উপজেলার কৃষ্টপুর গ্রামের বাসিন্দা বলে দাবী করেছেন। কাহ্নপা রচিত চর্যাপদে ব্যবহৃত বিভিন্ন শব্দ এখনও নেত্রকোণার গ্রামাঞ্চলে ব্যাপক প্রচলন জিতেন বড়ুয়ার দাবীকে যৌক্তিক বলে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তবে কেউ কেউ বলেন, তিনি তিব্বতি ঐতিহ্যমতে উড়িষ্যার অধিবাসী।

বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদের কবিগোষ্ঠীর মধ্যে তিনিই ছিলেন শ্রেষ্ঠ। পালরাজ দেবপালের রাজত্বকালে (আনুঃ ৯০০-৯৫০) তিনি বর্তমান ছিলেন। কাহ্নপা সম্প্রদায়গতভাবে ছিলেন ব্রাহ্মণ, পরে সহজিয়া মতে দীক্ষা নিয়ে সিদ্ধাচার্য, মন্ডলাচার্য ইত্যাদি উপাধিতে ভূষিত হন। পরিণত বয়সে পাহাড়পুরের সোমপুর বিহারে তিনি অবস্থান করতেন। তিনি ছিলেন সোমপুর বিহারের অন্যতম বিখ্যাত আচার্য।

তিনি বৌদ্ধ সহজিয়া মতের অনুসারী ছিলেন। নাথপন্থীযোগী জলন্ধরী পা বা হাড়িপা ছিলেন তার  গুরু। চর্যাপদের ২৩ জন কবির মধ্যে কাহ্নপার পদসংখ্যা সর্বাধিক, মোট ১৩টি। এ পর্যন্ত কাহ্নপার ভণিতায় ৭৪ খানি গ্রন্থের নাম জানা গেছে। অনেকে মনে করেন, সকল গ্রন্থের রচয়িতা একই কাহ্নপা নাও হতে পারেন। চর্যাপদ ছাড়া বাকিগুলি অপভ্রংশ ও সংস্কৃত ভাষায় রচিত। তার  পদগুলিতে বৌদ্ধতন্ত্র ও হিন্দুতন্ত্রের মিশ্রণ আছে।

অন্যান্য পদকর্তার মতো কাহ্নপাও সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। তার প্রত্যেক পদের শীর্ষে রাগ-তালের উল্লেখ আছে। রূপক-প্রতীক-সংকেতের ভাষায় রচিত পদগুলিতে তার কবিত্বশক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। তার নামে প্রচলিত কয়েকটি গ্রন্থ হলো: কাহ্নপাদগীতিকা, যোগরত্নমালা, হেবজ্রসাধন, তত্ত্বোদ্যোৎকার, হেবজ্রপদ্ধতি, মণ্ডলবিধি ইত্যাদি। এছাড়া অপভ্রংশ ভাষায় লেখা তার একটি ‘দোহাকোষ’ আবিষ্কৃত হয়েছে। তার রচিত “হেবজ্রপঞ্জিকা’ নামক একখানি পুঁথি ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে রক্ষিত আছে।[২] এখানে কাহ্নপার একটি গীতি দেয়া হলো।

আলিএঁ কালিএঁ বাট রুন্ধেলা

(রাগ পটমঞ্জরী)

আলিএঁ কালিএঁ বাট রুন্ধেলা।
তা দেখি কাহ্ন বিমণা ভইলা॥
কাহ্ন কহি গই করিম নিবাস ।
জো মণ গোঅর সো উআস॥
তে তীনি তে তীনি তীনি হো ভিন্না
ভণই কাহ্ন ভব পরিচ্ছিন্না॥
জে জে আইলা তে তে গেলা ।
অবণাগবণে কাহ্ন নিঅড়ি বিমণা ভইলা॥
হেরি সে কাহ্ন নিঅড়ি জিনিউর বট্টই।
ভণই কাহ্নি মো হিঅহি ন পইসই॥

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র

১. রফিকুল ইসলাম, মোহাম্মদ আবু জাফর ও আবুল কাসেম ফজলুল হক সম্পাদিত, কবিতা সংগ্রহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জুন ১৯৮৯, পৃষ্ঠা ৪৩৫।
২. অনুপ সাদি, দোলন প্রভা, নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ, টাঙ্গন, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ, জুন ২০২৪, পৃষ্ঠা ৮৭।

Leave a Comment

error: Content is protected !!