মনের জানালা ধরে উঁকি দিয়ে গেছে যার চোখ: সলিল ও সতীনাথের কালজয়ী সৃষ্টি

‘মনের জানালা ধরে উঁকি দিয়ে গেছে যার চোখ তাকে আর মনে পড়ে না’—গানটি কালজয়ী সুরকার ও গীতিকার সলিল চৌধুরীর এক অতুলনীয় সৃষ্টি। এটি কেবল একটি গান নয়, বরং তাঁর নিজের লেখা একটি ছোটগল্পের ছায়ায় তৈরি এক সুরের আখ্যান। সলিল চৌধুরীর সৃজনে যে আধুনিকতা ও নাগরিক বিষণ্নতার মেলবন্ধন দেখা যায়, এই গানটি তারই এক অনন্য উদাহরণ। বিরহ আর বিস্মৃতির কাব্যিক আবহে গানটি ফেলে আসা স্মৃতিগুলোকে এক নতুন রূপকের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলে।

সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের জাদুকরী কণ্ঠ গানটিকে দিয়েছে অমরত্ব। তাঁর ধ্রুপদী ঢঙের গায়কী ও নিখুঁত পরিবেশনা গানটিকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। বিশেষ করে সুরের চড়াই-উতরাই আর বিরহের গভীর আবেদন সতীনাথবাবু অত্যন্ত দরদ দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। পরবর্তী সময়ে বহু শিল্পী গানটি কাভার করলেও, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের সেই আদি ও অকৃত্রিম সংস্করণটিই আজও সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

গানটি শ্রীকান্ত আচার্যের কণ্ঠে ইউটিউব থেকে শুনুন

স্মৃতি ও মুক্তির কাব্যিক বুনন: এক অপূর্ণ প্রেমের আখ্যান

সলিল চৌধুরীর এই বিরহী সৃষ্টিতে এক অদ্ভুত অতৃপ্তি, ধূসর স্মৃতি আর হৃদয়ের তীব্র আকুতি মিশে আছে। এখানে পুরনো প্রেমের স্মৃতি এতটাই প্রবল যে, তা নতুন কোনো সম্পর্কে জড়ানোর পথে এক অদৃশ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়। কামনার ফুল ঝরে যাওয়ার পরেও কবির অবচেতন মন প্রিয়জনের ফেরার প্রতীক্ষা করে—যা মূলত তাঁর একনিষ্ঠ ও হার না মানা ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ। বন্ধন ও মুক্তির চমৎকার রূপক ব্যবহার করে কবি বুঝিয়েছেন, প্রিয়জনকে মায়ার শিকলে আটকে রাখার শত চেষ্টা থাকলেও সে নূপুরের নিক্বণে ঠিকই দূর অজানায় হারিয়ে যায়। মূলত ভালোবাসার মানুষ যে জাগতিক কোনো নিয়মে ধরা দেয় না, সেই চিরন্তন সত্যটিই এখানে মূর্ত হয়ে উঠেছে।

গানের কথা

মনের জানালা ধরে উঁকি দিয়ে গেছে
যার চোখ তাকে আর মনে পড়ে না।

চেয়ে চেয়ে কত রাত দিন কেটে গেছে
আর কোনো চোখ তবু মনে ধরে না।

হৃদয়ের শাখা ধরে নাড়া দিয়ে গেছে
ঝুরঝুর ঝরে গেছে কামনার ফুল।

মালা গেথে কবে থেকে নিয়ে বসে আছি
আবার কখনও যদি করে সেই ভুল
ভুলেও কভু তো সে ভুল করে না।।

যেতে যেতে গানখানি পিছে ফেলে গেছে
ছমছম নুপূরের সকরুণ সুর।

শিকলে বাধিতে তারে চেয়েছিনু বুঝি
শিকল চরণে তার হয়েছে নুপূর
ধরার বাধনে সে তো ধরা পড়ে না।।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, ‘মনের জানালা ধরে উঁকি দিয়ে গেছে যার চোখ’ কেবল একটি গান নয়, বরং এটি সুর ও কাব্যের এক দীর্ঘশ্বাস। সলিল চৌধুরীর আধুনিক মনন আর সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের কালজয়ী কণ্ঠের এই মেলবন্ধন বাংলা সংগীতের ইতিহাসে এক অমূল্য সম্পদ। বিস্মৃতি আর স্মৃতির দোলাচলে ঘেরা এই গানটি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে শেখায়—কিছু প্রেম হারানো প্রাপ্তির চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর। আজও যখন কোনো নিভৃত বিকেলে এই গানটি বেজে ওঠে, তখন অজান্তেই তা শ্রোতার মনের জানালা খুলে দেয় এক না-বলা বিষণ্নতার জগতে।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র ও টিকা

১. লেখাটি ২০ মার্চ ২০১৯ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো। গানের কথা নেয়া হয়েছে শিশির চক্রবর্তী সংকলিত পত্রভারতী কলকাতা প্রকাশিত দ্বিতীয় মুদ্রণ ডিসেম্বর ২০১৮পাঁচদশকের আধুনিক বাংলা গানের গীতবিতান এ শুধু গানের দিন গ্রন্থের ৪২৬ পৃষ্ঠা থেকে।

Leave a Comment