বাংলাদেশে সাম্যবাদ বা বাংলাদেশে সাম্যবাদী রাজনীতি (ইংরেজি: Communism in Bangladesh) তার উৎসমুখ খুঁজে পায় ১৯৬৭ সালের চীন সোভিয়েত মহাবিতর্কের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির বিভিন্ন ধারার বিভক্তি, আইয়ুব বিরোধী স্বৈরতন্ত্র, ইয়াহিয়া বিরোধী সামরিক স্বৈরতন্ত্রের উৎখাত এবং ১৯৭১ সালের মহান গণযুদ্ধের ভেতর দিয়ে। সুতরাং বাংলাদেশের সাম্যবাদী রাজনীতি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের সাম্যবাদী ধারার রাজনৈতিক সংগঠনের মধ্যে কার্যকর বিভিন্ন পন্থার রাজনীতি। এদেশে সাম্যবাদী রাজনৈতিক আন্দোলন একাধিকবার উপদলে বিভক্ত হয়েছে এবং দুচারবার একাধিক উপদলও একই দলে একত্রিত হয়েছে।
বাংলাদেশের সাম্যবাদী আন্দোলন নিষিদ্ধ থেকে প্রকাশ্য রাজনৈতিক অংশগ্রহণ আবার প্রকাশ্য থেকে গোপন রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ইতিহাসের উত্তরাধিকার বহন করে। গোপন ও বেআইনি প্রক্রিয়ায় এটি ১৯৭১ সালের গণযুদ্ধে বিপ্লবী ভূমিকা গ্রহণ, পরবর্তী স্বৈরতন্ত্রী সরকারের সময়ে গেরিলা বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করার একাধিক উদাহরণ রয়েছে, বিশেষ ভাবে ১৯৭৩-৭৫ সালের সাম্যবাদী বিদ্রোহের কথা উল্লেখ করা যায় যা প্রথম স্বৈরতন্ত্রী আওয়ামী লীগের উৎখাতের মাধ্যমে শেষ হয় এবং যার ফলে প্রায় ৬০০০০ মানুষ প্রাণ হারায়।
সাম্যবাদী আন্দোলনে বিরাজমান ২০টি বিতর্ক
বাংলাদেশের সাম্যবাদী আন্দোলনে বিরাজমান প্রায় বিশটি বিভিন্ন বিতর্কের বিষয় দেখা যায়। এসব বিতর্ক পার্টি ও সংগঠনগুলো তাদের বিতর্কের ধারাবিকতা ও উদ্ভূত রাজনৈতিক সামাজিক পরিস্থিতিতে পেয়েছে। এসব বিতর্কের প্রায় সবগুলোই তারা আন্তর্জাতিক ও জাতীয় উত্তরাধিকার থেকে পেয়েছে। এসব বিতর্ক আবার বিভিন্ন সমকালীন ঘটনার প্রেক্ষিতে মাঝে মাঝে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেখা যায়।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কী প্রগতিশীল?
বাংলাদেশের আধুনিক সংশোধনবাদী ধারার সংগঠনগুলোতে প্রায়ই আওয়ামী লীগকে প্রগতিশীল বলার একটি প্রবণতা দেখা যায়। বিশেষভাবে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিবি, ন্যাপ মোজাফফর, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদের বিভিন্ন অংশ এবং বাসদের অভ্যন্তরে এই বিতর্কটি মাঝে মাঝেই প্রধান বিতর্কে হাজির হয়। নিচে এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত লেখা হলো।
বাংলাদেশের আধুনিক সংশোধনবাদী ধারার রাজনীতিতে ১৯৭১ সাল সংঘটিত বাংলাদেশের গণযুদ্ধের ফলাফল থেকে এই বিতর্কের উদ্ভব। ১৯৭৩ সাল থেকেই এই বিতর্কে সিপিবি এবং ন্যাপ আওয়ামী লীগের মাধ্যমে বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখা শুরু করে। আমরা পরবর্তীকালের ইতিহাসে দেখব, সিপিবি এবং ন্যাপ মোজাফফরের অনেকগুলো তুচ্ছ উপদল লীগের ভেতরে নিজেদের বিলুপ্ত করে দেয়।
প্রধান শত্রু নির্ণয়ের সমস্যা
বাংলাদেশের সমাজে বিরাজমান প্রধান শত্রু নির্ণয়ে জটিলতার প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ নামক গণহত্যাকারী দলটিকে সিপিবি এবং ন্যাপ ১৯৭১ পরবর্তীকালে সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের প্ররোচনায় প্রগতিশীল বলে লীগের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়। সমস্যাটিকে অনুধাবনের জন্য দুটো বিষয়কে বোঝা যে কোনো বাম-সহানুভূতিশীল মানুষের জন্য জরুরি।
১. বাংলাদেশের সমাজে প্রধান শত্রু বুর্জোয়া একনায়কত্ব মানে আওয়ামি-বিএনপি; যদিও তারা সাম্রাজ্যবাদনির্ভর;
২. বিশ্বসমাজে প্রধান শত্রু সাম্রাজ্যবাদ;
ফলে বাংলাদেশের সমাজে যদি আওয়ামি-বিএনপিকে উৎখাতের কর্মসূচিকে প্রধান না করা হয় তবে তা সংশোধনবাদের খপ্পরে পড়বেই। একটু মাও সেতুং-এর কাছে যাই, তিনি লিখেছেন
“কোনো প্রক্রিয়াতে যদি অনেকগুলো দ্বন্দ্ব থাকে তাহলে তাদের মধ্যে অবশ্যই একটি প্রধান দ্বন্দ্ব থাকবে, যা নেতৃস্থানীয় ও নির্ণায়ক ভূমিকা গ্রহণ করবে, অন্যগুলো গৌণ ও অধীনস্থ স্থান নেবে। তাই দুই বা দুইয়ের বেশি দ্বন্দ্ববিশিষ্ট জটিল প্রক্রিয়ার পর্যালোচনা করতে গেলে, আমাদের অবশ্যই তার প্রধান খুঁজে পাবার জন্য সর্ব প্রকারের প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এই প্রধান দ্বন্দ্বকে আঁকড়ে ধরলে সব সমস্যাকেই সহজে মীমাংসা করা যায়।”[১]
তাহলে বাংলাদেশে সমাজতন্ত্রিরা কাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালাবেন। অবশ্যই বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে এবং এই বুর্জোয়াদের প্রতিনিধি হিসেবেই রাজনীতি করছে আওয়ামি-বিএনপি-জামাত-জাপা। সমাজতন্ত্রিরা যদি জনগণের ভেতরকার দ্বন্দ্বগুলোকে কাজে লাগাতে পারেন, সফলতা আসবে। ফলে মূল আঘাতটি আওয়ামি-বিএনপি-জামাতকেই করতে হবে।
যেসব বামপন্থি ও তাদের সমর্থক আওয়ামী লিগকে আক্রমণ না করে বা আওয়ামী লিগকে সহযোগিতা করে দেশে সমাজতন্ত্র কায়েম এবং সামন্তবাদ দ্বারা উত্থিত, পুঁজিবাদ-পুষ্ট ও সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা পালিত জামাতসহ অন্যান্য গোঁড়া ধর্মপন্থি দলগুলোকে উৎখাতের স্বপ্ন দেখছেন তারা আসলে শ্রেণি-সমন্বয়ের লাইনে আছেন এবং সুবিধাবাদকে উৎসাহিত করছেন। তারা দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ এবং শ্রেণিসংগ্রাম থেকেও দূরে আছেন। তারা বিভিন্ন বস্তুর আলাদা আলাদা দ্বন্দ্বগুলো ও তাদের পারস্পরিক সম্পর্ককে বুঝতে চাচ্ছেন না।[২]
একসময় বাংলাদেশের বামপন্থীগণ শ্লোগান দিতেন ধর্ম নিয়ে ব্যবসা বন্ধ কর, পরে দেখা গেল এদেশে শুধু ধর্ম নিয়ে ব্যবসা চলে না, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ইত্যাদি নিয়েও দারুণ ব্যবসা করা যায়। মুক্তিযুদ্ধ শব্দটিও এখন অর্থহীনতায় পর্যবসিত এবং সেটিকে নানা অর্থনৈতিক ব্যাপারের সাথে জড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ১৯৭১ সালের সেই শ্রেণিযুদ্ধটিতে যারা জয়ী হয়েছিলো তারাই আজ দেশের সবচেয়ে সুবিধাভোগি শ্রেণি। এবং সেই যুদ্ধের দুর্বলতা থেকেই নির্মিত হয়েছে আজকের লুটেরা শ্রেণিটি। আর এই শ্রেণিটিকেই সেবা করে যাচ্ছে আওয়ামি-বিএনপি-জামাত-জাপার পুঁজিবাদি অর্থনীতি ও রাজনীতি।
স্বাধীনতা মানে তো সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিক-কৃষকের স্বাধীনতা; তারা স্বাধীন হলে তো তাদের মৌলিক অধিকারসহ অন্য স্বাধীনতাগুলো থাকতো, ১৯৭১-এর আগেও শ্রমিক-কৃষক পরাধীন, এখনো পরাধীন, স্বাধীন হয়েছে আওয়ামি-বিএনপির শিল্পপতি কোটিপতিরা; সেটাও অর্থনৈতিকভাবে; রাজনৈতিকভাবে আওয়ামি-বিএনপি আমেরিকার দাসত্বই করে। এইরূপ পরিস্থিতিতে সমাজতন্ত্রিদের আওয়ামি লিগের প্রতিক্রিয়াশীলদের মুখোশ উন্মোচন করতে হবে। বাংলাদেশে যেভাবে প্রগতিশীলতার নামে ইতিহাসের উল্টোদিক চলছে; সেই উলটো পথকে সোজা করে দিতে হবে।
পশ্চাৎপদ জনগণের রাজনীতি
সমাজের সবচেয়ে পশ্চাতপদ অংশ হচ্ছে ধর্ম অনুসারী লোকজন আর সেই শ্রেণিটির প্রতিনিধি হয়ে রাজনীতি করছে ধর্মপন্থি দলগুলো; মার্কসবাদিগণ সেই পশ্চাতপদ অংশটিকে এগিয়ে নিতে চায়। ফলে মার্কসবাদিদেরকে এসব পশ্চাতপদ অংশের মানুষকে সাথে নিয়ে রাজনীতি করতে হলে দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদি দৃষ্টিতে ধর্মকে এবং তার সাথে বাংলাদেশের পরিবেশকে বিবেচনা করে এগোতে হবে। ঐক্য-সংগ্রাম-ঐক্যের নীতি অবলম্বন করে সমাজের সবচেয়ে পশ্চাতপদ অংশটিকে বস্তুবাদী শিক্ষায় শিক্ষিত করে এগোতে হবে; সমাজের সবচেয়ে পশ্চাতপদ দরিদ্র মানুষের ধর্ম বিশ্বাসকে কোনোভাবেই সামান্যতম আঘাত করে তাদের সাথে অনৈক্য সৃষ্টি করা উচিত নয়। লেনিনের নির্দেশমতো সমাজতন্ত্র ও ধর্ম সম্পর্কে ঐতিহাসিক বস্তুবাদি দৃষ্টিভংগি অবলম্বন করে এগোতে হবে।
কারণ শ্রেণিসংগ্রামি-সমাজতন্ত্রিরা যদি বুর্জোয়াদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয় তাহলে তারা আর সঠিক লাইনে থাকে না। কিন্তু বাংলাদেশে আধুনিক সংশোধনবাদী অংশটি বারবার বুর্জোয়াদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদেরকে জনবিচ্ছিন্ন করেছে। সামরিক শাসকদের সরাতে বামপন্থি ও গণতান্ত্রিকদের ১৫ বছর অতিবাহিত হয়েছিলো। বুর্জোয়াদের সরাতে গিয়েও তাদের প্রায় ৪০ বছর পেরিয়ে গেলো; কিছুই করা সম্ভব হলো না। আওয়ামি-বিএনপির বুর্জোয়া একনায়কত্বকে সরাতে কত বছর লাগে তাই দেখেন?

তাহলে বাসদ-সিপিবির ১৮ ডিসেম্বর, ২০১২’র হরতালে ‘জামাত-শিবিরসহ সকল সাম্প্রদায়িক দল এবং রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ’[৩] করার যে দাবিটি প্রধান হয়েছে তা দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ না বোঝার ফলেই হয়েছে। সময় জ্ঞানে তাজরিন গার্মেণ্টসে শ্রমিক পুড়ানোর বিরুদ্ধে হরতাল অবশ্যই হতে পারতো, কিন্তু নেতারা ব্যাখ্যা দেবেন, যুদ্ধাপরাধের বিচারও জনগণের বিশাল একটা অংশ চায়; যদিও সেই অংশটিকেও অনেকেই মধ্যবিত্ত বলেই অভিহিত করছেন। পরবর্তীতে ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ সালে শুরু হওয়া শাহবাগ আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি দেখে সে আন্দোলনকে মধ্যবিত্তদের আন্দোলনরূপেই অভিহিত করা হয়েছে।
১৯২১ সাল থেকে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি অনেক কটি হরতাল পালন করেছে। হরতাল করাটা বড় কথা নয়। কাজ করাই বড় কথা নয়; কাজের ফল আওয়ামী লিগের ঘরে বা বিএনপির ঘরে যাতে না যায় সে বিষয়ে সচেতন থাকাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। লেনিনের একটি প্রবন্ধ আছে “কম করে, কিন্তু ভালো করে।”
আরো পড়ুন
- বাংলাদেশে সাম্যবাদ হচ্ছে বিভিন্ন সংগঠনে কার্যকর বিভিন্ন পন্থার রাজনীতি
- সিপিবির জাতীয়তাবাদ অভিমুখি বিচ্যুতি প্রসঙ্গে
- সিপিবির মোদীতোষণ এবং ক্ষুদে-বুর্জোয়া নির্বোধদের সিপিবিতোষণ
- বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো বনেদী বামপন্থী দল
- খোকা রায় ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনন্য বিপ্লবী
- সিপিবি মৌলভীবাজার জেলার ইতিহাস শ্রমিক, কৃষক ও মেহনতি মানুষের ইতিহাস
- সিপিবি সিলেট জেলার ইতিহাস শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ মেহনতি মানুষের সংগ্রামের পথ
- আনোয়ার হোসেন: নেত্রকোনার এক আদর্শবাদী ও সাম্যবাদী রাজনীতিকের জীবনগাথা
- কমরেড আবদুল বারী: মোহনগঞ্জের এক প্রদীপ্ত সাম্যবাদী চেতনার জীবনগাথা
- বাংলাদেশে মার্কসবাদ চর্চা
- মণি সিংহ ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ও বামপন্থী রাজনীতিক
- জ্যোতিষ বসু ছিলেন সাম্যবাদী বিপ্লবী, ভাষা সৈনিক, গণতান্ত্রিক যোদ্ধা
- রোকেয়া বেগম ছিলেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক নারীমুক্তি আন্দোলনের নেত্রী
তথ্যসূত্র
১. মাও সেতুং; দ্বন্দ্ব সম্পর্কে; আগস্ট, ১৯৩৭
২. অনুপ সাদি, ২ আগস্ট ২০১৭; রোদ্দুরে.কম, “প্রধান শত্রু নির্ণয়ের সমস্যা ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/ideology/socialism/main-enemy/
৩. সিপিবি ও বাসদ প্রকাশিত ৭ ডিসেম্বর, ২০১২ তারিখে প্রচারিত হ্যান্ডবিল।
রচনাকাল, ২০ ডিসেম্বর, ২০১২
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।