কমরেড খোকা রায় (মার্চ, ১৯০৭ – ৯ ডিসেম্বর, ১৯৯২) ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে একজন অনন্য বিপ্লবী নেতা। তিনি তাঁর মেধা, সাহস ও আদর্শ দিয়ে সাধারণ মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের তেজস্বী সৈনিক থেকে শুরু করে সাম্যবাদী আদর্শের প্রসারে তাঁর ভূমিকা অনন্য। তিনি ছিলেন একাধারে যুগান্তর দলের সক্রিয় সদস্য এবং পরবর্তী জীবনের একনিষ্ঠ কমিউনিস্ট নেতা।[১]
খোকা রায় ১৯০৭ সালের মার্চ মাসে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার ময়মনসিংহে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে দেশপ্রেমের এক উত্তাল পরিবেশে। পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক আবহ থেকেই তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার প্রেরণা লাভ করেন।
রাজনৈতিক হাতেখড়ি ও অসহযোগ আন্দোলন
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ঘটে অত্যন্ত অল্প বয়সে। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কর্মী হিসেবে রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯২১ সালে যখন মহাত্মা গান্ধীর আহ্বানে দেশজুড়ে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়, তখন কিশোর খোকা রায় সেই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ছাত্রাবস্থায় রাজপথে নেমে আসা এই সংকল্পই তাঁকে ভবিষ্যতের একজন আপসহীন বিপ্লবী হিসেবে গড়ে তোলে।
যুগান্তর দলে যোগদান ও সশস্ত্র বিপ্লব
অসহযোগ আন্দোলনের অভিজ্ঞতার পর তিনি অনুধাবন করেন যে, ব্রিটিশ শাসনমুক্ত হতে হলে সশস্ত্র সংগ্রামের বিকল্প নেই। এই লক্ষ্য নিয়ে মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি তৎকালীন প্রখ্যাত সশস্ত্র বিপ্লবী সংগঠন ‘যুগান্তর’ দলে যোগদান করেন। দলের আন্ডারগ্রাউন্ড বা গোপন বিভাগে তিনি অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের নজর এড়িয়ে সংগঠনের কাজ পরিচালনা করা এবং স্বাধীনতার মন্ত্রে যুবসমাজকে দীক্ষিত করার ক্ষেত্রে তিনি অসামান্য দক্ষতা প্রদর্শন করেন।
উচ্চশিক্ষা ও ছাত্র রাজনীতি
ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ থেকে ১৯২৮ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর খোকা রায় ১৯২৯ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রেখেই তিনি অধিকার আদায়ের আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৩০ সালে তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা ইউনিটের সম্পাদক নির্বাচিত হন। ছাত্র আন্দোলনে তাঁর আপসহীন ভূমিকার কারণে তৎকালীন কর্তৃপক্ষ তাঁকে জগন্নাথ হল থেকে বহিষ্কার করে।
সশস্ত্র বিপ্লব ও কারাবাস
ছাত্রাবস্থাতেই তিনি মাত্র ১৫ বছর বয়সে বিপ্লবী দল ‘যুগান্তর’-এ যোগ দিয়ে দলের গোপন (আন্ডারগ্রাউন্ড) কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর তিনি ময়মনসিংহে ফিরে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে আরও গতি সঞ্চার করেন। তবে ১৯৩০ সালের ৩০ নভেম্বর তিনি ব্রিটিশ পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। রাজদ্রোহের অপরাধে তাঁকে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে দুর্ভেদ্য আন্দামান সেলুলার জেলে নির্বাসন দেওয়া হয়।
সাম্যবাদে উত্তরণ
কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ খোকা রায়ের চেতনার বাতিঘর হয়ে দাঁড়ায়। আন্দামান জেলে বন্দি থাকা অবস্থায় তিনি কার্ল মার্কস ও ভ্লাদিমির লেনিনের রচনাবলি নিবিড়ভাবে অধ্যয়ন করেন। বৈপ্লবিক তাত্ত্বিক জ্ঞানের সংস্পর্শে এসে তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে আমূল পরিবর্তন ঘটে এবং তিনি মনেপ্রাণে একজন নিবেদিতপ্রাণ কমিউনিস্ট বা সাম্যবাদী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
কমিউনিস্ট পার্টি ও সাংগঠনিক দৃঢ়তা
১৯৩৮ সালে জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর খোকা রায় এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে সরাসরি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। সে বছরই তিনি ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির ময়মনসিংহ জেলা কমিটির সম্পাদক নির্বাচিত হন। তৎকালীন সময়ে কমিউনিস্ট পার্টি ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত হলেও তিনি অসীম সাহসিকতার সাথে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যান।
কঠিন সময়ে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব
নিষিদ্ধ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। খোকা রায় নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে ছিলেন আপসহীন। বারবার জেল-জুলুম ও হুলিয়া সত্ত্বেও তিনি পিছু হটেননি। পার্টির দায়িত্ব পালনে তাঁর সততা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ময়মনসিংহ অঞ্চলে কমিউনিস্ট পার্টিকে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিল। দলকে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠিত করতে এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের নজর এড়াতে দীর্ঘ সময় তাঁকে আত্মগোপনে (আন্ডারগ্রাউন্ড) থেকে কাজ করতে হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও জনযুদ্ধ নীতি
১৯৪১ সালের ২১ জুলাই বিশ্ব রাজনীতির মোড় এক নাটকীয় বাঁক নেয়। হিটলারের নাৎসি বাহিনী যখন বর্বরোচিতভাবে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে, তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চরিত্র আমূল বদলে যায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন এই ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং বিশ্ববাসীকে নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানায়। কমরেড খোকা রায় ও তাঁর দল এই সময় এক ঐতিহাসিক ও সাহসী অবস্থান গ্রহণ করেন। তাঁদের কাছে এই যুদ্ধ আর কেবল দুই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির লড়াই থাকল না; বরং তা পরিণত হলো ফ্যাসিবাদ বিরোধী ‘জনযুদ্ধে’ (People’s War)।
সাংগঠনিক উত্থান ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব
বিশ্বযুদ্ধের এই সংকটকালীন প্রেক্ষাপটে ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ সরকার কমিউনিস্ট পার্টির ওপর থেকে দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বাধ্য হয়। দল বৈধতা পাওয়ার পর খোকা রায়ের সাংগঠনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। ১৯৪৩ সালে অনুষ্ঠিত বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির ২য় সম্মেলনে তাঁর ওপর অর্পিত হয় গুরুদায়িত্ব। তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন এবং অতি দ্রুত তাঁর নিষ্ঠা ও মেধার স্বাক্ষর রেখে প্রাদেশিক সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য পদে উন্নীত হন।[২]
দাম্পত্য জীবন ও বিপ্লবের সখ্য
বিপ্লবী জীবনের কঠিন ও কণ্টকাকীর্ণ পথে খোকা রায় পাশে পেয়েছিলেন এক যোগ্য সহযোদ্ধাকে। ১৯৪৩ সালের জুলাই মাসে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির নিবেদিতপ্রাণ সার্বক্ষণিক কর্মী কমরেড জুঁইফুলকে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে গ্রহণ করেন। তাঁদের এই বিবাহ কেবল পারিবারিক বন্ধন ছিল না, বরং তা ছিল আদর্শিক মিলনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত, যেখানে ব্যক্তিগত সুখের চেয়ে দেশের মুক্তিই ছিল মুখ্য।
দেশভাগ ও আপসহীন সংগ্রাম
১৯৪৭ সালে যখন দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে এবং সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে ভারতীয় উপমহাদেশকে দ্বিখণ্ডিত করা হলো, তখন অনেক উচ্চপদস্থ নেতা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দেশত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু খোকা রায় ছিলেন মাটির টানে অবিচল। তিনি নিজ জন্মভূমি ও মেহনতি মানুষের অধিকার রক্ষায় স্বেচ্ছায় ঢাকায় চলে আসেন। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের তীব্র দমন-পীড়ন ও হুলিয়া সত্ত্বেও তিনি পিছু হটেননি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় তিনি আত্মগোপনে (আন্ডারগ্রাউন্ড) থেকে পার্টির সাংগঠনিক জাল বিস্তার করেন এবং প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেপথ্যে থেকে নেতৃত্ব দেন।
ইতিহাসের জীবন্ত দলিল: সংগ্রামের তিন দশক
একজন মাঠের লড়াকু সৈনিক হওয়ার পাশাপাশি খোকা রায় ছিলেন একজন প্রখর ধীসম্পন্ন লেখক। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা ও চড়াই-উতরাইয়ের কাহিনী তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ সংগ্রামের তিন দশক-এ। এই গ্রন্থটি কেবল তাঁর আত্মজীবনী নয়, বরং অবিভক্ত বাংলা ও পরবর্তীকালে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলনের এক প্রামাণ্য ও মূল্যবান ঐতিহাসিক দলিল।
পাকিস্তান আমলের বৈরী রাজনীতি ও প্রচারযুদ্ধ
১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের পর পূর্ব পাকিস্তানে কমিউনিস্ট পার্টির কাজের পরিধি কিছুটা বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ পায়। এই অনুকূল সময়ে দলীয় আদর্শ ও শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে খোকা রায়সহ শীর্ষ নেতৃবৃন্দ একটি মুখপত্র প্রকাশের উদ্যোগ নেন। অর্জিত হয় ‘জনতা’ নামক একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার ডিক্লারেশন। এই পত্রিকা পরিচালনার গুরুভার ন্যস্ত ছিল খোকা রায়, বারীণ দত্ত, কেজি মোস্তফা, আলী আকসাদ এবং প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ও লেখক জহির রায়হানের ওপর। কিন্তু মুক্তবুদ্ধি ও অধিকারের কথা বলা এই পত্রিকাটি পাকিস্তান সরকারের সহ্য হয়নি; প্রকাশের পরপরই রাষ্ট্রীয় শক্তিতে এটি বাজেয়াপ্ত করা হয়।
কলম যখন হাতিয়ার: ‘যুগের দাবি’ ও ‘মার্কসপন্থী’
সরকারি রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে খোকা রায় ও বারীণ দত্ত দমে যাননি। আদর্শিক প্রচার সচল রাখতে তাঁরা দ্রুতই ‘যুগের দাবি’ ও ‘মার্কসপন্থী’ নামে দুটি নতুন পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ শুরু করেন। এই প্রকাশনাগুলো ছিল তৎকালীন দুঃশাসনের বিরুদ্ধে মেহনতি মানুষের চেতনার বাতিঘর। লেখনীর মাধ্যমে তাঁরা শাসকগোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক ও শোষক চরিত্রের স্বরূপ উন্মোচন করতে থাকেন।
রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও পুনরায় আত্মগোপন
কমিউনিস্ট আন্দোলনের এই ক্রমবর্ধমান জোয়ার দেখে ভীত হয়ে পড়ে পাকিস্তান সরকার। ১৯৫৪ সালের মে মাসে কুখ্যাত ৯২ (ক) ধারা জারি করে জননিরাপত্তার দোহাই দিয়ে শুরু হয় গণগ্রেপ্তার। ফলশ্রুতিতে, ১৯৫৪ সালের ৪ জুলাই পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এবং এর মাত্র তিন সপ্তাহ পর পশ্চিম পাকিস্তানেও পার্টি নিষিদ্ধ হয়। রাজনীতির পথ আবারও রুদ্ধ হয়ে পড়লে এক মুহূর্ত দেরি না করে কমরেড খোকা রায় পুনরায় আন্ডারগ্রাউন্ড বা আত্মগোপনে চলে যেতে বাধ্য হন। অমানবিক হুলিয়া আর চিরুনি অভিযানের মধ্যেও তিনি নিভৃতে থেকে দলের মশাল জ্বালিয়ে রাখেন, যা পরবর্তী সময়ের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে রসদ জুগিয়েছিল।[৩]
মুক্তিযুদ্ধ ও সশস্ত্র গেরিলা বাহিনী গঠন
১৯৭১ সালে বাংলার মাটিতে যখন পাকিস্তানি হানাদারদের বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে গণযুদ্ধ শুরু হয়, তখন খোকা রায় যুদ্ধের ময়দান ও রাজনৈতিক ফ্রন্টকে একীভূত করতে সক্রিয় হন। পার্টির নির্দেশে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআই) শীর্ষ নেতাদের সাথে বৈঠকে বসেন এবং মুক্তিযুদ্ধের কৌশলগত ও সাংগঠনিক রূপরেখা চূড়ান্ত করেন। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়নের সমন্বয়ে গঠিত হয় একটি দুর্ধর্ষ যৌথ গেরিলা বাহিনী। এই বিশেষ বাহিনী দেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অসংখ্য গেরিলা অপারেশন পরিচালনা করে স্বাধীনতার পথ সুগম করে।
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বিশ্ব জনমত গঠন
খোকা রায় জানতেন, কেবল মাঠের যুদ্ধ নয়, বিশ্ববিবেকের সমর্থন আদায় করাও যুদ্ধের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেই লক্ষ্যেই ভারতের কোচিনে অনুষ্ঠিত ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেসে তিনি এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। সেই কংগ্রেসে উপস্থিত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও কমিউনিস্ট নেতাদের সামনে কমরেড মণি সিংহ, খোকা রায় এবং বারীণ দত্ত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চরিত্র ও শোষিত মানুষের মুক্তির আকাক্ষা অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে তুলে ধরেন।
বৈশ্বিক সমর্থন আদায় ও বিজয়
তৎকালীন শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন আদায় করা ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু খোকা রায়ের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার কারণে বিশ্বনেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের সংগ্রামকে একটি ‘জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম’ হিসেবে স্বীকৃতি দেন। তাঁর এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পক্ষে এক বিশাল জনমত তৈরি হয়, যা পাকিস্তানের মিত্রদের কোণঠাসা করে দেয় এবং আমাদের বিজয়কে ত্বরান্বিত করে।
স্বাধীন বাংলাদেশে নবযাত্রা ও দেশ পুনর্গঠন
দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্বাধীনতার সূর্য উদিত হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির ওপর থেকে সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। কমরেড খোকা রায় আত্মগোপনের জীবন থেকে বেরিয়ে এসে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে মনোনিবেশ করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং সাধারণ মানুষের অন্ন-বস্ত্রের অধিকার নিশ্চিত করতে তিনি ও তাঁর সতীর্থরা নিরলস শ্রম দেন। খোকা রায়ের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা তখন নবগঠিত রাষ্ট্র বিনির্মাণে এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে কাজ করেছিল।
বৈরী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
১৯৭৩ সাল থেকেই দেশে স্বৈরতন্ত্র শক্তিশালী হলে এবং বাকশাল গঠিত হলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। মুজিব-জিয়ার যৌথ স্বৈরতন্ত্র, সামরিক শাসন ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির উত্থানে প্রগতিশীল রাজনীতি চরম হুমকির মুখে পড়ে। আদর্শচ্যুত শাসনের কবলে পড়ে দেশ যখন আবারও সাম্প্রদায়িকতার দিকে ধাবিত হচ্ছিল, তখন অভিজ্ঞ এই বিপ্লবী ও তাঁর দলের নেতৃবৃন্দ আবারও বাধ্য হন আত্মগোপনে চলে যেতে।
শেষ জীবন ও মহাপ্রয়াণ
দীর্ঘ কয়েক দশকের কঠোর পরিশ্রম, কারাগারের অবর্ণনীয় নির্যাতন এবং জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময় আত্মগোপনে থাকার প্রভাব তাঁর শরীরের ওপর পড়তে শুরু করে। ১৯৭৬ সালে তাঁর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটলে উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজনে তিনি কলকাতায় পাড়ি জমান। কিন্তু বিদেশের মাটিতে থেকেও তাঁর প্রাণ সর্বদা পড়ে থাকত প্রিয় মাতৃভূমি বাংলার মানুষের জন্য।
অবশেষে, ১৯৯২ সালের ৯ ডিসেম্বর ৮৫ বছর বয়সে এই মহান বিপ্লবী কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর চিরবিদায়ের মাধ্যমে অবসান ঘটে বাঙালি বিপ্লববাদের এক বর্ণিল ও আপসহীন অধ্যায়ের।
আরো পড়ুন
- বাংলাদেশে সাম্যবাদ হচ্ছে বিভিন্ন সংগঠনে কার্যকর বিভিন্ন পন্থার রাজনীতি
- সিপিবির জাতীয়তাবাদ অভিমুখি বিচ্যুতি প্রসঙ্গে
- সিপিবির মোদীতোষণ এবং ক্ষুদে-বুর্জোয়া নির্বোধদের সিপিবিতোষণ
- বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো বনেদী বামপন্থী দল
- খোকা রায় ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনন্য বিপ্লবী
- সিপিবি মৌলভীবাজার জেলার ইতিহাস শ্রমিক, কৃষক ও মেহনতি মানুষের ইতিহাস
- সিপিবি সিলেট জেলার ইতিহাস শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ মেহনতি মানুষের সংগ্রামের পথ
- আনোয়ার হোসেন: নেত্রকোনার এক আদর্শবাদী ও সাম্যবাদী রাজনীতিকের জীবনগাথা
- কমরেড আবদুল বারী: মোহনগঞ্জের এক প্রদীপ্ত সাম্যবাদী চেতনার জীবনগাথা
- বাংলাদেশে মার্কসবাদ চর্চা
- মণি সিংহ ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ও বামপন্থী রাজনীতিক
- জ্যোতিষ বসু ছিলেন সাম্যবাদী বিপ্লবী, ভাষা সৈনিক, গণতান্ত্রিক যোদ্ধা
- রোকেয়া বেগম ছিলেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক নারীমুক্তি আন্দোলনের নেত্রী
তথ্যসূত্র
১. অনুপ সাদি, ৯ ডিসেম্বর ২০১৯, “খোকা রায় ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী যুগান্তর দলের সদস্য, সাম্যবাদী নেতা এবং বাঙালি বিপ্লবী”, রোদ্দুরে.কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/biography/khoka-roy/
২. জয়শ্রী গাঙ্গুলি, কমরেড খোকা রায় স্মরণে, সাপ্তাহিক একতা, তারিখহীন, http://www.weeklyekota.net/?page=details&serial=567
৩. চন্দন সাহা রায়, খোকা রায়, গুণীজন.অর্গ, তারিখহীন, http://www.gunijan.org.bd/GjProfDetails_action.php?GjProfId=309
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।