আজি শঙ্খে শঙ্খে মঙ্গল গাও: হীরেন বসুর গানের লিরিক্স ও আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণ

আজি শঙ্খে শঙ্খে মঙ্গল গাও, জননী এসেছে দ্বারেহীরেন বসুর লেখনীতে এটি একটি কালজয়ী আধুনিক বাংলা গান। মাত্র নয় চরণের এই ক্ষুদ্রায়ত গীতটি আধ্যাত্মিক ভাব ও ভক্তিতে অনন্য। গানটির সুরারোপ করেছেন স্বয়ং গীতিকার এবং তাঁর সঙ্গে সুরের মূর্ছনায় সহযোগিতা করেছেন প্রখ্যাত শিল্পী ধীরেন্দ্রনাথ দাস। কালজয়ী এই গানটি প্রথমবার রেকর্ড করার গৌরব অর্জন করেন প্রথিতযশা শিল্পী অনুপ ঘোষাল। পরবর্তীতে এটি সারেগামা লিমিটেড থেকে প্রকাশিত তাঁর ‘বেঙ্গলী ডেভোশনাল সংস’ অ্যালবামে স্থান পায়।

এই কালজয়ী গানটি মূলত মিশ্র আশাবরী রাগ এবং একতালের ছন্দে নিবদ্ধ একটি অপূর্ব আগমনী সঙ্গীত। গীতিকার হীরেন বসু এই সৃষ্টিতে আধুনিক বাংলা গানের লালিত্যের সাথে ভক্তিমূলক গাম্ভীর্যের এক অনন্য মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। গানটি মা দুর্গার আবাহন বা আগমনী সুর বহন করলেও এতে শ্যামাসঙ্গীতের ভক্তিভাবও অত্যন্ত প্রবল। পরম আরাধ্যা দেবীর প্রতীক্ষায় ভক্তের ব্যাকুলতা এবং দিনের পর দিন পথ চেয়ে বসে থাকার আকুল আকাঙ্ক্ষা গানটিতে কাব্যিকভাবে মূর্ত হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে গানটিতে ব্যবহৃত নতুনত্বপূর্ণ উপমা এবং সতেজ রূপকগুলো শ্রোতার মনে এক প্রশান্ত ও আধ্যাত্মিক অনুভূতির সৃষ্টি করে।

আজি শঙ্খে শঙ্খে মঙ্গল গাও গানটির গানের কথা

আজি শঙ্খে শঙ্খে মঙ্গল গাও জননী এসেছে দ্বারে!
সপ্ত-সিন্ধু কল্লোল রোল বেজেছে সপ্ত তারে, জননী এসেছে দ্বারে।

সুর-সপ্তক তুলেছে তান-সপ্ত ঋষির গানে,
সপ্ত-স্বর্গে দুন্দুভি ঘোষে’- সপ্ত-গ্রহের টানে,
অন্তরে আজ সপ্ত-দলের, নবজাগরণ সাড়ে, জননী এসেছে দ্বারে।

আজ সাত রাঙা রবি রামধনু হাতে বরণের বাণ হানে,-
সপ্ত-কোটি সু-সন্তান বিজয় মাল্য আনে।

আজ সপ্ত-স্বর্গ একসাথ হযে হৃদিমন্দির দ্বারে
তুলে নাও বুকে তারে, জননী এসেছে দ্বারে।।

গানটি ইউটিউবে শুনুন এবং আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন

হীরেন বসুর গাওয়া গান

গানের কাব্যিক বিশ্লেষণ

সৃষ্টির নিখিল কলতানে মাতৃ-আবাহন

গানের শুরুতেই গীতিকার এক মহাজাগতিক পটভূমি তৈরি করেছেন। এখানে মায়ের আগমন কেবল মর্ত্যের কোনো আঙিনায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা পরিব্যাপ্ত হয়েছে সপ্ত-সিন্ধু আর সপ্ত-স্বর্গের বিশালতায়। ‘সাত’ সংখ্যাটিকে প্রতীকি হিসেবে ব্যবহার করে শিল্পী বুঝিয়েছেন যে—জল, স্থল এবং অন্তরীক্ষ সবখানেই আজ উৎসবের আমেজ। সপ্ত-ঋষির পবিত্র গান আর সপ্ত-গ্রহের অমোঘ টানে যেন পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড এক সুরে মায়ের জয়গান গাইছে। শঙ্খধ্বনি আর দুন্দুভির গর্জন মিলেমিশে এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে ভক্তের হৃদয়ের ‘সপ্ত-দল’ বা সুপ্ত চেতনাগুলো নতুনভাবে জেগে উঠছে। এটি কেবল দেবীর আগমন নয়, বরং মানসলোকে এক নবজাগরণের ইঙ্গিত।

বৈচিত্র্য আর ঐক্যের মহামিলন

দ্বিতীয় অংশে কবি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর জাতীয় ঐক্যের এক অপূর্ব ছবি এঁকেছেন। ‘সাত রাঙা রবি’ আর ‘রামধনু‘র উপমায় বরণের যে ডালি সাজানো হয়েছে, তা যেন প্রকৃতির নিজস্ব উপচার। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো ‘সপ্ত-কোটি সু-সন্তান’-এর উল্লেখ, যা সমকালীন প্রেক্ষাপটে আপামর জনসাধারণের সম্মিলিত ভক্তি ও দেশপ্রেমকে নির্দেশ করে। গানটি আমাদের শেখায়, পরম জননীকে গ্রহণ করতে হলে সংকীর্ণতা ভুলে হৃদয়ের দুয়ার উন্মুক্ত করতে হয়। যখন সপ্ত-স্বর্গ আর মর্ত্য এক বিন্দুতে মিলিত হয়, তখনই কেবল সেই বিশ্বজননীকে অন্তরের ‘হৃদিমন্দিরে’ ঠাঁই দেওয়া সম্ভব হয়। বিজয়ের মাল্য হাতে নিয়ে সন্তানেরা যখন মাকে বরণ করে, তখন সেই মিলন মুহূর্তটি কেবল ধর্মীয় আচার থাকে না, বরং তা এক পরম আধ্যাত্মিক উৎসবে রূপ নেয়।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র ও টিকা

১. গানের কথা সুধীর চক্রবর্তী সংকলিত ও সম্পাদিত আধুনিক বাংলা গান, প্যাপিরাস কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১ বৈশাখ ১৩৯৪, পৃষ্ঠা ৯৫ থেকে নেয়া হয়েছে।

Leave a Comment