অধ্যাপক শফিকুল কাদির (ইংরেজি: Shafiqul Kadir জন্ম: ১৯৬৭) একজন সাংস্কৃতিক কর্মী, অধ্যাপক, প্রকৃতিপ্রেমী এবং রাজনৈতিক অনুসারী। তিনি ২০০৭-২০০৯ সাল পর্যন্ত ‘অর্ঘ্য’ নামে একটি ছোটকাগজ সম্পাদনা করতেন। সেই কাজ করতে আমি তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখেছি এবং তখনই তাঁর অদম্য লেগে থাকার শক্তিকে প্রথম টের পাই।
একটি মানসম্মত সংখ্যা প্রকাশের প্রতিটি ধাপে তার হাতের ছোঁয়া লেগে থাকে। লেখা সংগ্রহ করা থেকে শুরু করে কম্পোজের তদারকি, নিখুঁতভাবে প্রুফ দেখা, তথ্যবহুল সম্পাদকীয় রচনা এবং সূচিপত্রের বিন্যাস—সবই তিনি সম্পন্ন করেন গভীর মমতায়। তবে সবচেয়ে দুঃসাধ্য কাজটি তিনি হাসিমুখে সম্পন্ন করতেন, আর সেটি হলো বিজ্ঞাপন সংগ্রহ। একটি মফস্বল পত্রিকা টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে তিনি প্রতিটি বিজ্ঞাপনদাতার দ্বারে দ্বারে পাঁচ থেকে দশবার পর্যন্ত ধর্ণা দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেন না। অসংখ্যবার টেলিফোনে যোগাযোগ রক্ষা করে তিনি তাদের উদ্বুদ্ধ করেন। বিজ্ঞাপন থেকে প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ মাত্র তিনশ টাকা হলেও তিনি তা সানন্দে গ্রহণ করেন; কারণ তার কাছে অর্থের চেয়ে পত্রিকার স্থায়িত্বই বড়। নিজের প্রিয় ‘ডেয়াং’ মোটরবাইকটি নিয়ে তিনি মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দেন বিজ্ঞাপনের সন্ধানে। এই যাত্রায় তিনি গফরগাঁও থানার প্রতিটি ইউনিয়ন তো বটেই, এমনকি ময়মনসিংহ শহর, ধলা ও ত্রিশাল অঞ্চলের অলিগলি চষে বেড়িয়েছেন। তার এই অদম্য স্পৃহার ফলেই তিনি ঢাকার বাংলা একাডেমির মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করতেও সমর্থ হয়েছেন।
সেই সময়ে একটি মানসম্মত সাহিত্য পত্রিকার জন্য উপযুক্ত লেখা সংগ্রহ করা ছিল এক হিমালয়সম কঠিন কাজ। মানসম্পন্ন লেখা নিশ্চিত করতে লেখককে বারবার তাগাদা দেওয়া, সরাসরি সাক্ষাৎ করা এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করে তা কম্পিউটার কম্পোজের জন্য পাঠানোর প্রতিটি ধাপে প্রয়োজন হয় অসীম ধৈর্যের। বিশেষ করে বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস বা মহান শহীদ দিবসের মতো বিশেষ সংখ্যাগুলোর সময় কাজের চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। কম্পোজিটরের পেছনে ছোটাছুটি থেকে শুরু করে মুদ্রণ ও বাঁধাইয়ের কাজ যথাসময়ে শেষ করার যে দুঃসহ মানসিক চাপ, তাতে একজন সম্পাদকের মাথা ঠাণ্ডা রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এমন হাজারো প্রতিকূলতা ও যন্ত্রণা হাসিমুখে সহ্য করে অধ্যাপক শফিকুল কাদির সেই ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের ভেতরে অন্তত ১০টি সংখ্যা উপহার দিয়েছিলেন—এটি ভাবলে তার অদম্য সৃজনশীল সত্তা ও কৃতিত্বের প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে।
গত পহেলা বৈশাখ বা ১৪ এপ্রিল, ২০১৪ তারিখে তার গ্রাম গফরগাঁওয়ের কুকসাইরে গিয়ে দেখি তিনি শাহাদত হোসেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বৈশাখী মেলার আয়োজন করেছেন। সেই মেলার একপাশে জিলাপি ভাজা হচ্ছে, শিশুদের খেলনা, চকলেট, বাতাসা বিক্রি হচ্ছে, এমনকি অন্যপাশে কয়েকটি গাছ পর্যন্ত বিক্রির জন্যে রাখা হয়েছে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক শিশুদের নানান প্রতিযোগিতার আয়োজনে ব্যস্ত। বিকেলের দ্বিতীয় পর্বে উপস্থিত হয়ে দেখি তিনি একটি সেমিনারের আয়োজন করেছেন। সেই সেমিনারের প্রবন্ধ উপস্থাপন করলেন তিনিই; আমি এবং আরেকজন আলোচক। পহেলা বৈশাখকে গ্রাম দিবস ঘোষণা করার জন্য তিনি প্রবন্ধে নানান যুক্তি উপস্থাপন করলেন। আমারও মনে হলো শত দিবসের ভিড়ে আমাদের একটি গ্রাম দিবস থাকলে মন্দ হতো না।
আমাদের কত কত দিবস আছে। গ্রামের মানুষদের সুখ-দুঃখের কথা স্মরণ করার জন্যে তো একটি দিবস থাকতেই পারে। সেইদিন আমরা গ্রামের মানুষদের কথা ভাবব, তাদের কথা শুনবো, তাদের জ্বালা-যন্ত্রণার ভাগিদার হবো। গ্রাম-শহরের বৈষম্য দূর করার প্রক্রিয়া বের করার জন্য একটি দিন ব্যয় করলে হয়ত সমাধান হবে না, তবে সেই একটি দিন গ্রামকে নিয়ে ভাবা যেতে পারে। গ্রামকে নিয়ে আমরা যত বেশি ভাবব গ্রাম আমাদের কাছে তত শক্তিশালী হয়ে ধরা দেবে।
এই গ্রাম দিবসের কথা ভেবেছেন যে মানুষটি তার নাম শফিকুল কাদির। তার সঙ্গে আমার পরিচয় ময়মনসিংহের গফরগাঁয়ে ২০০৭ সালে। তিনি তার জমিতে শত প্রজাতির উদ্ভিদের একটি বাগান করেছেন। প্রকৃতি-অন্তপ্রাণ এই মানুষটি নানা রাজনৈতিক-সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন দীর্ঘদিন। কান্দিপাড়া আব্দুর রহমান ডিগ্রি কলেজে শিক্ষকতা করে যে অর্থ পান তা দিয়ে মানুষের জন্য কাজ করেই তার দিন-মাস-বছর কাটতে থাকে।
শফিকুল কাদির নিজ গ্রামে ‘গ্রাম সাহিত্য কেন্দ্র’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। সেই সাহিত্য কেন্দ্রে রয়েছে হাজারের বেশি বই, পুরনো পত্রিকা, বেশ কিছু ঐতিহাসিক আলোকচিত্র। গ্রামের মানুষকে জ্ঞান-গরিমায় শিক্ষিত করা তার ব্রত হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার উদ্ভিদপ্রীতি দেখে আগ্রহী হয়ে বাড়ির পাশে বছর চারেক আগে থেকে শুরু করেছেন বিপন্ন প্রজাতির গাছ লাগানোর কাজ। আজ তার সেই বাগানে ২০০ প্রজাতি ছাড়িয়ে গেছে। এই গণতান্ত্রিক মানুষটি কাজ করে চলেছেন হাজারো মানুষের জন্য। তাঁর কর্মময় জীবন দীর্ঘ হোক এই কামনা করি।
আমি বহুবার ভেবেছি, গ্রামীণ জনগণের শক্তিকে সামাজিক-বৈপ্লবিক শক্তিতে পরিণত করতে হবে। গ্রামের জনগণকে, বিশেষ করে কৃষককে শহুরে শ্রমিকের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সত্যিই আমাদের একটি গ্রাম দিবস দরকার। তবে দিবসগুলোকে যেভাবে কর্পোরেট পুঁজি গ্রাস করছে তাতে একটি নতুন দিবস যুক্ত হলে গ্রামকে শোষণ করার প্রক্রিয়া বাড়তেই পারে। তবে গ্রামে গ্রাম দিবস উদযাপিত হলে গ্রামে পুঁজির লেনদেন বাড়বে; যদিও আমরা সাম্যবাদীরা পুঁজির শাসনের উৎখাত চাই। গ্রাম-শহরের বৈষম্য দূর হতে পারে কেবল পুঁজির শাসন উৎখাতের মাধ্যমেই।
আরো পড়ুন
সেমিনারে অনুপ সাদির বক্তৃতাটি দেখুন ইউটিউবে
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚