অনুপ সাদি সম্পর্কে কিছু ধারণা | অরুণ গুপ্ত

আমি ২০১৬ সাল থেকে অনুপ সাদিকে চিনি। তার সম্পর্কে আমার প্রথম ধারণা হয়েছিল তার চিন্তাধারার উদারতা দেখে, যেই উদারতা মানুষকে নিজের স্বকীয়তা (agency) গঠনে প্রভাবিত করে। মানবিকবিদ্যার (Humanities) ক্ষেত্রে তার দক্ষতা ও শিক্ষা অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক। তাই তাকে এম.ফিল. (ইংরেজি) প্রোগ্রামে ভর্তি করার বিষয়ে আমার কোনো দ্বিধা ছিল না।

অনুপের মধ্যে এক চমৎকার মানবিক চেতনা রয়েছে, যা অঞ্চল এবং সীমানাকে নিছক রাজনৈতিক বিভাজন হিসেবে দেখে, কিন্তু রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা হিসেবে নয়। সে ধর্ম এবং বর্ণকে বৈচিত্র্য হিসেবে গ্রহণ করে, পার্থক্য হিসেবে নয়। এখানেই সে মানবিকবিদ্যার একজন উদারপন্থী মনীষী হয়ে ওঠে।

কাঠমান্ডুতে তার অবস্থান কেবল তার প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল একটি সাংস্কৃতিক সম্পৃক্ততা। সে নিরন্তর সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সাথে মিথস্ক্রিয়া করেছে—সেমিনার ও কর্মশালায় অংশ নিয়েছে, মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছে এবং সম্মেলনে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেছে। সাংস্কৃতিক অধ্যয়নের (cultural studies) বিভিন্ন দিক নিয়ে তার সাথে আমার কথোপকথনগুলো আমার কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে। তার চিন্তার স্বচ্ছতা আমাকে ভীষণভাবে মুগ্ধ করেছিল।

তার বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে বিশেষভাবে লক্ষণীয় হলো একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে চিন্তা করার এবং প্রাতিষ্ঠানিক জগতের গণতান্ত্রিক সূক্ষ্মতাগুলো বাস্তব জীবনে চর্চা করার সক্ষমতা। অনুপকে নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমাকে একটু মনস্তাত্ত্বিকভাবে যথাযথ হতে দিন। অনুপের মতো মানুষের সাথে যখন আমরা মিথস্ক্রিয়া করি, তখন ব্যক্তিত্বের ধারণাটি আসলে কী দাঁড়ায়? তার বুদ্ধিবৃত্তিক সত্তাই তার ব্যক্তিত্বের মূলে রয়েছে, যা সারমর্মের দিক থেকে অত্যন্ত মানবিক। তার ব্যক্তিত্বে কোনো জটিলতা নেই, কারণ জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে তার ধারণা সুনির্দিষ্ট: সে সবসময় আমাকে বলত যে, সে সারা জীবন একজন ভালো ছাত্র হওয়ার মাধ্যমে একজন ভালো মানুষ হতে চায়। বিশ্বাস এবং দৃষ্টিভঙ্গির জটিলতাগুলো নম্র মানুষ হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, আর এখানেই অনুপ একজন মানুষ হিসেবে সফল। তার সম্পর্কে আমার পর্যবেক্ষণ হলো তার সুস্থ ও সাবলীল মানসিক অবস্থা; তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা যেমন মাত্রাতিরিক্ত নয়, তেমনি জীবনের উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হওয়ার মতো খুব সামান্যও নয়। এটি একজন মনীষী হিসেবে তার আচরণের ধারাবাহিকতাকেই প্রকাশ করে।

আমি এমন কিছু মানুষের দেখা পেয়েছি যারা নিজেদের এবং তাদের চারপাশকে অতিষ্ঠ করে তোলে; মনোবিজ্ঞানীদের ভাষায় একে আমি ‘নিউরোটিক-সাইকোটিসিজম’ (আমার তৈরি করা একটি শব্দগুচ্ছ) বলি। এটি এমন এক অবস্থা যখন কোনো ব্যক্তির মেজাজ ঘনঘন ওঠানামা করে এবং সে চরম উদ্বেগের মধ্য দিয়ে যায়, আর একই সাথে তার কাজ ও আচরণের মাধ্যমে অন্যদের আঘাত করার চেষ্টা করে। একজন মানুষকে বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে আমার ধারণা হলো তাকে এই ‘নিউটিক-সাইকোটিসিজম’-এর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা। শিক্ষার্থীদের সাথে অন্যের প্রতি সহমর্মিতার মনোস্তত্ত্ব নিয়ে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে আমি এই ধারণাটি তুলে ধরেছি। অনুপ তার জীবন ও মানুষকে ভালোবাসার ক্ষেত্রে এবং তার প্রাতিষ্ঠানিক জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণের বিষয়ে অত্যন্ত স্বচ্ছ।

শিল্প এবং সাহিত্যের প্রতি তার ভালোবাসা প্রতিফলিত হয় মূল্যবোধ এবং সংবেদনশীলতা নিয়ে তার নিরন্তর লেখালেখির প্রচেষ্টায়। নেপাল এবং সেখানকার মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা অন্যের সংস্কৃতির প্রতি তার মূল্যবোধ-ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিকেই ফুটিয়ে তোলে। যখন সে এখানে পড়াশোনা করত, সে অনেক ভালো বন্ধু তৈরি করেছিল। মানুষের শিল্পকলা এবং জীবন সম্পর্কে জানতে সে সবসময়ই উৎসাহী ছিল। ব্যক্তিগতভাবে আমি তাকে অন্য কোনো দেশের ছাত্র বলে কখনো মনে করিনি।

একজন মানুষের সাফল্যের বর্ণনা দেওয়ার বাইরে তাকে নিয়ে লেখা সত্যিই খুব কঠিন। আমার ছাত্র হিসেবে তাকে নিয়ে ভাবার জন্য আমি কিছুটা সময় নিয়েছি। তাকে নিয়ে লেখাটা আমার জন্য সহজ ছিল না, তবুও তাকে নিয়ে আমার মনে যে ছাপ বা ধারণাগুলো (impressions) তৈরি হয়েছিল, আমি সেগুলোই লিখেছি।

৩০ অক্টোবর, ২০২২।
ওয়াশিংটন, যুক্তরাষ্ট্র।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখাটি এনামূল হক পলাশ সম্পাদিত সাহিত্যের ছোট কাগজ অন্তরাশ্রম-এর অনুপ সাদি সংখ্যা, সংখ্যা ৪, পৃষ্ঠা ১০, ময়মনসিংহ থেকে ৩০ নভেম্বর ২০২২ তারিখে প্রকাশিত হয়। পরে অনুপ সাদির ৫০তম জন্মদিন উপলক্ষে প্রকাশিতব্য গ্রন্থের জন্য পুনরায় লেখক সামান্য সংস্কার সাধন করেন। ফুলকিবাজ.কমে সর্বশেষ সংস্কারকৃত রূপটির অনুবাদ প্রকাশ করা হলো।

Leave a Comment