ব্রহ্মপুত্র বিধৌত ময়মনসিংহ কেবল শিক্ষা ও সংস্কৃতির জনপদ নয়, এটি বাংলাদেশের প্রগতিশীল ও বিপ্লবী রাজনীতির এক উম্মুক্ত পাঠশালা। স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী গত পাঁচ দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এখানকার রাজপথ কখনো স্তব্ধ হয়নি। নব্বয়ইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে হালের অধিকার আদায়ের লড়াই—সবখানেই ময়মনসিংহের একদল ত্যাগী, আদর্শবান এবং আমৃত্যু বিপ্লবী মানুষের সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে। এই পাঁচ দশকে ময়মনসিংহের রাজনীতি কেবল ক্ষমতার পালাবদল দেখেনি, বরং দেখেছে গভীর আদর্শিক লড়াই এবং সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে রাজপথের আপসহীন সংগ্রাম।
আদর্শিক দৃঢ়তা ও বামপন্থার শক্তিশালী ধারা
ময়মনসিংহের গত ৩০ বছরের রাজনীতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মূলধারার রাজনীতির সমান্তরালে বামপন্থী ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শের একটি সুসংগঠিত ধারা। স্নায়ুযুদ্ধকালীন কমরেড নগেন সরকার, জ্যোতিষ বসু (সেন্টু বসু) এবং পরবর্তীকালে অ্যাডভোকেট রোকেয়া বেগমের মতো কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বরা এই জনপদে সমাজতান্ত্রিক চেতনার মশাল জ্বালিয়ে রেখেছিলেন। ময়মনসিংহের রাজনীতিতে পদ-পদবির চেয়ে মতাদর্শ সব সময়ই বড় হয়ে ধরা দিয়েছে। রোকেয়া বেগমের মতো নেত্রীরা যখন সিপিবি থেকে বেরিয়ে সমাজতান্ত্রিক আদর্শ রক্ষায় বাসদে যুক্ত হন, তখন তা কেবল দলীয় পরিবর্তন ছিল না, বরং তা ছিল বামপন্থার বিশুদ্ধতা রক্ষার এক অনন্য উদাহরণ। তিন দশকের এই পরিক্রমায় অধ্যাপক মাহমুদুল আমীন খাঁন কিংবা কমরেড এম. এ. মতিনের মতো প্রাজ্ঞ বুদ্ধিজীবীরা মিছিল-মিটিংয়ের বাইরেও মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও মাওবাদের তাত্ত্বিক চর্চার মাধ্যমে এক সচেতন রাজনৈতিক প্রজন্ম তৈরি করেছেন।
শ্রমিক আন্দোলন, নেতৃত্বের সমাহার ও আন্তর্জাতিক চেতনার মেলবন্ধন
ময়মনসিংহের রাজনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। গত তিন দশকের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হলো ২০১৪ সালের ৫ মার্চ রেলওয়ে-মালগুদাম কার্যালয়ে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সমাবেশ। বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ ময়মনসিংহ জেলা কমিটির উদ্যোগে মহান জোসেফ স্তালিনের ৬১তম মৃত্যুবার্ষিকী পালন কেবল একটি শোকসভা ছিল না, বরং তা ছিল সাম্রাজ্যবাদি একচেটিয়া পুঁজি ও তাদের এদেশীয় দালালদের উচ্ছেদের ডাক।
সেই সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রবীণ সংগঠনের জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট হারুন-অর-রশিদ এবং সঞ্চলনা করেন বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদের জেলা সাধারণ সম্পাদক বিনোদ হেলা বিজয়। বক্তাদের কণ্ঠে ফুটে উঠেছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতির গভীর বিশ্লেষণ। তারা কমরেড স্তালিনকে লেনিনের সুযোগ্য উত্তরসূরি এবং ফ্যাসিবাদ-নাৎসিবাদ পরাস্ত করার মহান নেতা হিসেবে অভিহিত করেন। বক্তারা যুক্তি দেখান যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী সাম্যাজ্যবাদী বিশ্ব যখন স্তালিনকে অপবাদ দিয়ে শ্রমিক শ্রেণির একনায়কত্ব ভাঙতে তথাকথিত গণতন্ত্রের বুলি ছড়াচ্ছিল, তখন স্তালিনই ছিলেন সমাজতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী। ১৯৫৩ সালে স্তালিনের মৃত্যুর পর ক্রুশ্চেভ চক্রের সংশোধনবাদী অবস্থানের কারণেই যে সোভিয়েত ইউনিয়নে পুঁজিবাদ পুন:প্রতিষ্ঠিত হয়—এই তাত্ত্বিক উপলব্ধি ময়মনসিংহের রাজনৈতিক কর্মীদের আজও অনুপ্রাণিত করে।
তিন দশকের এই রাজনীতিকে সচল রেখেছেন বিভিন্ন সংগঠনের অগণিত নেতা ও কর্মী। ২০১৪ সালের সেই ঐতিহাসিক সভায় আমরা দেখেছি ময়মনসিংহের রাজনীতির এক নক্ষত্রখচিত সমাবেশ। সেখানে বক্তব্য রাখেন ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের জেলা সাধারণ সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন, ধ্রুবতারা সাংস্কৃতিক সংসদের জেলা আহ্বায়ক বিমান বিহারী সরকার, প্রগতিশীল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তপন সাহা চৌধুরী, প্রখ্যাত লেখক ও বুদ্ধিজীবী অনুপ সাদি এবং শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম কলেজের প্রভাষক রেজাউল করিম। এছাড়াও শম্ভুগঞ্জ জুটমিলস শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদের শাহজাহান মিয়া এবং জাতীয় ছাত্রদলের জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক জোবায়ের আহমেদ উৎসবের মতো তরুণ ও প্রবীণ নেতৃত্বের সমন্বয় ময়মনসিংহের রাজনীতিকে সব সময় প্রাণবন্ত রেখেছে। ডানপন্থী সুবিধাবাদ এবং বামপন্থী হঠকারিতার বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনকে বেগবান করতে স্তালিনের শিক্ষাকে আঁকড়ে ধরার যে আহ্বান তারা জানিয়েছিলেন, তা আজও ময়মনসিংহের প্রগতিশীল রাজনীতির মূল সুর।[১]
২৪ অক্টোবর, ২০১৪-এর স্মরণসভা
ময়মনসিংহের স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী রাজনীতিতে আদর্শের লড়াই কতটা গভীর, তার প্রতিফলন ঘটেছিল ২০১৪ সালের ২৪ অক্টোবর বিকেলে। পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের বেড়িবাঁধে কালীবাড়ি চর বস্তি সংলগ্ন এলাকায় আয়োজিত এক আলোচনা সভা সেদিন এক রাজনৈতিক মহামিলন মেলায় পরিণত হয়েছিল। ‘শহীদ বিপ্লবী ও দেশপ্রেমিক স্মৃতি সংসদ, ময়মনসিংহ জেলা শাখা’ আয়োজিত এই সভার মূল লক্ষ্য ছিল মাওবাদী নেতা ও প্রিয় ব্যক্তিত্ব কমরেড এম. এ. মতিনের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পালন এবং একইসঙ্গে বিপ্লবী নেত্রী কমরেড জমিলা খাতুনের স্মৃতিচারণ করা।
প্রফেসর মাহমুদুল আমিনের (কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, নয়া-গণতান্ত্রিক গণমোর্চা) সভাপতিত্বে এবং আবু বকর সিদ্দিক রুমেলের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই সভায় ময়মনসিংহের বামপন্থী ও প্রগতিশীল নেতৃবৃন্দের এক বিশাল সমাবেশ ঘটে। সভায় প্রয়াত নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বক্তাগণ তাঁদের আদর্শিক উত্তরাধিকারকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান। বিশেষ করে ২০১৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর এম. এ. মতিন, ২০১৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি জমিলা খাতুন এবং ১৮ অক্টোবর বিকাশ ভৌমিকের মৃত্যুর ঘটনাগুলো ময়মনসিংহের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক বিশাল রূপান্তর বয়ে আনে।
ব্রহ্মপুত্র পাড়ের এই স্মরণসভায় ময়মনসিংহের প্রগতিশীল রাজনীতির এক বর্ণাঢ্য সমাবেশ ঘটেছিল। সভায় গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য তুলে ধরেন বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলনের জেলা সভাপতি শেখ আবেদ আলী এবং শহীদ বিপ্লবী ও দেশপ্রেমিক স্মৃতি সংসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বিজন সম্মানিত। প্রগতিশীল কৃষিবিদ ফোরামের কেন্দ্রীয় সদস্য কৃষিবিদ শামসুল হোসেন, কবি শামসুল ফয়েজ এবং বিশিষ্ট লেখক অনুপ সাদি তাঁদের আলোচনায় প্রয়াত নেতাদের আদর্শিক পথরেখা নিয়ে আলোকপাত করেন। নয়া গণতান্ত্রিক গণমোর্চার নেতা ফরিদুল ইসলাম ফিরোজ এবং বাসদ জেলা সমন্বয়ক আ.ন.ম. খায়রুল বাশার জাহাঙ্গীর ময়মনসিংহের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই আন্দোলনের গুরুত্ব তুলে ধরেন। এছাড়াও জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের জেলা যুগ্ম আহ্বায়ক তোফাজ্জল হোসেন, গণসংহতি আন্দোলনের নেতা আবুল কালাম আল আজাদ এবং গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির নেতা আজহারুল ইসলাম আজাদ প্রগতিশীল শক্তিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী এরশাদুজ্জামান ও ছাত্রফ্রন্টের জেলা নেতা অজিত দাশের পাশাপাশি প্রয়াত নেতাদের পরিবারের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন কমরেড এম. এ. মতিনের স্ত্রী মরিয়ম বেগম এবং বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলনের নেত্রী রহিমা বেগম।
বক্তাদের আলোচনায় উঠে আসে যে, ময়মনসিংহের প্রগতিশীল রাজনীতির বর্তমান সংকট বা আন্দোলনহীনতার খরা কাটাতে হলে এম. এ. মতিন ও জমিলা খাতুনের ত্যাগ থেকে শিক্ষা নিতে হবে। জনগণের জীবন যন্ত্রণাকে রাজপথের আন্দোলনের সাথে একীভূত করতে পারলেই সত্যিকারের গণবিপ্লব সম্ভব। ব্রহ্মপুত্রের তীরে সেদিন যে স্লোগান ও শপথ উচ্চারিত হয়েছিল, তা প্রমাণ করে ময়মনসিংহের রাজনীতিতে এখনো সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা ও বিপ্লবী আদর্শের ফল্গুধারা প্রবহমান।[২]
সাম্প্রতিক সংকট ও আঞ্চলিক সংকীর্ণতা
তবে গত তিন দশকের এই সংগ্রামী ইতিহাসের সমান্তরালে সাম্প্রতিক সময়ে এক ধরনের রাজনৈতিক বিচ্যুতি ও সংকীর্ণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিজয় এক্সপ্রেসের রুট পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে ময়মনসিংহের তথাকথিত সচেতন মহলের একাংশ যে ‘আঞ্চলিক বর্ণবাদ’ প্রদর্শন করছে, তা আমাদের ঐতিহ্যবাহী উদার ও প্রগতিশীল রাজনীতির পরিপন্থী। যখন প্রগতিশীল আন্দোলনের নেতারা মেহনতি মানুষের রেল যোগাযোগের অধিকারের বিপক্ষে দাঁড়ান, তখন বোঝা যায় যে গত তিন দশকে আমাদের আদর্শিক ভিত কতটা দুর্বল হয়েছে। বিশেষ করে এক শ্রেণির সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং তথাকথিত প্রগতিশীলদের এই সংকীর্ণ আন্দোলনে অংশগ্রহণ ময়মনসিংহের রাজনীতির জন্য একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়।
স্বৈরতন্ত্রী ফ্যাসিবাদ পরবর্তী রাজনীতি
ময়মনসিংহ অঞ্চলের রাজনীতিতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী বছরগুলোতে প্রগতিশীল ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর ব্যাপক তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন, শ্রমিক অধিকার এবং সাংগঠনিক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট’ (এনডিএফ) এবং ‘বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ’ অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।
২০২৫: সাংগঠনিক পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক তৎপরতা
২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ময়মনসিংহে ছাত্র ও সাধারণ রাজনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। জুন মাসে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট-এনডিএফ ময়মনসিংহ জেলা কমিটি শহরের নতুন বাজার ও তাজমহল মোড় এলাকায় পথসভা এবং করিডর সংক্রান্ত প্রচারপত্র বিলি করে। মূলত সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনকে বেগবান করতেই এই কর্মসূচি পালিত হয়।
পরবর্তীতে ২২ জুলাই জাতীয় ছাত্রদলের ৫২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ময়মনসিংহে একটি প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা হয়। এই সভায় নেতৃবৃন্দ শিক্ষা ও নিরাপত্তার প্রশ্নে সোচ্চার হন এবং মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজের নিহত শিক্ষার্থীদের প্রতি শোক জানিয়ে প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনার দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ২৯ আগস্ট জেলা কাউন্সিলের লক্ষ্য নির্ধারণের মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতির সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করা হয়।
শোক ও আদর্শিক লড়াই
বছরের শেষ দিকে ৭ নভেম্বর ১০৮তম মহান রুশ বিপ্লব বার্ষিকী উপলক্ষে ময়মনসিংহ জেলা ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ র্যালী ও সমাবেশের আয়োজন করে। এর ঠিক এক মাস পর, ৭ ডিসেম্বর প্রগতিশীল আন্দোলনের বর্ষীয়ান নেতা মাস্টার মতিউর রহমানের মৃত্যুতে ময়মনসিংহের এনডিএফ ও ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দ গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং নেত্রকোনায় তাঁর সমাধিতে শপথ গ্রহণের মাধ্যমে রাজনৈতিক লড়াই অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেন।
শ্রমিক অধিকার ও রাজপথের সংগ্রাম
২০২৬ সালের শুরু থেকেই শ্রমিক আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। ৪ জানুয়ারি চরপাড়া মোড়ে হোটেল রেস্তোরাঁ সেক্টরে কর্মবিরতি সফল করার লক্ষ্যে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। জানুয়ারির শেষের দিকে (৩০ জানুয়ারি) জামালপুরে নির্মাণ শ্রমিকদের এক অনুষ্ঠানে ময়মনসিংহের শ্রমিক নেতারা অংশ নেন, যা আন্তঃজেলা শ্রমিক সংহতির প্রমাণ দেয়।
শ্রমিক আন্দোলনের এই অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে মে মাসে নেত্রকোনার শ্রমিক নেতা আনোয়ার হোসেনকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে গ্রেফতার করা হয়। এর প্রতিবাদে ১৬ মে দেশব্যাপী বিক্ষোভের ডাক দেয় ‘বাংলাদেশ হোটেল রেস্টুরেন্ট সুইটমিট শ্রমিক ফেডারেশন’। তীব্র আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত তিনি মুক্তি লাভ করেন।
সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য
সম্প্রতি (১৩ এপ্রিল ২০২৬) জামালপুরে অনুষ্ঠিত ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিটির সভায় শ্রমিক নেতৃবৃন্দ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে মে দিবসে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দিয়েছেন। একইসাথে হোটেল সেক্টরে মজুরি ও শ্রম আইন বাস্তবায়নের আন্দোলনকে প্রতিটি জেলায় ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। নেতৃবৃন্দের ওপর হামলা ও মামলার প্রতিবাদ জানিয়ে তারা সংগঠন ও সংগ্রামকে আরও সুসংহত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
উপসংহার: ভবিষ্যতের আলোকবর্তিকা
ময়মনসিংহের গত তিন দশকের রাজনীতি যেমন ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর, তেমনি সুবিধাবাদ ও বিবর্তনের দ্বন্দ্বে কিছুটা কণ্টকাকীর্ণ। তবে শফিকুল কাদিরের মতো প্রকৃতিপ্রেমী শিক্ষক কিংবা রোকেয়া বেগমের মতো আপসহীন নেত্রীদের রেখে যাওয়া আদর্শিক উত্তরাধিকার আজও ম্লান হয়ে যায়নি। মালগুদাম থেকে ব্রহ্মপুত্রের তীর পর্যন্ত অনুরণিত স্লোগানগুলো আজও প্রমাণ দেয়—এখানকার মেহনতি মানুষ মুক্তি চায়। নানা দমন-পীড়ন সত্ত্বেও প্রগতিশীল শক্তিগুলো তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার আদায়ে রাজপথে অনড়। মূলত, পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের দোসরদের হটিয়ে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে সেই প্রবীণ বিপ্লবীদের প্রদর্শিত পথেই এগোতে হবে। ময়মনসিংহের এই ছাত্র-শ্রমিক আন্দোলন কেবল অধিকারের লড়াই নয়, বরং এক গভীর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা ও রাজনৈতিক আদর্শের বলিষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ।
তথ্যসূত্র
১. বিশেষ প্রতিবেদক, ৫ মার্চ ২০১৪, “ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের উদ্যোগে মহান স্তালিনের ৬১তম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত” রোদ্দুরে.কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/news/death-anniversary-of-stalin/
২. অনুপ সাদি, খবরটি প্রথম প্রকাশিত হয়, প্রাণকাকলিতে, ২৪ অক্টোবর ২০১৪ তারিখে, পরে একই খবর ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭ তারিখে ‘কমরেড এম. এ. মতিন ও জমিলা খাতুন স্মরণে ময়মনসিংহে আলোচনা সভা’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। ইউআরএল: https://www.roddure.com/news/mamatin-and-jamila-khatun/
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।