কাতালোনিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন (ইংরেজি: Catalan separatist movement) মূলত একটি প্রগতিশীলতাবিরোধী ও স্বাধীনতাবিরোধী তৎপরতা, যাকে বিশ্বমানবতার শত্রুদের একটি পরিকল্পিত আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এই প্রক্রিয়াটি সংকীর্ণ কাতালান জাতীয়তাবাদে গভীরভাবে প্রোথিত একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, যার একমাত্র লক্ষ্য হলো স্পেনের রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা বিনষ্ট করে কাতালোনিয়ার জন্য একটি তথাকথিত ‘পতাকা স্বাধীনতা’ ছিনিয়ে আনা। এই আন্দোলনের অন্তরালে লুকিয়ে আছে একটি নতুন বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী কাঠামো তৈরির আকাঙ্ক্ষা, যা মূলত একটি শোষণমূলক, নিপীড়ক এবং নব্য-সাম্রাজ্যবাদী কাতালান প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নীল নকশা মাত্র। এটি সাধারণ মানুষের মুক্তির কথা বললেও প্রকৃতপক্ষে একটি বিশেষ সুবিধাবাদী শ্রেণির আধিপত্য কায়েমের চেষ্টা, যা বৃহত্তর মানবসভ্যতা এবং সংহতির পরিপন্থী।[১]
মার্কসবাদী প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতা ও মুক্তির সংজ্ঞা
আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজতাত্ত্বিক আলোচনায় ‘স্বাধীনতা’ বা ‘মুক্তি‘ শব্দ দুটি অত্যন্ত বহুল ব্যবহৃত এবং বিবিধ মাত্রায় বিশ্লেষিত। তবে এই ধারণার প্রচলিত উদারনৈতিক ব্যাখ্যাকে মার্কসবাদীরা কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং একে কখনো বুর্জোয়াদের সংকীর্ণ স্বার্থে ব্যবহার করেননি। মার্কসবাদী দর্শনে স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ কেবল বিমূর্ত কোনো ধারণা নয়; বরং এটি প্রধানত পণ্য, পুঁজি এবং মুনাফার দাসত্ব থেকে শ্রমজীবী মানুষের চূড়ান্ত নিষ্কৃতি। বিশেষ করে সাম্রাজ্যবাদের এই বর্তমান যুগে, স্বাধীনতার মূল নির্যাস নিহিত রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আর্থিক লুণ্ঠন ও একচেটিয়া পুঁজির শৃঙ্খল থেকে মুক্ত একটি স্বনির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্যে। এই অর্থনৈতিক মুক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে যুক্ত হয় শোষিত ও নিপীড়িত জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার বা জাতিগত স্বাধীনতা। এটি কেবল তথাকথিত রাষ্ট্রগুলোর নামমাত্র ‘পতাকা স্বাধীনতা’ নয়, বরং অনুন্নত ও পশ্চাৎপদ দেশগুলোর জাতীয় শিল্প-কারখানা বিকাশের পূর্ণ অধিকার এবং বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বিকাশের পথ প্রশস্ত করা।
স্পেনীয় রাষ্ট্রকাঠামোর ঐতিহাসিক বিবর্তন ও আধুনিক সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র
স্পেন একটি রাষ্ট্র হিসেবে পঞ্চদশ শতাব্দী থেকেই তার উগ্র পুঁজিবাদী ও নৃশংস উপনিবেশবাদী চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে আসছে, যা বর্তমান সময়ে এক ভয়ংকর সাম্রাজ্যবাদী রূপ ধারণ করেছে। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, এশিয়া, আফ্রিকা এবং বিশেষ করে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে স্পেনের রক্তক্ষয়ী শোষণের প্রক্রিয়া ও লুণ্ঠনের ইতিহাস আজও ভিন্ন ভিন্ন মোড়কে বিদ্যমান। এই সাম্রাজ্যবাদী কাঠামোর অর্থনৈতিক ভিত্তি কতটা শক্তিশালী তা আধুনিক পরিসংখ্যান থেকেও স্পষ্ট হয়; যেমন ২০১২ সালের উপাত্ত অনুযায়ী স্পেন ছিল বিশ্বের ১২তম বৃহত্তম রপ্তানিকারক এবং ১৬তম বৃহত্তম আমদানিকারক রাষ্ট্র।[২] এই বিশাল বাণিজ্যিক লেনদেন মূলত কোনো সাধারণ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত সাম্রাজ্যবাদী শোষণ প্রক্রিয়ার অংশ। ফলে এটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে, আধুনিক স্পেন রাষ্ট্রটি সম্পূর্ণভাবে একটি গণবিরোধী, শোষণমূলক এবং নব্য-সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, যা আজও বিশ্বজুড়ে তার লুণ্ঠন ও আধিপত্যবাদী নীতি অব্যাহত রেখেছে।
কাতালান বিচ্ছিন্নতাবাদের শ্রেণি-চরিত্র ও শ্রমিক শ্রেণির বিভ্রান্তি
এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে, স্পেনের একটি প্রদেশ হিসেবে বিদ্যমান কাতালোনিয়ার পৃথক স্বাধীনতার দাবি কোনোভাবেই একটি যৌক্তিক বা বৈজ্ঞানিক দাবি হিসেবে গণ্য হতে পারে না। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব ও গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট দেখা যায় যে, যারা এই তথাকথিত স্বাধীনতার ঝাণ্ডা উঁচিয়ে ধরেছে, তারা মূলত বুর্জোয়া ও পুঁজিবাদের তল্পিবাহক। সুতরাং, কাতালোনিয়ার এই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন কোনো অর্থেই একটি প্রকৃত মুক্তিকামী, প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী কিংবা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী স্বাধীনতাকামী সংগ্রাম নয়। বরং ইউরোপের বুকে কাতালোনিয়ার এই বিচ্ছিন্ন হওয়ার অপচেষ্টা আসলে এক প্রকার স্বাধীনতাবিরোধী ও বিশ্ব-জনগণের শত্রুদের পরিকল্পিত প্রতিক্রিয়াশীল আন্দোলন। এই ধরনের প্রগতিবিরোধী তৎপরতা বর্তমানে শক্তিশালী হওয়ার প্রধান কারণ হলো—সমকালীন ইউরোপীয় রাজনীতিতে শ্রমিক শ্রেণির বৈপ্লবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও শ্রেণি-চেতনা যথেষ্ট স্বচ্ছ ও সুসংহত নয়। শ্রমিক শ্রেণির এই তাত্ত্বিক অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়েই বুর্জোয়া শক্তিগুলো তাদের সংকীর্ণ স্বার্থে জাতীয়তাবাদের আফিম ছড়িয়ে এই শোষনমূলক ও সাম্রাজ্যবাদী লক্ষ্য অর্জনে সচেষ্ট হয়েছে।
কাতালান বিচ্ছিন্নতাবাদের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও বুর্জোয়া লুণ্ঠনের রূপরেখা
কাতালোনিয়ার বর্তমান অস্থিরতার গভীরে তাকালে দেখা যায়, যা ঘটছে তা কোনো জনকল্যাণমুখী সংগ্রাম নয়; বরং এটি কাতালোনিয়ার ধূর্ত বুর্জোয়া শ্রেণি, একচেটিয়া পুঁজিপতি এবং বিশ্ব-সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আরও গভীর ও নিপুণ শোষণের একটি নীল নকশা মাত্র। এই বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো শোষণের পরিধি বাড়ানো। অর্থাৎ, একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদী স্পেন রাষ্ট্রকে ভেঙে তারা দুটি পৃথক সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র কায়েম করতে চায়। সহজ কথায় বলতে গেলে, এটি একদল ভয়ংকর ডাকাতের দুটি উপদলে বিভক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া ছাড়া আর কিছুই নয়। এতদিন শোষণের মাধ্যমে অর্জিত মুনাফার যে অংশটি স্পেনের অন্যান্য অংশে ব্যয় হতো, কাতালোনিয়ার এই নব্য-সাম্রাজ্যবাদীরা এখন সেই লুণ্ঠিত অর্থের একক ভাগীদার হতে চাইছে। তারা আর তাদের লুণ্ঠনের অংশ স্পেনের অপেক্ষাকৃত পশ্চাৎপদ অঞ্চলগুলোর সাথে ভাগ করতে রাজি নয়। যেহেতু কাতালোনিয়ার শিল্পপণ্য আজ গোটা দুনিয়ার বাজারে রপ্তানি হচ্ছে এবং বিশ্ব-পুঁজিবাদের সাথে তাদের সরাসরি যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছে, তাই তারা এখন স্পেনের অভ্যন্তরীণ দায়বদ্ধতা ঝেড়ে ফেলে নিজেদের শোষণমূলক সাম্রাজ্যবাদী কর্তৃত্ব আরও নিরঙ্কুশ করতে চাইছে।
কাতালান অর্থনীতির সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র ও ঐতিহাসিক শোষণের খতিয়ান
অর্থনৈতিক মানদণ্ডে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কাতালোনিয়া অঞ্চলটি একটি চরম মাত্রার উচ্চ শিল্পসমৃদ্ধ এলাকা, যা বিশ্ব-পুঁজিবাদের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। ২০১৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কাতালোনিয়ার জিডিপি ছিল ২০০ বিলিয়ন পাউন্ড, যা সমগ্র স্পেনের মধ্যে সর্বোচ্চ।[৩] সেখানে মাথাপিছু জিডিপি ২৭,০০০ পাউন্ড (প্রায় ৩০,০০০ ডলার), যা মাদ্রিদ (৩১,০০০ পাউন্ড), বাস্ক (৩০,০০০ পাউন্ড) বা নাভারে (২৮,০০০ পাউন্ড) অঞ্চলের সমতুল্য বা কাছাকাছি। ২০১৪ সালে এই অঞ্চলের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১.৪ শতাংশ[৪] এবং ২০১১ সালের তথ্যমতে, বাৎসরিক জিডিপির নিরিখে কাতালোনিয়া ছিল বিশ্বের ৬৪তম বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি।[৫] এছাড়া, এটি ইউরোপের চারটি বৃহত্তম মোটরগাড়ি উৎপাদনকারী অঞ্চলের একটি হিসেবে স্বীকৃত। কাতালোনিয়ার অর্থনৈতিক কাঠামোর দিকে তাকালে দেখা যায়, এর মাত্র ৩ শতাংশ আসে প্রাকৃতিক উৎস থেকে, যেখানে বিশাল ৩৭ শতাংশ আসে ভারী শিল্পকারখানা থেকে এবং ৬০ শতাংশ আসে সেবাখাত থেকে। উল্লেখ্য যে, শিল্পকারখানার এই হার (৩৭%) সমগ্র স্পেনের গড় হারের (২৯%) চেয়ে অনেক বেশি।[৬]
এই গাণিতিক উপাত্তগুলো নিছক কোনো অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পরিচয় দেয় না, বরং এটি অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, কাতালান বুর্জোয়ারা বিশ্ব-সাম্রাজ্যবাদী শৃঙ্খলের একটি অবিচ্ছেদ্য ও শক্তিশালী অংশ। ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কাতালানরা কোনোভাবেই কোনো ‘নিপীড়িত জাতি’ নয়। বরং গত চারশ বছর ধরে তারা স্পেনের কেন্দ্রীয় শোষক শক্তির সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে নিপীড়কদের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে। কেবল সহযোগী হিসেবেই নয়, বরং এই দীর্ঘ সময় ধরে তারা স্পেনের সাথে যৌথভাবে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন স্বাধীনতাকামী জাতিকে পদদলিত করায় সরাসরি অংশ নিয়েছে এবং সেই পৈশাচিক লুণ্ঠন ও নিপীড়ন থেকে অর্জিত রক্তের মুনাফায় নিয়মিত ভাগ বসিয়েছে। ফলে আজ তাদের ‘স্বাধীনতার’ দাবি মূলত লুণ্ঠনের ভাগ এককভাবে ভোগ করার একটি সাম্রাজ্যবাদী কৌশল মাত্র।
২০০৮ সালের বৈশ্বিক মন্দা এবং কাতালান বিচ্ছিন্নতাবাদের রাজনৈতিক অপকৌশল
কাতালোনিয়ার বর্তমান বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতার প্রকৃত কারণ অনুধাবন করতে হলে আমাদের সাম্প্রতিক ইতিহাসের বস্তুগত পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টিপাত করতে হবে। ২০০৭-০৮ সালের ভয়াবহ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা বিশ্ব-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থাকে যে সংকটে ফেলেছে, তা থেকে উত্তরণের কোনো টেকসই পথ সাম্রাজ্যবাদ আজ অবধি দেখাতে পারেনি। এই গভীর সংকটের মুখে কাতালোনিয়ার ধূর্ত সাম্রাজ্যবাদী কর্পোরেট কোম্পানিগুলো তাদের ব্যর্থতা এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার সমস্ত দায়ভার কৌশলে স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপিয়ে দিতে সচেষ্ট হয়। মূলত ২০০৮ সালের সেই আর্থিক বিপর্যয় এবং পরবর্তীতে স্পেনের দক্ষিণপন্থী ‘পার্টিডো পপুলার’ (পিপলস পার্টি) কর্তৃক ২০০৬ সালের স্বায়ত্তশাসন আইনকে স্পেনের সাংবিধানিক আদালতে চ্যালেঞ্জ করার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতার বীজ বপন করা হয়। এই ঘটনাক্রমকে পুঁজি করেই ২০০৯ সালের দিকে সমসাময়িক তথাকথিত স্বাধীনতা আন্দোলনের নতুন জোয়ার তৈরি করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায়, ২০০৯ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে কাতালান পৌরসভাগুলোতে স্বাধীনতার ওপর ধারাবাহিক প্রতীকী গণভোটের আয়োজন করা হয়, যা মূলত বুর্জোয়া শাসকগোষ্ঠীর নিজেদের অর্থনৈতিক সংকট আড়াল করার এবং জনগণের ক্ষোভকে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের দিকে ধাবিত করার একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক ভাঁওতাবাজি ছিল।
২০১০-২০২১: কাতালান বুর্জোয়াদের তথাকথিত স্বাধীনতার নাটক ও রাষ্ট্রীয় সংকটের স্বরূপ
২০১০ সালে স্পেনের সাংবিধানিক আদালতের একটি বিতর্কিত রায়ে স্বায়ত্তশাসন আইনের কিছু অংশ অসাংবিধানিক ঘোষিত হলে, কাতালান বুর্জোয়ারা কৌশলে একে একটি ব্যাপক বিক্ষোভে রূপ দেয়। এই অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে ২০১২ সালের আকস্মিক নির্বাচনে কাতালান সংসদে প্রথমবারের মতো একটি তথাকথিত ‘স্বাধীনতা-পন্থী’ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ছিল মূলত একচেটিয়া পুঁজিপতিদের স্বার্থরক্ষার একটি রাজনৈতিক মঞ্চ। এই নতুন শাসকগোষ্ঠী ২০১৪ সালে একটি ‘অবাধ্যতামূলক’ আত্মনিয়ন্ত্রণ গণভোটের আয়োজন করে। যদিও সেখানে কাগজের কলমে স্বাধীনতার পক্ষে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখানো হয়েছিল, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সচেতন স্বাধীনতা-বিরোধী জনসাধারণের বর্জনের কারণে সেখানে ভোটার উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত নগণ্য ও অগ্রহণযোগ্য।
২০১৫ সালের পরবর্তী নির্বাচনের পর, বুর্জোয়া গোষ্ঠীগুলো আরও একটি ‘বাধ্যতামূলক’ গণভোটের ডাক দেয়। কিন্তু স্প্যানিশ কেন্দ্রীয় সরকার এবং সাংবিধানিক আদালত একে সরাসরি অবৈধ ঘোষণা করে, কারণ এ ধরনের গণভোট আয়োজনের কোনো আইনি বা সাংবিধানিক এখতিয়ার কাতালান আঞ্চলিক সরকারের নেই। তা সত্ত্বেও, ২০১৭ সালে চরম রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনার মধ্যে এই অবৈধ গণভোটটি অনুষ্ঠিত হয়। এই প্রক্রিয়া চলাকালীন বুর্জোয়াদের উস্কানি এবং কেন্দ্রীয় পুলিশের সহিংসতা—উভয়ই জনগণের ভোগান্তি বাড়িয়ে দেয়। একদিকে স্বাধীনতাপন্থী এবং অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতার অনুসারীদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে, কাতালান সংসদ একটি তথাকথিত ‘স্বাধীন প্রজাতন্ত্র’ ঘোষণার প্রস্তাব অনুমোদন করে, যা ছিল মূলত একটি হঠকারী ও জনবিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত।
এর প্রতিক্রিয়ায় স্প্যানিশ সিনেট নতুন আঞ্চলিক নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত কাতালান প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে এই ছদ্ম-বিপ্লবী আন্দোলনের নেতাদের গ্রেপ্তার করা শুরু হলে, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি কার্লেস পুইগডেমন্টসহ মূল হোতারা কাপুরুষের মতো বিদেশে পালিয়ে যান। দীর্ঘ অচলাবস্থার পর, ২০১৯ সালে নতুন স্প্যানিশ সরকার একটি ‘আলোচনার টেবিলে’ বসতে সম্মত হলেও তারা শুরুতেই জানিয়ে দেয় যে, কোনো প্রকার বিচ্ছিন্নতা বা তথাকথিত আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি তারা বিবেচনায় নেবে না। অবশেষে ২০২০ সালে, সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রকাঠামোর অভ্যন্তরীণ সমঝোতার অংশ হিসেবে গ্রেপ্তারকৃত নেতাদের ক্ষমার প্রক্রিয়া শুরু হয়, যা ২০২১ সালের জুন মাসে চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয়। এই পুরো ঘটনাক্রম প্রমাণ করে যে, এটি ছিল মূলত শাসক শ্রেণির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সমঝোতার একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক খেলা।
ইউরোপের রাজনৈতিক বন্ধ্যাত্ব ও কাতালান বিচ্ছিন্নতাবাদের নেতিবাচক প্রভাব
ইউরোপের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে শ্রমিক শ্রেণির প্রকৃত বৈপ্লবিক রাজনীতির চরম অনুপস্থিতি বিদ্যমান। গত দুই-তিন দশকে ইউরোপের কোনো দেশেই কোনো দৃশ্যমান বা আপসহীন শ্রেণিসংগ্রাম গড়ে ওঠেনি, যা মূলত পুঁজিবাদের জন্য এক বিশাল রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। বর্তমানে সমগ্র ইউরোপজুড়ে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোর নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং একসময়ের প্রদীপ্ত সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনগুলো আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। তার প্রতিক্রিয়ায় গোটা ইউরোপে “নতুন করে চরম জাতীয়তাবাদী ডানপন্থী রাজনীতির বিকাশ ঘটেছে। স্পেনের কাতালোনিয়াদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হলো এই ডানপন্থী রাজনীতি বিকাশের ফল।”[৭] এটি কোনো মুক্তিকামী সংগ্রাম নয়, বরং কাতালোনিয়া নিজেই একটি নতুন এবং আরও আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় এই বিচ্ছিন্নতাবাদকে সফল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
কাতালোনিয়ার এই সংকীর্ণ ও আত্মঘাতী আন্দোলন বিশ্বজুড়ে শোষিত মানুষের সংগ্রামের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত নেতিবাচক ও খারাপ দৃষ্টান্ত হয়েই থাকবে। এই ধরনের পশ্চাৎপদ ও বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী উন্মাদনার কারণে ইউরোপ অদূর ভবিষ্যতে জ্ঞান-বিজ্ঞান কিংবা কোনো প্রগতিশীল ও বৈপ্লবিক আন্দোলনের দিকে ধাবিত হতে পারবে না—যার স্পষ্ট লক্ষণ ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান হচ্ছে। কাতালান বিচ্ছিন্নতাবাদের এই সংক্রমণ আজ ইউরোপের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে; স্কটল্যান্ড, ওয়েলশ, উত্তর আয়ারল্যান্ড, জার্মানির বাভারিয়া এবং ফ্রান্সের ব্রিট্টানির মতো অঞ্চলগুলো এখন নিজস্ব ‘পতাকা স্বাধীনতা’র নামে বিচ্ছিন্ন হওয়ার দিবা স্বপ্ন দেখছে। এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতীয়তাবাদী বিভাজন মূলত বৃহৎ সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থকেই পুষ্ট করছে এবং ইউরোপীয় শ্রমিক শ্রেণির ঐক্যবদ্ধ লড়াইকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে।
ইউরোপীয় ছদ্ম-স্বাধীনতা এবং কাতালান বিচ্ছিন্নতাবাদের অন্তঃসারশূন্যতা
বর্তমান ইউরোপের মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায় সেখানে ৬০টিরও অধিক তথাকথিত ‘পতাকা স্বাধীন’ দেশ বিদ্যমান। কিন্তু মার্কসবাদী-লেনিনবাদী বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, এদের একটি রাষ্ট্রও প্রকৃত অর্থে স্বাধীন বা সার্বভৌম নয়। এই রাষ্ট্রগুলোর টিকে থাকার ভিত্তি উৎপাদন নয়, বরং পরজীবীতা; এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদ-নিপীড়িত জাতিগুলোর প্রাকৃতিক ও শ্রম সম্পদ লুণ্ঠন না করে এরা ১৫ দিনও নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে না। যেখানে বর্তমান সংকটে ইউরোপের জন্য একমাত্র মুক্তির পথ ছিল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এবং শ্রমজীবী মানুষের আন্তর্জাতিক সংহতি, সেখানে তারা উল্টো পথে হেঁটে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এই রাষ্ট্রগুলো একদিকে গোটা দুনিয়াকে লুণ্ঠন করছে, অন্যদিকে ন্যাটোর (NATO) মতো যুদ্ধবাজ সাম্রাজ্যবাদী জোটের কাছে নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক আত্মমর্যাদা সম্পূর্ণভাবে বিকিয়ে দিয়েছে।
এই বাস্তবতায়, স্পেনের অংশ হিসেবে থেকে লুণ্ঠনের ভাগ পাওয়া কাতালোনিয়া যদি আরেকটি নতুন ‘পতাকা’ অর্জনও করে, তবে তাতে শোষিত মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটবে না। প্রশ্ন জাগে, সাম্রাজ্যবাদের এই দাবার বোর্ডে নতুন একটি পতাকা পেয়ে তারা আসলে কী এমন ‘আঁটিটা বাঁধবে’? প্রকৃতপক্ষে, একটি নতুন ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হিসেবে তারা কেবল ন্যাটোর আরও একটি বশংবদ দাসে পরিণত হবে এবং বৈশ্বিক কর্পোরেট পুঁজির আরও নগ্ন শোষণের ক্ষেত্র তৈরি করবে। এই তথাকথিত স্বাধীনতা মূলত একদল বুর্জোয়া শোষকের হাত থেকে আরেকদল বুর্জোয়া শোষকের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি নামমাত্র প্রক্রিয়া ছাড়া আর কিছুই নয়। এটি কোনোভাবেই প্রগতি বা মুক্তির পথ নয়, বরং বিশ্ব-সাম্রাজ্যবাদের শৃঙ্খলকে আরও দীর্ঘ ও জটিল করার একটি প্রতিক্রিয়াশীল প্রয়াস।
পরিশেষে বলা যায়, কাতালোনিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন কোনো প্রগতিশীল বা স্বাধীনতাকামী সংগ্রাম নয়, বরং এটি বিশ্ব-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ সংকটের এক বিকৃত বহিঃপ্রকাশ। ইউরোপে বৈপ্লবিক শ্রমিক রাজনীতির অনুপস্থিতিতে বুর্জোয়া শ্রেণি জাতীয়তাবাদের ধোঁয়াশা তৈরি করে মূলত তাদের লুণ্ঠনের পরিধিকে আরও নিরঙ্কুশ করতে চাইছে। এই ‘পতাকা স্বাধীনতা’ আসলে নব্য-সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যেরই নামান্তর, যা কেবল ইউরোপকে আরও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরজীবী রাষ্ট্রে বিভক্ত করবে এবং ন্যাটোর মতো আধিপত্যবাদী শক্তির হাতকে শক্তিশালী করবে। বিশ্বমানবতার মুক্তির স্বার্থে এই সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ নয়, বরং প্রয়োজন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী একটি সুসংহত আন্তর্জাতিক সংহতি।
আরো পড়ুন
- দ্য গ্রেট ডিপ্রেশন বা ১৯২৯-এর মহামন্দা: পুঁজিবাদের সংকট ও বিশ্ব অর্থনীতির এক অন্ধকার অধ্যায়
- কাতালান বিচ্ছিন্নতাবাদ: মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে সাম্রাজ্যবাদী শোষণের নতুন রূপ
- প্রাচীন এথেন্সের বিচারব্যবস্থা: ডাইকাস্ট ও জনতার আদালতের আদ্যোপান্ত
- স্নায়ুযুদ্ধের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ: বিশ্ব রাজনীতির এক জটিল ইতিহাস
- ইউরোপের স্নায়ুযুদ্ধকালীন রাজনৈতিক ইতিহাস: সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠন
- ইউরোপের অর্থনৈতিক শক্তি: দেশগুলোর বিশাল শিল্প সাফল্য ও বৈশ্বিক প্রভাব
- মার্কাস টুলিয়াস সিসেরো: প্রাচীন রোমের সর্বশ্রেষ্ঠ বাগ্মী ও প্রজাতন্ত্রের শেষ বীর
- জুলিয়াস সিজার হত্যাকাণ্ড: রোমান প্রজাতন্ত্রের পতন ও এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র
- রেনেসাঁ বা নবজাগরণ: ইউরোপীয় আধুনিকতার উদয় ও বৌদ্ধিক রূপান্তর
- মার্টিন লুথার ও প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার: সামন্তবাদী ইউরোপ থেকে আধুনিকতার উত্তরণ
- সাইপ্রাসে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন: ব্রিটিশ ও মার্কিন ঘাঁটি এবং ভূ-রাজনীতি
- ইউরোপের ইতিহাস: গ্রিক ও রোমান ঐতিহ্য, সামন্তযুগের ধর্মবাদ ও শিল্প বিপ্লবের আখ্যান
- আধুনিকতা হচ্ছে একটি ঐতিহাসিক সময়কাল ও নবজাগরণের পরে উদ্ভূত সংস্কৃতি
- বেনিতো মুসোলিনি: ফ্যাসিবাদের উত্থান এবং ইতালির একনায়কতন্ত্রের ইতিহাস
- সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাসে লেনিনবাদী বলশেভিক পার্টির ভূমিকা
- সোভিয়েত ইউনিয়ন আমার নিজের ঘর — পল রবসন
- সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে পরিচিত ছিল সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক লোকতন্ত্রের ইউনিয়ন
- আলোকায়ন যুগ: যুক্তিনির্ভর আধুনিক সভ্যতার বিবর্তন, বৈজ্ঞানিক বিপ্লব ও এর বৈশ্বিক প্রভাব
- ফেবিয়ানবাদ বা ফেবিয়ান সমিতি হচ্ছে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী সমিতি
- চীনের সঙ্গে ইউরোপের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ
- ইউরোসাম্যবাদ বা ইউরোকমিউনিজম: পশ্চিম ইউরোপে মার্কসবাদের বিবর্তন ও আদর্শিক বিচ্যুতি
- প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার আন্দোলন: আধুনিক ইউরোপীয় জাতিরাষ্ট্র ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি
- ইউরোপীয় রাষ্ট্রচিন্তায় রেনেসাঁ বা নবজাগরণ বা পুনর্জাগরণ আন্দোলনের প্রভাব
তথ্যসূত্র ও টিকা
১. অনুপ সাদি, ২৬ নভেম্বর ২০১৭, “কাতালোনিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন একটি স্বাধীনতাবিরোধী আন্দোলন” রোদ্দুরে.কম, ইউআরএল: https://www.roddure.com/international/catalonia/ ২. https://www.omicsonline.org/earth-science-journals-spain/
৩. “PIB de las Comunidades Autónomas 2016”. https://www.datosmacro.com/pib/espana-comunidades-autonomas; Retrieved 2016-09-13.
৪. http://www.ine.es/prensa/np901.pdf
৫. National Statistics Office (Spain’s GDP and GRP), National Statistics Office. GDP Figures of Spanish autonomous communities and provinces 2008–2012. http://www.ine.es/prensa/np695.pdf
৬. অর্থনীতির তিন সেক্টরের তত্ত্বটি হচ্ছে এরকম যে, অর্থনীতির প্রাথমিক সেক্টরটি প্রাকৃতিক সম্পদসমূহ প্রত্যক্ষভাবে ব্যবহার করে বা প্রাকৃতিক সম্পদসমূহকে কাজে লাগায়। প্রাথমিক সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে কৃষি, বনায়ন, মৎস্য আহরণ এবং খনিজ উৎপাদন। তুলনার্থে, মাধ্যমিক সেক্টরটি শিল্পজাত পণ্য উৎপাদন করে। উচ্চ স্তরিক সেক্টরটি অন্তর্ভুক্ত করে সেবা খাতকে। ব্যবহৃত তথ্যসূত্রের লিংক “Structural Funds programmes in Catalonia – (2000–2006)” (PDF). Archived from the original (PDF) on 25 March 2009. Retrieved 25 April 2010.
৭. মতিউর রহমান, ফেসবুক পোস্ট, ৫ অক্টোবর, ২০১৭, লিংক: https://www.facebook.com/matiurbd25/posts/10155867979098130
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।