নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল কবি কাজী নজরুল ইসলামের রচিত একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় প্রেম ও বিরহী চেতনার নজরুল গীতি। গানটি মূলত বিচ্ছেদ এবং না-পাওয়ার বেদনার এক অপূর্ব কাব্যিক প্রকাশ।
নয়ন ভরা জল গো তোমার গানটি সম্পর্কে অন্যান্য তথ্য
নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল গানটি একটি আধুনিক নজরুল গীতি যা বিরহী রসে সিক্ত। গানে প্রিয়তমার চোখের জল ও আঁচলের ফুলের মধ্যে কোনোটি গ্রহণ করা হবে, তা নিয়ে কবির দোদুল্যমান মনের প্রকাশ ঘটেছে।
গানটি সাধারণত দাদরা তালে গাওয়া হয়। ১৯৪৪ সালের আগস্ট (শ্রাবণ-ভাদ্র ১৩৫০) মাসে এটি প্রথম কলম্বিয়া রেকর্ড থেকে প্রকাশিত হয়।
গানটি বাংলা সংগীত জগতের অনেক প্রথিতযশা শিল্পী বিভিন্ন সময়ে গেয়েছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের নাম হচ্ছে শ্যামল মিত্র, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, ফেরদৌস আরা, সত্য চৌধুরী, সুস্মিতা দেবনাথ শুচি এবং বাউল বাদশা অন্যতম। এছাড়াও অনেক স্থানীয় এবং উদীয়মান শিল্পী বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও রেকর্ডিংয়ে এই জনপ্রিয় গানটি পরিবেশন করেছেন
গানটির বিশ্লেষণ
উপমা
“নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল” গানটিতে কাজী নজরুল ইসলাম বিরহ ও ত্যাগের এক অনন্য রসায়ন তৈরি করেছেন। গানটির পরতে পরতে লুকিয়ে আছে অসাধারণ সব উপমা, রূপক ও তুলনা, যা গানটিকে শুধু একটি বিরহী গান নয়, বরং একটি উচ্চমানের কবিতায় রূপান্তর করেছে।
গানের প্রথম পঙক্তিতেই কবি দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী বস্তুর তুলনা করেছেন: ‘নয়ন ভরা জল’ এবং ‘আঁচল ভরা ফুল’। নয়ন ভরা জল হচ্ছে শোক, বেদনা ও বিচ্ছেদের প্রতীক। আঁচল ভরা ফুল হচ্ছে বসন্ত, আনন্দ ও মিলনের প্রতীক। কবি এখানে উপমা (Simile) ব্যবহার করে বোঝাতে চেয়েছেন যে, প্রিয়তমা একই সাথে সুখ (ফুল) ও দুঃখ (জল) নিয়ে উপস্থিত। কবির দ্বিধা হলো—তিনি কি আনন্দের ডালি ‘ফুল’ নেবেন, নাকি বেদনার স্মৃতি ‘অশ্রু’ গ্রহণ করবেন?
রূপক
গানে একটি চমৎকার রূপক ব্যবহার করা হয়েছে: “অশ্রু নিলে ফুটবে না আর প্রেমের মুকুল।” এখানে প্রেমকে একটি ‘মুকুল’ বা কুঁড়ির (Metaphor of Love Bud) সাথে তুলনা করা হয়েছে। সাধারণত ফুল ফোটার জন্য জলের প্রয়োজন হয়, কিন্তু কবির কাব্যিক দর্শনে বিরহের অতিশয় অশ্রু যদি তিনি গ্রহণ করেন, তবে প্রেমের সেই কোমল কুঁড়িটি অঙ্কুরেই বিনষ্ট হতে পারে। অর্থাৎ, অতিরিক্ত শোক প্রেমের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।
অন্যান্য বিশ্লেষণ
গানের একটি অংশে কবি বলেছেন— “পিপাসা মোর মাগে রে জল, নয়ন মাগে আলো।” এখানে মানুষের হৃদয়ের চিরন্তন হাহাকারকে ‘পিপাসা’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। তৃষ্ণার্ত মানুষ যেমন জল চায়, কবি তেমনি ভালোবাসা চান। কিন্তু সেই ভালোবাসা যদি শুধুই অশ্রুসিক্ত হয়, তবে সেই তৃষ্ণা মেটে না। এখানে ‘জল’ ও ‘আলো’র মাধ্যমে কবি প্রিয়তমার সান্নিধ্য ও স্পষ্টতার আকাঙ্ক্ষাকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
গানের শেষ পর্যায়ে কবি নিজেকে এক কঠিন সিদ্ধান্তে উপনীত করেন। তিনি ফুলের হাসি নয়, বরং প্রিয়ার চোখের জলকেই আপন করে নিতে চান। এখানে ‘ফুল’ হলো সাময়িক মোহ বা বাহ্যিক সৌন্দর্য। ‘অশ্রু’ হলো অন্তরের গভীর টান এবং শাশ্বত সত্য। কবি রূপকার্থে বোঝাতে চেয়েছেন, সত্যিকারের প্রেম কেবল হাসিতে নয়, চোখের জলেও সার্থক হয়।
নজরুল এই গানে ফুলকে ‘মিলন’ এবং জলকে ‘বিরহ’ হিসেবে ব্যবহার করে দেখিয়েছেন যে, একজন প্রকৃত প্রেমিক মিলনের সুখের চেয়ে প্রিয়জনের বিরহ-বেদনা ভাগ করে নেওয়াকেই শ্রেয় মনে করেন।
গানের প্রেক্ষাপট
নজরুল সংগীতের ইতিহাসে ‘নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল’ গানটি একটি অনন্য স্থান দখল করে আছে। আব্বাস উদ্দীনের সাথে কবির গান রচনার মজার সব স্মৃতির মাঝে এমন কিছু রোমান্টিক গান কবির সংবেদনশীলতার পরিচয় দেয়।
গানের কথাসমূহ
নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল,
ফুল নেব না অশ্রু নেব ভেবে হই আকুল।
ফুল যদি নিই তোমার হাতে
জল রবে গো নয়ন পাতে
অশ্রু নিলে ফুটবে না আর প্রেমের মুকুল।।
মালা যখন গাঁথো তখন পাওয়ার সাধ যে জাগে
মোর বিরহে কাঁদো যখন আরও ভালো লাগে।
পেয়ে তোমায় যদি হারাই
দূরে দূরে থাকি গো তাই
ফুল ফোটায়ে যাই গো চলে চঞ্চল বুলবুল।।
আরো পড়ুন
- জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেলছ জুয়া
- কাজী নজরুল ইসলামের প্রবন্ধ হচ্ছে দেশপ্রেম ও উপনিবেশবাদ বিরোধিতার জ্বলন্ত দলিল
- কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা মূলত বিদ্রোহ, দেশপ্রেম ও মানবতার জয়গানে মুখর
- বিদায় সন্ধ্যা আসিল ওই ঘনায় নয়নে অন্ধকার
- যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই কেন মনে রাখ তারে
- নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল
- নজরুল গীতি হচ্ছে দেশপ্রেম, প্রেম, ধর্মসংগীতসহ রাগ ধারার গান
- কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও সঙ্গীতজ্ঞ
ফিরোজা বেগমের কণ্ঠে গানটি শুনুন ইউটিউব থেকে:
বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখাটি ৪ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।