স্বাধীনতা-উত্তর পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যচর্চা: ঐতিহ্য, আধুনিকতা ও প্রথাবিরোধী আন্দোলন

পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যচর্চার ইতিহাস সুদীর্ঘ এবং অত্যন্ত সমৃদ্ধ। খ্রিষ্টীয় নবম শতাব্দী থেকে শুরু করে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত অসংখ্য গুণী সাহিত্যিক বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে অলঙ্কৃত করেছেন। তবে রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী সময়ে কিংবা ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর বাংলা সাহিত্যের গতিপথ রুদ্ধ হয়ে যায়নি; বরং তা নতুন নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে এক ভিন্ন দিশা লাভ করেছিল। এই নিবন্ধে আমরা মূলত দেশভাগ তথা স্বাধীনতা-উত্তর পশ্চিমবাংলার সাহিত্যিক বিকাশ এবং সেই সময়ের যুগান্তকারী কবি-সাহিত্যিকদের সৃষ্টিশীল আন্দোলন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।

বাংলা সাহিত্যের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: প্রাচীন থেকে আধুনিক যুগ

আনুমানিক খ্রিষ্টীয় নবম শতাব্দীতে বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনার সূত্রপাত ঘটে। খ্রিষ্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে রচিত বৌদ্ধ দোঁহা-সংকলন ‘চর্যাপদ’-কে বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য ছিল মূলত কাব্যপ্রধান, যা গড়ে উঠেছিল হিন্দুধর্ম, ইসলাম ও বাংলার লৌকিক ধর্মবিশ্বাসকে কেন্দ্র করে। এই দীর্ঘ সময়ে বাংলা সাহিত্যের মূল বিষয় ছিল:

  • মঙ্গলকাব্য ও বৈষ্ণব পদাবলী
  • শাক্ত পদাবলী ও বৈষ্ণব সন্তজীবনী
  • রামায়ণ, মহাভারত ও ভাগবতের বঙ্গানুবাদ
  • পীরসাহিত্য, নাথসাহিত্য, বাউল পদাবলী এবং ইসলামি ধর্মসাহিত্য

খ্রিষ্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার সূত্রপাত হয়। পরবর্তীতে ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার নবজাগরণের যুগে কলকাতা শহরকে কেন্দ্র করে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। এই সময় থেকে ধর্মীয় গণ্ডি পেরিয়ে মানুষ, মানবতাবাদ ও মানব-মনস্তত্ত্ব বাংলা সাহিত্যের প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে।

দেশভাগ ও বাংলা সাহিত্যের দ্বিমুখী ধারা

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর বাংলা সাহিত্য ভৌগোলিক সীমানার সাথে সাথে দুটি প্রধান ধারায় বিভক্ত হয়ে যায়:
১. কলকাতা-কেন্দ্রিক পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য
২. ঢাকা-কেন্দ্রিক পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ)-এর সাহিত্য

এই বিভাজনের পরও উভয় ধারা নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যে বিকশিত হয়ে বর্তমান বিশ্বে বাংলা সাহিত্যকে একটি অন্যতম সমৃদ্ধ সাহিত্যধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

রবীন্দ্র-বৃত্তের বাইরে নতুন দিগন্ত: ‘কল্লোল যুগ’-এর উত্থান

রবীন্দ্র-প্রভাবের স্বর্ণযুগেই মূলত একদল তরুণ কবি-সাহিত্যিকের হাত ধরে বাংলা সাহিত্যে পাশ্চাত্য আধুনিকতার পত্তন ঘটে। ১৯৩০-এর দশকের এই আন্দোলন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ‘কল্লোল যুগ’ নামে সমধিক পরিচিত। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে প্রবর্তিত ‘কল্লোল’ পত্রিকার মূল কর্ণধার ছিলেন দীনেশরঞ্জন দাশ ও গোকুলচন্দ্র নাগ।

আন্দোলনের লক্ষ্য ও বিস্তার:
কল্লোল যুগের নাবিকদের মূল লক্ষ্য ছিল রবীন্দ্র-বৃত্তের বাইরে গিয়ে সাহিত্যের একটি মৃত্তিকাসংলগ্ন বা বাস্তবমুখী জগৎ সৃষ্টি করা। কবি বুদ্ধদেব বসু ছিলেন এই নবযুগের অন্যতম প্রধান কাণ্ডারী। কল্লোল পত্রিকার আবহে দ্রুত অনুপ্রাণিত হয়ে ওঠে প্রগতি, উত্তরা, কালিকলম ও পূর্বাশার মতো পত্রপত্রিকাগুলো।

শনিবারের চিঠি ও বৈপরীত্য:
অন্যদিকে, আধুনিকতার নামে যথেচ্ছাচারিতা ও অশ্লীলতার প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে—এমন অভিযোগ এনে একটি ভিন্ন বলয় গড়ে তোলে ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকা। মোহিতলাল মজুমদার, সজনীকান্ত দাস ও নীরদচন্দ্র চৌধুরী প্রমুখ এই ধারায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

কল্লোল যুগের শ্রেষ্ঠ কাণ্ডারীবৃন্দ:
কবিতার ক্ষেত্রে যাঁদের নাম কল্লোল যুগের শ্রেষ্ঠ নায়ক হিসেবে বিবেচিত হয়, তাঁরা হলেন:

  • জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী ও বিষ্ণু দে।
  • এর পাশাপাশি কাজী নজরুল ইসলাম, প্রেমেন্দ্র মিত্র, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত এবং সঞ্জয় ভট্টাচার্যের ভূমিকাও ছিল অনন্য। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত রচিত ‘কল্লোল যুগ’ এ বিষয়ে একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ।

কৃত্তিবাস পত্রিকা: তরুণদের স্পর্ধা ও কবিতার বিস্ফোরণ

১৯৫৩ সালে কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একদল প্রতিভাবান তরুণ বাংলা সাহিত্যের জগতে এক অভূতপূর্ব ঝড় তোলেন ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকার মাধ্যমে। বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকা তখনো সচল ছিল এবং বাজারে জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের মতো প্রথম সারির কবিরা বর্তমান ছিলেন। কিন্তু কৃত্তিবাস এক দুঃসহ স্পর্ধায় প্রবীণদের বাদ দিয়ে নিতান্ত তরুণদের কবিতা নিয়ে প্রকাশ হতে থাকে।

বোহেমিয়ান সংস্কৃতির প্রভাব:
ষাশের দশকের শুরুতে মার্কিন কবি অ্যালেন গিনসবার্গ কলকাতায় এলে কৃত্তিবাসের কবিরা ‘বীটনিক কাব্যের’ অনুরক্ত হয়ে পড়েন। ফলে তাঁদের কবিতা হয়ে ওঠে তীব্র, উদাসীন, উন্মত্ত, ক্ষুব্ধ এবং অতৃপ্ত। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু ও তারাপদ রায় প্রমুখ ছিলেন এই গোষ্ঠীর মূল স্তম্ভ।

সীমাবদ্ধতা ও বিতর্ক:
১৯৬৯ সালের পর কৃত্তিবাস দীর্ঘকাল বন্ধ থাকার পর যখন মাসিক পত্রিকা হিসেবে পুনরায় আত্মপ্রকাশ করে, তখন এটি গদ্যের দিকেও ঝুঁকে পড়ে। তবে কৃত্তিবাসের প্রথম পর্বের বিরুদ্ধে অতি-চিৎকার ও অশ্লীলতার অভিযোগ উঠেছিল। পুঁজিবলবান প্রাতিষ্ঠানিকতার দাপট এবং প্রতিযোগী ব্যক্তিবাদের লালনে একসময়কার প্রথাবিরোধী কৃত্তিবাস তার বোহেমিয়ান গৌরব হারিয়ে ফেলে এবং মাত্র কয়েকজন মেধাস্বত্বাধিকারীর নামে সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে কৃত্তিবাসের পাশে তৎকালীন ‘শতভিষা গোষ্ঠী’র মতো অনেক প্রতিভাই হারিয়ে যায়।

হাংরি আন্দোলন: বাংলার প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকতাবিরোধী লড়াই

বাংলা সাহিত্যে স্থিতাবস্থা ভাঙার আওয়াজ তুলে, ইশতাহার (Manifesto) প্রকাশের মাধ্যমে শিল্প ও সাহিত্যের যে একমাত্র চরম আন্দোলন হয়েছিল, তার নাম ‘হাংরি আন্দোলন’ (Hungryalist বা ক্ষুধার্ত আন্দোলন)। জিউফ্রে চসারের “In the sour hungry time” বাক্যটি থেকে ‘হাংরি’ শব্দটি নেওয়া হয়েছিল, যা মূলত দেশভাগোত্তর বাঙালির চরম সংকট ও ক্ষুৎকাতর কালখণ্ডকে চিহ্নিত করে। আন্দোলনকারীদের মনে হয়েছিল, দেশভাগের ফলে পশ্চিমবঙ্গ এক ভয়ংকর অবসাদের মুখে পড়েছে, যেখানে উনিশ শতকের মনীষীদের মতো বাঙালির আবির্ভাব আর সম্ভব নয়। তাই তাঁরা একে ‘কাউন্টার কালচারাল’ বা প্রতি-সংস্কৃতি আন্দোলন হিসেবে আখ্যা দেন।

আন্দোলনের সূত্রপাত ও বিস্তার:
১৯৬১ সালের নভেম্বরে পাটনা শহর থেকে একটি ইংরেজি ইশতাহার প্রকাশের মাধ্যমে এই আন্দোলনের সূত্রপাত করেন সমীর রায়চৌধুরী, মলয় রায়চৌধুরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং হারাধন ধাড়া (দেবী রায়)। ১৯৬২-৬৩ সালের মধ্যে এই আন্দোলনে বিনয় মজুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র, ফালগুনী রায় এবং চিত্রকর অনিল করঞ্জাই ও করুণানিধান মুখোপাধ্যায়সহ বহু তরুণ যুক্ত হন।

বুলেটিন সংস্কৃতি ও প্রচার কৌশল:
হাংরি আন্দোলনকারীরা মূলত এক পৃষ্ঠার সস্তা বুলেটিন, পোস্টকার্ড বা পোস্টার প্রকাশ করতেন। হ্যান্ডবিলের মতো এই বুলেটিনগুলো কলকাতার কলেজ স্ট্রিট কফি হাউস, বিভিন্ন পত্রিকা দপ্তর এবং কলেজের বাংলা বিভাগে বিতরণ করা হতো। এই অভিনব প্রচারের কারণে হাংরি আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

ঐতিহাসিক ক্ষতি ও ভাঙন:
বুলেটিনগুলো হ্যান্ডবিলের মতো সস্তায় বিলি করার কারণে সংগ্রাহকেরা তা সংরক্ষণ করতে পারেননি, যা আন্দোলনের একটি বড় ঐতিহাসিক ক্ষতি। পরবর্তী সময়ে সুবিমল বসাক, দেবী রায় ও মলয় রায়চৌধুরীর কিছু চরম ও উগ্র কর্মকাণ্ডের কারণে হাংরি আন্দোলন তীব্র ‘প্রতিষ্ঠানবিরোধী’ রূপ নেয়। ফলস্বরূপ, ১৯৬৩ সালের শেষার্ধে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ শীর্ষস্থানীয় সাহিত্যিকরা এই আন্দোলন ত্যাগ করেন এবং ১৯৬৫ সালের মধ্যে মূল হাংরি আন্দোলন ফুরিয়ে যায়। যদিও নকশাল আন্দোলনের পর উত্তরবঙ্গ ও ত্রিপুরার তরুণরা একে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তাত্ত্বিক ভিত্তির অভাবে তা আর দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

প্রাক-ঔপনিবেশিক বনাম আধুনিক সাহিত্যের ডিসকোর্স

আধুনিক সাহিত্যের ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতার বিপরীতে যদি আমরা প্রাক-ঔপনিবেশিক সাহিত্যরীতির দিকে তাকাই, তবে এক বিশাল তফাত চোখে পড়ে। প্রাক-ঔপনিবেশিক কালে ‘পদাবলী সাহিত্য’ বা ‘মঙ্গলকাব্য’-এর মতো সামষ্টিক পরিসরে (Macro Space) রাধা-কৃষ্ণ, চণ্ডী, মনসা বা ধর্মঠাকুরের মতো ক্ষুদ্র উপাখ্যানগুলো (Micro Space) সুন্দরভাবে সহাবস্থান করত। সেই সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল সৃষ্টির মূল ভাব বা ‘সন্দর্ভ’ (Discourse), রচয়িতার ব্যক্তিগত নাম বা অহংকার সেখানে মুখ্য ছিল না। আধুনিক যুগের পুঁজিবাদী প্রাতিষ্ঠানিকতা সাহিত্যের সেই সামষ্টিক রূপকে ভেঙে ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে তুলেছে, যার বিরুদ্ধে কৃত্তিবাস বা হাংরি আন্দোলনের কবিরা তাঁদের মতো করে লড়াই করার চেষ্টা করেছিলেন।

আরো পড়ুন

শব্দার্থ ও টীকা:

  • বীটনিক কাব্য (Beatnik Poetry): ১৯৫০-এর দশকে আমেরিকায় শুরু হওয়া একটি প্রথাবিরোধী সাহিত্য আন্দোলন, যা মূলধারার রাজনীতি ও সংস্কৃতির বিরোধিতা করত।
  • ডিসকোর্স (Discourse): কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক বা তাত্ত্বিক আলোচনা/সন্দর্ভ।
  • কাউন্টার কালচার (Counter Culture): মূলধারার প্রতিষ্ঠিত সংস্কৃতি বা রীতিনীতির বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা প্রতি-সংস্কৃতি।

তথ্যসূত্র

১. সেনগুপ্ত, অচিন্ত্যকুমার। কল্লোল যুগ। ডি এম লাইব্রেরি, কলকাতা। (এই গ্রন্থটি কল্লোল যুগের সাহিত্য আন্দোলন, বুদ্ধদেব বসু ও জীবনানন্দ দাশদের সমকালীন সাহিত্যচর্চার একটি প্রামাণ্য দলিল)।
২. রায়চৌধুরী, মলয়। হাংরি আন্দোলনের ইশতাহার ও ইতিহাস। (হাংরিয়ালিস্ট আন্দোলনের সূত্রপাত, কফি হাউসের বুলেটিন সংস্কৃতি এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর সাথে সম্পর্কের ইতিহাসের জন্য এই বিষয়ের মূল দলিল ও গবেষকদের প্রবন্ধসমূহ অনুসৃত)।
৩. এই সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধটি সর্বপ্রথম ০৩ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে ফুলকিবাজ.কম-এর সম্মানিত পাঠকদের উদ্দেশ্যে প্রকাশিত হয়েছিল।

Leave a Comment