ভাষা যোগাযোগের জটিল প্রণালীগুলির বিকাশ, অধিগ্রহণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করে

ভাষা (ইংরেজি: Language) হচ্ছে এমন একটি পদ্ধতি যা যোগাযোগের জটিল প্রণালীগুলির বিকাশ, অধিগ্রহণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যবহার সমন্বিত করে, বিশেষভাবে এটি মানুষের করার ক্ষমতা আছে; একটি ভাষা হচ্ছে এমন একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতির উদাহরণ। মানুষের চিন্তার অর্থবহ ধ্বনিসমষ্টি হলো ভাষা। আমাদের চিন্তা থেকে ধ্বনির আশ্রয়ে ওষ্ঠের মধ্য দিয়ে ভাষার প্রবাহ বেরিয়ে আসে।[১]

মনুষ্যেতর প্রাণীরা চিন্তাজাত উন্নততর প্রকাশভঙ্গির বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে পারে না, তাই তাদের কণ্ঠস্বরকে ভাষা বলা যাবে না। বস্তুত উন্নততর ভাব ও চিন্তাকে প্রকাশের জন্যই মানুষের ভাষার প্রয়োজন হয়। একজনের মনের ভাব যখন আমরা অন্যজনের নিকট পৌছে দিতে চাই, তখনই জন্ম হয় ভাষার। তা হলে দেখা যাচ্ছে, ভাষা সৃষ্টির জন্য অন্তত দুটি মানুষের প্রয়োজন হয়। এই এক থেকে দুই বা ততোধিক মানুষের অস্তিত্ব যখন আমরা অনুভব করি, তখনই এসে পড়ে সমাজ ভাবনার কথা। 

মানুষের মনের ভাব আদান প্রদান এবং জ্ঞান অর্জনের প্রতীকময় মাধ্যম এই ভাষার দুটি রূপ — কথ্য ও লেখ্য। এটা বিবর্তিত হয় কথ্যরূপের উপর ভিত্তি করে। তাই যে-ভাষাগোষ্ঠীর জনসংখ্যা অধিকতর হয় সেই ভাষাই দ্রুত রূপান্তরিত হয়। প্রথমে সৃষ্টি হয় উপভাষার। তারপর আঞ্চলিক রূপগুলি পৃথক হতে হতে যখন পারস্পরিক বোধগম্যতার সীমা অতিক্রম করে যায়, তখন স্বতন্ত্র ভাষার মর্যাদা পেয়ে যায়।[২]

ভাষা কত ধরনের বা প্রকারভেদ

ভাষাকে ব্যবহার ও সৃষ্টির দিক থেকে স্বাভাবিক এবং কৃত্রিম এই দুইভাগে ভাগ করা যায়। দৈনন্দিন জীবনে চিন্তার প্রকাশ এবং পারস্পরিক প্রত্যক্ষ যোগাযোগের যে ভাষাকে আমরা ব্যবহার করি তাকে স্বাভাবিক ভাষা বলা যায়। কিন্তু বিশ্লিষ্ট চিন্তা প্রকাশের জন্য সচেতনভাবে আমাদের ভাষা সৃষ্টিও করতে হয়। অঙ্কের চিহ্ন, পদার্থের প্রকৃতি বিশ্লেষণকারী তত্ত্বের ভাষা, দূর বার্তার কিংবা গোপন তথ্যের সংকেত ইত্যাদি ভাষাকে কৃত্রিম বলা চলে।[৩]

আরো পড়ুন:  হুমায়ুন আজাদ ছিলেন নিরাশার কর্দমে ডুবে থাকা বাঙলার হাহাকারের কবি

এটা মানুষের সমাজ জীবনের প্রকাশ। ভাষার ব্যবহারের ফলেই একজনের সৃষ্টি দশজনের এবং ক্রমে তা সমগ্র সমাজের সম্পদে পরিণত হতে পেরেছিল।[৪] সঙ্গীহীন কোনো ব্যক্তির কথা চিন্তা করলে তার মুখে ভাষার বিকাশ চিন্তা করা যায় না। মানুষ জীবন রক্ষার জন্যই আদিতে সমাজবদ্ধ হয়েছে। খাদ্য উৎপাদনই হচ্ছে জীবন রক্ষার মূলশর্ত। ব্যক্তিগতভাবে নয় সামাজিকভাবেই ব্যক্তিকে আদিতে খাদ্য উৎপাদন করতে হয়েছে। জীবন রক্ষার এই উপায়ের উৎপাদনে অপরাপর হাতিয়ারের মধ্যে ভাষা ছিল মানুষের অন্যতম প্রাথমিক হাতিয়ার। ভাষার মাধ্যমেই মানুষ পরস্পরের শ্রমকে সংযুক্ত করে সমষ্টিগতভাবে বনের পশুকে শিকার করে খাদ্য সংগ্রহ করতে পেরেছে, হিংস্র ব্যাঘ্র এবং বৈরী গোত্রের আক্রমণ প্রতিহত করতে পেরেছে এবং কালক্রমে অবকাশের ব্যবহারে সুকুমার বৃত্তির চর্চা করে সংস্কৃতির সৃষ্টি করতে পেরেছে।

ভাষা চিন্তার আধারও বটে। চিন্তার মধ্য দিয়ে এটার সৃষ্টি এবং বিকাশ ঘটে। কিন্তু ভাষার মধ্যেই আবার চিন্তার অবস্থান ঘটে। চেতনার বিকাশেও ধর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চিত্র থেকে সংকেতে উত্তরণই হচ্ছে ভাষার ক্রমবিকাশের ধারা।

ভাষা ভাবের প্রকাশ। ভাবকে দেখা যায় না। কিন্তু ভাষার সংকেতকে দেখা যায়। তার উচ্চারণকে শ্রবণ করা যায়। ভাব বিদেহী হলেও ভাবই ভাষার নিয়ন্তা। কিন্তু আমরা জানি, মানুষের ভাব সমাজোর্ধ্ব কোনো সত্তা নয়। সমাজবদ্ধ মানুষের ভাবের নিয়ন্ত্রক হচ্ছে সমাজ।

ভাষা ইতিহাসেরও বাহক বটে। ভাষার মাধ্যমেই মানুষ তার এক যুগের জ্ঞান ভান্ডারকে পরবর্তী যুগের মানুষের হাতে পৌছে দিতে পারে। এ্যাবষ্ট্রাক্ট বা বিশ্লিষ্ট চিন্তা প্রকাশের উপযুক্ত ভাষা পাইনে বলে আমরা অনেক সময় অভিযোগ করি। কিন্তু ভাষা ব্যতীত বিমূর্ত চিন্তা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। বিশ্লিষ্ট বস্তুর পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনার ভিত্তিতে সাধারণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ হচ্ছে জ্ঞানের প্রক্রিয়া। এ দিক থেকে যে কোনো অর্থবোধক শব্দ মাত্রই চিন্তার সাধারণীকরণ। আবার একথাও ঠিক যে চিন্তা এবং ভাষা অভিন্ন নয়। সমাজে ভাষার উদ্ভবের পরে ভাষা চিন্তা থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্নভাবেই নির্দিষ্ট হয়। প্রত্যেকটি ভাষার একটি নির্দিষ্ট কাঠামো থাকে। শব্দের উচ্চারণ, প্রাকৃতিক পরিবেশ, সামাজিক বোধ-প্রভৃতি নিয়েই ভাষার এই আন্তরিক কাঠামো গঠিত। এই কাঠামোর বাইরে একটি ভাষার কোনো প্রতীকের অর্থ যথার্থভাবে উপলব্ধি করা সহজ নয়।

আরো পড়ুন:  অনিল ভট্টাচার্য ছিলেন বিশতকের গীতিকার, সুরকার

তথ্যসূত্র:

১. অনুপ সাদি, ৭ জুন ২০১৯, “ভাষা প্রসঙ্গে”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/literature/on-language/
২. কেশব আড়ু, সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত, বুদ্ধিজীবীর নোটবই, নবযুগ প্রকাশনী, বাংলাবাজার, ঢাকা, প্রথম সংস্করণ ফেব্রুয়ারি ২০১০, পৃষ্ঠা, ৪৯৪-৪৯৫।
৩. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ২৫৬-২৫৭।
৪. সত্যেন সেন, ইতিহাস ও বিজ্ঞান প্রথম খণ্ড, দ্যু প্রকাশন, ঢাকা, দ্বিতীয় মুদ্রণ জুলাই ২০১৮, পৃষ্ঠা ৩০।

1 thought on “ভাষা যোগাযোগের জটিল প্রণালীগুলির বিকাশ, অধিগ্রহণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করে”

Leave a Comment

error: Content is protected !!