বাংলাদেশের দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাসে শ্রমিক, কৃষক এবং শোষিত-নিপীড়িত জনগণের মুক্তির লক্ষ্যে যে গণযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে, সেখানে নারীদের আত্মত্যাগ ও অবদান অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল। এই মুক্তিকামী নারী যোদ্ধাদের মিছিলের প্রথম সারিতে যে নামটি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয়, তিনি হলেন শহীদ কমরেড রাবেয়া আখতার বেলী। তিনি কেবল একজন সাধারণ কর্মী ছিলেন না, বরং বিপ্লবী আন্দোলনের এক অকুতোভয় ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তার রাজনৈতিক দর্শনের মূলে ছিল একটি সাম্যবাদী ও শোষণমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা। একটি প্রকৃত নয়া-গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতেন তিনি, যেখানে মেহনতি মানুষের অধিকার সুনিশ্চিত হবে। এই লক্ষ্য অর্জনে তিনি দীর্ঘস্থায়ী জনযুদ্ধের কৌশলকে বেছে নিয়েছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন যে, কৃষিবিপ্লবের মাধ্যমেই এদেশের সর্বহারা শ্রেণীর প্রকৃত মুক্তি সম্ভব।
মতাদর্শগতভাবে তিনি মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদকে জীবনের ধ্রুবতারা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। নকশালবাড়ি কৃষক আন্দোলনের বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি তৎকালীন প্রচলিত সংশোধনবাদ, সংস্কারবাদ ও নির্বাচনের মোহ ত্যাগ করেন। আপসহীন এই নেত্রী শোষিত শ্রেণির মুক্তির নেশায় আমৃত্যু বিপ্লবী পথে অবিচল ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত আত্মদানের মাধ্যমে এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন।
হীদ কমরেড রাবেয়া আখতার বেলীর জন্ম জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুরে। তার বিপ্লবী সত্তার বিকাশ ঘটেছিল মূলত ছাত্রাবস্থায়, যখন তিনি বামপন্থী আদর্শের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন। মেধাবী ও সাহসী এই নেত্রী সত্তর দশকের উত্তাল ছাত্র রাজনীতিতে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন। ১৯৭০ সালে ছাত্র ইউনিয়ন যখন আদর্শিক দ্বন্দ্বে বিভক্ত হয়ে পড়ে, তখন তিনি পূর্ববাংলা ছাত্র ইউনিয়নের অন্যতম শীর্ষ সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তবে কেবল ছাত্র রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে সরাসরি লড়াইয়ে নামেন। সেই সময় জয়পুরহাট অঞ্চলে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল) নেতৃত্বে যে শক্তিশালী সশস্ত্র কৃষক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, বেলী তাতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ছাত্র থেকে সরাসরি সশস্ত্র আন্দোলনের মাঠকর্মী হয়ে ওঠার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, শোষিত শ্রেণির মুক্তিই ছিল তার জীবনের প্রধান ব্রত। কৃষকদের জাগিয়ে তোলা এবং তাদের অধিকার আদায়ের মিছিলে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক নির্ভীক লড়াকু নাম।
১৯৭১ সালের গণযুদ্ধ ও শোষিত মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে কমরেড বেলীর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। সেই উত্তাল সময়ে স্থানীয় পার্টি নেতা ছমির মন্ডলের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে জয়পুরহাট অঞ্চলে এক তীব্র সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। এই সংগ্রাম ছিল একই সাথে সামন্ততান্ত্রিক শ্রেণিশত্রু এবং দখলদার পাকবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকারদের বিরুদ্ধে। এই দ্বিমুখী লড়াইয়ে কমরেড বেলী কেবল একজন কর্মী হিসেবে নয়, বরং একজন সংগঠক হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সাহসী ভূমিকা পালন করেন।
তবে এই লড়াইয়ের পথ ছিল অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যখন জয়পুরহাট দখল করে নেয়, তখন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল)-এর বিপ্লবীরা চরম প্রতিকূলতার মুখে পড়েন। পাকবাহিনী ও তাদের এদেশীয় সহযোগীদের বর্বরোচিত হামলায় একে একে শহীদ হন ছমির মন্ডল, কাজল মাঝি, আব্দুল, আজম, কুদ্দুস, সাত্তার, ফজলু, মোফাজ্জেল এবং এযারতের মতো নিবেদিতপ্রাণ বিপ্লবীরা। সহযোদ্ধাদের এই আত্মত্যাগ কমরেড বেলীকে শোকাতুর করলেও তার বিপ্লবী চেতনাকে আরও শাণিত করেছিল। শোষিত মানুষের অধিকার রক্ষায় তাদের এই রক্তদান জয়পুরহাটের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে আছে।
বিপ্লবী লড়াইয়ের সেই কঠিন সময়ে কমরেড বেলীকে চরম প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। স্থানীয় মুসলিম লীগ ও রাজাকার বাহিনীর হাতে তিনি দুইবার গ্রেফতার হন। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা ও আন্দোলনের গভীরতা এতটাই ছিল যে, ব্যাপক গণচাপের মুখে শোষকগোষ্ঠী তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে নিরাপত্তার খাতিরে এবং কৌশলগত কারণে তিনি আত্মগোপন করে ভারতে যান। তবে সেখানেও তিনি নিরাপদ ছিলেন না; ভারতীয় সম্প্রসারণবাদী শক্তি ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হলে তিনি পুনরায় নিজ দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন।
বাংলাদেশে ফিরে এসে তিনি পুনরায় সশস্ত্র সংগ্রাম সংগঠিত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালান। কিন্তু তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার শত্রুপক্ষ ছিল বহুমুখী। একদিকে মুসলিম লীগ ও রাজাকারের অবশিষ্টাংশ, অন্যদিকে তৎকালীন প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তিগুলো তাকে নিশ্চিহ্ন করতে একজোট হয়। কারণ, পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল) কেবল পাকবাহিনী ও রাজাকারদের বিরুদ্ধেই লড়েনি, বরং তারা একইসাথে তৎকালীন স্থানীয় শ্রেণিশত্রু এবং ভারতীয় লেজুড়বৃত্তি করা শক্তির বিরুদ্ধেও আপসহীন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিল।
১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি ছিল এই বিপ্লবী নেত্রীর জীবনের শেষ দিন। দেশে ফেরার পর যখন তিনি পুনরায় নতুন করে আত্মগোপনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হন। পথিমধ্যে আওয়ামী লীগ, মুসলিম লীগ ও রাজাকারদের এক অশুভ আঁতাতের মাধ্যমে তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এই লড়াকু বিপ্লবীর নিথর দেহটি তারা রাস্তার ওপর ফেলে রেখে যায়।
আজকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও কমরেড রাবেয়া আখতার বেলীর সেই অসমাপ্ত বিপ্লবের চেতনা সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদসহ সকল বৈশ্বিক আধিপত্যবাদী শক্তি এবং ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের নগ্ন হস্তক্ষেপমুক্ত একটি প্রকৃত ‘নয়াগণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম আজও থামেনি। শোষিত প্রলেতারিয়েত শ্রেণি, ভূমিহীন কৃষক এবং অবহেলিত নারী সমাজের পূর্ণাঙ্গ মুক্তির যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখন পরবর্তী প্রজন্মের কাঁধে।
কমরেড বেলী যে মাওবাদী মতাদর্শকে পাথেয় করে নিজের জীবনকে কৃষিবিপ্লবী সংগ্রামে বিলিয়ে দিয়েছিলেন, সেই আদর্শিক পথই শোষিত মানুষের মুক্তির দিশারি। তিনি বিশ্বাস করতেন, সংশোধনবাদ বা আপসকামী রাজনীতির মাধ্যমে নয়, বরং আমূল কৃষিবিপ্লব ও দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের পথেই জনগণের প্রকৃত সার্বভৌমত্ব অর্জিত হতে পারে। তার সুমহান আত্মত্যাগ আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের নিগড় থেকে মুক্তি পেতে হলে বৈপ্লবিক আদর্শে অবিচল থাকার কোনো বিকল্প নেই। শহীদ রাবেয়া আখতার বেলীর দেখানো সেই রক্তক্ষয়ী পথেই নিহিত রয়েছে মেহনতি মানুষের চূড়ান্ত বিজয়।
🔗 নকশালবাড়ি সংগ্রহশালা:
- 📖 আরও পড়ুন: নকশালবাড়ি আন্দোলনের সশস্ত্র সংগ্রামের সাংস্কৃতিক প্রভাব এবং আর কতকাল, বলো সইব কতকাল গানের বিশ্লেষণ 🎵
- 📖 আরও পড়ুন: আন্দোলনের আরেক অকুতোভয় লড়াকু সৈনিক কমরেড ভারতজ্যোতি রায়চৌধুরী ✊
- 🚩 আরও পড়ুন: নকশালবাড়ি অভ্যুত্থানের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস ও বিপ্লবীদের বীরত্বগাথা: নকশালবাড়ি অভ্যুত্থান।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚