ফেলে আসা শৈশব আমাদের—এ যেন এক অন্তহীন স্মৃতির ভাণ্ডার। যত খুলতে যাই, ততই নতুন নতুন গন্ধ বেরোয়—ভেজা মাটির গন্ধ, কাঁচা আমের টক গন্ধ, দুপুরবেলার পাকা রোদে শুকোতে দেওয়া বইয়ের পাতার গন্ধ। শৈশবের সেই মানুষগুলো আজ আর আসে না। কোথায় হারিয়ে গেল তারা? কোথায় হারিয়ে গেল সেই ছোটবেলা, যে ছোটবেলা বারবার পিছু ডাকে, নিঃশব্দে হাত ধরে টান দেয়?
আজ অফিসের ব্যস্ততা, কলেজের তাড়া, কিংবা প্রতিযোগিতার চাপে শিশুদের সময় যেন ক্যালেন্ডারের পাতায় বন্দি। অথচ খুব বেশি দিন আগেও পাড়ায় আসত হাওয়াই মিঠাইওয়ালা। ঘণ্টা বাজিয়ে তার আগমনী সুর শুনলেই মন ছুটে যেত। কয়েক পয়সায় পাওয়া যেত সেই রঙিন তুলোর মতো মিষ্টি, মুখে দিলেই গলে যেত। এখন আর সে আসে না। আজকের শিশুরা চায় দামি আইসক্রিম, শপিং মলের চকচকে খেলনা, কিংবা মোবাইলের পর্দায় ডুবে থাকা এক জগৎ। তাই হারিয়ে যাচ্ছে সেই ছোট ছোট ছোঁয়া, সেই অমূল্য সরলতা।
জীবনচক্রের কত স্তর—গর্ভাবস্থা, শৈশব, হামাগুড়ির বছর, বয়ঃসন্ধি, কৈশোর, যৌবন, মধ্যবয়স, প্রৌঢ়ত্ব—কোথা থেকে শুরু করব এই জীবনকাব্যের স্মৃতিচারণ? মনে হয় এই তো সেদিনের কথা। এখন বুঝার বয়সে এসে দাদু-দিদার মুখে নিজের ছোটবেলার গল্প শুনে লজ্জায় মুখ ঢাকি। মনে পড়ে, সন্ধ্যা হলেই দাদুর কেচ্ছার ঝুলি খুলে বসা। ঠাম্মার স্নেহভরা হাত মাথায় বুলিয়ে রাজা-রাণীর গল্প শোনানো। একদিন গল্প না শুনলে যেন ঘুমই আসত না।
শীতের সকালে ঘুম থেকে উঠে ঠাম্মার পিঠে তেল মালিশ করে রোদ পোহানো—কুয়াশা ভেজা উঠোনে সেই উষ্ণ রোদ যেন আজও গায়ে লাগে। ভাইবোনদের সাথে ঝগড়া, আবার একটু পরেই মিল হয়ে যাওয়া—অভিমানগুলোও ছিলো মিষ্টি। কখনও ঠাম্মাকে সুর করে রামায়ণ আর মহাভারত মহাকাব্য পাঠ করে শোনানো—ভুল করলেও তিনি হাসিমুখে শুধরে দিতেন। এসব মনে হলেই বুকের ভেতরটা কেমন নরম হয়ে আসে, এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া জেগে ওঠে।
মা আর ঠাম্মার সেই খোশগল্পের দৃশ্যটা এখনো চোখে ভাসে। বৃষ্টি হলেই রাতের বেলা মা আর ঠাম্মা আমাদের নিয়ে এক বিছানায় গল্প করতে করতে ঘুমাতেন। বাইরে টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ, ভেতরে গল্পের উষ্ণতা। এখন যখন চারদিকে বউ-শাশুড়ির অশান্তির গল্প শুনি, তখন আমার মা আর ঠাম্মার সেই মিষ্টি মধুর সম্পর্কটাকে ভীষণ মিস করি। তাদের সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বের মতো—স্নেহ, শ্রদ্ধা আর বোঝাপড়ার এক অপূর্ব মিলন।
ছোটবেলা থেকেই মা-বাবা শিখিয়েছেন—কিছু খাওয়ার সময় ভাগ করে খেতে হয়। আমাদের ভাইবোনদের জন্য একটা চকলেট এলেও সেটা ভেঙে ঠাম্মাকে একটু দিতাম। কারণ ঠাম্মা ছিলেন আমাদের বন্ধুর মতোই। তার সঙ্গে হাসি, গল্প, অভিমান—সবই ছিল সহজ আর আন্তরিক।
স্কুলজীবনের কথা মনে পড়লে আজও মুখে হাসি ফুটে ওঠে। জাতীয় সঙ্গীত আর পিটি করার সময় লুকিয়ে ফাঁকি দেওয়া, আর ধরা পড়ে গেলে টিচারের বকুনি খাওয়া—সেই ভয় মেশানো মজার মুহূর্তগুলো এখন মনে পড়লে খিলখিলিয়ে হাসি পায়। টিফিন টাইমে বাসায় গিয়ে খেয়ে আসলেও, স্কুলে বন্ধুদের সাথে বসে ৫ টাকা দিয়ে ঝালমুড়ি, বড়ই, বাদাম না খেলে যেন পেটের ভাত হজমই হতো না। টিফিনে স্কুল পালানো—সে তো এক অন্যরকম রোমাঞ্চ! ধরা পড়ার ভয়, তবু দৌড়ে পালানোর আনন্দ—সেই দুষ্টুমিগুলোই ছিল আসল মজা।
স্কুল ছুটির পর ঝড়-বৃষ্টিতে ছাতা উল্টে যাওয়া, সবাই মিলে কাকভেজা হয়ে বাড়ি ফেরা—সে দৃশ্য এখনো চোখে ভাসে। তখন বিরক্ত লাগলেও আজ মনে হয়, ওই ভেজা পথই ছিল আমাদের সবচেয়ে উজ্জ্বল স্মৃতি।
মনে পড়ে সেই কাঠি আইসক্রিমওয়ালাকে? গরম দুপুরে তার ডাক শুনলেই মন নেচে উঠত। কয়েক পয়সার বিনিময়ে পাওয়া যেত লাল-নীল বরফমিঠাই। আনন্দটা ছিল সহজ, সরল। বিকেলের মাঠে ফুটবল, কানামাছি, লুকোচুরি—মাঠে দৌড়াতে দৌড়াতে সূর্য ডুবে যেত। ঘুড়ি উড়াতে গিয়ে কাটাকুটিতে হেরে কান্না, বাড়ি ফিরে মায়ের বকুনি—তবু পরদিন আবার নতুন করে শুরু।
গরম দুপুরে মায়ের জোর করে ঘুম পাড়ানো, আর দূর থেকে ভেসে আসা বেহালার সুরে মন ছুটে যাওয়া—এসব স্মৃতি আজও স্পষ্ট। তখন বুঝিনি, এসব মুহূর্তই একদিন হয়ে উঠবে জীবনের সবচেয়ে দামী সম্পদ।
সবকিছু বদলাচ্ছে, সময় তার নিয়মেই এগিয়ে যাচ্ছে। তবু মনে হয়, শৈশব কোনো বয়স নয়—এ এক অনুভূতি। আমরা বড় হয়ে যাই, দায়িত্ব বাড়ে, ব্যস্ততা বাড়ে। কিন্তু ভেতরে কোথাও সেই ছোট্ট মানুষটা রয়ে যায়—যে বৃষ্টিতে ভিজতে ভালোবাসে, ফাঁকি দিয়ে পিটি করতে চায় না, বন্ধুদের সাথে ৫ টাকার ঝালমুড়িতে স্বর্গ খুঁজে পায়, আর ঠাম্মার পাশে বসে গল্প শুনতে শুনতে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে।
আরো পড়ুন
- সৌন্দর্যের আসল সংজ্ঞা কি?
- তেলেনাপোতা আবিষ্কার
- যে শৈশব আর ফিরে আসে না
- চণ্ডালের চণ্ডিপাঠ
- ঋত্বিক ঘটক-এর চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে বাংলার আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট
- নিঃস্বার্থ আনন্দপথের অভিযাত্রী: অর্চনা দত্ত
- স্মৃতি জুড়ে সীমান্তের বেদনা, স্বরূপে মোড়ানো নিজস্ব ঐতিহ্য
- আমার নানী বহুগুণে ভরপুর এমন ব্যক্তি যাকে বলে মরুর বুকে বৃক্ষের ছায়া
- আমার দাদী শাহেরা খাতুনের গ্রামীণ জীবন যাপনের এক ঝাঁক স্মৃতি
- কল্পনা ও শৌখিন কল্পনা সম্পর্কে স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজের বিশ্লেষণ

লেখক অনাবিলা অনা ২০০১ সালের ১৬ জুলাই বাংলাদেশের নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা থানার বড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার মাতা গীতাঞ্জলি সরকার এবং পিতা রঞ্জন কান্তি সরকার। শৈশব থেকেই সৃজনশীলতার প্রতি গভীর আগ্রহ তাকে সাহিত্য ও শিল্পচর্চার পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন ১৩ নং বড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরবর্তীতে বারহাট্টা সিকেপি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৭ সালে এসএসসি এবং নেত্রকোনা সরকারি কলেজে ২০১৯ সালে এইচএসসি এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ২০২৫ সালে স্নাতক (সম্মান) সম্পন্ন করে বর্তমানে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত। যুক্ত আছেন বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে। পঞ্চম শ্রেণি থেকেই তার লেখালেখি শুরু; কবিতার পাশাপাশি বই পর্যালোচনা ও ভাবনাধর্মী লেখা এখন তার প্রধান কার্যক্রম। ছবি আঁকা ও ‘Ana’Tivity’ ইউটিউব চ্যানেলে দ্বিমাত্রিক অ্যানিমেশন নির্মাণ তার সৃজনজগতের অংশ।