কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও সঙ্গীতজ্ঞ

কাজী নজরুল ইসলাম (ইংরেজি: Kazi Nazrul Islam; ২৪ মে ১৮৯৯ – ২৯ আগস্ট ১৯৭৬; ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ – ১২ ভাদ্র ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ) ছিলেন বিশ শতকের অন্যতম জনপ্রিয় আধুনিক বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও সঙ্গীতজ্ঞ। নজরুল বাংলা কবিতায় অগ্রগামী ভূমিকা রাখার পাশাপাশি প্রগতিশীল প্রণোদনার জন্য সর্বাধিক পরিচিত। তিনি বাংলা সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হিসেবে উল্লেখযোগ্য।

কাজী নজরুল ইসলাম: জীবনের জয়গান ও বিদ্রোহী সত্তা

প্রথম মহাযুদ্ধের অভিঘাতে মধ্যবিত্তের চিরাচরিত জীবনধারা যখন বিপর্যস্ত, তখন চারদিকে আশাবাদের পরিবর্তে এক চরম নৈরাশ্য দানা বাঁধে। সেই রুক্ষ বাস্তবতাকে মেনে নিতে না পেরে যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তকে গ্রাস করে দুঃখবাদ; বুদ্ধদেব বসু বা অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তরা আশ্রয় খোঁজেন হামসুন-লরেন্সীয় রক্তমাংসের প্রেমজ আবর্তে। কেউ কেউ আবার আত্মরক্ষার তাগিদে বেছে নেন বক্তব্যের দুর্বোধ্যতা, কেউবা পশ্চিমা এলিয়টিক ভঙ্গির নৈরাশ্যবাদে নিমজ্জিত হয়ে আসন্ন মহাপ্রলয়ের মুখে দাঁড়িয়ে মুক্তির বদলে মৃত্যুই কামনা করেন।

ঠিক সেই গুমোট ও হাহাকারের মাঝখানে কাজী নজরুল ইসলাম নিয়ে এলেন উজ্জ্বল প্রাণের দীপ্ত আশাবাদের এক প্রবল বন্যা। তাঁর এই প্রাণোচ্ছ্বল আগমনে উৎফুল্ল হয়ে মোহিতলাল মজুমদার সেদিন ‘মোসলেম ভারত’-এ লিখেছিলেন— “নূতন দিক হইতে হাওয়া বহিতে দেখিয়া গুমোটক্লিষ্ট প্রাণে বড়ই আরাম পাইয়াছি।”

নিরন্তর দুঃখ-দারিদ্র্যের সঙ্গে চরম সংগ্রাম করেও নজরুলের সাহিত্য সাধনা ছিল অবিরাম। ১৯২০ থেকে ১৯৪২ সাল—এই উত্তাল সময়খণ্ডে কলকাতা তথা সমগ্র বাংলা মুখরিত হয়েছিল তাঁর গান, অফুরান জীবনোচ্ছ্বাস আর স্বদেশী আন্দোলনের দুর্বার প্রাণের স্পন্দনে। রবীন্দ্রযুগের প্রদীপ্ত উপস্থিতিতেই তিনি নিজের স্বকীয়তায় হয়ে ওঠেন অনন্য এক মহীরুহ। এমনকি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছ থেকেও তিনি অর্জন করেন অসামান্য স্বীকৃতি ও স্নেহাশিস। একের পর এক কবিতা, গান ও প্রবন্ধ রচনা করে তিনি বাংলার সাহিত্য ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন, যা আজও আমাদের প্রেরণার উৎস।

নজরুল ইসলামের কবিতা

কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা মূলত অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে আপসহীন বিদ্রোহ, গভীর দেশপ্রেম এবং মানবতার জয়গানে মুখর। শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর এই বজ্রকণ্ঠের কারণেই তিনি বাংলা সাহিত্যে চির অম্লান ও ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত।

নজরুলের সৃষ্টিতে সাম্যবাদী চেতনার পাশাপাশি প্রাণের আবেগময় গভীরতা চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে। তাঁর এই বৈপ্লবিক সাহিত্যদর্শন বাংলা সাহিত্যে কেবল নতুনত্বের সঞ্চারই করেনি, বরং একটি অনন্য জাগরণ ও বিপ্লবের সূচনা করেছে।

নজরুল গীতি

নজরুল গীতি বা কাজী নজরুল ইসলামের সংগীত এক বিশাল ও বৈচিত্র্যময় ভাণ্ডার। তাঁর সৃষ্টিকর্মে দেশপ্রেম, বিরহ-মধুর প্রেম এবং ভক্তিগীতি থেকে শুরু করে রাগপ্রধান গানের এক অনন্য সংমিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়। উচ্চাঙ্গ সংগীতের রাগ-রাগিণীকে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সাধারণ মানুষের প্রাণের ভাষায় রূপান্তর করেছেন। শৈশবের লেটো দল থেকে শুরু করে মধ্যবয়সের সৃজনশীলতার চূড়া পর্যন্ত নজরুলের এই সংগীত প্রতিভা ছিল নিরবচ্ছিন্ন। তাঁর স্বল্পস্থায়ী সৃজনশীল জীবনে তিনি প্রায় ৩ হাজারেরও বেশি গান রচনা করেছেন, যা বিশ্বসংগীতের ইতিহাসে এক বিরল ও বিস্ময়কর কীর্তি।

👉 বিশেষ সংকলন: পড়ুন কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা, গান, প্রবন্ধ সম্পর্কে বিস্তারিত

বন্দী জীবনের সেই অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসেই তিনি রচনা করেন কালজয়ী গান ‘এই শিকল পরা ছল’। এছাড়া ‘ভাঙার গান’, ‘সেবক’ ও ‘মরণবরণ’-এর মতো অগ্নিগর্ভ গানগুলো গেয়ে তিনি অন্য বন্দীদের প্রাণে স্বাধীনতার আগুন জ্বালিয়ে দিতেন। শিকল পরেই শিকল ভাঙার সেই গান নজরুলের অদম্য সাহস ও নির্ভীকতার এক অনন্য দলিল হয়ে আছে।

জন্ম ও শৈশবে নজরুল

ব্রিটিশ ভারতের বাংলা প্রদেশের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মে, বাংলা ১৩০৬, ১১ জ্যৈষ্ঠ নজরুলের জন্ম। তাঁর পিতা কাজী ফকির আহমদ ছিলেন ধর্মপ্রাণ ও সত্যনিষ্ঠ বাক্তি। কিন্তু দারিদ্র্য ছিল তার নিত্যসঙ্গী। এই দরিদ্র পরিবারে জন্মে দুঃখ দরিদ্রের সঙ্গে সমাজের অসম ব্যবস্থার বাস্তব রূপটি প্রত্যক্ষ করবার সুযোগ ঘটেছিল নজরুলের বাল্যকাল থেকেই। এই সময়েই একটি বিদ্রোহী ভাব তার মনের গভীরে জন্মলাভ করেছিল এবং এই মনোভাব নিয়েই তিনি আজীবন সমস্ত অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, শোষণ, পীড়ন ও অব্যবস্থার বিরুদ্ধে সৈনিকের মত সংগ্রাম করে গেছেন।

শৈশবে মাতৃপিতৃহীন হওয়ায় বিদ্যাশিক্ষায় বাধা পান এবং দারিদ্র্যদীর্ণ জীবন শুরু করেন। দশ বছর বয়সে মক্তবে নিম্ন-প্রাথমিক পরীক্ষাত্তীর্ণ হন। বাংলা ভাষার সঙ্গে আরবী ও ফারসী এই সময়ই তিনি শিক্ষা করেন। পরে সেখানেই এক বছর পড়ান। বাল্যকালে নজরুল অত্যন্ত দুরন্ত প্রকৃতির ছিলেন। বাঁধাধরা নিয়মে থাকা ছিল তার স্বভাব-বিরুদ্ধ।

কর্মজীবনে কাজী নজরুল

পারিবারিক অনটন আর জীবনসংগ্রামের কঠিন বাস্তবতায় মাত্র এগারো বছর বয়সেই নজরুলকে নেমে পড়তে হয় জীবিকার সন্ধানে। এই অল্প বয়সেই তিনি লেটো দলে যোগ দিয়ে পালাগান ও কবিতা বাঁধতে শুরু করেন, যা তাঁর শিল্পীসত্তার প্রাথমিক উন্মেষ ঘটিয়েছিল। এরপর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ধরাবাঁধা জীবন থেকে মুক্তি পেতে তিনি পালিয়ে যান রানীগঞ্জে। সেখানে যাপন করেন এক যাযাবর ও সংগ্রামী জীবন। টিকে থাকার লড়াইয়ে আসানসোলের এক রুটির দোকানে মাত্র পাঁচ টাকা মাসিক বেতনে রুটি তৈরির কাজও করেছিলেন তিনি। কিশোর বয়সের এই অমানবিক পরিশ্রম ও দারিদ্র্যের কশাঘাতই পরবর্তীতে তাঁর সাহিত্যে গণমানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ ও সাম্যের সুর বয়ে এনেছিল।

আসানসোলের সেই রুটির দোকানে কাজ করার সময় নজরুলের জীবনের মোড় ঘুরে যায় জনৈক সহৃদয় দারোগার বদান্যতায়। তাঁরই সহায়তায় নজরুলের শিক্ষা জীবন পুনরায় প্রাণ ফিরে পায়। নজরুল যখন দশম শ্রেণীর ছাত্র, ঠিক তখনই বেজে ওঠে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা। শিয়ারশোল উচ্চ বিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র থাকাকালীন দেশপ্রেমের অদম্য টানে ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে (কিছু তথ্যমতে ১৯১৪-তে প্রস্তুতি ও ১৯১৭-তে যোগদান) তিনি ৪৯ নং বাঙালি পল্টনে সৈনিক হিসেবে যোগ দেন। ১৯১৭ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত করাচির সেনানিবাসে কাটানো তাঁর সেই যুদ্ধকালীন দিনগুলোই ছিল নজরুলের সাহিত্যিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। সৈনিক জীবনের সেই কঠোর শৃঙ্খলা, বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা এবং গভীর দেশপ্রেমই পরবর্তীতে তাঁর অমর কবিতা ও গানের মূল উৎস হয়ে দেখা দেয়।

পল্টনের সঙ্গে নজরুলের গন্তব্য নির্ধারিত হয় সুদূর করাচিতে। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর সৈনিক জীবন, যা সমান্তরালভাবে তাঁর কবিসত্তাকেও জাগিয়ে তোলে। করাচির সেই নিভৃত সেনানিবাসে বসেই তিনি পারস্যের মহাকবি হাফিজের অমর সৃষ্টি ‘দীওয়ান-ই-হাফেজ’-এর রুবাইগুলো বাংলায় অনুবাদ করতে শুরু করেন। এমনকি তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘রিক্তের বেদন’-এর গল্পগুলোও রচিত হয়েছিল আরব সাগরের সেই বিজন সৈকতে বসে। সেনানিবাসের কঠোর শৃঙ্খলার মাঝেও নজরুলের লেখনী থেকে অজস্র ধারায় ঝরে পড়তে থাকে গান, গল্প ও কবিতা। করাচি থেকে পাঠানো তাঁর সেই কালজয়ী সৃষ্টিগুলো তৎকালীন বাংলাদেশের (তথা অবিভক্ত বাংলার) নামী-দামী পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ে পাঠকমহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

করাচির সেনানিবাসে থাকাকালীন নজরুলের অধিকাংশ রচনার শেষেই লেখা থাকত ‘হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলাম’। এই পরিচয়েই সাহিত্য অঙ্গনে তাঁর প্রাথমিক পরিচিতি গড়ে ওঠে এবং সমসাময়িক পাঠকসমাজে তিনি ‘হাবিলদার কবি’ হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯১৯ সালে করাচি থেকেই তাঁর প্রথম গদ্য রচনা ‘বাউন্ডুলের আত্মকাহিনী’ তৎকালীন প্রভাবশালী ‘সওগাত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এই গল্পের নায়ক ও তাঁর জীবনদর্শনের মধ্যে নজরুলের আপন জীবনের ছায়াপাত লক্ষ্য করা যায়, যা তাঁর অনাগত কালজয়ী সাহিত্যিক যাত্রার এক বলিষ্ঠ সূচনা ছিল।

১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে (১৩২৬ বঙ্গাব্দ) ছাপার অক্ষরে নজরুলের সাহিত্যিক আত্মপ্রকাশ ঘটে এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণে। তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতার নাম ‘মুক্তি’, যা তৎকালীন প্রখ্যাত ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’-র শ্রাবণ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। এই একটি কবিতার মাধ্যমেই বাংলা কাব্যসাহিত্যে এক নতুন ও শক্তিশালী কণ্ঠস্বরের আগমনী বার্তা ঘোষিত হয়। একই বছর তৎকালীন অভিজাত ও রুচিশীল পত্রিকা ‘প্রবাসী’-র পৌষ সংখ্যায় পারস্যের মহাকবি হাফিজের একটি রুবাইয়াৎ-এর অনুবাদ প্রকাশিত হয়। নজরুলের এই অনুবাদ সাহিত্য কেবল তাঁর ভাষাগত দক্ষতাই নয়, বরং বিশ্বসাহিত্যের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগের প্রমাণ দেয়।

১৯১৯ সালে একই বছর ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’-য় প্রকাশিত হয় নজরুলের দুটি অসাধারণ ছোটগল্প— ‘ব্যথার দান’ ও ‘হেনা’। এই গল্পদুটি কেবল নিছক প্রেমের কাহিনী ছিল না, বরং এতে ফুটে উঠেছিল নজরুলের প্রগাঢ় দেশপ্রেম ও সুদূরপ্রসারী আন্তর্জাতিকতাবোধ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখা এই গল্পগুলোর মধ্য দিয়ে কবি তাঁর বিশ্বজনীন মানবিক চেতনা ও শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে এক নতুন রূপ দিয়েছিলেন।

১৯২০ খ্রিস্টাব্দের মার্চ-এপ্রিল নাগাদ ৪৯ নং বাঙালি পল্টন ভেঙে দেওয়া হলে নজরুল করাচি থেকে কলকাতায় ফিরে আসেন। এই প্রত্যাবর্তন তাঁর সাহিত্যিক জীবনে এক নতুন প্রাণের স্পন্দন ও বেগের সঞ্চার করে। ১৯২১ সালের ডিসেম্বরে (মতান্তরে জানুয়ারী ১৯২২) তাঁর কালজয়ী ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নজরুলের কবিখ্যাতি দাবানলের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার সেই বজ্রনির্ঘোষ দেশবাসীর হৃদয়ে এক অভূতপূর্ব উন্মাদনা সৃষ্টি করে এবং তিনি সর্বস্তরের মানুষের কাছে ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে স্বতঃস্ফূর্ত অভিনন্দন ও চিরস্থায়ী স্বীকৃতি লাভ করেন।

১৯২২ সালে নজরুলের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা এবং ‘মে ভুখা হুঁ’ শীর্ষক জ্বালাময়ী প্রবন্ধ প্রকাশের পর ব্রিটিশ রাজশক্তি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। ফলে ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ১৬ জানুয়ারি রাজদ্রোহের অভিযোগে নজরুলকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। কারাবাসকালেও নজরুলের বিদ্রোহী সত্তা দমিত হয়নি; জেল কর্তৃপক্ষের অমানবিক ও নির্মম আচরণের প্রতিবাদে তিনি হুগলি জেলে আমরণ অনশন শুরু করেন। 

নজরুলের অনশনের সংবাদ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র জনরোষ তৈরি হয়। সুদূর শিলং থেকে উদ্বিগ্ন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন— ‘Give up hunger strike, our literature claims you’ (অনশন ত্যাগ করো, আমাদের সাহিত্যের তোমাকে প্রয়োজন)। কিন্তু কুচক্রী জেল কর্তৃপক্ষ সেই গুরুত্বপূর্ণ তারবার্তা নজরুলের হাতে পৌঁছাতে দেয়নি। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং আবদুল্লাহ সোহরাওয়ার্দীর মতো বরেণ্য ব্যক্তিদের সব অনুরোধই বিফলে যাচ্ছিল। দীর্ঘ উনচল্লিশ দিন অমানবিক অনশনের পর প্রবল জনমত ও রবীন্দ্রনাথের মধ্যস্থতায় টনক নড়ে ব্রিটিশ সরকারের। বন্দিদের দাবি মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে দীর্ঘ ৪০ দিন পর নজরুল অনশন ভঙ্গ করেন।

কাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে। ওই বছরের ২৪ এপ্রিল (বৈশাখ, ১৩৩১ বঙ্গাব্দ) তিনি প্রমীলা সেনগুপ্তের সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। পারিবারিক এই স্থিতিশীলতার মাঝেই তাঁর রাজনৈতিক চেতনা আরও বিস্তৃত হতে থাকে। ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে ফরিদপুরে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনে মোহনদাস গান্ধীর সঙ্গে কবির প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে। সেই সম্মেলনে নজরুলের কণ্ঠে দেশাত্মবোধক ‘চরকার গান’ শুনে গান্ধী এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি কবির অসামান্য সৃজনশীলতার ভূয়সী প্রশংসা করেন।

১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় যখন ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়, কবি তখন কৃষ্ণনগরে অবস্থান করছিলেন। মানবতার এই সংকটে ব্যথিত হৃদয়ে তিনি রচনা করেন তাঁর কালজয়ী গান ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’। কৃষ্ণনগরে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনে এই গানটি গেয়ে তিনি দেশবাসীকে জাগিয়ে তোলেন। একই সময়ে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্বরাজ পার্টির সম্মেলনে কবি কৃষিজীবী মানুষের অধিকার ও সংহতির ডাক দিয়ে গেয়ে ওঠেন— ‘ওঠরে চাষী জগৎবাসী ধর কসে লাঙল’

বিংশ শতাব্দীর এক যুগসন্ধিক্ষণে, যেখানে অসম্ভবের সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছিল, সেখানেই মহাবিস্ফোরণের মতো আবির্ভাব ঘটে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের। কবিতা, গান ও প্রবন্ধের নিপুণ বুনন ছাড়িয়ে তিনি নিজের উদার জীবনচর্চা, অকুতোভয় মানসিকতা এবং ন্যায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এক অনন্য সংগ্রামের প্রতীকরূপে জাতির হৃদয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর এই অসামান্য সাহিত্যকীর্তি ও দেশপ্রেমের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘জগত্তারিণী’ স্বর্ণপদক দিয়ে সম্মানিত করে। পরবর্তীকালে, ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মভূষণ’ উপাধিতে ভূষিত করে।

বাংলা সবাক চলচ্চিত্রের সূচনা লগ্ন থেকেই কাজী নজরুল ইসলাম এই শিল্পের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত হন। তিনি কেবল সংগীত রচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং তাঁর সৃজনশীল সত্তা চলচ্চিত্রের কাহিনী ও চিত্রনাট্য নির্মাণেও ছড়িয়ে পড়েছিল। ‘ধ্রুব’, ‘বিদ্যাপতি’ এবং ‘সাপুড়ে’-র মতো কালজয়ী চলচ্চিত্রগুলোর সংগীত পরিচালনার পাশাপাশি এগুলোর মূল কাহিনীও তিনি রচনা করেছিলেন। চলচ্চিত্রের এই নতুন মাধ্যমে নজরুলের পদচারণা বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক সোনালী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

বিদ্রোহী কবির নীরব প্রস্থান ও শেষ বিদায়

১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে কবির ব্যক্তিগত জীবনে নেমে আসে চরম বিপর্যয়; তাঁর জীবনসঙ্গিনী প্রমীলা নজরুল পক্ষাঘাতে পঙ্গু হয়ে যান। এর কয়েক বছর পর, ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে কবি নিজেও পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে স্মৃতিশক্তি ও বাকশক্তি হারিয়ে পুরোপুরি নির্বাক হয়ে পড়েন। ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে উন্নত চিকিৎসার জন্য সস্ত্রীক কবিকে ইউরোপে (লন্ডন ও ভিয়েনা) পাঠানো হলেও তাঁর অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি।

১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে শেখ মুজিবর রহমান কবিকে বাংলাদেশে নিয়ে গিয়েও চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য যে নীরব কবি আর স্বর ফিরে পাননি। বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে শহীদ দিবসে নজরুলকে একুশে পদক দিয়ে সম্মানিত করেন। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের ২৯ আগস্ট চিরবিদ্রোহী নজরুল ঢাকাতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সেখানেই রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে কবরস্থ করা হয়।

পরিশেষে বলা যায়, নিরন্তর দুঃখ-দারিদ্র্য আর প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে নজরুল ছিলেন এক অপরাজেয় কলমযোদ্ধা। ১৯২০ থেকে ১৯৪২ সালের সেই গুমোট ও নৈরাশ্যময় সময়ে তিনি কেবল এক নতুন ধারার সাহিত্যই সৃষ্টি করেননি, বরং বাঙালিকে শিখিয়েছেন মাথা উঁচু করে বাঁচার মন্ত্র। রবীন্দ্রযুগের প্রদীপ্ত উপস্থিতিতেও আপন মহিমায় ভাস্বর এই কবি তাঁর কালজয়ী কবিতা, গান ও প্রবন্ধের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য ভাণ্ডারকে যে ঐশ্বর্য দান করেছেন, তা আজও আমাদের জাতীয় জীবনে অন্তহীন প্রেরণার উৎস হয়ে আছে।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র

১. দোলন প্রভা, ৪ ডিসেম্বর ২০১৮, “কাজী নজরুল ইসলাম আধুনিক বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় কবি”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/biography/kazi-nazrul-islam/
২. আজহার উদ্দীন খান, মাহবুবুল আলম সম্পাদিত, সমালোচনা সংগ্রহ, খান ব্রাদার্স এ্যান্ড কোম্পানি, ঢাকা, সেপ্টেম্বর ২০০১, পৃষ্ঠা ৯৯০।
৩. সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত আধুনিক বাংলা গান, প্যাপিরাস, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১ বৈশাখ ১৩৯৪, পৃষ্ঠা, ১৬৭-১৬৮।
৪. যাহেদ করিম সম্পাদিত নির্বাচিত জীবনী ১ম খণ্ড, নিউ এজ পাবলিকেশন্স, ঢাকা; ২য় প্রকাশ আগস্ট ২০১০, পৃষ্ঠা ৪০-৪৩।

Leave a Comment

error: Content is protected !!