আমার আঁধার ঘরের প্রদীপ যদি নাইবা জ্বলে—হীরেন বসুর লেখনীতে এটি আধুনিক বাংলা গানের এক অনন্য সৃষ্টি। মাত্র নয় চরণের এই সংক্ষিপ্ত অথচ ভাবগম্ভীর গানটি মূলত একটি গভীর বিরহ ও প্রেমের নিবেদন। গানটিতে সুরের মূর্ছনা দিয়েছেন প্রখ্যাত সুরকার রবীন চট্টোপাধ্যায় এবং প্রথমবার এটি রেকর্ড করার গৌরব অর্জন করেন কালজয়ী শিল্পী রবীন মজুমদার। পরবর্তী সময়ে গানটির চিরন্তন আবেদনের কারণে প্রথিতযশা শিল্পী অভিজিৎ ভট্টাচার্য সহ আরও অনেক আধুনিক কণ্ঠশিল্পী এটি নতুনভাবে পরিবেশন করেছেন।
আমার আঁধার ঘরের প্রদীপ যদি নাইবা জ্বলে গানটি হীরেন বসুর এক অসাধারণ রোমান্টিক গীতিকবিতা। আধুনিক বাংলা প্রেমের গানের আদি পর্বের সকল সুষমা ও বৈশিষ্ট্য এই সৃষ্টিতে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে। বিরহ-বিহ্বলতা, প্রকৃতির অনুষঙ্গ, মায়াবী সুরেলা আবেশ এবং প্রিয়তমার চরণে নিঃশর্ত সমর্পণ—সব মিলিয়ে গানটি রোমান্টিকতার এক চূড়ান্ত রূপ ধারণ করেছে। যদিও এই রচনায় কিছু চিরাচরিত বা প্রথাগত উপমা ব্যবহার করা হয়েছে, তবুও হীরেন বসুর শব্দের কারুকার্য আর সুরের জাদুতে তা এক অনন্য এবং নতুনত্বপূর্ণ মাত্রায় শ্রোতাদের হৃদয়ে দোলা দেয়।
আমার আঁধার ঘরের প্রদীপ যদি নাইবা জ্বলে গানের কথা
আমার আঁধার ঘরের প্রদীপ যদি নাইবা জ্বলে
কণ্ঠ-মালার বকুল যদি যায় গো দ’লে—
ওগো প্রিয়! জাগবো বাসর শূন্য শয্যা পাতি—আমার বিফল রাতি!
বন্ধ হবে সেদিন গানের খেয়া চুকবে সেদিন সকল নেওয়া-দেওয়া
পথের পাশে ঝরবে শেফালিকা দীর্ঘশ্বাসে মাতি—
ওগো প্রিয়! জাগবো বাসর শূন্য শয্যা পাতি—আমার বিফল রাতি!
তোমার পায়ের চিহ্ন স্মরি হৃদয় তলে রাখব ধরি
মরণ যেদিন আসবে ঘিরে নিভবে যখন বাতি
ওগো প্রিয়! জাগবো বাসর শূন্য শয্যা পাতি—আমার বিফল রাতি!
হীরেন বসুর লেখা এই গানটি ইউটিউবে শুনুন
গানটির কাব্যিক বিশ্লেষণ
বিরহের হাহাকার ও জীবনের শূন্যতা
“আমার আঁধার ঘরের প্রদীপ যদি নাইবা জ্বলে”—এই গানটি মূলত গভীর বিরহ এবং একান্ত সমর্পণের এক করুণ আখ্যান। প্রথম স্তবকে কবি প্রিয়তমার অনুপস্থিতিতে নিজের জীবনের চরম শূন্যতাকে নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। আঁধার ঘরে প্রদীপের অনুপস্থিতি কিংবা কণ্ঠের বকুল মালা দলিত হওয়ার রূপকটি মূলত ব্যর্থ প্রেম ও অপ্রাপ্তির দীর্ঘশ্বাস। বাসর যখন শূন্য থাকে এবং প্রতীক্ষার রজনী বিফল হয়ে যায়, তখন সেখানে জাগতিক কোনো গান বা লৌকিকতা অবান্তর হয়ে পড়ে। ঝরে পড়া শেফালি ফুলের বিষাদে যে হাহাকার ফুটে ওঠে, তা আসলে কবির হৃদয়েরই এক নিভৃত ও নিঃশব্দ ক্রন্দন।
ধ্যানের স্তরে বিরহ ও স্মৃতিচারণ
দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে এই পার্থিব বিফলতাকে ছাপিয়ে এক মৃত্যুহীন স্মৃতির আর্তি ফুটে উঠেছে। বাহ্যিক জগত থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে কবি প্রিয়তমের রেখে যাওয়া পদচিহ্নকেই হৃদয়ের মণিকোঠায় সারাজীবনের পরম সম্পদ হিসেবে আগলে রাখতে চান। জীবনের শেষ প্রদীপটি যখন নিভে আসবে এবং মৃত্যু শিয়রে এসে দাঁড়াবে, তখনও সেই শূন্য বাসরশয্যায় প্রিয়র স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে থাকার সংকল্প এক অবিচল নিষ্ঠাকেই প্রকাশ করে। এখানে বিরহ কেবল বেদনা নয়, বরং প্রিয়র অভাবকে এক অনন্য ধ্যানের স্তরে উন্নীত করার এক মহান আধ্যাত্মিক প্রচেষ্টা।
আরো পড়ুন
- আজি শঙ্খে শঙ্খে মঙ্গল গাও: হীরেন বসুর গানের লিরিক্স ও আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণ
- হীরেন বসু: বাংলা চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক প্রথার জনক ও এক বহুমুখী প্রতিভার জীবনগাথা
- শেফালী তোমার আঁচলখানি: গানের লিরিক্স ও শারদীয় কাব্যিক বিশ্লেষণ
- আমার আঁধার ঘরের প্রদীপ যদি নাইবা জ্বলে: গানের লিরিক্স ও বিরহের কাব্যিক বিশ্লেষণ
তথ্যসূত্র ও টিকা
১. গানের কথা সুধীর চক্রবর্তী সংকলিত ও সম্পাদিত আধুনিক বাংলা গান, প্যাপিরাস কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১ বৈশাখ ১৩৯৪, পৃষ্ঠা ৯৬-৯৭ থেকে নেয়া হয়েছে। এছাড়াও শিশির চক্রবর্তী সংকলিত, পাঁচদশকের আধুনিক বাংলা গানের গীতবিতান এ শুধু গানের দিন, পত্রভারতী কলকাতা, দ্বিতীয় মুদ্রণ ডিসেম্বর ২০১৮, পৃষ্ঠা-২৮১-তে গানটি মুদ্রিত আছে। ফুলকিবাজ.কম গানটি প্রকাশ করতে পেরে আনন্দিত।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚
‘জাগবো বাসর’ হবে