প্রেমেন্দ্র মিত্রের গান আধুনিক বাংলা গানের ধারায় রচিত

প্রেমেন্দ্র মিত্রের গান আধুনিক বাংলা গানের ধারায় রচিত প্রায় দেড় শতাধিক গানের সমাহার। কবি ও কথাসাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্রের বহুমুখী প্রতিভার আরেকটি চমকপ্রদ দিক ছিল তাঁর গান রচনা। তাঁর গানগুলোকে আধুনিক বাংলা গান হিসেবে সহজেই শ্রেণিকরণ করা যায়। তাঁর গানেও প্রেম, বিরহ, রোমান্টিকতার অনুভব এবং স্বাভাবিকভাবেই চাঁদ ফুল তারা পাখি ইত্যাদি শব্দের প্রভাব দেখা যায়।

প্রেমেন্দ্র মিত্র তাঁর দীর্ঘ জীবনে অন্তত দেড়শত গান লিখেছেন বলে জানা যায়, যার মধ্যে অনেক গানই পরবর্তীকালে যথাযথভাবে সংগৃহীত বা গ্রন্থভুক্ত হয়নি। মজার বিষয় হলো, প্রেমেন্দ্র মিত্র নিজে গান গাইতে পারতেন না, তবে শৈশবে তিনি বেশ কিছুদিন এসরাজ চর্চা করেছিলেন। তাঁর সেই সহজাত সুরবোধ ও সঙ্গীতজ্ঞানই পরবর্তী জীবনে সার্থক গান রচনায় প্রধান সহায়ক হয়ে উঠেছিল।

প্রেমেন্দ্র মিত্রের গান রচনার নেপথ্যে কোনো প্রবল অন্তর্গত প্রেরণা ছিল না; মূলত চলচ্চিত্রের বাণিজ্যিক প্রয়োজনেই তিনি গীত রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। তবে চিত্রনাট্যের বাধ্যবাধকতা ছাপিয়ে তাঁর সহজাত কবিত্বশক্তি ও প্রকাশের অভিনবত্বে চল্লিশের দশকের গানগুলো শ্রোতামহলকে দারুণভাবে আপ্লুত করেছিল। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ ১৯৩৯ সালের ‘রিক্তা’ চলচ্চিত্রটি, যেখানে সংগীত পরিচালক ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের জাদুকরী সুরে এবং রমলা দেবীর কণ্ঠে ‘আরও একটু সরে বসতে পারো’ এবং ‘চাঁদ যদি নাহি উঠে’ গান দুটি বিপুল জনপ্রিয়তা পায়।[২]

রিক্তা চলচ্চিত্রের গান

রিক্তা চলচ্চিত্রের অন্তত তিনটি গান লিখেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। এই সিনেমার আরও একটু সরে বসতে পারো, আরও একটু কাছে মূলত ভালোবাসার মানুষের প্রতি এক ধরনের মিষ্টি আবদার বা মান-অভিমানের গল্পকে ফুটিয়ে তোলে। গানের কথাগুলোতে প্রিয়জনের আরও কাছে আসার আকুতি প্রকাশ পেয়েছে। সাধারণ কথাবার্তার ঢঙে লেখা এই গানে নাগরিক জীবনের প্রেম এবং তার সহজ বহিঃপ্রকাশ ফুটে উঠেছে।

থামো বন্ধু, দাঁড়াও ক্ষণেক থামি গানটিও আবেগী অনুভূতি প্রকাশের জন্য লেখা হয়। এই গানটিও রিক্তা চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত হয়। এই গানেও প্রেম এবং বিদায়ের এক করুণ সুর ফুটে উঠেছে। এখানে কবি বন্ধুকে বলছেন—একটু থামো, একটু দাঁড়াও। সব সময় জয়ের নেশায় ছুটলে অনেক স্বপ্ন হারিয়ে যাচ্ছে।

একই চলচ্চিত্রে তাঁরই লেখা আরেকটি গান ছিল চাঁদ যদি নাহি ওঠে, না উঠুক ক্ষতি নেই। এই গানটিতেও প্রেম মিলন ও বিরহ একই সাথে খেলা করে। গানটির কথা নিচে দেয়া হলো।

চাঁদ যদি নাহি উঠে, না উঠুক ক্ষতি নেই, এই বেশ ভালো।
আহত নগর দূরে গরজায়, আঁধার ঘিরেছে জমকালো।।
আমি যেন ঢেউ যেন তুমি তীর, উতরোল টলমল অস্থির,
ভেঙ্গে পড়ি বার বার দুরাশায়, খোঁজা তবু এখনো না ফুরালো।।
তীর আর সাগরের লীলা এই, বিচ্ছেদ মিশে আছে মিলনেই।
চাঁদ উঠে আজ আর কাজ নাই রাঙা বেদনার আজ রোশনাই
যে দাহনে দিগন্ত দীপ্ত, জ্বালা তার নাই আর জুড়ালো।।[১]

যোগাযোগ চলচ্চিত্রের গান

যোগাযোগ চলচ্চিত্রের অন্তত তিনটি গান লিখেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। এই চলচ্চিত্রের জন্য লেখা হয় নাবিক আমার নোঙর ফেলো, ওই তো তোমার তীর গানটি। এই গানের পংক্তিগুলোতে মানুষের জীবনকে একটি দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার সাথে তুলনা করা হয়েছে। যেখানে ‘নাবিক’ বা ‘সাগর-মুসাফির’ হলো খোদ মানুষের আত্মা। দীর্ঘকাল অজানার পথে ভ্রমণ শেষে এবার তীরে ফেরার অর্থাৎ শান্তির নীড় খোঁজার সময় এসেছে।

যোগাযোগ চলচ্চিত্রের অন্য আরেকটি গান এই জীবনের যত মধুর ভুলগুলি,—। গানটি জীবনের ছোট ছোট ভুলগুলিকে উপেক্ষা করে উদ্দাম ও উচ্ছ্বলতায় ভেসে যাবার আহ্বান জানয়।

একই চলচ্চিত্রের তৃতীয় গানটি হচ্ছে যদি ভালো না লাগে তো দিও না মন, শুধু দূরে যেতে কেন বলো এমন গানটি। এই গানের পঙক্তিগুলো গভীর বিরহ, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এবং অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষার এক অনন্য প্রকাশ। এই গানে মিনতি করা হয়, প্রেমিক যদি ভালবাসতে নাও পারে, সে যেন অন্তত চোখের সামনে থেকে দূরে সরে যাওয়ার কথা না বলে।

অন্যান্য গান

প্রেমেন্দ্র মিত্র যে শদেড়েক গান লিখেছিলেন তার সবগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা সম্ভব নয়, কারণ গানগুলো কোথাও সংকলিত হয়নি। তার একটি গান হারা-মরু নদী, শ্রান্ত দিনের পাখি গেয়েছিলেন ফিরোজা বেগম। এই গানটি মূলত সমাজের অবহেলিত, নিগৃহীত এবং নিঃস্ব মানুষের প্রতি গভীর সমবেদনা ও মানবিকতার এক অনন্য দলিল। আমরা এখানে মোট সাতটি গান নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছি।

উপসংহার

প্রেমেন্দ্র মিত্রের কাছে গান লেখা ছিল অনেকটা খেয়ালি খেলার মতো; তাই এই ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য ও জননন্দিত হওয়া সত্ত্বেও পরবর্তীতে তিনি এর প্রতি আর তেমন আগ্রহ বোধ করেননি। পরবর্তীকালে গান লেখায় অনীহার কারণ হিসেবে তিনি জানিয়েছিলেন, সুরকার ও শিল্পীদের পেছনে ছুটে বেড়ানোর ঝক্কি সামলানো তাঁর স্বভাবে ছিল না। অথচ তাঁর এই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গানগুলো যথাযথভাবে সংকলিত হলে বাংলা গানে একটি নতুন ঘরানার সন্ধান পাওয়া সম্ভব ছিল, যা একাধারে স্বাদুগুণসম্পন্ন, চমৎকার পাঠযোগ্য এবং গভীর কাব্যগুণে সমৃদ্ধ।[২]

আরো পড়ুন

যদি ভালো না লাগে তো গানটি কানন দেবীর কণ্ঠে গানটি শুনুন ইউটিউব থেকে

তথ্যসূত্র

১. অরুণ সেন ও গোপালকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সংকলিত, চার দশকের বাংলা গান, প্রকাশ ভারতী কলকাতা, মে ১৯৬০, পৃষ্ঠা-৫-৭।
২. সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত আধুনিক বাংলা গান, প্যাপিরাস, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১ বৈশাখ ১৩৯৪, পৃষ্ঠা, ১৭৪-১৭৫।

Leave a Comment

error: Content is protected !!