‘তব মুখখানি খুঁজিয়া ফিরি গো সকল ফুলের মুখে, ফুল ঝরে যায় তব স্মৃতি জাগে’—এটি বাংলা আধুনিক গানের স্বর্ণযুগের এক অমর সৃষ্টি। ১৯৪১ সালে প্রথম রেকর্ড হওয়া এই কালজয়ী গানটিতে সুরারোপ করেন এবং কণ্ঠ দেন কিংবদন্তি শিল্পী কমল দাশগুপ্ত। ১৪ লাইনের এই বিরহী প্রেমের গানটি দাদরা তালে নিবদ্ধ, যা আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। পরবর্তীতে শুক্লা পাল সেতু, নাসিমা শাহীন এবং অরুণ চৌধুরীসহ আরও অনেক প্রথিতযশা শিল্পী গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন। সময়ের ব্যবধানেও এর কাব্যিক আবেদন বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি; বরং আজও তা সঙ্গীতপ্রেমী শ্রোতাদের হৃদয়ে মুগ্ধতা ছড়িয়ে যাচ্ছে।
গানের বিশ্লেষণ
গানটির রচয়িতা নিয়ে কিছুটা ভিন্নমত প্রচলিত রয়েছে। বিশিষ্ট সংগীত গবেষক সুধীর চক্রবর্তী তাঁর ‘আধুনিক বাংলা গান’ গ্রন্থে একে প্রণব রায়ের রচনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে, বাংলা উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, ১৯৫২ সালের মে মাসে প্রকাশিত কাজী নজরুল ইসলামের ‘বুলবুল’ (দ্বিতীয় খণ্ড) কাব্যে গানটি অন্তর্ভুক্ত করেন প্রমিলা রায়।
মূলত প্রেমিকার প্রশস্তি ও গভীর রূপকধর্মী এই গীতি-কবিতাটিতে আধুনিক বাংলা প্রেমের গানের চিরচেনা সব বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে। গানটির পরতে পরতে লুকিয়ে আছে প্রকৃতির সঙ্গে প্রিয়তমার রূপের এক অপূর্ব তুলনা। তবে কেবল স্তুতি নয়, মিলনের তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে ছাপিয়ে এখানে বিরহের যে গূঢ় ও শাশ্বত বেদনা চিত্রিত হয়েছে, তা গানটিকে সাধারণ প্রেমের সীমানা ছাড়িয়ে এক অনন্য কাব্যিক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ঝরে যাওয়া ফুলের স্মৃতি আর অধরা প্রিয়তমার মুখচ্ছবি খোঁজার এই আকুলতা গানটিকে কেবল একটি সংগীত হিসেবে নয়, বরং বিরহী হৃদয়ের এক অমর কাব্যে পরিণত করেছে। আধুনিক বাংলা গানের ইতিহাসে এর আবেদন তাই আজও অম্লান ও চিরভাস্বর।
গানের কথা
তব মুখখানি খুঁজিয়া ফিরি গো
সকল ফুলের মুখে,
ফুল ঝরে যায় তব স্মৃতি জাগে
কাটার মতন বুকে।।
তব প্রিয়নাম ধ’রে ডাকি
ফুল সাড়া দেয় মেলি আঁখি,
তোমার নয়ন ফুটিল না হায়,
ফুলের মতন সুখে।।
তোমার বিরহে আমার ভুবনে ওঠে রোদনের বাণী,
কানাকানি করে চাঁদ ও তারায় জানি গো তাহারে জানি।
খুঁজি বিজলী প্রদীপ জ্বেলে
কাঁদি ঝঙ্কার পাখা মেলে
অন্ধ আকাশে আঁধার মেঘের
ঢেউ ওঠে মোর বুকে।।
আরো পড়ুন
- কতদিন দেখিনি তোমায়: প্রণব রায় রচিত বিচ্ছেদ ও নিঃসঙ্গতার এক কাব্যিক আখ্যান
- মায়ের মমতা ও প্রকৃতির মেলবন্ধন: ‘মধুর আমার মায়ের হাসি’ গানের কাব্যিক বিশ্লেষণ
- নাইবা ঘুমালে প্রিয় রজনী এখনো বাকি: কালজয়ী এই গানের পেছনের গল্প ও লিরিক্স
- তব মুখখানি খুঁজিয়া ফিরি গো সকল ফুলের মুখে: গানটির ইতিহাস ও অজানা তথ্য
- জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা: বিরহ ও না পাওয়ার এক কালজয়ী গান
- বলেছিলে তুমি তীর্থে আসিবে আমার তনুর তীরে: গানটির সঠিক গীতিকার ও ভাবার্থ
- কেন এ হৃদয় নিজেরে লুকাতে চায়: এক অন্তর্মুখী প্রেমের কাব্যিক ব্যবচ্ছেদ
- বাস্তববাদী গান হচ্ছে বিশিষ্ট সঙ্গীত ধারা, যা উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে উদ্ভূত হয়েছে
- প্রেমের গান ভালোবাসা, প্রেমে পড়ার আনন্দ ও বিচ্ছেদের হাহাকার নিয়ে রচিত হয়
- রাখালিয়া সুর আনে মৃদু সমীরণ আনন্দ মুখোপাধ্যায়ের লেখা একটি আধুনিক বাংলা গান
- বনে বনে বসন্ত আসে বকুলের গান যায় ছড়িয়ে শিরশিরে ফাল্গুনী হাওয়া
- যদি ভালো না লাগে তো দিও না মন, শুধু দূরে যেতে কেন বলো এমন
- যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই কেন মনে রাখ তারে
- মন-ময়ূরী ছড়ালো পেখম তারি হচ্ছে সলিল চৌধুরীর আধুনিক বাংলা প্রেমের গান
- নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল
- শেফালী তোমার আঁচলখানি বিছাও শারদ প্রাতে, চরণে চরণে তোলো রিনিঝিনি
- আমার আঁধার ঘরের প্রদীপ যদি নাইবা জ্বলে, কণ্ঠ-মালার বকুল যদি যায় গো দ’লে
গানটি সাম্প্রতিককালে গাওয়া অরুণ চৌধুরীর কণ্ঠে শুনুন
তথ্যসূত্র ও নোট
১. লেখাটি ৩ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো। গানের কথা সুধীর চক্রবর্তী সংকলিত ও সম্পাদিত আধুনিক বাংলা গান, প্যাপিরাস কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১ বৈশাখ ১৩৯৪, পৃষ্ঠা ১৩১-১৩২ থেকে নেয়া হয়েছে।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।