“বলেছিলে তুমি তীর্থে আসিবে আমার তনুর তীরে”—প্রণব রায়ের লেখা এই আধুনিক বাংলা গানটি বিরহ আর আকুলতার এক অনন্য দলিল। ১০ লাইনের এই মাঝারি দৈর্ঘ্যের গানটি মূলত প্রেমের এক গভীর প্রশস্তি। নিজের অস্তিত্বকে ভালোবাসার মানুষের কাছে সম্পূর্ণ সমর্পণ করার যে আর্তি এখানে ফুটে উঠেছে, তা সত্যিই হৃদয়স্পর্শী। গানটির আদি সুরকার ছিলেন কমল দাশগুপ্ত। কণ্ঠশিল্পী ছিলেন জগন্ময় মিত্র, পরবর্তীতে ফিরোজা বেগমসহ আরও অনেক প্রথিতযশা শিল্পী এটি নতুন করে গেয়েছেন। আজও গানটি তার কাব্যিক আবেদনে শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রাখে।
গানের বিশ্লেষণ
সুধীর চক্রবর্তী তাঁর আধুনিক বাংলা গান গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে গানটি প্রণব রায়ের রচিত। তবে মে ১৯৫২ সালে প্রকাশিত কাজী নজরুল ইসলামের বুলবুল দ্বিতীয় খণ্ডে গানটি প্রমিলা রায় অন্তর্ভুক্ত করেন বলে বাংলা উইকিপিডিয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে। এই গীতি-কবিতাটি মূলত বিচ্ছেদের করুণ সুরকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। এখানে ‘তনুর তীর’ বা শরীরকে একটি পবিত্র স্থানের সাথে তুলনা করা হয়েছে, যেখানে প্রিয়তমের আসার কথা ছিল।
১. প্রতিশ্রুতি ও বিষাদ: গানের শুরুতে যে ‘আশার সূর্য’ ডুবে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে, তা প্রিয়তমের না আসার চরম হতাশাকে ফুটিয়ে তোলে।
২. মৃত্যুঞ্জয়ী প্রেম: “শুধু সেই তব কথার লাগিয়া হয়তো আসিব ফিরে”— এই চরণে গীতিকার বোঝাতে চেয়েছেন যে, ভালোবাসার মানুষের দেওয়া একটি কথা বা প্রতিশ্রুতি মৃত্যুকেও জয় করতে পারে। মানুষের দেহ লীন হয়ে গেলেও সেই আকাঙ্ক্ষা বা আত্মার টান অমর থেকে যায়।
৩. বিরহ-বীণ: পথ চেয়ে থেকে নাম জপ করা এবং বিরহের সুর বাজানো—এটি কেবল বিচ্ছেদ নয়, বরং এক ধরণের সাধনা।
গানের কথা
বলেছিলে তুমি তীর্থে আসিবে আমার তনুর তীরে।
তুমি আসিলে না, আশার সূর্য ডুবিল সাগর-নীরে।।
চলে যাই যদি, চিরদিন মনে
তোমার সে-কথা রহিবে স্মরণে,
শুধু সেই তব কথার লাগিয়া হয়তো আসিব ফিরে।।
শুধু সেই আশে হয়তো এ তনু মরণে হবে না লীন
পথ চেয়ে চেয়ে, তব নাম গেয়ে বাজাব বিরহ-বীণ।
হেরো গো, আমার যাবার সময় হ’ল
তোমার সে-কথা মিথ্যা হবে না বলো,
কোন শুভক্ষণে নিমেষের তরে জড়াবে কন্ঠ ঘিরে।।
আরো পড়ুন
- কতদিন দেখিনি তোমায়: প্রণব রায় রচিত বিচ্ছেদ ও নিঃসঙ্গতার এক কাব্যিক আখ্যান
- মায়ের মমতা ও প্রকৃতির মেলবন্ধন: ‘মধুর আমার মায়ের হাসি’ গানের কাব্যিক বিশ্লেষণ
- নাইবা ঘুমালে প্রিয় রজনী এখনো বাকি: কালজয়ী এই গানের পেছনের গল্প ও লিরিক্স
- তব মুখখানি খুঁজিয়া ফিরি গো সকল ফুলের মুখে: গানটির ইতিহাস ও অজানা তথ্য
- জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা: বিরহ ও না পাওয়ার এক কালজয়ী গান
- বলেছিলে তুমি তীর্থে আসিবে আমার তনুর তীরে: গানটির সঠিক গীতিকার ও ভাবার্থ
- কেন এ হৃদয় নিজেরে লুকাতে চায়: এক অন্তর্মুখী প্রেমের কাব্যিক ব্যবচ্ছেদ
- বাস্তববাদী গান হচ্ছে বিশিষ্ট সঙ্গীত ধারা, যা উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে উদ্ভূত হয়েছে
- প্রেমের গান ভালোবাসা, প্রেমে পড়ার আনন্দ ও বিচ্ছেদের হাহাকার নিয়ে রচিত হয়
- রাখালিয়া সুর আনে মৃদু সমীরণ আনন্দ মুখোপাধ্যায়ের লেখা একটি আধুনিক বাংলা গান
- বনে বনে বসন্ত আসে বকুলের গান যায় ছড়িয়ে শিরশিরে ফাল্গুনী হাওয়া
- যদি ভালো না লাগে তো দিও না মন, শুধু দূরে যেতে কেন বলো এমন
- যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই কেন মনে রাখ তারে
- মন-ময়ূরী ছড়ালো পেখম তারি হচ্ছে সলিল চৌধুরীর আধুনিক বাংলা প্রেমের গান
- নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল
- শেফালী তোমার আঁচলখানি বিছাও শারদ প্রাতে, চরণে চরণে তোলো রিনিঝিনি
- আমার আঁধার ঘরের প্রদীপ যদি নাইবা জ্বলে, কণ্ঠ-মালার বকুল যদি যায় গো দ’লে
গানটি কমল দাশগুপ্তের সুরে ইউটিউবে শুনুন
তথ্যসূত্র ও নোট
১. লেখাটি ৩ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো। গানের কথা সুধীর চক্রবর্তী সংকলিত ও সম্পাদিত আধুনিক বাংলা গান, প্যাপিরাস কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১ বৈশাখ ১৩৯৪, পৃষ্ঠা ১৩১ থেকে নেয়া হয়েছে।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।