উৎপাদন পদ্ধতি হচ্ছে মার্কসবাদী ঐতিহাসিক বস্তুবাদ তত্ত্বের অন্যতম উপাদান

উৎপাদন পদ্ধতি বা উৎপাদন প্রণালী বা উৎপাদন ব্যবস্থা বা উৎপাদনের উপায় (ইংরেজি: Mode of Production) হচ্ছে বৈষয়িক সামগ্রী অর্জনের নির্দিষ্ট প্রণালী। এটি মার্কসবাদী ঐতিহাসিক বস্তুবাদ তত্ত্বের অন্যতম উপাদান যাকে সামাজিক অর্থনৈতিক গঠনরূপের ভিত্তি বলা হয়। উৎপাদন পদ্ধতি হচ্ছে ইতিহাস নির্দেশিত এমন একটি প্রণালী যার মাধ্যমে উৎপাদন ও ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্যে পণ্য সংগৃহীত হয়। উৎপাদিকা শক্তিউৎপাদন সম্পর্কের যোগফলে উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে;— এই উপাদান দুটি পরস্পর নির্ভর ও সম্পৃক্ত।[১]

উৎপাদিকা শক্তির মধ্যে রয়েছে মানব শ্রমশক্তি এবং উৎপাদনের উপকরণ। উৎপাদনের উপকরণ বা উৎপাদনের উপায় বলতে বোঝায় সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি, কারখানা ভবন, অবকাঠামো, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, কাঁচামাল, উদ্ভিদ, প্রাণী এবং শোষণযোগ্য জমি।

উৎপাদনের সামাজিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে রয়েছে সম্পত্তি, ক্ষমতা এবং সমাজের উৎপাদনের উপকরণ নিয়ন্ত্রণ সম্পর্ক (আইনি কোড), সমবায়ী কাজের সংস্থা, মানুষ এবং তাদের কাজের বস্তুর মধ্যে সম্পর্ক এবং সামাজিক শ্রেণীর মধ্যে সম্পর্ক।

মার্কস বলেছিলেন যে, একজন ব্যক্তির উৎপাদন ক্ষমতা এবং সামাজিক সম্পর্কে অংশগ্রহণ সামাজিক পুনরুৎপাদনের দুটি অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য, এবং পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতিতে সেই সামাজিক সম্পর্কের বিশেষ ধরণ মানুষের উৎপাদন ক্ষমতার ক্রমবর্ধমান বিকাশের সাথে সহজাতভাবে সাংঘর্ষিক।

এই ধারনার একটি পূর্বসূরী ধারণা ছিল অ্যাডাম স্মিথের জীবিকা নির্বাহের পদ্ধতি; যাতে বলা হয় সমাজের নাগরিকরা কীভাবে তাদের বস্তুগত চাহিদা পূরণ করে তার উপর ভিত্তি করে সমাজের বিভিন্ন ধরণের অগ্রগতি বর্ণনা করা হয়।

উৎপাদন পদ্ধতি পরিভাষাটি এসেছে জার্মান শব্দ Produktionsweise থেকে এসেছে যার ইংরেজি অর্থ হচ্ছে Mode of Production বা “the way of producing” বাংলায় যেটিকে মাঝে মাঝে উৎপাদনের উপায়ও বলা হয়।

ধারণার তাৎপর্য

ইতিহাসে পরম্পরাক্রমে পাঁচ ধরনের উৎপাদন ব্যবস্থাকে দেখা যায়; আদিম গােষ্ঠীগত, দাসমালিকানা প্রথা, সামন্তবাদী, পুঁজিবাদী এবং সমাজতন্ত্রী — প্রত্যেকটির নিজস্ব সামাজিক-সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। মার্কস উৎপাদন ব্যবস্থার ধারণাটি স্পষ্ট করে তুলে ধরেন: “বস্তুগত জীবনে উৎপাদন পদ্ধতি জীবনের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়াগুলির সাধারণ চরিত্র নির্ধারণ করে।”[২]

মার্কস বিবেচনা করেছিলেন যে মানুষ যেভাবে ভৌত জগতের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে এবং সামাজিকভাবে একে অপরের সাথে যেভাবে সম্পর্ক স্থাপন করে তা নির্দিষ্ট এবং প্রয়োজনীয় উপায়ে আবদ্ধ: “মানুষ [যারা] কাপড়, লিনেন, রেশম উৎপাদন করে… তারা সেই সামাজিক সম্পর্কও তৈরি করে যার মধ্যে তারা কাপড় এবং লিনেন তৈরি করে।” বেঁচে থাকার জন্য মানুষকে অবশ্যই ভোগ করতে হবে, কিন্তু ভোগ করার জন্য তাদের অবশ্যই উৎপাদন করতে হবে এবং উৎপাদনের সময় তারা এমন সম্পর্কে প্রবেশ করে যা তাদের ইচ্ছার বাইরে স্বাধীনভাবে বিদ্যমান।

পুরানো একটা উৎপাদন পদ্ধতির জায়গায় নতুন একটি উৎপাদন পদ্ধতি অনিবার্য, কারণ ক্রমবর্ধিষ্ণু উৎপাদিকা শক্তির সঙ্গে সাবেকি উৎপাদন সম্পর্কের বিরোধ ও বৈসাদৃশ্য দেখা দেয়।[৩]

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র

১. সোফিয়া খোলদ, সমাজবিদ্যার সংক্ষিপ্ত শব্দকোষ, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৯০, পৃষ্ঠা ২৩।
২. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ৪৯।
৩. অনুপ সাদি, ২১ ডিসেম্বর ২০১৮; রোদ্দুরে.কম, “উৎপাদন ব্যবস্থা কাকে বলে”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/encyclopedia/marxist-glossary/mode-of-production/

Leave a Comment

error: Content is protected !!